পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা মঞ্চনাটক
বলতে পারো, পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মঞ্চস্থ হওয়া নাটক কোনটি? উত্তরটা হলো ‘দ্য মাউসট্র্যাপ’।
১৯৫২ সালে লন্ডনের মঞ্চে প্রথমবারের মতো পর্দা উঠেছিল নাটকটির। এরপর পেরিয়ে গেছে সাত দশকেরও বেশি সময়। বদলে গেছে পৃথিবীর রাজনীতি, প্রযুক্তি আর মানুষের জীবনযাপন। কিন্তু লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডে নাটকটির প্রদর্শনী থামেনি। করোনাভাইরাস মহামারির সময় কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আবার মঞ্চে ফিরেছে ‘দ্য মাউসট্র্যাপ’। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই নাটক গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও জায়গা করে নিয়েছে।
কিন্তু কী এমন আছে এই রহস্যনাটকে, যার টানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দর্শকেরা থিয়েটারে ছুটে যাচ্ছেন? কীভাবে একটি নাটক এত বছর ধরে মানুষের আগ্রহ ধরে রেখেছে? সেই গল্প জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৪৭ সালে।
রানির জন্মদিনে এক বিশেষ উপহার
ব্রিটেনের রানি মেরি ছিলেন রহস্যকাহিনির ভক্ত। ১৯৪৭ সালে তাঁর ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে বিবিসি রেডিও বিশেষ একটি অনুষ্ঠান প্রচারের পরিকল্পনা করে। রানির কাছে জানতে চাওয়া হয়, তিনি কী শুনতে চান। রানি জানালেন, তাঁর প্রিয় লেখক আগাথা ক্রিস্টির লেখা একটি নতুন রেডিও নাটক শুনতে চান।
বিবিসি যোগাযোগ করল আগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে। রানির জন্মদিনের উপহার হিসেবে তিনি লিখে ফেললেন প্রায় ৩০ মিনিটের একটি রেডিও নাটক। নাম দিলেন ‘থ্রি ব্লাইন্ড মাইস’। নামটি নেওয়া হয়েছিল একটি পরিচিত ইংরেজি ছড়া থেকে।
১৯৪৭ সালের ৩০ মে বিবিসি রেডিওতে নাটকটি সম্প্রচারিত হয়। রানির পাশাপাশি সাধারণ শ্রোতারাও নাটকটি পছন্দ করেন। এর গল্পে ছিল রহস্য আর উত্তেজনা। ফলে আগাথা ক্রিস্টি ভাবলেন, ছোট্ট এই রেডিও নাটককে আরও বড় করে মঞ্চনাটক হিসেবে তৈরি করা যায়।
রানি কাহিনিতে পরিবর্তন আনলেন, যোগ করলেন নতুন চরিত্র ও রহস্যের নানা বাঁক। কিন্তু মঞ্চে আনার সময় দেখা দিল সমস্যা। ‘থ্রি ব্লাইন্ড মাইস’ নামে আরেকটি নাটক যুক্তরাজ্যের থিয়েটারে আগে থেকেই নিবন্ধিত ছিল। তাই নতুন নাটকের জন্য অন্য নাম খুঁজতে হলো।
নামের পেছনের গল্প
নাটকটির নতুন নাম কী হবে, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছিল। এ সময় আগাথা ক্রিস্টির মেয়ে রোসালিন্ডের স্বামী অ্যান্থনি হিকস একটি নাম প্রস্তাব করলেন দ্য মাউসট্র্যাপ।
নামটি এসেছিল বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেকসপিয়ারের হ্যামলেট নাটক থেকে। সেখানে যুবরাজ হ্যামলেট রাজা ও রানির সামনে একটি নাটক মঞ্চস্থ করার ব্যবস্থা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, নাটকটির মাধ্যমে অপরাধীর প্রতিক্রিয়া দেখে সত্যটা বের করে আনা। হ্যামলেট মজা করে নাটকটির নাম দিয়েছিলেন দ্য মাউসট্র্যাপ, অর্থাৎ ইঁদুর ধরার ফাঁদ।
আগাথা ক্রিস্টির রহস্যনাটকের সঙ্গেও নামটির দারুণ মিল ছিল। এখানেও কয়েকজন মানুষ একটি জায়গায় আটকা পড়ে। তাদের মধ্যে কে সত্য বলছে আর কে নিজের পরিচয় লুকাচ্ছে, তা বোঝা কঠিন। একের পর এক রহস্য উন্মোচিত হতে থাকে। তাই দ্য মাউসট্র্যাপ নামটিই শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হলো।
১৯৫২ সালের ৬ অক্টোবর ইংল্যান্ডের নটিংহামের থিয়েটার রয়্যালে প্রথম মঞ্চস্থ হয় নাটকটি। এরপর বিভিন্ন শহরে প্রদর্শনীর পর ২৫ নভেম্বর লন্ডনের অ্যাম্বাসেডরস থিয়েটারে শুরু হয় এর প্রদর্শনী। প্রযোজক ছিলেন পিটার সন্ডার্স। লন্ডনের প্রথম প্রদর্শনীতে অভিনয় করেন ব্রিটিশ অভিনেতা রিচার্ড অ্যাটেনবরো, তাঁর স্ত্রী শীলা সিমসহ আরও অনেকে।
প্রথম প্রদর্শনীর পর দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে নাটকটি প্রশংসা পায়। শুরু হয় এক দীর্ঘ যাত্রা, যা আজও নাটকের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
তুষারঝড়ের মধ্যে এক রহস্য
কী এমন গল্প আছে দ্য মাউসট্র্যাপে, যা মানুষকে এত বছর ধরে মুগ্ধ করে রেখেছে?
নাটকের কাহিনির কেন্দ্র লন্ডনের বাইরে অবস্থিত মঙ্কসওয়েল ম্যানর নামের একটি পুরোনো বাড়ি। জাইলস ও মলি র্যালস্টন নামের এক নবদম্পতি বাড়িটিকে অতিথিশালা হিসেবে চালু করেছে। কিন্তু তাদের নতুন ব্যবসার শুরুতেই দেখা দেয় বিপত্তি।
বাইরে শুরু হয় প্রচণ্ড তুষারঝড়। চারপাশ বরফে ঢেকে যায়। বন্ধ হয়ে যায় রাস্তাঘাট। টেলিফোনের সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়িটির বাসিন্দারা কার্যত আটকা পড়ে যায়।
এমন সময় সেখানে এসে হাজির হয় কয়েকজন অতিথি। তাদের প্রত্যেকের স্বভাব আলাদা, আর প্রত্যেকের মধ্যেই যেন কিছু একটা রহস্য লুকিয়ে আছে।
আছে ক্রিস্টোফার রেন নামের এক তরুণ স্থপতি, যার আচরণ বেশ অদ্ভুত। আছেন মিসেস বয়েল নামের এক অসন্তুষ্ট ও খিটখিটে স্বভাবের নারী। আছেন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেজর মেটকাফ এবং রহস্যময় মিস ক্যাসওয়েল। আরও আছেন মি. পারাভিচিনি নামের এক বিদেশি, যিনি তুষারঝড়ে গাড়ি আটকে যাওয়ায় বাড়িটিতে আশ্রয় নিয়েছেন।
সবাই যখন বাড়িটির ভেতরে আটকা, ঠিক তখন স্কি ব্যবহার করে বরফ পেরিয়ে সেখানে হাজির হন সার্জেন্ট ট্রটার নামের এক পুলিশ কর্মকর্তা।
ট্রটার জানান, লন্ডনে এক নারী খুন হয়েছেন। ঘটনাস্থলের কাছে পাওয়া একটি নোটবুকে মঙ্কসওয়েল ম্যানরের ঠিকানা লেখা রয়েছে। সেখানে রয়েছে থ্রি ব্লাইন্ড মাইস ছড়াটিরও উল্লেখ।
এর অর্থ কী? খুনি কি এই বাড়ির ভেতরেই রয়েছে? অতিথিদের মধ্যে কে বিপজ্জনক? আর কে হতে পারে খুনির পরবর্তী শিকার?
এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বাড়িতে ঘটে যায় আরেকটি খুন। অতিথিরা একে অপরকে সন্দেহ করতে শুরু করে। প্রত্যেকের অতীত নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। একদিকে তুষারঝড়, অন্যদিকে খুনির আতঙ্ক—সব মিলিয়ে বাড়িটি যেন পরিণত হয় এক রহস্যময় ফাঁদে।
এই রহস্যের সমাধান জানতে হলে নাটকটি দেখতে হবে। কারণ দ্য মাউসট্র্যাপ-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণই হলো এর শেষের চমক।
দর্শকের সঙ্গে এক গোপন চুক্তি
ইন্টারনেটের যুগে কোনো সিনেমা বা সিরিজের শেষের চমক গোপন রাখা কঠিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, কেউ গল্পের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা খুনির পরিচয় আগেভাগেই প্রকাশ করে দিয়েছে। একেই বলে স্পয়লার।
কিন্তু দ্য মাউসট্র্যাপ এত বছর ধরে দর্শকদের কাছে একটি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে আসছে—নাটকটির শেষ রহস্য যেন কেউ অন্যের কাছে প্রকাশ না করেন।
প্রতিটি প্রদর্শনীর শেষে অভিনেতারা মঞ্চে এসে দর্শকদের অভিবাদন জানান। এ সময় সার্জেন্ট ট্রটার চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা দর্শকদের উদ্দেশে নাটকের রহস্য গোপন রাখার অনুরোধ জানান। উদ্দেশ্য একটাই, যাঁরা পরে নাটকটি দেখতে আসবেন, তাঁরাও যেন অন্যদের মতো রহস্য উন্মোচনের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন।
এই অনুরোধ নাটকটির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। দর্শকেরাও যেন সেই গোপন চুক্তির অংশীদার। তাঁরা নাটক দেখে বেরিয়ে এসে খুনির পরিচয় প্রকাশ না করে অন্যদের জন্য রহস্যের আনন্দ অক্ষুণ্ন রাখেন।
ভাবো তো, এত বছর ধরে হাজার হাজার প্রদর্শনী হয়েছে। অসংখ্য দর্শক নাটকটি দেখেছেন। তবু নতুন দর্শকেরা এখনো গল্পের শেষটা না জেনেই নাটক দেখতে যেতে পারেন। রহস্যনাটকের জন্য এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে!
সিনেমা তৈরি হয়নি কেন
এত জনপ্রিয় একটি নাটক নিয়ে সিনেমা তৈরি হবে না কেন? এই প্রশ্ন মনে আসতেই পারে।
এর পেছনে রয়েছে আগাথা ক্রিস্টির একটি বিশেষ শর্ত। ১৯৫৬ সালে নাটকটির চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বত্ব বিক্রির সময় শর্ত দেওয়া হয়েছিল, লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডে নাটকটির প্রদর্শনী বন্ধ হওয়ার অন্তত ছয় মাস পরেই এর চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যাবে।
অর্থাৎ নাটকটির প্রদর্শনী বন্ধ হলেও সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়া যাবে না; বন্ধ হওয়ার পরও ছয় মাস অপেক্ষা করতে হবে। নাটকটি এখনো চলছে বলে এর কোনো অনুমোদিত চলচ্চিত্ররূপ তৈরি হয়নি।
তবে ২০২২ সালে মুক্তি পায় সি হাউ দে রান নামের একটি রহস্য-কমেডি চলচ্চিত্র। এর কাহিনি ১৯৫০-এর দশকের লন্ডনের থিয়েটারজগতে আবর্তিত হয়। দ্য মাউসট্র্যাপ নাটককে চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা এবং নাটকটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি হত্যাকাণ্ড এর কাহিনির অংশ। তবে এটি আগাথা ক্রিস্টির মূল নাটকের সরাসরি চলচ্চিত্ররূপ নয়।
রেকর্ডের পর রেকর্ড
সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা একটি নাটক কতটা জনপ্রিয় হতে পারে, তা দ্য মাউসট্র্যাপের ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়।
নাটকটি ১৯৫২ সালে নটিংহামে যাত্রা শুরু করে। পরে ১৯৫২ সালের ২৫ নভেম্বর লন্ডনের অ্যাম্বাসেডরস থিয়েটারে এর প্রদর্শনী শুরু হয়। ১৯৭৪ সালে এটি স্থানান্তরিত হয় সেন্ট মার্টিনস থিয়েটারে। সেই থেকে এই থিয়েটারই নাটকটির স্থায়ী মঞ্চ।
দীর্ঘ এই সময়ে নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন অসংখ্য অভিনেতা-অভিনেত্রী। বদলেছে অভিনয়শিল্পী, বদলেছে দর্শকদের কয়েকটি প্রজন্ম। কিন্তু গল্পের রহস্য আর মঞ্চের আকর্ষণ একইভাবে টিকে আছে।
২০১৯ সালের ১২ অক্টোবর লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডে নাটকটির ২৮ হাজারতম প্রদর্শনী হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ দ্য মাউসট্র্যাপ ৩০ হাজার প্রদর্শনীর মাইলফলক অতিক্রম করে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি অনুযায়ী, এটি বিশ্বের দীর্ঘতম সময় ধরে চলা মঞ্চনাটক।
ভাবতে পারো, একটি নাটক কত মানুষের শ্রম আর ভালোবাসায় এত দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে! অভিনয়শিল্পী, নির্দেশক, মঞ্চকর্মী ও প্রযোজনা দলের অসংখ্য মানুষের পরিশ্রমেই সম্ভব হয়েছে এই দীর্ঘ যাত্রা।
ছোট্ট উপহার, বড় সম্পদ
দ্য মাউসট্র্যাপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি মজার গল্প। আগাথা ক্রিস্টি তাঁর নাতি ম্যাথিউ প্রিচার্ডকে ৯ বছর বয়সে নাটকটির কপিরাইট উপহার দিয়েছিলেন।
একটি নাটকের কপিরাইট যে ভবিষ্যতে কত মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে, দ্য মাউসট্র্যাপ তারই উদাহরণ। নাটকটির দীর্ঘ জনপ্রিয়তার ফলে এর স্বত্বের গুরুত্বও বেড়েছে। ম্যাথিউ প্রিচার্ডও এই নাটকের স্বত্ব থেকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন।
তবে নাটকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আগাথা ক্রিস্টি নিজেও যে এতটা আশাবাদী ছিলেন, তা নয়। কথিত আছে, তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নাটকটি কত দিন চলতে পারে। তিনি নাকি বলেছিলেন, বড়জোর আট মাস।
বাস্তবে তাঁর ধারণাকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে দ্য মাউসট্র্যাপ। আট মাসের বদলে নাটকটি চলছে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে।
একটি রহস্যনাটককে এত দিন ধরে জনপ্রিয় রাখার পেছনে নিশ্চয়ই রয়েছে এর আকর্ষণীয় কাহিনি, অভিনয় আর দর্শকদের সঙ্গে গড়ে ওঠা বিশেষ সম্পর্ক। আর আছে সেই গোপন রহস্য, যা দর্শকেরা নিজেদের মধ্যে রেখে যান-যাতে পরের দর্শকও নাটকটি দেখে সমান বিস্মিত হতে পারেন।
এখন প্রশ্ন হলো, দ্য মাউসট্র্যাপ আর কত দিন চলবে? সেই উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। তবে নাটকটির ইতিহাস আমাদের একটা কথা মনে করিয়ে দেয়: ভালো গল্পের আবেদন কখনো কখনো সময়কেও হার মানাতে পারে।