হুমায়ূননামা

বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো যেমন মজার, তিনি নিজেও ছিলেন দারুণ রসিক। রসিকতা করতে খুবই পছন্দ করতেন তিনি। মজার মজার ঘটনা ঘটত তাঁর জীবনে। আজ তাঁর জন্মদিনে শুনব তেমন কিছু ঘটনা।
অলংকরণ: তুলি

ফ্রি আইসক্রিম

জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ছেলেবেলাটা ছিল বেশ মজার। তিনি নিজে যেমন অদ্ভুত সব কাণ্ড করেছেন, তাঁর সঙ্গেও ঘটেছে মজার সব ঘটনা। আগের দিনে গ্রামে আইসক্রিমওয়ালাদের হাঁক শোনা যেত। ঠিক হাঁক নয়, টিনের বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে ছেলেমেয়েদের জানান দিতেন, তাঁরা এসে গেছেন। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরাও সেই বাঁশি শুনে পড়িমরি করে ছুটে আসত, পকেটে পয়সা থাকুক আর না থাকুক। যার পয়সা আছে, সে আইসক্রিম কিনে অন্যদের দেখিয়ে দেখিয়ে খেত, লোভ ধরাত। যার পয়সা নেই, তার দেখেই সুখ। একদিন ছোট্ট হুমায়ূন আহমেদও ছুটলেন আইসক্রিমওয়ালার বাঁশি শুনে। কিন্তু পকেটে টাকা নেই। আইসক্রিমওয়ালা ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি, তাই জিজ্ঞেস করেন, ‘আইসক্রিম খাবে?’

হুমায়ূন আহমেদের তখন ভীষণ মন খারাপ, চোখের সামনে আইসক্রিমের বাক্স, দুধমালাইয়ে ভর্তি। অথচ সেই আইসক্রিম চেখে দেখতে পারবেন না, পকেটে পয়সা নেই বলে।

আইসক্রিমওয়ালা তখন জিজ্ঞেস করেন, ‘কী বাবু, নেবে না?’

হুমায়ূন আহমেদ জানান, তাঁর কাছে পয়সা নেই। আইসক্রিমওয়ালার মায়া হয়। একটা দুধমালাই খেতে দেন ফ্রিতে। হুমায়ূন আহমেদ তো মহাখুশি। ভারি মজা তো, এভাবে ফ্রিতেই যদি আইসক্রিম পাওয়া যায়, তাহলে পয়সার কী দরকার!

এরপর তিনি এই কৌশল আয়ত্ত করে প্রতিদিন ফ্রিতে আইসক্রিম খেতে লাগলেন। তাহলে কি আইসক্রিমওয়ালা তাঁর কৌশল বোঝেননি? রোজ রোজ কেন একইজনকে আইসক্রিম খেতে দেবেন?

হুমায়ূন আহমেদ এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু লেখেননি। তবে ধারণা করতে কষ্ট হয় না। এক আইসক্রিমওয়ালা রোজ একই এলাকায় আসেন না। একেক দিন একেকজন আসেন। হয়তো ১৫ দিন কি এক মাস পর সেই আইসক্রিমওয়ালা আবার ফিরে আসেন। প্রতিদিন যেহেতু নতুন লোক, তাই কেউই হুমায়ূন আহমেদের কৌশল ধরতে পারেননি। তাই পরপর কয়েক দিন ফ্রিতে আইসক্রিম খেতে সমস্যা হয়নি হুমায়ূন আহমেদের। কিন্তু একদিন তাঁর বাবার নজরে পড়ে যায় ব্যাপারটা। তিনি রেগে যান, জিজ্ঞাসা করেন, আইসক্রিমওয়ালা তাঁকে কেন ফ্রিতে আইসক্রিম খাওয়ান? কিন্তু এ প্রশ্নের জবাব পাননি তিনি।

ফুটবলের আক্ষেপ

হুমায়ূন আহমেদের এক বন্ধু ছিলেন, নাম শঙ্কর। ছেলেটা লেখাপড়ায় ভালো নন। পরীক্ষায় ডাব্বা মারেন। সেই শঙ্করকে নিয়ে ঘটে এক মজার ঘটনা।

হুমায়ূন আহমেদ মেধাবী ছিলেন, ভালো ফল করতেন সব সময়। তাই বলে পড়াশোনায় খুব মনোযোগী ছিলেন, তা–ও নয়। হুমায়ূন আহমেদ তখন থ্রিতে পড়তেন। সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা। দিন ঘোষণাও হয়ে গেছে। বন্ধুরা যখন ধুমসে পড়াশোনা করছেন, হুমায়ূন আহমেদ তখন বইপত্র ছুঁয়েও দেখছেন না। ফেল করার সাধ জেগেছিল কি না, কে জানে? এরই মধ্যে একদিন শঙ্করের আবির্ভাব। বলেন এক দারুণ অফারের কথা। তাঁর মা নাকি বলেছেন, পরীক্ষায় যদি শঙ্কর পাস করেন, তাহলে একটা ফুটবল কিনে দেবেন। সেকালের ছেলেদের কাছে ফুটবল ছিল আরাধ্য বস্তু। এই সুযোগ শঙ্কর হাতছাড়া করেন কীভাবে! হুমায়ূন আহমেদকে তিনি বলেন, কিছু একটা ব্যবস্থা করে দিতে।

শঙ্কর ফুটবল পাবেন, সেই ফুটবল নিয়ে খেলতে পারবেন হুমায়ূন আহমেদও। কিছু একটা করতেই হবে। হুমায়ূন আহমেদ মাস্টারি শুরু করলেন। নিজে ভালোমতো পড়াশোনা করেন, তারপর সেগুলো শিখিয়ে দেন শঙ্করকেও।

পরীক্ষা শুরু হলো, খুশি মনে পরীক্ষা দিলেন দুজনেই। ফল যখন বের হলো, দেখা গেল হুমায়ূন আহমেদ প্রথম হয়েছেন, কিন্তু শঙ্কর করেছেন ফেল! দুজনেরই তখন সে কী আফসোস! হাতছাড়া হয়ে গেল সাধের ফুটবল!

ভক্তের জান কোরবান

দেখার জন্য রাস্তায় ভিড় লেগে যেত, বইমেলায় তৈরি হতো দীর্ঘ লাইন। তাই তাঁর জন্য জীবন দেওয়া লোকের অভাব ছিল না। কিন্তু এমন এক ভক্তের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর অদ্ভুত এক কাণ্ড করে জীবন দেওয়া থেকে তাঁকে বাঁচিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদ লেখক হিসেবে যতটা সফল ছিলেন, নাটক আর সিনেমার পরিচালক হিসেবে মোটেও পিছিয়ে ছিলেন না। তাঁর সবচেয়ে বড় ক্যারিশমা ছিল বিনোদনজগতের বাইরের লোকদের নিয়ে নাটক-সিনেমা বানানোতে। যেমন চ্যালেঞ্জার, ডা. এজাজের মতো গুণী অভিনেতাদের তিনি নিজ হাতে তৈরি করেছেন। তেমনি কুদ্দুস বয়াতি, বারী সিদ্দিকীর মতো শিল্পীদের তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাই অনেক লোকই হুমায়ূন আহমেদের কাছে আসতেন অভিনয় কিংবা গানের জগতে নাম লেখানোর জন্য।

হুমায়ূন আহমেদের সেদিন ৫২তম জন্মদিন। বগুড়া থেকে এক লোক এসেছেন শুভেচ্ছা জানাতে, ৫২টি ফুল নিয়ে। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে সেই লোকের দেখা হলো। ভদ্রলোক একেবারে বিগলিত। জানালেন, লেখকের জন্য তিনি জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত। হুমায়ূন আহমেদ এ কথা শুনে খুশি হয়েছিলেন কি না, জানা যায় না। তবে লোকটার আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন। অবশ্য লোকটা নিজেই জানিয়েছিলেন উদ্দেশ্যটা। বলেছিলেন, ‘প্লিজ স্যার, আমাকে একটা সুযোগ দিন আপনার নাটকে অভিনয় করার। আমি আপনার জন্য জীবন দিয়ে দেব।’

হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ম্যানেজারকে ডেকে বলেন, ‘এই ভদ্রলোকের নাম-ঠিকানা লিখে রাখো।’ আর সেই লোকটাকে বলেন, ‘আপনার ঠিকানা রইল, কখনো যদি আমার কিডনির দরকার পড়ে, যোগাযোগ করব।’

(হুমায়ুন আহমেদের বিভিন্ন আত্মজীবনীমূলক বই অবলম্বনে)