বিড়ালের জন্য আলাদা সিঁড়ি আছে যে দেশে

জার্মান আলোকচিত্রী ও স্থাপত্যপ্রেমী ব্রিজিট শুস্টার সুইজারল্যান্ডের রাজধানী বার্ন শহর ঘুরে দেখার সময় এই দারুণ জিনিসের দেখা পানছবি: দ্য গার্ডিয়ান

তোমরা অনেকেই হয়তো বিড়াল পোষো। অনেকে খাবার দাও বাসার পাশের বিড়ালকে। একবার ভেবে দেখো তো তোমার পোষা বিড়ালের জীবনটা কেমন? তোমরা সবাই যখন বাড়ির বাইরে ঘুরতে যাও, তখন বিড়ালটা একা একাই বাড়িতে রয়ে যায়। বাইরে যাওয়ার খুব ইচ্ছা, কিন্তু বের হওয়ার কোনো উপায় নেয়।

একা থাকতে থাকতে সে হয়তো অস্থির হয়ে ওঠে। সে একবার দরজার কাছে যায়, আবার জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। জানালার কাচে নাক চেপে ধরে সে শুধু দেখে আর ভাবে, ‘ইশ, যদি বাইরে যেতে পারতাম।’ দিনের পর দিন এভাবে থাকতে থাকতে বিড়ালের মেজাজটা তো একটু খারাপ হতেই পারে। তাই পরেরবার যখন তোমার বিড়ালটা রাগ করে, তখন এই কারণটার কথা ভেবে দেখো।

ধরো, তুমি তোমার মা-বাবার সঙ্গে একটা উঁচু অ্যাপার্টমেন্টে থাকো। সঙ্গে তোমার বিড়াল। যখনই ওর বাইরে যেতে ইচ্ছা করে, ওকে তোমার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কারণ, তুমি ছাড়া ওর নিচে নামার বা কোথাও যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

জার্মান আলোকচিত্রী ও স্থাপত্যপ্রেমী ব্রিজিট শুস্টার সুইজারল্যান্ডের রাজধানী বার্ন শহর ঘুরে দেখার সময় এই দারুণ জিনিসের দেখা পান।

এমন পরিস্থিতিতে যদি ওর জন্য আলাদা একটা সিঁড়ি থাকে, তাহলে কেমন হয়? যেই সিঁড়ি বেয়ে যখন খুশি চারতলা বা পাঁচতলা থেকে নিচে নামতে পারবে বিড়াল। আবার ইচ্ছা হলেই বাসায় ফিরে আসবে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও পৃথিবীতে সত্যিই এমন দেশ আছে, যেখানে মানুষের পাশাপাশি বিড়ালদেরও চলাচলের জন্য বিশেষ সিঁড়ি ব্যবস্থা রয়েছে।

ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

দেশটার নাম সুইজারল্যান্ড। ছবির মতো দেখতে সুন্দর যেমন দেশটি। তেমনি সেখানের মানুষের চিন্তাভাবনা। বিশেষ করে বিড়ালদের ব্যাপারে এখানকার মানুষজন বেশ স্বাধীনচেতা। সে কারণেই হয়তো সুইজারল্যান্ডকে বিড়ালদের জন্য বিশ্বের সেরা জায়গা বলা যায়। শহরের টাউনহাউস বা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের পাশেই দেখা যায় মানুষের তৈরি বিশেষ মই বা র‍্যাম্প। এগুলো এমনভাবে বানানো হয়েছে যাতে বিড়ালরা নিজেদের ইচ্ছেমতো বাইরে যেতে ও আসতে পারে।

জার্মান আলোকচিত্রী ও স্থাপত্যপ্রেমী ব্রিজিট শুস্টার সুইজারল্যান্ডের রাজধানী বার্ন শহর ঘুরে দেখার সময় এই দারুণ জিনিসের দেখা পান। তিনি তাঁর ‘সুইস ক্যাট ল্যাডার্স’ নামের বইয়ে অসংখ্য মইয়ের ছবি প্রকাশ করেছেন, যা শুধু বিড়ালদের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। ব্রিজিট শুস্টারের জানান, ‘এই মইগুলো বিড়ালদের প্রতি যত্নের এক দারুণ উপায়। এগুলো শুধু বিড়ালদেরই স্বাধীনতা দেয় না। সঙ্গে মালিকদেরও স্বাধীনতা এনে দেয়। বিড়ালপ্রেমীরা তাদের পোষা প্রাণীকে বাইরে যাওয়ার ও যখন খুশি ঘরে ফিরে আসার সুযোগ করে দিতে পারেন। ফলে তাদের আর বিড়ালের জন্য দরজার কাছে অপেক্ষা করে থাকতে হয় না।’

সুইজারল্যান্ডের বিড়াল-মইগুলো বিভিন্ন জিনিস দিয়ে তৈরি করা হয়। কিছু মই কাঠের, কিছু ধাতুর, আবার কিছু মই একাধিক জিনিস দিয়ে বানানো।

বিড়ালদের জন্য বিশেষ মই বা সিঁড়ি ইউরোপের আরও কিছু দেশে দেখা গেলেও, সুইজারল্যান্ডে এগুলোর সংখ্যা অনেক বেশি। এর কারণ সেখানকার মানুষেরা বিড়ালকে খুব ভালোবাসেন। দেশটিতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ পোষা বিড়াল রয়েছে, যা অন্য যেকোনো পোষা প্রাণীর চেয়ে বেশি।

ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

সুইসদের কাছে বিড়াল এত জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ আছে। দেশটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ভাড়া বাড়িতে থাকেন। বাড়িওয়ালারা কুকুরের চেয়ে বিড়াল পোষার অনুমতি বেশি দেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার সুইসরা সব প্রাণীর স্বাধীনতাকে সম্মান করে। এই ভালোবাসার কারণেই তারা বিড়ালদের জন্য এমন বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি করেছে। যাতে ওরা যখন খুশি বাইরে যেতে পারে ও ইচ্ছেমতো ঘরে ফিরতে পারে। মইগুলো জানালা কিংবা বেলকনিতে থাকে। জানালার ছোট অংশ দিয়ে যাতায়াত করে বিড়াল। আমাদের দেশে ঢাকা শহরেও এমন দেখা যায়। তবে এখানে সব বিড়ালই বিল্ডিংয়ের কার্নিশ দিয়ে চলাফেরা করে।

সুইজারল্যান্ডের বিড়াল-মইগুলো বিভিন্ন জিনিস দিয়ে তৈরি করা হয়। কিছু মই কাঠের, কিছু ধাতুর, আবার কিছু মই একাধিক জিনিস দিয়ে বানানো। এগুলো চাইলে অনলাইনে বা পোষা প্রাণীর দোকান থেকে কেনা যায়। আবার অনেকে নিজেদের বিড়ালের জন্য নিজেরাই মনের মতো করে মই বানিয়ে নেন। এই মইগুলো শুধু নিজেদের বাড়িতেই থাকে এমন নয়। বড় বাড়িতে এক বাসা থেকে পাশের বাসায় সঙ্গেও যুক্ত থাকে সিঁড়িগুলো। এর ফলে বিড়ালরা প্রতিবেশীর বাড়িতেও অবাধে যাতায়াত করতে পারে।

তবে বিশ্বজুড়ে এমন বিতর্ক চললেও সুইজারল্যান্ডে এই বিষয় নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। অনেক সুইস বিশ্বাস করেন বিড়ালদের জন্য বাইরে যাওয়া সুস্থ থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সুইস বিশ্বাস করেন বিড়ালদের জন্য বাইরে যাওয়া সুস্থ থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

পোষা বিড়ালদের বাইরে অবাধে বিচরণ করতে দেওয়া হলেও, এদের এই স্বাধীনতা বন্য প্রাণীর জন্য এক বড় হুমকি। বিড়াল পোষ মানলেও শিকারের প্রবণতা থেকে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে বিড়াল প্রতিবছর লাখ লাখ পাখি হত্যা করে। এ ছাড়া সরীসৃপ ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকার করে থাকে।

তবে বিশ্বজুড়ে এমন বিতর্ক চললেও সুইজারল্যান্ডে এই বিষয় নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। অনেক সুইস বিশ্বাস করেন বিড়ালদের জন্য বাইরে যাওয়া সুস্থ থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জুরিখ শহরের প্রাণী সুরক্ষা সমিতির মতে, একটি বিড়ালকে ঘরে বন্দী করে রাখা তার মালিকের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঘরের ভেতরে থাকা বিড়ালদের মনকে সতেজ রাখার জন্য সামাজিক যোগাযোগ, শিকারের মতো কাজ ও নতুন অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। সুইসরা মনে করেন, একটি বিড়ালকে ঘরে বন্দী করে রাখা স্বাভাবিক কিছু নয়। বিড়ালদের তোমার ও আমার মতোই বাইরে যাওয়া প্রয়োজন।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও দ্য গার্ডিয়ান