ফিসফিস করে কথা বললে দূর থেকে শোনা যায় না কেন
মাঝরাত। চারদিকে পিনপতন নীরবতা। পুরো বাড়ি ঘুমে কাদা। তুমি আর তোমার ছোট ভাই পা টিপে টিপে অন্ধকার বারান্দা দিয়ে এগোচ্ছ। উদ্দেশ্য, ফ্রিজ খুলে গতকালের বেঁচে যাওয়া কেকটুকু লুকিয়ে সাবাড় করা! একটু জোরে শব্দ হলেই মা–বাবা জেগে যাবেন, তারপরই শুরু হবে বকাঝকা। ঠিক এমন সময় ভাইকে খুব জরুরি একটা কথা বলা দরকার। তুমি খুব সাবধানে গলার স্বর একেবারে নামিয়ে ফিসফিস করে বললে, ‘আস্তে হাঁট, বাবা টের পেলে খবর আছে!’ কথাগুলো ঠিকই তোমার ভাইয়ের কান পর্যন্ত পৌঁছাল। সে তোমার কথা বুঝতেও পারল। কিন্তু একটা ব্যাপার খেয়াল করেছ? তোমার গলার সেই চিরচেনা স্বাভাবিক স্বরটা কিন্তু পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে!
গলার স্বর লুকিয়ে ফিসফিস করে আমরা সবাই কথা বলতে পারি। কিন্তু কখনো কি মনে এ প্রশ্ন জেগেছে যে ফিসফিস করে কথা বলার সময় আমাদের গলার আসল আওয়াজটা কোথায় হারিয়ে যায়? কেন তখন শুধু হিসহিস আওয়াজ বের হয়?
ফিসফিসানির বিজ্ঞান বোঝার আগে আমাদের জানতে হবে, স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা কথা বলি কীভাবে। আমাদের গলার ভেতর একটা অদ্ভুত সুন্দর যন্ত্র আছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ল্যারিংস বা স্বরযন্ত্র। এই স্বরযন্ত্রের ভেতরে খুব নরম ও পাতলা দুটি পর্দা আছে। এদের নাম ভোকাল কর্ড। বাংলায় বলে স্বরতন্ত্রী। তুমি এগুলোকে একটা গিটারের তার কিংবা রাবার ব্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করতে পারো।
তুমি যখন কথা বলতে চাও, তখন ফুসফুস থেকে বাতাস প্রবল বেগে ওপরের দিকে উঠে আসে। এই বাতাস গলার ভেতর দিয়ে বের হওয়ার সময় ভোকাল কর্ডের গায়ে ধাক্কা দেয়। বাতাসের ধাক্কায় ভোকাল কর্ড দুটি কাঁপতে শুরু করে। ঠিক যেমন গিটারের তারে আঙুল দিলে সেটা কাঁপে, তেমন। এই কাঁপুনি থেকেই মূলত তোমার গলার আসল আওয়াজ তৈরি হয়।
তোমার গলার আওয়াজ কখনো খুব তীক্ষ্ণ হয়, আবার কখনো বেশ ভারী শোনায়। এটা কীভাবে হয়? পুরো ব্যাপারটা নির্ভর করে তোমার গলার পেশির ওপর। গলার পেশিগুলো যখন ভোকাল কর্ডকে খুব শক্ত করে টেনে ধরে, তখন গলার স্বর চিকন হয়। আবার পেশিগুলো যখন একটু ঢিলা বা শিথিল থাকে, তখন আওয়াজ ভারী হয়। অর্থাৎ তুমি কীভাবে কথা বলবে, তা ঠিক করে দেয় এই ভোকাল কর্ডের টান।
এবার আসা যাক আমাদের মূল প্রশ্নে। ফিসফিস করে কথা বলার সময় গলার আওয়াজ হারিয়ে যায় কেন? তুমি যখন ফিসফিস করে কথা বলার সিদ্ধান্ত নাও, তখন তোমার মস্তিষ্ক গলার পেশিগুলোকে এক অদ্ভুত নির্দেশ দেয়। স্বাভাবিক কথা বলার সময় ভোকাল কর্ড দুটি কাছাকাছি এসে কাঁপতে থাকে। কিন্তু ফিসফিস করার সময় ভোকাল কর্ড দুটি একে অপরের থেকে কিছুটা দূরে সরে যায়। শুধু দূরে সরেই যায় না, গলার পেশিগুলো এদের এমন শক্ত ও টান টান করে ধরে রাখে যে বাতাস ধাক্কা দিলেও এগুলো আর কাঁপতে পারে না!
যেহেতু ভোকাল কর্ড কাঁপে না, তাই তোমার গলার সেই স্বাভাবিক আওয়াজটাও তৈরি হয় না। ভাবতে পারো, ভোকাল কর্ড যদি না-ই কাঁপে, তাহলে অন্যরা ফিসফিসিয়ে বলা কথা শুনতে পায় কীভাবে? এর কারণ বাতাস। ভোকাল কর্ড দুটি যখন একটু দূরে সরে টান টান হয়ে থাকে, তখন তাদের মাঝখানে একটা সরু ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। ফুসফুস থেকে আসা বাতাস প্রচণ্ড বেগে হুঁশ করে ওই সরু ফাঁকা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে যায়।
সরু জায়গা দিয়ে জোর করে বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে একধরনের তীব্র ঘর্ষণ তৈরি হয়। এই দ্রুতগামী বাতাস একসঙ্গে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন কম্পনের জন্ম দেয়। আমাদের কান এই মিশ্র কম্পনগুলোকে একটি হিসহিস শব্দ হিসেবে শুনতে পায়। এরপর সেই হিসহিস শব্দটাকে তোমার ঠোঁট, দাঁত ও জিব মিলে বিভিন্ন ধ্বনির রূপ দেয়। এভাবেই তৈরি হয় ফিসফিসানি!
অনেকেই মনে করেন, গলায় ব্যথা হলে ফিসফিস করে কথা বললে গলার বিশ্রাম হয়। কিন্তু বিজ্ঞানের মতে এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা! ফিসফিস করে কথা বলার সময় গলার পেশিগুলো ভোকাল কর্ডকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত করে টেনে রাখে। ফলে গলার ওপর আরও বেশি চাপ পড়ে। এ জন্যই গায়কদের গলা ভেঙে গেলে চিকিৎসকেরা কখনোই তাঁদের ফিসফিস করে কথা বলতে দেন না। তার চেয়ে বরং চুপ থাকাটা গলার জন্য অনেক বেশি উপকারী।
অর্থাৎ তুমি যখন কারও সঙ্গে ফিসফিস করে কোনো গোপন কথা বলো, তখন সেই কথাকে গোপন রাখতে তোমার ভোকাল কর্ড দুটিকে কিন্তু কম কষ্ট করতে হয় না!