নদীর যে মাছকে বলা হয় স্রোতের রাজকন্যা
স্কটল্যান্ডের কোনো নদীর পাড়ে দাঁড়ালে মাছশিকারিকে বলতে শোনা যায়, ‘আজ লেডি ধরতে এসেছি।’ শুনে মনে হতে পারে, কোনো রূপকথার গল্প বলছে সে। কিন্তু নয়, এটি আসলে একটি মাছের নাম। গ্রেলিং নামের এই মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Thymallus thymallus। আর ডাকনাম ‘লেডি অব দ্য স্ট্রিম’, বাংলায় ‘স্রোতের রাজকন্যা’।
এই নামের পেছনে একটি কারণ আছে। পিঠের ওপর বিশাল একটি পাখনা থাকে। দেখতে অনেকটা ছোট নৌকার পাল। স্রোতে ভাসতে ভাসতে যখন পাখনা দোলে, তখন রঙের খেলা শুরু হয়। সবুজ, বেগুনি ও লালের ঝিলিক একসঙ্গে চোখে পড়ে। গায়ের রং রুপালি–ধূসর। ছোট অবস্থায় কিছুটা সবুজাভ আভা থাকে, সঙ্গে নীলচে কিছু ফুটকি। বড় হলে লম্বায় ৬০ সেন্টিমিটার, আর ওজনে সাত কেজির কাছাকাছি হতে পারে এই মাছ। ২০১৯ সালে ডরসেটে এক শিকারি চার পাউন্ড আট আউন্স ওজনের একটি গ্রেলিং ধরেছিলেন। সেই অঞ্চলের জন্য এটি রীতিমতো রেকর্ড।
মুখের গঠন একটু আলাদা। ওপরের ঠোঁট নিচেরটিকে ঢেকে রাখে, ফলে মুখটি থাকে মাথার নিচের দিকে কিছুটা বাঁকা। কারণ সহজ। এই মাছ নদীর তলায় খাবার খোঁজে, তাই মুখও সেদিকেই তাকিয়ে। প্রিয় খাবার পানির নিচের চিংড়ি ও পোকার লার্ভা। মাঝেমধ্যে ওপরে উঠে এসে উড়ন্ত পোকাও খেয়ে নেয়, কিন্তু আসল ভোজ চলে পানির নিচে।
একটি মজার দিক হলো এর নামের উৎস। ‘থাইম্যালাস’ শব্দটি এসেছে গন্ধ থেকে। তাজা ধরা গ্রেলিং থেকে থাইম গাছের মতো একরকম গন্ধ আসে। কেউ কেউ আবার বলেন, সেটি শসার গন্ধের কাছাকাছি লাগে। একটি মাছের নিজের গন্ধ থাকতে পারে, এটিই–বা কম অদ্ভুত কী!
বসন্তকালে এই মাছের জীবনে আসে নতুন একটি অধ্যায়। ডিম পাড়ার সময় পুরুষ মাছ স্ত্রী মাছের চারপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে মনোযোগ কাড়ার চেষ্টায়।
এই মাছ থাকার জায়গা নিয়ে বেশ খুঁতখুঁতে। চাই পরিষ্কার, ঠান্ডা ও তরতরিয়ে বয়ে চলা পানি। ব্রিটেন থেকে শুরু করে ফ্রান্স, এমনকি রাশিয়ার ইউরাল পাহাড় পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। স্কটল্যান্ডের টে আর আর্ন নদী, ইংল্যান্ডের ইচেন আর ইডেন—এসব জায়গা শিকারিদের কাছে তীর্থস্থানের মতো। দক্ষিণ ইউরোপের গরম আবহাওয়ায় আবার একে খুঁজেই পাওয়া যায় না।
এবার একটু মন খারাপ করা একটি গল্প। একসময় এই সুন্দর মাছটিকেই শত্রু ভাবা হতো। স্কটল্যান্ডের স্যামন নদীগুলোয় গ্রেলিংকে উপদ্রব মনে করে জল থেকে তুলে ফেলে দেওয়া হতো। ধারণা ছিল, ট্রাউটের খাবার আর জায়গা কেড়ে নিচ্ছে সে। বহু বছর পর গবেষণায় ধরা পড়ল আসল সত্য। দুটি মাছ আসলে আলাদা খাবার খায়, আলাদা জায়গায় থাকে। কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
সেই ভুল ভাঙার পর থেকে বদলে গেছে গ্রেলিংয়ের কপাল। অক্টোবর থেকে মার্চ যখন আইন করে ট্রাউট ধরা বন্ধ থাকে শীতকালে, তখনই শিকারিদের আসল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এই মাছ। দল বেঁধে চলে গ্রেলিং। তাই একটি চোখে পড়লে বুঝে নিতে হয়, আশপাশে আরও আছে।
এত কদরের পরও সব জায়গায় ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়। বাল্টিক সাগর অঞ্চলে এখন বিপন্নের তালিকায় এই মাছের নাম উঠে গেছে। বার্ন কনভেনশন নামের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় চলছে রক্ষার চেষ্টা।
একটি কাজিনও আছে এর, আর্কটিক গ্রেলিং। আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে আছে সেই প্রজাতি। দুজনকে আলাদা করার সহজ উপায় হলো পাখনার কাঁটা গুনে দেখা। ইউরোপীয় গ্রেলিংয়ের পিঠের পাখনায় পাঁচ থেকে আটটি, আর পায়ুর পাখনায় তিন–চারটি কাঁটা থাকে। আর্কটিক প্রজাতির শরীরে এই কাঁটাগুলো একদমই নেই।
পরের বার নদীর পানিতে চোখ পড়লে খেয়াল রেখো। হয়তো ঠিক সামনে দিয়েই সাঁতরে যাচ্ছে সেই রাজকন্যা, গায়ে থাইমের ঘ্রাণ ও পিঠে পালতোলা নৌকার মতো পাখনা।