তোমরা যারা আমার থেকেও বেশি অ্যানিমেশন মুভি দেখো, তারা একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবে সব কটি অ্যানিমেশনের প্রধান চরিত্রের লক্ষ্য দর্শক হিসেবে তুমি দ্রুত জেনে যাও। আমার এ মুহূর্তে মনে পড়ছে ওয়াল-ই মুভিটার কথা। সেখানে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ধূসর পৃথিবীতে একটা রোবট একটা গাছের চারা খুঁজে পায়। এবার তার লক্ষ্য হয়ে ওঠে সেই চারাগাছটা বাঁচানো। পুরো মুভিটা সেই চারাগাছটিকে রক্ষা করা থেকে শুরু করে সেটির মাধ্যমে আবার পৃথিবীকে সবুজ করে তোলারই তো গল্প। ওয়াল-ই আসলে চারাগাছটার মাধ্যমে বাঁচিয়ে চলছিল আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীকেই।

আরেকটা মুভির কথা মনে পড়ছে—আপ! আপ সিনেমাও নিশ্চয় তোমরা দেখেছ। সেখানে এক বয়স্ক দম্পতি তাদের তারুণ্যে ঠিক করেছিল একটি পাহাড়ের পাশে নিজেদের ঘর করবে। দুজনই ছিল ভীষণ ভ্রমণপিপাসু। কিন্তু সংসারের নানা প্রতিবন্ধকতায় তাদের সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। আমরা দেখি সেই দম্পতি তাদের বাড়িটাকে এবার নিয়ে যেতে চায় সেই বিশেষ পাহাড়ের কাছে। বয়স্ক দম্পতির এই ইচ্ছা আর লক্ষ্যের সঙ্গে আমরা একাত্ম হয়ে মুভিটাকে উপভোগ করতে থাকি।

এভাবে কুংফু পান্ডা, মাদাগাসকার থেকে শুরু করে সব অ্যানিমেশনেই আমাদের প্রধান চরিত্র তার লক্ষ্য জানিয়ে দেয় আমাদের। আর আমরা তাদের লক্ষ্যকে নিজেদের লক্ষ্য বানিয়ে চোখের পলক না ফেলে তাদের আনন্দে হাসি আর তাদের দুঃখে কাঁদি। এবার আমরা যখন অ্যানিমেশনের গল্প লিখব, চরিত্র তৈরি করব তখন যেন খেয়াল রাখি আমাদের প্রধান চরিত্রের লক্ষ্যের ব্যাপারটা। এটা আমরা যত দ্রুত আর যত পরিষ্কারভাবে পাঠক ও দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারব, তত বেশি শক্তিশালী হবে চরিত্রগুলো। চরিত্রের লক্ষ্য তৈরির ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে চরিত্রের লক্ষ্য কিন্তু একটি ঘটনা থেকে আরেকটি ঘটনায় গিয়ে বদলাতে পারে। বা বড় একটি লক্ষ্যের মধ্যে ছোট ছোট অনেক লক্ষ্যও তৈরি হতে পারে। যেমন কোকো মুভিটাতেই প্রথমে আমরা জানতে পারি যে মিগেল একটা প্রতিযোগিতায় গান গাইতে চায়। কিন্তু ঘটনাচক্রে সে ভূতের দেশে পৌঁছে যায়। এবার সেখানে গিয়ে তার লক্ষ্য তৈরি হয় যে তাকে যেভাবে হোক মানুষের জগতে ফিরে আসতে হবে। না হলে সে ধীরে ধীরে ভূতে বদলে যাবে। পুরো মুভিজুড়েই দেখা যায় মিগেল ছোট ছোট বিভিন্ন লক্ষ্যে এগিয়ে যায় এবং সব শেষে তার সবচেয়ে যে বড় লক্ষ্য গায়ক হয়ে ওঠা—সেটা পূরণ করতে সক্ষম হয়।

হতে হবে তৎপর

প্রধান চরিত্রটিকে অবশ্যই তৎপর এমনকি অতি-তৎপর হওয়াও প্রয়োজন। অতি-তৎপরের ইংরেজি Pro-active. এই শব্দটা নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে বেশি পরিচিত। যদি চরিত্রের কোনো তৎপরতা না থাকে তাহলে সে ঘটনার জন্ম দিতে পারবে না...আর যে চরিত্র ঘটনার জন্ম দিতে পারে না, তাকে আমরা কেন পছন্দ করব? তৎপরতা মানে কিন্তু শুধু ছোটাছুটি, দৌড়াদৌড়ি নয়। টম অ্যান্ড জেরির ছোটাছুটির কথা আমাদের সবার মনে আছে। কিন্তু সবাই তো আর তাদের মতো না। কুংফু পান্ডার পান্ডাটিই যেমন ভীষণ অলস...তবু খেয়াল করলে দেখতে পাই চরিত্রটি ভীষণ তৎপর। সে একের পর এক ঘটনার জন্ম দিয়ে চলে। এই সে খাচ্ছে তো এই সে কারাতের অনুশীলন করছে। সে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে ঠিকই, মাস্টার শিফুর সামনে থেকে পালাতে চাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কখনোই আসলে থেমে থাকছে না। টারবো মুভিটার কথা নিশ্চয়ই তোমাদের মনে আছে? ওই যে একটা শামুকের গল্প। খেয়াল করলে দেখবে শামুকের মতো ধীরস্থির প্রাণীটিও কী ভীষণভাবে কিছু না কিছু করে যাচ্ছে সিনেমাটিতে। আসলে প্রধান চরিত্র যদি ঘটনার জন্ম দিতে না পারে এবং ঘটে যাওয়া ঘটনার বিপরীতে রিঅ্যাক্ট করতে না পারে, তাহলে চরিত্রটি খুবই বোরিং লাগে। আমরা বলি না কিছু কিছু সিনেমার ক্ষেত্রে যে ধুর, সিনেমাটা খুব বোরিং!...এবার তোমরা লক্ষ করে দেখো, সিনেমাটা বোরিং হয়ে উঠছে আসলে চরিত্রগুলোর জন্য। কারণ তারা হয় কোনো ঘটনার জন্ম দিতে পারছে না...না হয় ঘটে যাওয়া ঘটনায় রিঅ্যাক্ট করছে না। তাই আমরা আমাদের অ্যানিমেশন চরিত্র নির্মাণের সময় তাকে একটা লক্ষ্য যেমন দেব তেমনি এমন তৎপর-অতি-তৎপর বানাব যেন প্রায় কোনো সময়ই সে চুপ করে বসে না থাকে। সে যেন ঘটনার জন্ম দিতে দিতে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়।

যেন বৈশিষ্ট্য না হারায়

একটা ভালো চরিত্র কখনোই তার বৈশিষ্ট্য হারাবে না। আমরা যখন চরিত্র নির্মাণ করব তখন যেন অবশ্যই এই লাইনটা মাথায় রাখি। কারণ এটা কখনো কখনো আমরা করে ফেলি যে ঘটনার ঘনঘটায় যে চরিত্রটিকে হয়তো দেখিয়েছিলাম আপেল পছন্দ করে না, সে দিব্যি আপেল খাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, চরিত্র বিনা কারণে, তেমন কোনো ঘটনা না ঘটলে, কখনোই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হারাবে না। বাস্তব জীবনে একজন মানুষ হয়তো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বাইরে গিয়ে কিছু করতে পারে, কিন্তু মুভিতে তেমন কিছু হঠাৎ করে দেখালে দর্শকদের মনে প্রশ্ন উঠবে এবং চরিত্রটির ওপর আস্থা কমে যাবে। কুংফু পান্ডায় পুকে আমরা দেখেছি সে ভোজনপ্রিয় আয়েশপ্রিয় আমুদে চরিত্র। ভীষণ মারপিটের সময়ও সে চট করে কোনো একটা খাবার তুলে খেয়ে নেয়। আবার আগুনের মধ্যেও তার আমুদে ভাবটা নষ্ট হয়ে যায় না। চরিত্র নির্মাণের সময় আমরা একটা চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো পাশে লিখে ফেলতে পারি। কেউ কেউ ক্যারেক্টার ডায়মন্ডও তৈরি করে। তাতে চরিত্রের নাম মধ্যে রেখে তার ছয়টা কোনায় লেখা হয় ছয়টি বৈশিষ্ট্য। আমরা আমাদের গল্পের সব কটি চরিত্রের ক্যারেক্টার ডায়মন্ড তৈরি করে তাদের বৈশিষ্ট্য পাশে লিখে নিজের কাছে রাখতে পারি। যেন দরকার পড়লেই একবার চোখ বুলিয়ে বুঝে নিতে পারি আমার চরিত্রের মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কী কী। আর লেখার সময় সেই বৈশিষ্ট্য থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি কি না।

হোক আন্ডারডগ

শুধু খেলায় না, আন্ডারডগ শব্দটা কিন্তু দারুণভাবে পাওয়া যাবে চরিত্র তৈরিতেও। মনে রাখার মতো বেশির ভাগ চরিত্রগুলোই দেখা যায় আসলে একেকটি আন্ডারডগ চরিত্র। মানে, সে বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত হয়েছে, না হয় হচ্ছে। হয় সে দুর্বল, না হয় সে এমন শক্তির মুখোমুখি হয় যে পরাজয় নিশ্চিত। আন্ডারডগ চরিত্র সব সময় মানুষের মধ্যে মমতা তৈরি করতে সক্ষম হয়। মানুষ দ্রুত চরিত্রটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, ভালোবেসে ফেলে। খরগোশ আর কাছিমের দৌড়ের গল্পে প্রায় প্রথম থেকেই আমরা যে কাছিমের পক্ষে অবস্থান নিই, তার কারণ কিন্তু এটাই। আমরা জানি কাছিমটি কখনো খরগোশের সঙ্গে দৌড়ে পারবে না। সেই শক্তিই তার নেই। কিন্তু খরগোশের আলস্যে আর কাছিমের লেগে থাকার প্রবল বাসনায় যখন দেখি শেষে খরগোশ না, জিতে যাচ্ছে কাছিমটি...তখন আমরা রোমাঞ্চিত হই, আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়ি। কাছিমকে আমরা আপনজন মনে করি।

যদি বাংলাদেশ খেলছে না এমন একটি ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে বসি আমরা...আর যদি আমাদের ব্যক্তিগত কোনো পছন্দের দল না থাকে, তাহলে মনে মনে আমরা কিন্তু অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলকেই সমর্থন করি। মানুষের সাধারণ অবস্থান সব সময় দুর্বলদের পক্ষেই হয়ে থাকে। আর সেই দুর্বল চরিত্র যখন এমন কোনো কিছু অর্জন করে, যা তার পক্ষে করা ছিল প্রায় অসম্ভব...তখন মানুষ তাকে অনেক দিন মনে রাখে।

অ্যানিমেশন চরিত্র নির্মাণের সময়ও আমরা মানুষের এই সাধারণ অবস্থার কথা মনে রাখতে পারি। সদ্য দেখে শেষ করা কোকো মুভিতেও দেখি মিগেল এক আন্ডারডগ চরিত্র। গায়ক হয়ে ওঠা তার জন্য এক অসম্ভব ব্যাপার। কারণ, জুতার কারিগরিতে তুষ্ট থাকা পরিবারের প্রতিটি সদস্য গানকে ঘৃণা করে। এ রকম অবস্থায় মিগেল যখন সত্যিই গায়ক হয়ে ওঠে, তখন আমাদের মন মিগেলের সঙ্গে খুশিতে নেচে ওঠে।

এ ছাড়া আরও কিছু কথা চরিত্রটি নির্মাণের সময় আমরা মনে রাখতে পারি। যেমন চরিত্রটি হাতি-ঘোড়া-ব্যাঙ-মশা-মাছি যে-ই হোক না কেন তার দর্শক হবে মানুষ। তাই ওই চরিত্রের মধ্য দিয়ে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের সমস্যা আর মানুষের ইচ্ছাগুলোকেই প্রকাশ করব। চরিত্রটির যদি কোনো বিশেষ দুর্বলতা থাকে এবং দর্শক যদি তা জেনে যায়, তাহলে মজার মজার ঘটনা ঘটাতে দারুণ সুবিধা হয়। ধরা যাক একটা চরিত্রের উচ্চতাভীতি রয়েছে দর্শক এটি মুভির প্রথম দিকেই জেনে গেলেন। পরে দেখা গেল খুব কঠিন একটা মুহূর্তে চরিত্রটিকে একটা প্লেনে উঠতে হচ্ছে। এবার প্লেনে উঠে চরিত্রটি কী করে তা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠবে। চরিত্রের কোনো বিশেষ বিষয়ের প্রতি দুর্বলতা, ভীতি, গোপনীয়তা থাকলে সেটা তাকে নির্মাণে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে।

তো, অনেক কথা হয়ে গেল এতক্ষণ। এত বকবক শুনে নিশ্চয়ই তোমাদের মাথা ধরে গেছে? আচ্ছা একটা বকবক করা চরিত্র তৈরি করলে কেমন হয়? ঠিক আছে...আমি এখন বকবক করা চরিত্রটি নিয়ে কাগজ-কলম টেনে বসছি। বুঝতেই পারছি চরিত্রটি তোমাদের পছন্দ হয়নি, তোমরা না হয় তোমাদের মতো একটা করে চরিত্র তৈরি করো! যে চরিত্রটিকে তুমি ভালোবাসবে...যে হাসলে তুমি হাসবে, যে কাঁদলে তুমি কাঁদবে! তোমার কাছে আছে নাকি এমন একটা চরিত্র?