বিশ্বের বৃহত্তম মাছটিকে কেন কেউ এখনো ধরতে পারল না

প্রায় ২০ বছর আগে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার মেকং নদীতে কাজ করার সময় মৎস্য জীববিজ্ঞানী জেব হোগান একটি বিশেষ আইডিয়া পান। তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিঠাপানির মাছ খুঁজে বের করা ও সেগুলোকে বাঁচানোর জন্য ‘মেগাফিশেস প্রজেক্ট’ শুরু করেন। নেভাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিজ্ঞানীর মনে প্রশ্ন ছিল, কোন মাছটি আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়? হোগান বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, এর উত্তর খুব সহজেই পেয়ে যাব। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল।’

হোগান বছরের পর বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন নদী–নালা ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি ন্যাট জিও ওয়াইল্ড চ্যানেলের জনপ্রিয় ‘মনস্টার ফিশ’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবেও কাজ করেছেন। এই খোঁজাখুঁজির মধ্যে ২০০৫ সালে থাইল্যান্ডে একটি বিশাল মেকং জায়ান্ট ক্যাটফিশ ধরা পড়ে, যার ওজন ছিল প্রায় ২৯৩ কেজি। এই মাছ দেখার পরই মূলত তাঁর মনে বড় মাছ খোঁজার আগ্রহ তৈরি হয়। তবে হোগান লক্ষ করেন, নদী বা হ্রদের এই বিশাল মাছগুলো নিয়ে বিজ্ঞানীদের খুব একটা গবেষণা নেই। উল্টো অতিরিক্ত শিকার ও পরিবেশদূষণের কারণে এই বড় প্রজাতির মাছগুলো দিন দিন কমে যাচ্ছে। এদের অনেকগুলোই এখন বিলুপ্তির মুখে।

বিজ্ঞানীদের সেই দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির অভিজ্ঞতা নিয়ে জেব হোগান একটি বই লেখা শুরু করেন। ‘চেজিং জায়ান্টস: ইন সার্চ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স লার্জেস্ট ফ্রেশওয়াটার ফিশ’ নামের এই বই নেভাদা ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বইটির পাণ্ডুলিপি শেষ করার পরেও হোগান নিশ্চিত ছিলেন না পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিঠাপানির মাছ আসলে কোনটি।

আরও পড়ুন

ঠিক তখনই কম্বোডিয়ায় হোগানের গবেষণা দলের কাছে একটি জরুরি ফোন আসে। স্থানীয় জেলেরা মেকং নদীতে একটি বিশাল আকৃতির স্টিংরে বা শাপলাপাতা মাছ ধরেছিলেন। মাপার পর দেখা গেল, মাছটি ১৩ ফুট লম্বা এবং এর ওজন প্রায় ৩০০ কেজি। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ২০২২ সালে এই স্টিংরে মাছটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির মাছ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এই আবিষ্কার নদীর বড় বড় প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখার লড়াইকে আরও সহজ করে তুলেছে। ২০০৫ সালের সেই ক্যাটফিশটিকে মেরে বাজারে বিক্রি করা হলেও এই রেকর্ড গড়া স্টিংরেটিকে কিন্তু মারা হয়নি। গবেষকেরা মাছটির শরীরে একটি ট্র্যাকিং ডিভাইস লাগিয়ে সেটিকে আবার নদীতে জীবিত ছেড়ে দিয়েছেন। এর ফলে বিজ্ঞানীরা এখন পানির নিচে মাছটির চলাচল ও জীবনযাত্রা নিয়ে নতুন সব তথ্য জানতে পারছেন, যা আগে কখনোই জানা সম্ভব ছিল না।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মেকং নদীর বিশালাকার জায়ান্ট বার্ব ও জায়ান্ট ক্যাটফিশ হয়তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিঠাপানির মাছের তালিকায় আমাজনের অ্যারাপাইমা ও ইউরোপের ওয়েলস ক্যাটফিশের নাম থাকলেও ওজনের দিক দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে যায় দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার মিঠাপানির বিশালাকার স্টিংরে। বিজ্ঞানী জেব হোগান থাইল্যান্ডের মে ক্লোং নদীতে একবার একটি রেকর্ড ভাঙার মতো বড় স্টিংরে ধরলেও উপযুক্ত দাঁড়িপাল্লার অভাবে সেটির ওজন মাপতে পারেননি।

হোগান সন্দেহ করতেন কম্বোডিয়ার মেকং নদীর গভীর পানির গর্তগুলোয় আরও বড় স্টিংরে লুকিয়ে আছে। এই লক্ষ্যে ২০১৭ সাল থেকে তিনি ওয়ান্ডার্স অব দ্য মেকং প্রকল্পের কাজ শুরু করেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির সহায়তায় তিনি মেগাফিশ নামের একটি তালিকা তৈরি করেছেন। এ তালিকায় অন্তত ৬ ফুট লম্বা, আর প্রায় ৯১ কেজি ওজনের দুই ডজনের বেশি প্রজাতির মাছ রয়েছে, যার মধ্যে বিশাল কার্প, ক্যাটফিশ, ইলেকট্রিক ইল ও প্রকাণ্ড অ্যালিগেটর গার মাছ অন্তর্ভুক্ত।

আরও পড়ুন

এই বিশাল মাছগুলো মূলত নদীর পরিবেশ ভালো থাকার লক্ষণ। কিন্তু অতিরিক্ত শিকার, বাঁধ, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদী থেকে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। হোগানের গবেষণার শুরুতেই ২০ ফুটের বেশি লম্বা চায়নিজ প্যাডেলফিশ পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। হোগান বলেন, ‘কোটি কোটি বছর ধরে টিকে থাকা এই প্রাচীন মাছগুলো আমাদের চোখের সামনেই হারিয়ে যাচ্ছে।’ তবে তিনি এখনো আশা হারাননি এবং ৬৬১ পাউন্ডের চেয়ে বড় কোনো মেগাফিশের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মতে, ‘বড় মাছগুলো এখনো নদীতে টিকে আছে এবং আমাদের উচিত এদের রক্ষা করা।’

তবে কম্বোডিয়ায় গবেষণারত আমেরিকান বিজ্ঞানীরা প্রথমবার রেকর্ড গড়া একটি স্ত্রী স্টিংরে মাছের শরীরে ট্র্যাকিং ডিভাইস লাগিয়ে দেন। পানির নিচের রিসিভার থেকে দেখা যায়, মাছটি সব সময় নদীর একটি নির্দিষ্ট এলাকার আশপাশেই থাকে। তাই ওই অঞ্চলকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করলে এদের সহজে রক্ষা করা সম্ভব। কম্বোডিয়ার মৎস্য কর্মকর্তা হেং কং জানান, স্থানীয় মানুষকে সচেতন করে এই বিশাল মাছগুলোকে বাঁচানোর পরিকল্পনা চলছে।

জেব হোগানের বড় মাছের খোঁজ এখনো শেষ হয়নি। কারণ, জেলেরা দাবি করেন, নদীতে এর চেয়ে বড় স্টিংরে রয়েছে। এদিকে কিছু বিজ্ঞানীর ধারণা, আমাজনের অ্যারাপাইমা মাছ ওজনে কম্বোডিয়ার স্টিংরের সমান হতে পারে। গবেষণা বলছে, ব্রাজিলের চেয়ে গায়ানার এসেকুইবো নদীর অ্যারাপাইমা মাছ অনেক বেশি ভারী হয়। ব্রাজিলে ধরা পড়া ১০ ফুট লম্বা ও ৫৪০ পাউন্ডের একটি অ্যারাপাইমা গায়ানার নদী হলে ওজনে প্রায় ৩১৭ কেজি ছাড়িয়ে যেত। অধ্যাপক ডোনাল্ড স্টুয়ার্ট আশা করছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অ্যারাপাইমা মাছটি গায়ানা থেকেই মিলবে। হোগান স্পষ্ট করেন, তাঁর অভিযানের উদ্দেশ্য শুধু রেকর্ড গড়া নয়; বরং এই প্রাচীন ও বিশাল প্রাণীগুলো সম্পর্কে নতুন তথ্য জানা।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
আরও পড়ুন