অতিরিক্ত গরম কীভাবে আমাদের শরীরের ক্ষতি করে
যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো অতিরিক্ত গরম বা তাপপ্রবাহ। মানুষের শরীর সাধারণ উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা এখন সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে আমাদের শরীরের মানিয়ে নেওয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। দিন দিন যেভাবে তাপপ্রবাহ বাড়ছে, তাতে এই অতিরিক্ত গরম কেন আমাদের জন্য এতটা বিপজ্জনক ও কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন, তা জানা সবার জন্যই জরুরি। যখন চারপাশের আবহাওয়া প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে, তখন মূলত আমাদের শরীরের ভেতরে কী ঘটে, চলো তা জেনে নেওয়া যাক।
আমাদের শরীর যেভাবে অতিরিক্ত গরম সামাল দেয়
বাইরে প্রচণ্ড গরম পড়লে কিংবা কঠোর পরিশ্রমের কারণে যখন আমাদের শরীর গরম হতে শুরু করে, তখন শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখার জন্য একটি চমৎকার ব্যবস্থা চালু করে। এ প্রক্রিয়ায় শরীর তার ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে গরম রক্তকে বাইরের দিকে সরিয়ে দেয় ও ঠান্ডা রক্তকে ভেতরের দিকে পাঠিয়ে দেয়। শরীর মূলত দুটি প্রধান কৌশলে এই কাজ করে।
প্রথমত, শরীর তার ভেতরের বাড়তি তাপকে ত্বকের মাধ্যমে বাইরে বের করে দেওয়ার জন্য রক্তের দিক পরিবর্তন করে। শরীরের কেন্দ্রস্থল বা ভেতর থেকে রক্ত তখন ত্বকের উপরিভাগের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ত্বকের নিচের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো রক্তে ভরে যায়। ঠিক এ কারণেই প্রচণ্ড গরম লাগলে মানুষের মুখাবয়ব বা চেহারা অনেক সময় লালচে দেখায়।
দ্বিতীয়ত, শরীরকে ঠান্ডা করতে ঘাম হওয়া শুরু হয়। ত্বক থেকে যখন ঘাম বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে যায়, তখন তা আমাদের ত্বককে শীতল করে তোলে। এই শীতল ভাব ত্বকের ঠিক নিচে থাকা রক্তকেও ঠান্ডা করে দেয়। পরবর্তী সময় সেই ঠান্ডা রক্ত আবার শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলোয় ফিরে যায় এবং সেগুলোকে অতিরিক্ত গরম হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে।
আমাদের শরীর তার ভেতরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য এই দুটি কৌশল সব সময়ই ব্যবহার করে। এমনকি যখন আমাদের খুব বেশি গরম লাগে না তখনো এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
অতিরিক্ত গরমে শরীরের ভেতর কী ঘটে
যখন চারপাশের বাতাসের তাপমাত্রা আমাদের ত্বকের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন শরীর বাইরে তাপ ছাড়ার বদলে উল্টো চারপাশ থেকে বেশি তাপ শুষে নিতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে বাতাসের আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্পের পরিমাণ একটি বড় ভূমিকা রাখে। আবহাওয়া শুষ্ক থাকলে অনেক বেশি তাপমাত্রায়ও শরীর থেকে ঘাম সহজে বাতাসে বাষ্প হয়ে উড়ে যায় এবং শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বা ভ্যাপসা গরম বেশি থাকলে ঘাম আর বাষ্প হতে পারে না; বরং তা কেবল গা বেয়ে ঝরতেই থাকে, শরীরকে মোটেও ঠান্ডা করতে পারে না। ঠিক এ কারণেই শুষ্ক গরমের চেয়ে ভ্যাপসা বা আর্দ্র গরম আমাদের কাছে অনেক বেশি অসহ্য ও ক্লান্তিকর মনে হয়।
শরীরকে ঠান্ডা রাখার এই বাড়তি লড়াইয়ের কারণে আমাদের হৃৎপিণ্ডকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। শরীরের বাইরের অংশে রক্ত চলাচলের গতি বাড়াতে গিয়ে হৃৎস্পন্দন বা হার্টবিট দ্রুত বেড়ে যায়। এতে রক্তচাপ কমে যায়। তাপপ্রবাহের সময় হঠাৎ উঠে দাঁড়াতে গিয়ে অনেকের অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণই হলো এই রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া। এর ওপর অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর যখন পানিশূন্য হয়ে পড়ে, তখন রক্তে পানির পরিমাণ কমে যায়, যা রক্তচাপকে আরও বিপজ্জনক স্তরে নামিয়ে আনে।
এই পরিস্থিতি সবার জন্য একরকম নয়। বয়স্ক মানুষ ও যাদের ডায়াবেটিসের মতো রোগ আছে, তাদের জন্য ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মতো সাধারণ তাপমাত্রাও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চরম ঝুঁকিতে থাকেন। কারণ, অতিরিক্ত গরম তাদের দুর্বল হৃৎপিণ্ডের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।
যাঁরা তরুণ ও সুস্থ, সাময়িকভাবে অতিরিক্ত গরমে তাঁদের শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা বড়জোর এক বা দুই ডিগ্রি বাড়তে পারে এবং পরে তা আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। এতে সাময়িক অস্বস্তি হলেও শরীর বড় কোনো ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যায়।
শরীরের ভেতর যখন তাপমাত্রা সীমার বাইরে চলে যায়
শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে ১০১ থেকে ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি পৌঁছায় ও শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকে, তখন তাকে বলা হয় ‘হিট এগজোশন’ বা তাপজনিত অবসাদ। জ্বরের কারণেও শরীরের তাপমাত্রা এতটা বাড়তে পারে, কিন্তু জ্বরের ক্ষেত্রে শরীর নিজে থেকেই তা নিয়ন্ত্রণ করে বলে এই তীব্র ক্ষতিগুলো হয় না।
এ পর্যায়ে শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ে ও যেকোনো কাজ করতে গেলে পেশিগুলো দ্রুত অবশ হয়ে আসে। মূলত আমাদের মস্তিষ্কই শরীরকে অতিরিক্ত তাপমাত্রা থেকে বাঁচাতে এই ক্লান্তির সংকেত পাঠায়; যাতে আমরা কাজ থামিয়ে বিশ্রাম নিই। এর পাশাপাশি বমি বমি ভাব, তীব্র মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড় করা ও ঘন ঘন ছোট ছোট শ্বাস নেওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
বিপদ আরও বাড়ে, যখন শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি বা তার ওপরে চলে যায়। এ অবস্থাকে বলা হয় হিটস্ট্রোক। এ পর্যায়ে এসে মানুষের রক্তচাপ বা ব্লাডপ্রেশার মারাত্মকভাবে কমে যায়। যার ফলে শরীরের ভেতরের প্রধান অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো প্রয়োজনীয় রক্ত ও অক্সিজেন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। এমনকি তীব্র উত্তাপ সরাসরি আমাদের শরীরের কোষগুলোকে মেরে ফেলে, যা শেষ পর্যন্ত অঙ্গ বিকল হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।