নক্ষত্রের ভোজে গ্রহ, অপেক্ষায় আছে বাদামি বামন

বৃহস্পতি গ্রহের চেয়ে প্রায় ২২ গুণ বেশি ভরবিশিষ্ট এই বাদামি বামনটির শেষ পর্যন্ত একই পরিণতি হবে। পতন হবে নক্ষত্রে।নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া

পৃথিবী থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ আলোকবর্ষ দূরের ঘটনা। একটি নক্ষত্র একটি গ্রহকে নিজের মধ্যে টেনে নিয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, নক্ষত্রটি শিগগিরই আরেকটি মহাজাগতিক বস্তুকেও গিলে ফেলতে পারে। নতুন দুটি গবেষণায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

মহাবিশ্বে অনেক গ্রহের পরিণতি শেষমেশ এমনই হয়। গ্রহ একসময় নক্ষত্রের ভেতরে ঢুকে যায়। প্রচণ্ড তাপে গলে ভেঙে যায় এদের মৌলিক উপাদানে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় গ্রহ-গ্রাস (planetary engulfment)। আমাদের সৌরজগতেরও একদিন এমন পরিণতি হবে। আরও কয়েক শ কোটি বছর পর সূর্য যখন লাল দানবে (Red Giant) পরিণত হবে, তখন সূর্য বুধ, শুক্র এবং সম্ভবত পৃথিবীকেও গ্রাস করবে।

এখন অবশ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অন্য নক্ষত্রে এমন ঘটনার প্রমাণ দেখছেন। কারণ, কোনো নক্ষত্র যখন একটি গ্রহকে গ্রাস করে, তখন সেই গ্রহের কিছু রাসায়নিক উপাদান নক্ষত্রের আলোতে বিশেষ ছাপ তৈরি করে।

ঠিক এমনই একটি নক্ষত্রের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। নাম TOI-5882। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই নক্ষত্রের আলোয় এখনো জ্বলজ্বল করছে খেয়ে ফেলা একটি গ্রহের অবশিষ্টাংশ। গবেষকদের মতে, গ্রহটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল একটি বিশাল ব্রাউন ডোয়ার্ফ বা বাদামি বামন। যেটি নক্ষত্রটিকে খুব কাছ থেকে প্রদক্ষিণ করছিল। বাদামি বামন হলো নক্ষত্র এবং গ্রহের মধ্যবর্তী একধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় বস্তু। এদের ভর সাধারণত সূর্যের ভরের তুলনায় অনেক কম। মাঝেমধ্যে এগুলোকে ব্যর্থ নক্ষত্র বলা হয়। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিকস জার্নালে।

বৃহস্পতি গ্রহের চেয়ে প্রায় ২২ গুণ বেশি ভরবিশিষ্ট এই বাদামি বামনটি সহজেই আশপাশের গ্রহগুলোর কক্ষপথ অস্থির করে দিতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এর নিজেরও একই পরিণতি হবে।

আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে এই বাদামি বামনটিকেও নক্ষত্রটি গিলে ফেলবে। আগের ধারণার তুলনায় ঘটনাটি হয়তো আরও দ্রুত ঘটবে। এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল কার্নাল লেটার্সে।

আরও পড়ুন
শিল্পীর কল্পনায় নক্ষত্রে গ্রহের পতন
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া

TOI-5882 নক্ষত্রটির ভর সূর্যের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। গত বছর এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মূলত এর চারপাশে ঘুরতে থাকা বাদামি বামনটির কারণে। TOI-5882-b নামের এই বিশাল বস্তুটি নক্ষত্রটির এত কাছাকাছি ঘুরছিল যে মাত্র এক সপ্তাহেই একটি প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করছিল। এই দূরত্ব এতই কম যে ভবিষ্যতে এটি নক্ষত্রের ভেতরে ঢুকে যাবে। এ বিষয়ে গবেষকেরা প্রায় নিশ্চিত। তুলনা করলে বলা যায়, পৃথিবীর সূর্যকে একটি প্রদক্ষিণ করতে লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন।

যখন বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রটিকে আরও বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন, তাঁরা দেখলেন এর আলোতে অস্বাভাবিক পরিমাণ লিথিয়াম রয়েছে। এই মৌলটি সাধারণত গ্রহে অনেক বেশি থাকে, নক্ষত্রে তেমন থাকে না। ফলে প্রশ্ন উঠল, নক্ষত্রটি কি এরই মধ্যে একটি গ্রহ খেয়ে ফেলেছে?

এর আগেও বিজ্ঞানীরা অনেক নক্ষত্রে লিথিয়ামসহ বিভিন্ন গ্রহ উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এসব উপাদান ইঙ্গিত দেয়, অতীতে এসব নক্ষত্র হয়তো এক বা একাধিক গ্রহ গ্রাস করেছিল। যদিও শুধু রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি দেখেই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন যে সেগুলো কোনো গ্রহ থেকেই এসেছে। তবু গবেষকদের মতে, TOI-5882-এর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন।

উইসকনসিন–ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক মেলিন্ডা সোয়ারেস-ফুর্তাদো এই দুটি গবেষণারই সহলেখক। তিনি বলেন, নক্ষত্রটি এর বিবর্তনের এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে লিথিয়ামের এই অস্বাভাবিক উপস্থিতির অন্য কোনো ব্যাখ্যা খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়।

মেলিন্ডা সোয়ারেস-ফুর্তাদো বলেন, সাধারণত খুব অল্পবয়সী কিংবা খুব বেশি বয়স্ক নক্ষত্রে স্বাভাবিকভাবেই লিথিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকতে পারে। কিন্তু TOI-5882 এই দুই শ্রেণির কোনোটিতেই পড়ে না। এটি না সদ্য জন্ম নেওয়া নক্ষত্র, না আবার জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছানো কোনো নক্ষত্র। তাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এত লিথিয়াম তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

এসব তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, TOI-5882 সত্যিই একটি গ্রহকে গ্রাস করেছে।

তবে এখানেই আরেকটি ধাঁধা সামনে এসেছে।

নক্ষত্রটি এখনো রেড জায়ান্ট বা লাল দানব পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ এটি এখনো ফুলে-ফেঁপে এত বড় হয়নি যে কাছের কোনো গ্রহকে নিজের ভেতরে টেনে নিতে পারে। তাহলে গ্রহটি নক্ষত্রের মধ্যে গেল কীভাবে?

প্রথম গবেষণার প্রধান লেখক এবং মিশিগান ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ব্রুক কটেন মনে করেন, এর পেছনে রয়েছে কাছাকাছি ঘুরতে থাকা ব্রাউন ডোয়ার্ফ TOI-5882-b।

আরও পড়ুন

বেশি ভরের কারণে এই ব্রাউন ডোয়ার্ফটির মহাকর্ষীয় টান আশপাশের গ্রহগুলোর কক্ষপথে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সেই অস্থিরতার ফলেই হয়তো একটি গ্রহ নিজের স্বাভাবিক কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়ে সরাসরি নক্ষত্রের দিকে ধাবিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত নক্ষত্রের সঙ্গে সংঘর্ষে ধ্বংস হয়ে যায়।

গবেষকদের মতে, এই বিশৃঙ্খলার পেছনে ছিল TOI-5882-b বাদামি বামন। আর নক্ষত্রের আলোতে পাওয়া লিথিয়ামের প্রমাণের সঙ্গে সেটি মিলিয়ে দেখা গেলে ধারণা করা যায়, হারিয়ে যাওয়া গ্রহটি সম্ভবত একটি পাথুরে সুপার-আর্থ কিংবা নেপচুনের সমান ভরের কোনো গ্রহ ছিল। গত প্রায় ২০০ কোটি বছরের মধ্যে কোনো এক সময়ে ঘটনাটি ঘটেছে। এটি নিজের কক্ষপথ থেকে ছিটকে নক্ষত্রের দিকে চলে গেছে।

গ্রহটি একবার নক্ষত্রের ভেতরে প্রবেশ করার পর পুরো গ্রাস হওয়ার প্রক্রিয়াটি খুব দ্রুত ঘটে। কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এটি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এর মৃত্যুর রাসায়নিক চিহ্ন নক্ষত্রের আলোয় কয়েক শ কোটি বছর পর্যন্ত থেকে যেতে পারে।

হারিয়ে যাওয়া গ্রহটির পরে নক্ষত্রের ভেতরে যাবে বাদামি বামনটি। আগের গবেষণাগুলোতে ধারণা করা হয়েছিল, বাদামি বামনটিকে নক্ষত্রটির গ্রাস করতে আরও প্রায় ১১ কোটি বছর লাগবে। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ঘটনাটি এরও অনেক আগে ঘটতে পারে।

এমআইটির (MIT) জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ঋত্বিক নারায়ণের নেতৃত্বে গবেষকেরা নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ গঠন এবং গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যে সৃষ্ট মহাকর্ষীয় টান (tidal dynamics) নিয়ে কম্পিউটার মডেল তৈরি করেন।

সেই বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্রাউন ডোয়ার্ফটি আগের ধারণার তুলনায় দুই থেকে ছয় গুণ দ্রুত নক্ষত্রের দিকে সর্পিল পথে এগিয়ে যেতে পারে। সম্ভবত আগামী আড়াই থেকে তিন কোটি বছরের মধ্যেই এটি এমন অবস্থানে পৌঁছাবে, যখন নক্ষত্রটি এটিকে গ্রাস করতে শুরু করতে পারবে। গবেষকেরা এখন TOI-5882-এ আরও এমন প্রমাণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, যা থেকে বোঝা যাবে নক্ষত্রটি অতীতে আরও কোনো গ্রহ খেয়ে ফেলেছিল কি না।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন