ইঁদুরের মতো মুখ বলে মাছের নাম ইন্দুর বাইলা
নদীর মোহনায় কাদার ভেতর একটা মাছ শুয়ে থাকে। গায়ের রং কাদার সঙ্গে মিলে যায়, চোখে পড়ে না সহজে। মাথাটা চ্যাপটা। চোখ দুটো ছোট্ট। মুখের গড়নটা দেখলে কেন যেন প্রথমেই মনে পড়ে যায় ইঁদুরের কথা। সেই মিল থেকেই নাম হয়ে গেছে ইন্দুর বাইলা। জেলেরা বলেন, জাল থেকে তুলে হাতে নিলেই বোঝা যায় কেন এই নাম, মুখটা সামনের দিকে সরু হয়ে আসা, একদম ইঁদুরের নাকের মতো।
বরিশাল, ভোলা বা পটুয়াখালীর বাজারে গেলে একে আরেক নামেও চিনবে। তুলার ডান্ডি। স্থানীয় বাসিন্দারা দুটো নামই চালান একসঙ্গে, কেউ বলেন ইন্দুর বাইলা, কেউ শুধু ডান্ডি মাছ। কোথাও কোথাও নামটা একটু বদলে যায়, ডাটি বা ডাডি—মুখে মুখে চলতে চলতে শব্দটা বছরের পর বছর ধরে একটু একটু করে রূপ বদলেছে এলাকাভেদে।
এটা একধরনের বাইলা বা বেলে মাছ বলেই মানুষ চেনে। তবে এখানে একটা ছোট্ট গোলমাল আছে। আমরা যে বেলে মাছ সবচেয়ে বেশি চিনি, যার বৈজ্ঞানিক নাম Glossogobius giuris (গ্লসোগোবিয়াস জিউরিস), সেটা থাকে Eleotridae (এলিওট্রিডি) পরিবারে। ইন্দুর বাইলা সে পরিবারের মাছ নয়। এর নাম Sillaginopsis panijus (সিলাজিনপসিস প্যানিজাস), পরিবার Sillaginidae (সিলাজিনিডি)। দেখতে আর স্বভাবে কাছাকাছি লাগলেও বংশের হিসাবে দুটো মাছ দুই জায়গার। বাজারে অবশ্য কেউ এত হিসাব করে না। তলায় শুয়ে থাকা কাদাপ্রিয় মাছ দেখলেই নাম দেওয়া হয় বাইলা।
নামকরণের একটা ইতিহাস আছে এই মাছের পেছনে। ১৮২২ সালে ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিল্টন গঙ্গা নদীর মোহনা থেকে একটা নমুনা তুলে এই মাছের প্রথম নাম দেন। সেই গঙ্গার ছাপ থেকে গেছে ইংরেজি নামে—Gangetic whiting (গ্যানজেটিক হোয়াইটিং)। পরে চালু হয় আরেক নাম—Flathead Sillago (ফ্ল্যাটহেড সিলাগো), মাথার চ্যাপটা গড়নের কারণে। ১৮৬১ সালে গিল নামের একজন বিজ্ঞানী খেয়াল করলেন, এই মাথা পরিবারের আর কারও সঙ্গে মিলছে না। তাই তিনি আলাদা একটা গণ বানালেন, নাম Sillaginopsis। আজও সেই গণে এই একটাই মাছ। ২০০ বছরের কাছাকাছি পার হয়ে গেছে, তবু কোনো নতুন সদস্য জুটল না।
চোখ দুটো হাড়ের মধ্যে বসানো এমনভাবে যে দেখলে মনে হয় ঢেকে রাখা হয়েছে। কাদাটে পানিতে চোখের কাজ কমই বোধ হয়, তাই ছোট হয়ে গেছে যুগে যুগে। শরীরটা লম্বাটে, নলের মতো গোলগাল। আঁশ মিহি, হাতে নিলে পিছলে যায়। পিঠের প্রথম পাখনায় ১০টি কাঁটা থাকে, এর একটা বেশ লম্বা আর পেছন দিকে বাঁকানো। দ্বিতীয় পাখনায় থাকে ২৫ থেকে ২৭টি নরম রশ্মি। মাছ-বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবারের সব আত্মীয়ের মধ্যে চেহারায় সবচেয়ে আলাদা মাছ এটাই, দূর থেকেও চেনা যায় সহজে।
মাছটা থাকে নদীর মোহনায়, যেখানে মিষ্টি আর লোনাপানি মেশে একসঙ্গে। বাংলাদেশ ছাড়া ভারত, মিয়ানমার আর ইন্দোনেশিয়ার কিছু অংশেও মেলে। গবেষকদের হিসাবে, মেঘনার মোহনায় এই মাছের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, পৃথিবীর আর কোথাও এত নেই বলে ধারণা করা হয়। দক্ষিণের মেঘনা, তেঁতুলিয়া, বলেশ্বর এই মাছের জন্য আলাদা একটা ঘরবসতির মতো।
আকারে খুব বড় হয় না, লম্বায় সর্বোচ্চ ৪৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। স্ত্রী মাছ ১৮-১৯ সেন্টিমিটার লম্বা হলেই প্রজননের জন্য তৈরি হয়ে যায়। মেঘনায় করা এক গবেষণায় ধরা পড়া মাছের মধ্যে স্ত্রী মাছের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে, আর ওজন বাড়ার গতিও স্ত্রী মাছের একটু বেশি। হুগলি নদীর মোহনায় আগে একটা গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই মাছের কানের ভেতরের ছোট্ট হাড়ের পরত গুনে বয়স বের করেছিলেন, গাছের গুঁড়ির বছর গোনার মতো কায়দায়। জেলেরা বলেন, বর্ষার সময় আর শীতের শুরুতে এই মাছ বেশি ধরা পড়ে জালে।
দক্ষিণ উপকূলের বাজারে এই মাছের চাহিদা ভালোই। ভুনা করে খাওয়াটাই স্থানীয়ভাবে বেশি চলে। কাঁটা কম, মাংস নরম, তাই রান্নায় ঝামেলাও কম। বিদেশে এর নাম তেমন শোনা যায় না, রপ্তানির বাজারে এর জায়গা ছোট। ছোট বয়সের ইন্দুর বাইলা কখনো কখনো অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছ হিসেবেও বিক্রি হয়, যদিও বাংলাদেশে এই চল এখনো হয়নি। বাইরের কোনো কোনো দেশে শখের মাছ হিসেবেই এর কদর কিছুটা বেশি।
বাংলাদেশের লাল তালিকা অনুযায়ী মাছটা এখনো বিপদের মুখে পড়েনি। তবে নদীর তলায় শুয়ে থাকা এই মাছের সংখ্যা ঠিক কতটা বাড়ছে বা কমছে, তার নিয়মিত হিসাব রাখার মতো গবেষণা এখনো কম। উপকূল আর মোহনার পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে কোথাও কোথাও দিনে দিনে। এই বদল ইন্দুর বাইলার মতো মোহনাপ্রিয় মাছের জন্য কতটা ভালো বা খারাপ, সে উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা নেই।