পকেটে হারমোনিকা, কোথায় পাব, দাম কত
ছোটবেলার একটা ঘটনা বলি। সামনেই আমার জন্মদিন। তাই বাসার সবাইকে একে একে জিজ্ঞাসা করছি, ‘এবার জন্মদিনে আমাকে কী দেবে?’ কেউ বলেছে বড় একটা ফ্যান এনে দেবে, কেউ বলেছে ঘরভর্তি বেলুন এনে দেবে। তখনো স্কুলে ভর্তি হইনি। একেবারে শিশুমন! যে যা দেওয়ার কথা বলছে, তাতেই আমি মহাখুশি।
শুধু একজন বলেছিলেন, ‘তোকে এবার একটা বিশেষ জিনিস দেব।’ তিনি আমার মেজ মামা।
যথারীতি জন্মদিন চলে এল, কেক কাটা হলো, আনন্দও হলো। কিন্তু আমার সেই বিশেষ উপহার আর পাওয়া হলো না। এর কয়েক দিন পর এক দুপুরে মামা একটা আয়তাকার বাক্স ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই নে, তোর উপহার।’
বাক্স খুলে পেলাম লম্বাটে, আয়তাকার একটা লাল বস্তু। চকচকে লাল রং। হাতে নিয়ে দেখি, সেটার গায়ে মৌচাকের মতো অনেকগুলো ছোট ছোট ছিদ্র। মামার কথা শুনে ছিদ্রগুলোতে ফুঁ দিতেই নানা রকম শব্দ বের হতে লাগল। আমার তখন মনে হয়েছিল, এর চেয়ে দারুণ খেলনা বুঝি পৃথিবীতে আর নেই!
মামা সেদিন বস্তুটার একটা নাম বলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই নাম মনে রাখিনি। এরপর যখন ক্লাস ফাইভ কিংবা সিক্সে পড়ি, হঠাৎ একদিন আবার সেই খেলনাটা সামনে চলে এল। আর তখন থেকেই শুরু হলো হারমোনিকার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব।
হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ। সেদিনের সেই উপহারটির নাম ছিল হারমোনিকা। একে মাউথ অর্গানও বলা হয়। ছোট্ট এই বাদ্যযন্ত্র বাজাতে তারে আঙুল ছোঁয়াতে হয় না, চাপতে হয় না কোনো চাবি। শুধু ফুঁ দিয়ে কিংবা বাতাস টেনে তৈরি করা যায় সুর। হারমোনিকার সুর শুনতে পাবে জ্যাজ, কান্ট্রি, ফোক ও রকের মতো নানা ধরনের সংগীতে। কোনো কোনো ধরনের হারমোনিকা ‘হার্প’ বা ‘ব্লুজ হার্প’ নামেও পরিচিত।
হারমোনিকার ইতিহাসও বেশ পুরোনো। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চীনের শেং নামের একটি বাদ্যযন্ত্রের কথা। প্রায় তিন হাজার বছর আগে চীনে এই বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন ছিল। পরবর্তী সময়ে ইউরোপে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক হারমোনিকার বিকাশ ঘটে। ১৮২১ সালে জার্মানির বার্লিনে ক্রিশ্চিয়ান ফ্রিডরিখ লুডভিগ বুশমান মুন্ডঅলিন নামে একটি ছোট মুখে বাজানো বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন। আধুনিক হারমোনিকার বিকাশের ইতিহাসে তাঁর এই উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশেও হারমোনিকা বাজানোর চল আছে। কেউ শখ করে বাজায়, কেউ নিয়মিত চর্চা করে হয়ে ওঠে দক্ষ। তবে তুমিও যদি হারমোনিকা কিনে বাজানো শিখতে চাও, তাহলে আগে এর ধরন সম্পর্কে একটু ধারণা থাকা ভালো। সাধারণত ডায়াটোনিক, ট্রেমোলো ও ক্রোমাটিক—এই তিন ধরনের হারমোনিকা বেশি পরিচিত।
ডায়াটোনিক হারমোনিকায় নির্দিষ্ট সুরের স্কেলের নোটগুলো বাজানো যায়। ব্লুজ, ফোক ও রকসংগীতে এর ব্যবহার বেশি। ট্রেমোলো হারমোনিকায় দুটি রিডের কম্পাঙ্কে সামান্য পার্থক্য থাকায় সুরে একধরনের কাঁপুনি তৈরি হয়। অন্যদিকে ক্রোমাটিক হারমোনিকায় থাকে একটি স্লাইডার। সেটি ব্যবহার করে বিভিন্ন সুরের নোট বাজানো যায়।
এবার আসা যাক দামের কথায়। হারমোনিকা কিনতে খুব বেশি টাকা খরচ করতেই হবে, এমন নয়। সাধারণ কিছু দোকানে ১২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে বি বা ফ্লাইং ইগল ব্র্যান্ডের হারমোনিকা পাওয়া যেতে পারে। ১০ হোলের ডায়াটোনিক হারমোনিকার দাম ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা। আর ২৪ হোলের মেটাল বডির ট্রেমোলো হারমোনিকার দাম হতে পারে ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা।
তবে দোকান ও মানভেদে দাম আলাদা হতে পারে। আমার মতো অনভিজ্ঞ কেউ কিনতে গেলে কখনো কখনো একই জিনিসের জন্য বেশি দামও দিয়ে ফেলতে পারে!
একটু ভালো মানের হারমোনিকা কিনতে চাইলে ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকার বাদ্যযন্ত্রের দোকানগুলো ঘুরে দেখতে পারো। সেখানে সুজুকি, হনার ও এসএক্স ব্লুসের মতো ব্র্যান্ডের হারমোনিকা পাওয়া যায়। সাধারণ ডায়াটোনিক বা ট্রেমোলো হারমোনিকার দাম ৪৫০ থেকে ২ হাজার টাকা। আর ক্রোমাটিক হারমোনিকা কিনতে খরচ হতে পারে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা বা তারও বেশি। ব্র্যান্ড, মডেল ও মান অনুযায়ী দাম বদলায়।
তবে একটা কথা মনে রেখো, দামি হারমোনিকা কিনলেই ভালো বাজাতে পারবে, এমন নয়। নিয়মিত চর্চা আর সুরের প্রতি মনোযোগই আসল। ছোট্ট একটা হারমোনিকা দিয়েই শুরু হতে পারে সংগীতের সঙ্গে দীর্ঘ বন্ধুত্ব। আমার ক্ষেত্রে যেমন হয়েছিল সেই চকচকে লাল উপহারটি দিয়ে!