মাইগ্রেনের ব্যথা কেন হয়

মাথাব্যথা তো আমাদের সবারই কমবেশি হয়। কিন্তু মাইগ্রেন মোটেও কোনো সাধারণ মাথাব্যথা নয়। মাইগ্রেন হলে মাথার এক পাশে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। এই ব্যথা সহজে কমে না। অনেক সময় ব্যথার সঙ্গে বমি বমি ভাব থাকে। চোখের সামনে অদ্ভুত সব দৃশ্য ভাসতে পারে, যেমন অনেকে চোখের সামনে আঁকাবাঁকা রেখা দেখতে পায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘অরা’। এ সময় আলো বা শব্দ একদম সহ্য হয় না। কিন্তু এই ভয়ংকর মাইগ্রেন কেন হয়?

অবাক করা ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা এখনো এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানেন না। তবে তাঁরা নিশ্চিত যে এর পেছনে মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক কার্যকলাপ দায়ী। মস্তিষ্কের স্নায়ু ও রক্তনালিগুলোর মধ্যে কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। বিজ্ঞানীরা এখনো এর পুরোটা বুঝতে পারেননি। মাইগ্রেন কি একটি কারণে হয় নাকি একাধিক, তা–ই বিজ্ঞানীরা এখনো খুঁজছেন!

তবে বিজ্ঞানীরা এর পেছনের কিছু বিজ্ঞান ইতিমধ্যে বের করেছেন। মস্তিষ্কে ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু নামের একটি বিশাল স্নায়ু আছে। এটি আমাদের মাথা ও মুখের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, মাইগ্রেনের সময় এই স্নায়ু অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন মস্তিষ্ক থেকে কিছু রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়। যেমন সেরোটোনিন। এই সেরোটোনিনের মাত্রা হঠাৎ কমে গেলে মাথার ভেতরের রক্তনালিগুলো ফুলে যায়। এতে স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। তখনই তীব্র ব্যথা শুরু হয়।

আরও পড়ুন

এর সবচেয়ে সহজ উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের পরিবারে। ৯০ শতাংশ মাইগ্রেন রোগীর পরিবারেই এই রোগের ইতিহাস থাকে। অর্থাৎ মা–বাবা বা দাদার থাকলে সন্তানেরও এই রোগ হতে পারে। একটি বিশেষ ধরনের মাইগ্রেন আছে। এর নাম ফ্যামিলিয়াল হেমিপ্লেজিক মাইগ্রেন। এটি বেশ বিরল। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, নির্দিষ্ট চারটি জিনের পরিবর্তনের কারণে এটি হয়। সাধারণ মাইগ্রেনের সঙ্গেও নানা রকম জিনের সম্পর্ক আছে। এই জিনগুলো মস্তিষ্কের কাজ করার ধরনকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

জিন তো গেল একটা কারণ। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট বিষয় এই ব্যথাকে জাগিয়ে তোলে। এগুলোকে বলা হয় ট্রিগার। এই ট্রিগারগুলো একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়।

হরমোনের ওঠানামা মাইগ্রেনের একটি বড় ট্রিগার। বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন নামের একটি হরমোন। এই হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মেয়েদের মাইগ্রেন বেশি হয়। গর্ভাবস্থা বা মেনোপজের সময় এই হরমোন খুব ওঠানামা করে। তাই তখন ব্যথার প্রকোপ অনেক বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন

আমাদের রোজকার খাবারও মাইগ্রেনের কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা কফি খেলে মাইগ্রেন হতে পারে। আবার হঠাৎ কফি খাওয়া ছেড়ে দিলেও ব্যথা শুরু হতে পারে। খাবারে মেশানো নানা রকম রাসায়নিক উপাদানও এর জন্য দায়ী। অনেকেই ওজন কমানোর জন্য ডায়েট করেন। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকেন। খালি পেটে থাকলে বা কোনো বেলার খাবার বাদ দিলে মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হতে পারে।

আমাদের ঘুমের একটা নির্দিষ্ট চক্র আছে। এই চক্রে ব্যাঘাত ঘটলে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়। টানা কয়েক রাত ঘুম কম হলে মাইগ্রেন শুরু হতে পারে। দীর্ঘ সময় বিমানযাত্রার পর জেট ল্যাগ হয়। তখনো ঘুমের নিয়ম উল্টে যায়। এর কারণেও মাইগ্রেন হতে পারে।

পরিবেশের অনেক কিছুও মাইগ্রেন শুরু করতে পারে। তীব্র আলো বা কড়া রোদ মাইগ্রেনের ব্যথা বাড়িয়ে দেয়। খুব জোরে শব্দ বা কোলাহলও এই ব্যথা শুরু করতে পারে। এমনকি কড়া গন্ধও মাইগ্রেনের জন্য দায়ী। উগ্র পারফিউম, রঙের গন্ধ বা ধোঁয়া থেকে অনেকের মাথাব্যথা শুরু হয়।

মাইগ্রেন পুরোপুরি সারানোর কোনো জাদুমন্ত্র এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তবে নিজের ট্রিগারগুলো চিনে সেগুলো এড়িয়ে চললে বেশ ভালো থাকা যায়। সময়মতো খাওয়া ও ঘুমানো এ ক্ষেত্রে খুব জরুরি। বিজ্ঞানীরাও থেমে নেই। তাঁরা মস্তিষ্কের এই রহস্য সমাধানে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। নির্দিষ্ট কোনো সমাধানে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস

আরও পড়ুন