খাই খাই

ধরো, অন্য একটা পৃথিবী কল্পনা করি। যে পৃথিবীর মানুষরা একটু দুষ্টু। ‘একটু দুষ্টু’ মানে—তাদের এমনিতে আচার–ব্যবহার ভালোই, কিন্তু খাবার বেলায় অদ্ভুত কিছু কাণ্ড করে তারা। খাবার জন্য যদি তিনটা কলা কেনে—তার মধ্যে একটা ছুড়ে ফেলে দেয়। বাকি দুইটা খায়। তিন চামচ ভাত প্লেটে নিলে এক চামচ ফেলে দেয়, বাকি দুই চামচ খায়।

বিদঘুটে না ব্যাপারটা?

আশ্চর্য হচ্ছে, কল্পনার প্রয়োজন নেই—কারণ আমাদের পৃথিবীতেই এই অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। সারা পৃথিবীতে যে পরিমাণ খাবার তৈরি হয়, তার তিন ভাগের এক ভাগ নষ্ট হয়ে যায়। অন্যভাবে বললে, প্রতিটি মানুষ গড়ে ১০০ কেজি খাবার নষ্ট করে, প্রতিবছর!

কেন আমরা এমনটা করি? একটু ভেবে দেখা যেতে পারে।

‘এমন খিদে পেয়েছে—আস্ত ঘোড়া খেয়ে ফেলতে পারব!’

কে কবে আস্ত ঘোড়া খেয়েছিল জানি না, তবে বাংলায় এই প্রবাদ দারুণ চালু। বছর কয়েক আগে, এক রাতে আমার মনে হয়েছিল, আসলেই বোধ হয় আমি একটা ঘোড়া খেতে পারব। সারা দিন ক্লাস করে সেই রাতে চার বন্ধু বেরিয়েছিলাম ‘দারুণ খিদে’ নিয়ে। পুরান ঢাকার একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে চোখ বন্ধ করে বলে দিয়েছিলাম, মামা, চার প্লেট কাচ্চি!

আমাদের কোনো একজনের হাতে সেই রাতে পয়সা ছিল—খরচের কথা চিন্তা করিনি।

সমস্যাটা শুরু হলো, যখন দুই গ্রাস কাচ্চি মুখে দিলাম। খাবার বেশ ভালো ছিল—কিন্তু আমরা কেউই এত বড় খাদক ছিলাম না যে আস্ত এক প্লেট কাচ্চি সাবাড় করে দিতে পারব! আধ প্লেট করে খেলেই একেকজনের বেশ চলে যেত।

আধখাওয়া খাবার তো ফেরত দেওয়া যায় না। আমরা শুকনো মুখ করে যথাসম্ভব খেলাম। এরপর অপরাধীর মতো একটা চেহারা নিয়ে বসে থাকলাম।

আমি ঠিক জরিপ করিনি, তবে আমার বিশ্বাস, এই ঘটনা মোটামুটি সবার জীবনেই ঘটেছে। কোনো না কোনো দিন আমাদের মনে হয়েছে, ‘আস্ত একটা ঘোড়া খেয়ে ফেলতে পারব,’ এবং একগাদা খাবার নিয়ে বসে আবিষ্কার করেছি, আমরা কোনো দিনই ঘোড়াটা খেতে পারব না।

‘কলার শেষ হালিটা কিনব না’

তোমরা কখনো অবেলায় বাজারে গিয়েছ? একটু রাতের দিকে, যখন বাজার ‘উঠে যাই যাই’ করছে—তখন শুনেছ, কেউ তড়িঘড়ি করে সবজি কিনতে যাচ্ছে?

সম্ভাবনা কম। শেষবেলায় কাঁচাবাজারের ঝুড়িতে প্রায় কিছুই থাকে না। যদিও বা একটা পুঁইশাকের আঁটি থাকে—সেটা কিনতে কেউ বিশেষ আগ্রহ দেখাবে না।

আমরা একটা থট এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে পারি। ধরো, তুমি এক হালি কলা কিনতে বাজারে গিয়েছ। গিয়ে দেখলে, দুজন বিক্রেতা বসে আছেন। একজনের কাছে চারটা কলাই আছে। অন্যজন কয়েক কাঁদি কলা নিয়ে আছেন। তুমি কার কাছ থেকে কলা নেবে?‘কলার শেষ হালিটা কিনব না’

তোমরা কখনো অবেলায় বাজারে গিয়েছ? একটু রাতের দিকে, যখন বাজার ‘উঠে যাই যাই’ করছে—তখন শুনেছ, কেউ তড়িঘড়ি করে সবজি কিনতে যাচ্ছে?

সম্ভাবনা কম। শেষবেলায় কাঁচাবাজারের ঝুড়িতে প্রায় কিছুই থাকে না। যদিও বা একটা পুঁইশাকের আঁটি থাকে—সেটা কিনতে কেউ বিশেষ আগ্রহ দেখাবে না।

আমরা একটা থট এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে পারি। ধরো, তুমি এক হালি কলা কিনতে বাজারে গিয়েছ। গিয়ে দেখলে, দুজন বিক্রেতা বসে আছেন। একজনের কাছে চারটা কলাই আছে। অন্যজন কয়েক কাঁদি কলা নিয়ে আছেন। তুমি কার কাছ থেকে কলা নেবে?

বেশির ভাগ মানুষ দ্বিতীয়জনের কাছ থেকেই কলা নেবে!

কারণটা স্পষ্ট। আমরা সাধারণত মনে করি, সবার শেষে যে জিনিসটা পড়ে থাকে, সেটায় কোনো খুঁত আছে। সমস্যা হলো, ব্যাপারটা প্রায়ই সত্যি নয়। চিন্তা করে দেখো, তোমার পরিচিত ফলওয়ালা—যিনি ভালো আপেল বেচেন, আপেল কেনার সময় কি তিনি বেছে বেছে খানিকটা পচা আপেল কেনেন?

কার্টুন: ডেমিয়েন গ্লেজ

অথচ দিনের শেষে তিনটা ভালো আপেল একা পড়ে থাকবে। কারণ ওইটুকু কেউ কিনবে না।

এই জন্য বিক্রেতারা, বিশেষ করে সুপারমার্কেটের বিক্রেতারা যে কাজটা করেন—প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস তাঁরা কিনে রাখেন। এক হালি কলা নিয়ে বসে থাকলে সেটা কোনো দিনই বিক্রি হবে না। তাই কলা কেনা হয় কাঁদি কাঁদি। সেটা বিক্রিও হয় প্রচুর, আর যেটুকু বিক্রি হয় না—সোজা ফেলে দেওয়া হয়।

এই পরিমাণটা ভয়াবহ। সারা পৃথিবীতে যেটুকু ফল-সবজি তৈরি হয়, তার ৪৫ শতাংশ কোনো দিনই কেউ খায় না। স্রেফ ফেলে দেয়।

‘সর্বনাশ! পাউরুটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে’

যেসব খাবার মোড়কজাত, সেগুলোর গায়ে দেখবে একটা মেয়াদ দেওয়া থাকে। যে পাউরুটি আজ কিনলে, সেটার মেয়াদ হয়তো লেখা তিন দিন।

কী হয় মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর? কিংবা, মেয়াদের তারিখটা আদৌ কেন দেওয়া হয়?

সত্যি যদি বলি, বহুদিন পর্যন্ত আমি নিজেও ভাবতাম, এসব ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করে বের করা হয় যে একটা খাবার কত দিন পর্যন্ত ভালো থাকবে, কোনো দিন নষ্ট হয়ে যাবে এবং কবে আর খাওয়া যাবে না।

আশ্চর্য হলো, এটা সত্যি নয়! খাবারের মোড়কে মেয়াদের যে তারিখ লেখা থাকে, সেটা কেবল উৎপাদনকারীর একটা ‘অনুমানের চেষ্টা’—কত দিন পর্যন্ত খাবারটা খাওয়া যেতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ এমনভাবে লেখা হয়, যেন খাবারটা বিক্রিও হয়ে যায়, আবার কারো বাসায়ও যেন দিনের পর দিন পড়ে না থাকে।

যেমন পাউরুটির ক্ষেত্রে—যদি ফ্রিজে রাখা হয় এবং মোটামুটি ভালো মানের পাউরুটি হয়, সেটা দুই সপ্তাহ পরও আরামে খাওয়া যেতে পারে।

কার্টুন: লুয়ো জি

সমস্যা হলো, আমার মতোই ব্যাপারটা অনেকের অজানা। তাই যে খাবারের মেয়াদ শেষ হয়ে আরও দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে, সেটা খাওয়ার সাহস আমরা করি না এবং দিন শেষে সেটার জায়গা হয় ময়লার ঝুড়িতে।

‘বিয়ে হলো, খাওয়া কই?’

এই ব্যাপারটা অবশ্য আমি এখনো ঠিক বুঝি না—বিয়ের সঙ্গে খাওয়াদাওয়ার সম্পর্কটা কোথায়। সংবিধানে কি কোথাও লেখা আছে, ‘নারী ও নর পরস্পর বিবাহ করিলে তাহারা পরিচিত ও অর্ধপরিচিত প্রতিটি মানুষকে উপযুক্ত পরিমাণে খাদ্য ভক্ষণ করাইতে বাধ্য থাকিবে’?

যেহেতু বুঝি না—বিয়ের আসর থেকেও দূরে থাকারই চেষ্টা করি। কিন্তু যেহেতু মানুষ হয়েই জন্মেছি, বেশ কটা বিয়ে আমাকে দেখতে হয়েছে। প্রতিটাতেই একটা জিনিস খুব চোখে লেগেছে—খাবার ওড়ানো। একটা দল করে মানুষ খেতে বসে, পাহাড়সমান খাবার একেকজনের পাতে তুলে দেওয়া হয় এবং যখন তারা ওঠে, খুব কম মানুষের প্লেটই ঝকঝক করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টেবিলে যে পরিমাণ খাবার পড়ে থাকে—সেটা দিয়ে একটা দরিদ্র পরিবারকে সারা দিন পেট পুরে খাওয়ানো যায়।

এতে যা এসে যায়

উত্তরটা স্পষ্ট। সারা পৃথিবীতে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ এখনো পেট ভরে খেতে পায় না। আমাদের দেশেই প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু এখনো অপুষ্টিতে ভোগে। যে পৃথিবীতে শিশুরা না খেয়ে থাকে, সেখানেই কিছু মানুষ খাবার নষ্ট করে এবং মানুষটা আমি নিজেই—ব্যাপারটা আমাকে পীড়া দেয়।

এটা অনেক বড় একটা সমস্যা। এই সমস্যার সমাধানে কী করা যায়, তা নিয়ে আমরা কথা বলব। কিন্তু তার আগে ছোট্ট করে আরেকটা কথা বলা দরকার।

যেসব খাবার আমরা ফেলে দিই, সেগুলো শেষ পর্যন্ত পচে যায় এবং একসময় মিশে যায় মাটিতে। ব্যাপারটা মন্দ শোনায় না। কারণ আমরা জানি, খাবার যদি প্লাস্টিক হতো, তাহলে কয়েক শ বছর ধরে পচত না এবং পরিবেশে এক শ রকম দূষণ ঘটাত।

সমস্যাটা আসে অন্যদিক দিয়ে। একসঙ্গে এত খাবার যখন পচে, সেখানে প্রচুর পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি হয়। তোমরা কেউ কেউ নিশ্চয়ই জানো, বর্তমান পৃথিবীর একটা বড় সমস্যা এই গ্রিনহাউস গ্যাস। বাতাসে এসব গ্যাসের পরিমাণ যেভাবে বাড়ছে, সেটা যদি বন্ধ না করা যায়, তাহলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে একটা বিপর্যয় ঘটবে। সত্যি বলতে কী, ‘ঘটবে’ বলাটা ভুল। কিছু বিপর্যয় আমরা এখনই দেখতে শুরু করেছি (যেমন ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় হওয়া, গ্রীষ্মে অস্বাভাবিক গরম পড়া ইত্যাদি)।

কার্টুন: কুশল

আমরা কী পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বাতাসে ছাড়ি, সেই সংখ্যাটাও বিস্ময়কর—৫১ বিলিয়ন টন প্রতিবছর! সংখ্যাটা এত বড় যে আমি ঠিক গুনতেও পারি না, বিড়বিড় করে বলতে পারি কেবল। আমাদের লক্ষ্য এটাকে শূন্যে নামিয়ে আনা (হুম, শূন্য)!

এই ৫১ বিলিয়ন টনের মধ্যে ৩.৩ বিলিয়ন টনের পেছনে দায়ী আমাদের ফেলে দেওয়া আর পচে যাওয়া খাবার।

এই সংখ্যাটা একটু ছোট ছোট দেখায়। আমরা বোঝার চেষ্টা করতে পারি, এটা কত ছোট।

এই যেমন, আমরা বলতে পারি, ইউরোপের সব কটা দেশ মিলে যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে, ফেলে দেওয়া খাবার থেকে ঠিক সেই পরিমাণ গ্যাস বের হয়। কিংবা ফেলে দেওয়া খাবারগুলো তৈরি করতে খেতখামারে যেটুকু পানি নষ্ট হয়, সেটা সারা পৃথিবীর সব বাসায় ব্যবহার করা পানির সমান!

ব্যাপারটা স্পষ্ট—যখনই, যেখানেই আমরা একটু খাবার নষ্ট করি, সেটা একটা বিশাল বিপর্যয়ের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।