এআই কি আগামী এক দশকের মধ্যেই মানুষকে মেরে ফেলবে
গত কয়েক দিনে বিশ্বজুড়ে কিছু সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, কৃত্রিম সুপার ইন্টেলিজেন্স বা এএসআই এখন পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বড় হুমকি। এর কারণে চেরনোবিলের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে। এমনকি আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে সব মানুষ মারা যাওয়ার আশঙ্কাও নাকি ১০ শতাংশের বেশি।
যে প্রযুক্তিকে এখনো বেশির ভাগ মানুষ একটু বেশি কথা বলতে পারে, এমন একটি সার্চ ইঞ্জিন হিসেবেই মনে করে, তার সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে এসব সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।
মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমন এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাজ্যে সংসদ সদস্য ও আইনপ্রণেতারাও আলোচনা শুরু করেছেন। পারমাণবিক অস্ত্রের সঙ্গে তুলনা করে সতর্ক করেছেন দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেস ব্রাউন এবং বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান কম্পিউটারবিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট রাসেল।
২০১৭ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপের দাবিতে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপনসের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তিনি সংসদ সদস্যদের বলেন, ‘এমন কিছু সক্ষমতার মুখোমুখি আমরা এই প্রথম হচ্ছি না, যেগুলো শেষ পর্যন্ত আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে পারে।’
এই আলোচনা আয়োজন করেছে কন্ট্রোলএআই নামের একটি সংগঠন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের পক্ষে কাজ করে সংগঠনটি। এ সপ্তাহে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেবার পার্টির এমপি অ্যালেক্স সোবার একটি বিল উত্থাপন করেছেন। কৃত্রিম সুপার ইন্টেলিজেন্স তৈরি নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যেই বিলটি করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার রাতে অ্যানথ্রোপিকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মী বলেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআই ‘সব মানুষকে মেরে ফেলতে পারে’, এমন আশঙ্কা তিনি ১০ শতাংশের বেশি মনে করেন। তিনি আরও সতর্ক করেন, এএসআই তৈরি হলে সেটি মানুষের ক্ষতি করবে না, এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো কোনো পরিকল্পনা অ্যানথ্রোপিকের নেই। কবে এএসআই তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে অবশ্য মতভেদ আছে। কেউ মনে করেন কয়েক বছরের মধ্যেই তা সম্ভব, আবার কেউ মনে করেন এক দশকের বেশি সময় লাগতে পারে।
অ্যানথ্রোপিকের এআই নিরাপত্তা গবেষণা দলের প্রধান ইভান হুবিঙ্গারের মতও একই। এর আগে অ্যানথ্রোপিকে কাজ করা ২৮ বছর বয়সী গবেষক জ্যাকব কক্সন পদত্যাগ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, অ্যানথ্রোপিক ও ওপেনএআই, কোনো প্রতিষ্ঠানই দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে না। তাঁর ভাষায়, প্রতিষ্ঠানগুলো ‘আমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে’।
কক্সনের দাবি, অ্যানথ্রোপিকে এআইয়ের ঝুঁকিগুলো ভালোভাবেই জানা আছে। কিন্তু কে আগে এ প্রযুক্তি তৈরি করতে পারবে, সেই প্রতিযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি আটকে গেছে। তবে তিনি কিছুটা আশাবাদীও। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এআই গবেষণাগারগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে এই প্রতিযোগিতার গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে। কক্সনের মতামত গুরুত্ব দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো প্রচার করেছে। সামাজিক মাধ্যমে এই বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এআই নিরাপত্তা নিয়ে নিজের প্রচারণা আরও জোরদার করেছেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। এআই প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য তিনি আবারও কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের পক্ষে একটি জনমত জরিপের ফলও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, ৮১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, এআই নিয়ে রাজনীতিবিদদের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
মানুষ একসময় পারমাণবিক যুদ্ধকেই মানবজাতির জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য বড় হুমকি মনে করত। এখন অনেকেরই মনে হচ্ছে, সুপার ইন্টেলিজেন্ট এআই একই মাত্রার, এমনকি সম্ভবত আরও বড় হুমকি তৈরি করতে পারে।
তবে সবাই এটা নিয়ে এতটা আতঙ্কিত নয়। সারি ইনস্টিটিউট ফর পিপল-সেন্টারড এআইয়ের ড. অ্যান্ড্রু রোগয়স্কি বলেছেন, বাস্তবে বর্তমান এআই ব্যবস্থা মানুষের মতো বহুমুখী সক্ষমতার ধারেকাছেও নেই। এমনকি একসঙ্গে কাজ করা একদল মানুষের সক্ষমতার সঙ্গেও তাদের তুলনা চলে না। তাঁর ধারণা, ‘আমরা হয়তো এমন একটি সময়ের দিকে এগোচ্ছি, যাকে তিনি “দ্য গ্রেট ডিজঅ্যাপয়েন্টমেন্ট” বা “বড় হতাশা” বলতে চান। অর্থাৎ উন্নত এআই শেষ পর্যন্ত এত ব্যয়বহুল ও কম উপকারী হয়ে উঠতে পারে যে বর্তমান গতিতে এর উন্নয়ন চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনই থাকবে না।’
অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, এডিনবরো ও ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষকদের নিয়ে গঠিত রাষ্ট্রীয় সহায়তাপ্রাপ্ত এআই গবেষণাগার সোফেয়ারের পরিচালক ডেভিড বারবারও অতিরিক্ত আতঙ্ক ছড়ানোর ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘এআই চলে যাবে না। এটি অত্যন্ত উপকারী প্রযুক্তি। তবে ইন্টারনেট ও বিভিন্ন কম্পিউটার ব্যবস্থায় কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এআইকে প্রবেশাধিকার দেওয়া সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই এসব ব্যবস্থাকে আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় আমাদের শিখতে হবে।’
অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সান্দ্রা ওয়াখটার অবশ্য ‘টার্মিনেটর’-এর মতো কল্পিত পরিস্থিতিতে বিশ্বাস করেন না। তবে তাঁর মতে, এআইয়ের কারণে বাস্তব কিছু হুমকি তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশের ওপর প্রভাব, ভুল তথ্যের বিস্তার এবং মানুষের কাজের জায়গা এআইয়ের দখলে চলে যাওয়া। তাঁর মতে, ‘টার্মিনেটর’ ধরনের কল্পিত ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা বরং বাস্তব সমস্যাগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়।