প্রচণ্ড গরম শরীরের কী ক্ষতি করে
গরম আমাদের সবারই অসহ্য লাগে। কয়েক ঘণ্টা বাইরে থাকলেই মাথা ঝিমঝিম করে, শরীর দুর্বল লাগে। বারবার পানি খেতে ইচ্ছা করে। গত কয়েক বছরে বিশ্বের অনেক জায়গায় তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হয়েছে। তাপপ্রবাহের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে গরম লাগার অস্বস্তির পাশাপাশি প্রচণ্ড গরম মানুষের শরীরে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
পৃথিবীর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪, এই টানা ১০ বছরই ছিল নথিভুক্ত ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ ১০ বছর। ২০২৪ সাল ছিল রেকর্ডের উষ্ণতম বছর। এরপরের সময়েও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা গেছে। তাপমাত্রা যত বাড়ছে, ততই মানুষের শরীরের ওপর অতিরিক্ত গরমের চাপ বাড়ছে।
গরমে শরীরের কী ক্ষতি হয়?
আমাদের শরীর ভেতরের তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। বাইরে বেশি গরম হলে শরীর অতিরিক্ত তাপ বের করে দিতে ঘাম তৈরি করে। ঘাম বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সময় শরীর কিছুটা ঠান্ডা হয়। কিন্তু তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা দুটোই বেশি হলে এ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করতে পারে না।
তখন শুরু হতে পারে পানিশূন্যতা। শরীর থেকে পানি ও লবণ কমে গেলে তৃষ্ণা, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ সময় প্রচণ্ড গরমে থাকলে হতে পারে হিট এক্সহোশন বা অতিরিক্ত গরমে শরীর দুর্বল হয়ে পড়া।
আর শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেলে ঘটতে পারে হিটস্ট্রোক। হিটস্ট্রোকে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং মস্তিষ্কসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গরমের আর যেসব প্রভাব দেখা যায়
প্রচণ্ড গরমের প্রভাব আরও অনেক ক্ষতির কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত তাপের কারণে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। শরীরকে ঠান্ডা রাখতে হৃদযন্ত্রকে বেশি কাজ করতে হয়। ফলে বিশেষ করে হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তীব্র গরম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
গবেষণায় অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে হৃদরোগজনিত সমস্যা ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। খুব গরম আবহাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে যেতে পারে।
বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়। ধরো, থার্মোমিটারে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাস যদি খুব আর্দ্র হয়, তাহলে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ফলে শরীরও সহজে ঠান্ডা হতে পারে না। এ কারণেই শুধু তাপমাত্রা নয়, বাতাসের আর্দ্রতাও কতটা গরম অনুভূত হবে, তার ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
প্রচণ্ড গরম সবার শরীরে একই প্রভাব ফেলে না। শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যাঁদের হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। যাঁরা রোদে বা গরম পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাজ করেন, যেমন নির্মাণশ্রমিক, কৃষক বা রিকশাচালক, তাঁরাও বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তারা বড়দের তুলনায় দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে। তাই গরমের দিনে খেলাধুলা বা বাইরে থাকার সময় নিয়মিত পানি পান করা এবং অতিরিক্ত রোদ এড়িয়ে চলা দরকার।
রাতে গরম থাকলেও সমস্যা
দিনের বেলায় প্রচণ্ড গরমের কথা আমরা সহজেই বুঝতে পারি। কিন্তু রাতে তাপমাত্রা বেশি থাকাও সমস্যার কারণ হতে পারে। শরীর রাতে ঘুমের সময় নিজেকে কিছুটা ঠান্ডা করার সুযোগ পায়। রাতের তাপমাত্রা বেশি থাকলে সে সুযোগ কমে যায়। ফলে ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে এবং শরীর পুরোপুরি বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ না–ও পেতে পারে।
এ কারণে শুধু দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নয়, রাতে কতটা গরম থাকছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গরম থেকে বাঁচব কীভাবে?
প্রচণ্ড গরমের দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শরীরকে অতিরিক্ত গরম হতে না দেওয়া। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদে থাকা এড়িয়ে চলা ভালো। বাইরে যেতে হলে হালকা ও বাতাস চলাচল করতে পারে এমন পোশাক পরা যেতে পারে। দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে ভারী শারীরিক পরিশ্রম কম করাও উপকারী।
কারও যদি খুব দুর্বল লাগে, মাথা ঘোরে, বমি হয়, অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায় বা শরীরের তাপমাত্রা খুব বেড়ে যায়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। হিটস্ট্রোকের সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, তাপপ্রবাহ শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব সমাজের ওপরও পড়ছে। শহরে, বাইরে কাজ করা মানুষ থেকে শুরু করে গ্রামের বাসিন্দা, সবাই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।