ভালো মানুষেরা কি সব সময় পিছিয়ে পড়ে

ছবি: সংগৃহীত

ভালো ব্যবহার ও সাহায্য করার মানসিকতা নিশ্চয়ই ভালো গুণ। কিন্তু সব সময় সবার কথায় ‘হ্যাঁ’ বলাই কি ভালো মানুষ হওয়ার লক্ষণ? গবেষণা বলছে, ব্যাপারটা এত সহজ নয়।

‘তুমি মানুষ হিসেবে খুব ভালো!’—কথাটা শুনলে নিশ্চয়ই সবার ভালো লাগে। আমিও একসময় ভাবতাম, ভালো মানুষ হওয়াই বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রশংসা। আমি এমন মানুষ হতে চাইতাম, যাকে নিয়ে অন্যরা বলবে, ‘ও আসলেই খুব ভালো।’ এমনকি আমি যখন সেখানে থাকব না, তখনো মানুষ আমাকে ভালো বলবে।

এখান থেকেই হিল্টন নামের একজন লেখকের জীবনের দারুণ একটা অভিজ্ঞতার কথা তোমাদের সঙ্গে শেয়ার করি। হিল্টন রিডার্স ডাইজেস্টে লিখেছেন:

একবার আমার বসের অফিসে অনেক কাজের চাপ ছিল। তিনি খুব ব্যস্ত সময় পার করছিলেন। আমি নিজেই এগিয়ে গেলাম তাঁকে সাহায্য করতে। কারণ, আমি তো দলের ভালো সদস্য! মানুষকে সাহায্য করতেও আমার ভালো লাগে। তবে সত্যি কথা বলতে, মনে মনে আরেকটা আশাও ছিল। ভাবছিলাম, আমি যদি যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করি আর সবাইকে সাহায্য করি, তাহলে বস খুশি হবেন। হয়তো একদিন আমাকে পদোন্নতিও দেবেন।

কয়েক মাস ধরে নিজের কাজের পাশাপাশি সকাল-সন্ধ্যা আমি অতিরিক্ত শিফট করতে শুরু করলাম। নিজের কাজ শেষ করে অন্যের কাজও করতাম। ভাবতাম, এত কিছু করছি, নিশ্চয়ই একদিন এর মূল্য পাব।

অবশেষে একদিন বসের কাছ থেকে একটা ই-মেইল এল। আমি ভাবলাম, এবার হয়তো তিনি বলবেন, ‘তুমি এত অতিরিক্ত কাজ করেছ, তোমাকে ধন্যবাদ। তোমাকে ছাড়া এটা সম্ভব হতো না।’

কিন্তু না। ই-মেইলে ছিল অন্য কথা। এক শিফট শেষে আমি নাকি যথেষ্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিনি। সে জন্য তিনি আমাকে ই-মেইল করে বকা দিলেন। শেষে বস লিখলেন, ‘মনে রেখো, এখানে কাজ করতে পারা তোমার সৌভাগ্য।’

আরও পড়ুন

মাথা গরম হয়ে গেল! কারণ, চাকরিটা ছিল খুবই সাধারণ, ন্যূনতম মজুরির একটা চাকরি। আমি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী ছিলাম না। ক্যানসারের ভ্যাকসিনও আবিষ্কার করছিলাম না। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের গোপন কোড পাহারা দেওয়ার দায়িত্বও আমার ছিল না। অথচ আমি নিজের কাজের বাইরে এত কিছু করছিলাম, মূলত বসকেই সাহায্য করার জন্য।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এত ভালো ব্যবহার করেও আমি পদোন্নতি পেলাম না। এমনকি আমাকে খুব ভালো কর্মী হিসেবেও মনে করা হলো না। বরং যে ব্যক্তি পদোন্নতি পেলেন, তিনি মোটেও ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন না।

তখনই মনে হলো, ছোটবেলায় শুনেছিলাম, ‘ভালো ছেলেরা সবার শেষে থাকে।’

অবশ্য আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ছিল একটু অন্য রকম। আমি এত বেশি ভালো হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম যে অতিরিক্ত অনেকগুলো শিফট করেছি, বাথরুম পরিষ্কার করেছি, জিনিসপত্র গুছিয়েছি, নিজের ওপর চাপ নিয়েছি এবং অসুস্থও হয়েছি। তারপরও কিছু জিনিস ঠিকমতো না করার জন্য ক্ষমা চেয়েছি!

শুনলে তো লেখকের কথা? তাঁর জীবনের এই বাস্তব অভীজ্ঞতা থেকে আমরা কী শিক্ষা নেব? তাহলে কি ভালো হওয়াটা আসলেই কোনো কাজে আসে না?

অবশ্যই আসে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, ভালো মানুষ হওয়ার অর্থ সব সময় অন্যের কথায় রাজি হয়ে যাওয়া নয়। বরং কোথায় সাহায্য করতে হবে, কোথায় ‘না’ বলতে হবে, তা জানতে হবে। পাশাপাশি জানতে হবে, নিজের অধিকার কীভাবে ধরে রাখতে হয়।

আর ভালো মানুষ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি, সেটাও আগে পরিষ্কার করা দরকার।

আরও পড়ুন

ভালো মানুষ বলতে কী বোঝায়

‘ভালো’ কথাটার অর্থ আসলে বেশ গোলমেলে। পরিস্থিতি বদলালে এর অর্থও বদলে যেতে পারে। তাই আমরা শুরুতে কাইন্ডনেস (kindness) শব্দটা নিয়ে একটু কথা বলি। এই শব্দের মানে দয়া বা অন্যের প্রতি ভালো আচরণ। সহজ করে বললে, নিজের কিছুটা সময় বা শ্রম দিয়ে অন্যের উপকার করার চেষ্টা করা। কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে।

কেউ যদি সাহায্য করতে চায় বলেই অন্যকে সাহায্য করে, তাহলে সেটা এক জিনিস। মানে সাহায্য করতে তার ভালো লাগে। কিন্তু কেউ যদি শুধু অন্যকে খুশি করার জন্য সব সময় ‘হ্যাঁ’ বলেন, তাহলে সেটা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। প্রথমটি হতে পারে কাইন্ডনেস, দ্বিতীয়টি অনেক সময় হয়ে যায় পিওপেল প্লেসিং। মানে অন্যকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজের প্রয়োজনকে সব সময় পেছনে ফেলে দেওয়া।

এখানেই একটা মজার ব্যাপার আছে। ভালো মানুষ হলে জীবনের সব জায়গায় একই ফল পাওয়া যায় না। চাকরি, প্রেম বা বন্ধুত্ব এবং সুখ—এই তিন বিষয় আলাদা করে দেখলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়।

কখনো বেশি সহমতপ্রবণ বা সব সময় অন্যের সঙ্গে মানিয়ে চলা মানুষ কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তে পারেন। আবার অন্যের প্রতি সত্যিকারের দয়ালু হওয়া ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে সাহায্য করে। এতে মানুষের সুনামও বাড়তে পারে, সুখও বাড়তে পারে। এবার একেক করে দেখা যাক।

চাকরিতে কি ভালো মানুষ পিছিয়ে পড়ে

এখানে ভালো হওয়ার একটা সমস্যা আছে। জার্নাল অব পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি বিখ্যাত গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা ব্যক্তিত্বের দিক থেকে বেশি সহমতপ্রবণ, তাঁরা কর্মজীবনে তুলনামূলক কম আয় করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য আরও বেশি দেখা গেছে।

এর একটা সম্ভাব্য কারণ হলো, তাঁরা নিজের দাবি আদায় করে নিতে পারেন না। যেমন বেতন বাড়ানোর সময় হয়তো তাঁরা বেশি জোর দিয়ে কথা বলেন না। পদোন্নতি পাওয়ার সময় নিজের যোগ্যতা তুলে ধরতেও অস্বস্তি বোধ করতে পারেন।

কেউ যদি সব সময় ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চান এবং সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে বারবার ‘হ্যাঁ’ বলেন, তাহলে একটা সময় অন্যরা ধরে নিতে পারে, তাঁকে দিয়ে আরও কাজ করানো যাবে।

ফলে তিনি অতিরিক্ত কাজ করলেও হয়তো বেতন বাড়ানোর কথা বলেন না, পদোন্নতির কথা তো তোলেনই না। একসময় মনে হতে পারে, ‘আমি এত কিছু করছি, অথচ কেউ আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।’

এতে জমতে পারে রাগ, হতাশা ও মানসিক চাপ। এমনকি কাজের প্রতি একসময় ক্লান্তিও চলে আসতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে দয়ালু হওয়া কর্মক্ষেত্রে খারাপ। বরং সত্যিকারের দয়ালু আচরণ অন্য রকম ফল দিতে পারে।

কেন?

কারণ, মানুষ সাধারণত এমন কাউকে পছন্দ করে ও বিশ্বাস করে, যার সঙ্গে কাজ করতে ভালো লাগে। মানুষ সাধারণত এমন কাউকে পদোন্নতি দিতে এবং সাহায্য করতে বেশি আগ্রহী হয়, যাকে তারা পছন্দ ও বিশ্বাস করে। এখানে দয়ালু হওয়ার একটা বড় সুবিধা আছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অপরিচিত কিছু মানুষকে যখন এলোমেলোভাবে কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়েছিল, তখন দলের সবচেয়ে বেশি পরোপকারী সদস্যদেরই অন্যরা নেতা ও সহযোগী হিসেবে বেছে নিতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে।

অর্থাৎ আপনি যদি এমন কাজে থাকেন যেখানে অন্যদের সঙ্গে মিলে কাজ করতে হয় বা নেতৃত্ব দিতে হয়, তাহলে দয়ালু হওয়া বেশ কাজে আসতে পারে। কারণ, দয়ালু আচরণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস বাড়ায়। সম্পর্ক ভালো হয়, মানুষ একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়। দলের কাজও ভালো হয়। আর দীর্ঘদিন ধরে ভালো ব্যবহার করলে কর্মক্ষেত্রে আপনার সুনামও তৈরি হতে পারে।

তাই কর্মক্ষেত্রে সমস্যা ‘ভালো’ হওয়ায় নয়। সমস্যা হয় যখন ভালো হতে গিয়ে নিজের অধিকারটুকুও ছেড়ে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

ভালো মানুষ কি বেশি সুখী

গবেষণা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাঁ। হার্ভার্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের সুখের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো অর্থপূর্ণ সম্পর্ক। অর্থাৎ এমন সম্পর্ক, যেখানে মানুষ সত্যিই একে অন্যের কাছাকাছি থাকে, ভরসা করতে পারে এবং প্রয়োজনের সময় পাশে পায়।

দয়ালু মানুষ সাধারণত অন্যদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। ফলে তাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সব মিলিয়ে তাঁদের মানসিকভাবে ভালো থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।

শুধু তা-ই নয়, কাউকে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করাও নিজের সুখ বাড়াতে পারে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২৭টি পরীক্ষার ফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। এসব পরীক্ষায় মোট চার হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। ফলাফল ছিল বেশ মজার। যাঁরা অন্যের জন্য ভালো কাজ করেছিলেন, তাঁরা ভালো কাজ না করা দলের চেয়ে বেশি সুখে ছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।

অর্থাৎ অন্যকে সাহায্য করলে শুধু অন্য মানুষেরই উপকার হয় না, নিজের মনও ভালো হতে পারে।

তাহলে পিছিয়ে পড়ার কথাটা কি ভুল

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, হ্যাঁ। তবে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা সত্যিই পিছিয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ হয়তো অতিরিক্ত। তাঁরা হয়তো সহজে রাজি হয়ে যাওয়া মানুষ। আরেক দল আছেন, যাঁরা বাইরে থেকে ভালো ব্যবহার করেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা করেন।

ধরা যাক, আপনি বন্ধুকে সাহায্য করলেন। কিন্তু মনে মনে ভাবলেন, ‘আমি ওর জন্য এত কিছু করলাম, এখন ওকেও আমার জন্য কিছু করতেই হবে।’

এটা আর পুরোপুরি নিঃস্বার্থ দয়া নয়। ওপরে যে লেখকের কথা বললাম, তাঁরও এখানেই সমস্যা হয়েছিল। তিনি একদিকে সব কিছুতে রাজি হয়ে যাচ্ছিলেন, অন্যদিকে মনে মনে আশা করছিলেন, এত কিছু করার পর নিশ্চয়ই বস তাঁকে পুরস্কৃত করবেন।

কিন্তু ভালো ব্যবহারকে যদি সব সময় কোনো পুরস্কার পাওয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে হতাশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর জীবনে সব ফল সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না।

কেউ যদি অল্প সময়ের জন্য স্বার্থপর বা আক্রমণাত্মক আচরণ করে, তাতে হয়তো সে দ্রুত কোনো সুবিধা পেতে পারে। দেখে মনে হতে পারে, খারাপ মানুষটাই জিতে গেল! কিন্তু দীর্ঘ সময়ে মানুষের আচরণের একটা হিসাব তৈরি হয়। মানুষ মনে রাখে কে তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছে, কে খারাপ ব্যবহার করেছে। কে শুধু নিজের দরকারে ভালো ব্যবহার করেছে, তা-ও মানুষ মনে রাখে। তাই দীর্ঘমেয়াদে ভালো সুনামের মূল্য অনেক।

ছেলে ও মেয়েদের ক্ষেত্রে কি ব্যাপারটা আলাদা

কিছুটা আলাদা। তবে মানুষ আসলে কতটা ভালো, তার চেয়ে অন্যরা তাকে কীভাবে বিচার করছে, পার্থক্যটা সেখানে বেশি। সমাজে পুরুষ ও নারীর কাছ থেকে অনেক সময় আলাদা ধরনের আচরণ আশা করা হয়।

যেমন একজন পুরুষ যদি নিজের কথা জোর দিয়ে বলেন, তাঁকে আত্মবিশ্বাসী বা শক্তিশালী মনে করা হতে পারে। কিন্তু একজন নারী একইভাবে নিজের কথা বললে তাঁকে কখনো কখনো ‘কঠিন’ বা ‘ঝামেলাপূর্ণ’ বলে মনে করা হয়।

আবার নারীদের কাছ থেকে সাধারণত বেশি সহযোগিতাপূর্ণ ও ঝামেলা এড়িয়ে চলা আচরণ আশা করা হয়। ফলে কর্মক্ষেত্রে একজন নারী একদিকে খুব নরম হলে তাঁকে দুর্বল মনে করা হতে পারে, আবার বেশি দৃঢ়ভাবে কথা বললে বলা হতে পারে তিনি যথেষ্ট ‘ভালো’ নন।

এ ক্ষেত্রে একই আচরণকে পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে বিচার করা। তবে পুরুষেরাও এই ধরনের সামাজিক ধারণার কারণে সমস্যায় পড়তে পারেন। খুব দয়ালু বা নরম পুরুষকে কখনো কখনো কম শক্তিশালী মনে করা হয়। অর্থাৎ ছেলেমেয়ে দুই পক্ষই এই ধরনের সামাজিক ধারণার কারণে সমস্যায় পড়তে পারে। শুধু সমস্যার ধরন হতে পারে আলাদা।

আরও পড়ুন

তাহলে উপায় কী

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আসে। দয়ালু হওয়া আর নিজের সব সীমা মুছে ফেলা এক জিনিস নয়। তুমি অন্যকে সাহায্য করবে, ভালো ব্যবহার করবে, কিন্তু নিজেরও কিছু সীমা থাকবে। সেই সীমা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কেউ সত্যিই সাহায্য করতে চান বলে সাহায্য করলে সেটা দয়া দেখানো। কিন্তু কেউ ‘না’ বলতে ভয় পান বলে সাহায্য করলে সেটা অনেক সময় অন্যকে খুশি রাখার চেষ্টা হয়ে যায়।

নিজেকে বোঝার জন্য কয়েকটি প্রশ্ন কাজে লাগতে পারে। প্রথমত, কেউ তোমাকে কিছু করতে বললে নিজেকে জিজ্ঞাসা করো, ‘আমি কি সত্যিই এটা করতে চাই?’ নাকি তুমি ভয় পাচ্ছ যে ‘না’ বললে সে রাগ করবে?

দুটি বিষয় কিন্তু এক নয়। তুমি যদি নিজের ইচ্ছায় কাউকে সাহায্য করো, সেটি তোমার সিদ্ধান্ত। কিন্তু শুধু অন্যের রাগ বা অসন্তুষ্টির ভয় থেকে বাঁচাতে রাজি হলে, তুমি হয়তো নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করছ।

আরেকটি লক্ষণ হলো, কোনো কাজ করার পর তোমার ভেতরে খুব রাগ বা বিরক্তি জমছে কি না। ধরো, তুমি বন্ধুর জন্য কিছু করলে। বাইরে বললে, ‘কোনো সমস্যা নেই।’ কিন্তু ভেতরে–ভেতরে ভাবছ, ‘আমাকে দিয়েই সব কাজ করিয়ে নেয়!’ এ রকম ক্ষেত্রে তোমার শুরুতেই ‘না’ বলা উচিত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের উদ্দেশ্য বোঝা।

কেউ যদি তোমার কাছে অনেক কিছু চায় এবং তুমি শুধু তাকে কষ্ট দিতে চাও না বলে সবকিছু মেনে নাও, তাহলে সেটি ভালো ব্যবহার হলেও নিজের প্রতি অন্যায় হতে পারে। আবার কেউ তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে, কিন্তু তুমি ঝামেলা হবে ভেবে চুপ করে থাকলে। এটাও ভালো মানুষ হওয়ার প্রমাণ নয়। তুমি উদার হতে পারো, বড় মনের মানুষ হতে পারো, অন্যকে সাহায্য করতে পারো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে অন্য মানুষ তোমার ওপর নিয়ন্ত্রণ করবে।

না বলা কি খারাপ

একদম নয়। অনেক সময় আমরা ‘না’ বলতে গিয়ে এত বেশি ব্যাখ্যা দিই যে একটা ছোট ‘না’ পাঁচ পৃষ্ঠার গল্প হয়ে যায়! আসলে ‘না’ একটি সম্পূর্ণ বাক্য। অবশ্য ভদ্রভাবে ‘না’ বলা যায়। যেমন, ‘দুঃখিত, এবার পারছি না।’ এর বেশি ব্যাখ্যা সব সময় দরকার নেই। নিজেকে প্রশ্ন করো, এই মুহূর্তে আমার কতটা সময়, শক্তি বা মানসিক সামর্থ্য আছে? যতটা পারছ, ততটাই করো। ভালো মানুষ হওয়ার জন্য নিজের সব শক্তি শেষ করে ফেলার দরকার নেই।

আর নিজের প্রয়োজনের কথাও বলতে হবে। একই সঙ্গে দয়ালু এবং দৃঢ় হতে হবে। নিজের প্রয়োজনের কথা পরিষ্কারভাবে বলা মানে খারাপ মানুষ হওয়া নয়। বরং নিজের কথা বলার সময় অন্যের কথাও শুনতে হবে, তার দিকটা বুঝতে হবে এবং প্রয়োজন হলে মাঝামাঝি একটা সমাধান খুঁজতে হবে।

তুমি অন্যকে সাহায্য করবে, আবার নিজের লক্ষ্যও ঠিক রাখবে। নিজের পড়াশোনা, কাজ, সময়, বিশ্রামেরও মূল্য আছে। ব্যক্তিগত সীমা থাকা খুব দরকার। সীমা মানে অন্য মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং তুমি কী করবে আর কী করবে না, সেটা পরিষ্কার করে দেওয়া। যেমন, কেউ যদি প্রতিদিন তোমার ক্লাসের নোট ধার চায়, তুমি বলতে পারো, ‘আজ দিতে পারব, কিন্তু প্রতিদিন দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ অথবা কেউ তোমার সঙ্গে খারাপভাবে কথা বললে বলতে পারো, ‘তুমি যদি এভাবে কথা বলো, আমি এই আলোচনা আর আগাব না।’

এখানে তুমি অন্য মানুষকে কী করতে হবে, সেটা ঠিক করে দিচ্ছ না। তুমি শুধু বলছ, অন্য মানুষ এমন আচরণ করলে তুমি কী করবে। কারণ, সীমা না থাকলে একটা ছোট সাহায্যও পরে নিয়মে পরিণত হতে পারে। আজ তুমি একবার বন্ধুর কাজ করে দিলে। কাল সে আবার বলল। পরশু আরও বড় কাজ দিল। তুমি প্রতিবারই ‘ঠিক আছে’ বললে। একসময় সে ধরে নিতে পারে, এই কাজটা করা তোমার দায়িত্ব। তখন তুমি ভাববে, ‘আমি তো এত সাহায্য করছি!’ অন্যজন ভাববে, ‘এটা তো ও এমনিতেই করে।’ সমস্যা শুরু হয় এখানেই।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টা ভালো বা খারাপ হওয়ার নয়। বিষয়টা হলো, তুমি কেন ভালো আচরণ করছ। শুধু অন্যরা তোমাকে পছন্দ করবে বলে সব সময় তাদের কথা মেনে চলা ভালো মানুষ হওয়ার একমাত্র উপায় নয়। তুমি অন্যকে সাহায্য করতে পারো, কিন্তু নিজের প্রয়োজনও বুঝতে হবে। কাউকে ভালোবাসতে পারো, কিন্তু নিজের সম্মানও ধরে রাখতে হবে। বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে পারো, আবার প্রয়োজন হলে তাকে ‘না’ও বলতে পারতে হবে।

ভালো মানুষ হওয়া মানে সবার জন্য নিজেকে শেষ করে ফেলা নয়। অনেক সময় আমরা ছোটবেলা থেকেই শিখি, ভালো ছেলে বা ভালো মেয়ে হলে কথা শুনতে হবে, কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না, সব সময় সাহায্য করতে হবে। এসব শেখার মধ্যে অনেক ভালো বিষয় আছে। কিন্তু একটা সময় বুঝতে হয়, সবাইকে খুশি রাখা সম্ভব নয়। তুমি যতই ভালো হও না কেন, কেউ না কেউ তোমার ওপর রাগ করবেই। কেউ তোমার কোনো সিদ্ধান্ত হয়তো পছন্দ করবে না। কেউ তোমার ‘না’ শুনে বিরক্তও হতে পারে।

তাই শুধু অন্য কেউ খুশি থাকবে বলে নিজের সব ইচ্ছা, সময় ও শক্তি দিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। সব কথায় হ্যাঁ বলার মানেই ভালো মানুষ হওয়া নয়। আর সত্যিকারের দয়ালু হওয়ার মানেও এই নয় যে তুমি নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেবে। নিজেকে সস্তা বানিয়ে বা অন্যের দরকারে সব সময় হাজির থেকে কখনো যাচাই করা যায় না, মানুষ তোমাকে আসলেই মূল্যায়ন করে কি না।

আমি এখনো ভালো মানুষই আছি। তবে এখন আমি ভালো আচরণ করি; কারণ, আমি ভেতর থেকে সেটা চাই, অন্য কাউকে খুশি করার জন্য বা নিজেকে প্রমাণ করার জন্য নয়।

আরও পড়ুন