পশুদেরও কি পোষা প্রাণী থাকে
বানর, শিম্পাঞ্জি ও গিবনের মতো প্রাণীরা বেশ সামাজিক। বুনো পরিবেশে প্রায়ই দেখা যায়, এরা নিজের দলের বাইরে অন্য জাতের প্রাণীদের সঙ্গেও নানা মজার কাজ করছে। কখনো অন্য প্রাণীর সঙ্গে খেলা করছে, কখনো এদের গায়ের ময়লা পরিষ্কার করে দিচ্ছে, আবার কখনো ভালোবেসে পিঠে বসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সিরিল গ্রুয়েটার ও তাঁর দল দেখতে চেয়েছে, মানুষের মতো এসব প্রাণীদের মধ্যেও কি অন্য প্রাণীকে পোষা বা যত্ন নেওয়ার কোনো ইচ্ছা কাজ করে?
গবেষণাপত্রটি ‘প্রাইমেটস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। প্রশ্নের উত্তর জানতে গবেষকেরা ৩০৩টি বৈজ্ঞানিক ঘটনা, ৫৮টি ছবি ও ভিডিও এবং ৬৬ জন প্রাণী বিশেষজ্ঞের মতামত পরীক্ষা করেন। তাঁরা মূলত তিনটি বিষয় জানতে চেয়েছিলেন, প্রাইমেটরা কি এদের মতো দেখতে বা কাছাকাছি জাতের প্রাণীদের সঙ্গেই বেশি মেশে? স্ত্রী প্রাইমেটরা কি অন্য প্রাণীদের বেশি লালন-পালন করে? ছোট বা কম বয়সী প্রাইমেটদের মধ্যে কি এই আচরণ বেশি দেখা যায়? এখানে প্রাইমেট বলতে বানর, শিম্পাঞ্জি, গোরিলা ও গিবনের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দলকে বোঝানো হয়েছে।
গবেষণায় জানা যায়, এসব প্রাণী সত্যি সত্যিই অন্য প্রজাতির প্রাণীদের সঙ্গে চমৎকার বন্ধুত্ব জমাতে পারে। চীনের সাংহাই চিড়িয়াখানায় একটি বানরকে ইঁদুর নিজের কাছে রাখতে দেখা যায়। আবার একটি ল্যাঙ্গুর বানরকে দেখা গেছে বড় কাঠবিড়ালিকে আদর করতে। আর জাপানি ম্যাকাক বানর সুযোগ পেলে হরিণের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ছোট বানররা অন্য প্রাণীদের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি ও খেলাধুলা করতে পছন্দ করে। আর স্ত্রী বানররা অন্য প্রাণীর শরীর পরিষ্কার করে দেয় কিংবা কোলে তুলে নেয়।
তবে সব সম্পর্ক সবসময় ভালো থাকে না। কৌতূহল থেকে বা খেলার ছলে মিশতে গিয়ে কখনো কখনো এরা হিংস্র হয়ে ওঠে, যার ফলে ছোট প্রাণীটি আঘাত পেতে পারে। গবেষণা থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, প্রাণীর প্রতি কৌতূহল দেখানো, বন্ধুত্ব করা কিংবা যত্ন নেওয়ার স্বভাব অন্য প্রাণীদের মধ্যেও রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ প্রাইমেটদের চেয়ে স্ত্রী প্রাইমেটরা অন্য প্রজাতির প্রাণীদের অনেক বেশি ভালোবাসে ও এদের দেখভাল করে। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, কাকে যত্ন করছে, ওর বয়স কত, তা নিয়ে এরা একদম ভাবে না। ছোট কোনো বাচ্চার মতো ছানাই হোক কিংবা বয়স্ক কোনো প্রাণী, স্ত্রী প্রাইমেটরা একই রকম পরম মমতায় সবাইকে লালন-পালন করতে পারে।
প্রকৃতিতে নিজের শত্রুর সন্তানকে দত্তক নেওয়ার মতো অবাক করা ঘটনাও ঘটে। ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ভারতের গির জঙ্গলে একটি এশীয় সিংহী নিজের দুটি বাচ্চার সঙ্গে একটি চিতাবাঘের বাচ্চাকে নিজের সঙ্গে রেখে বড় করে। সিংহ ও চিতাবাঘ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সত্ত্বেও এটি ঘটেছিল।
বিজ্ঞানীরা জানান, কিছু প্রাণী নিজের সন্তান চেনার চেয়ে মাতৃত্বের স্বাভাবিক তাগিদকে বেশি প্রাধান্য দেয়। তাই শত্রুর বাচ্চাকেও এরা নিজের মনে করে কোল তুলে নেয়। এতে ভুল করে অন্য প্রাণীর সন্তানকে বড় করার বাড়তি ঝামেলা থাকলেও, এরা মায়ায় পড়ে বাচ্চাটিকে আগলে রাখে।
অন্য প্রাণীর সঙ্গে এমন বন্ধুত্ব প্রাইমেটদের টিকে থাকতেও সাহায্য করে। এতে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হয়, খাবারের নতুন উৎস খোঁজা যায় এবং বাচ্চার যত্ন নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়।
গবেষক সিরিল গ্রুয়েটার জানিয়েছেন, আমরা ঘরে বিড়াল বা কুকুর যেভাবে আদর করে পোষা প্রাণী বানিয়ে রাখি, বনের বানর বা শিম্পাঞ্জিরা ঠিক সেভাবে ভেবেচিন্তে অন্য প্রাণীকে পোষ মানায় না। তবে অন্যান্য প্রাণীর প্রতি এদের কৌতূহল, যত্ন নেওয়া কিংবা একসঙ্গে খেলার এই সহজাত স্বভাব আছে।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স