ইরেজার কীভাবে পেনসিলের দাগ মুছে দেয়
খাতায় পেনসিল দিয়ে লেখার সময় ভুল হলে আমরা ইরেজার দিয়ে ঘষে তা মুছে ফেলি। কিন্তু ইরেজার কীভাবে কোনো দাগ না রেখে পেনসিলের লেখা মুছে দেয়, তা কি জানো? আসলে পেনসিলের সিস গ্রাফাইট দিয়ে তৈরি হয়। আমরা যখন কাগজে লিখি, তখন গ্রাফাইটের অতি ক্ষুদ্র গুঁড়া কাগজের তন্তুর বা আঁশের সঙ্গে আটকে যায়। চলো জানা যাক, সাধারণ দেখতে এই ছোট প্রযুক্তিটি ঠিক কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে কাগজের দাগ একদম মুছে ফেলে?
মানুষ কিন্তু হাজার হাজার বছর আগে থেকেই গ্রাফাইট দিয়ে কোনো না কোনো জায়গায় দাগ কেটে আসছে। তবে কাঠের ভেতর গ্রাফাইট ও কাদার মিশ্রণ ভরে আজকের আধুনিক পেনসিল তৈরি শুরু হয় মূলত ১৬০০ কিংবা ১৭০০ সালের দিকে।
মজার ব্যাপার হলো, পেনসিল আগে আবিষ্কার হলেও দাগ মোছার ইরেজার অনেক পরে এসেছে। শুরুর দিকে মানুষ পেনসিলের লেখা মুছতে বাসি রুটির নরম অংশ গোল করে বল বানিয়ে ব্যবহার করত। কেউ কেউ আবার মোমও ব্যবহার করত। এরপর ১৭০০ সালের পর থেকে প্রথম প্রাকৃতিক রাবার দিয়ে দাগ মোছার কাজ শুরু হয়। ১৮০০ সালের দিকে কাঁচা রাবারকে আগুনে তাপ ও সালফার দিয়ে আরও শক্ত ও উন্নত করার পদ্ধতি আবিষ্কার হয়। আর সবশেষে ১৯০০ সালের পর বাজারে আসে আজকের ইরেজার।
বাসি রুটি, শক্ত রাবার কিংবা আজকের প্লাস্টিকের ইরেজার কিন্তু একই বৈজ্ঞানিক নিয়মে কাজ করে। পেনসিল ও ইরেজারের এই পুরো খেলাটি চলে মূলত দুটি জিনিসের ওপর। আকর্ষণ ও ঘর্ষণ।
ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির রসায়নের অধ্যাপক জোসেফ এ শোয়ার্জ জানান, ‘আমরা যখন কাগজে পেনসিল দিয়ে লিখি, তখন কার্বনের অতি ক্ষুদ্র কণাগুলো খসে গিয়ে কাগজের গায়ে লেগে থাকে। এভাবেই পেনসিলের কালো দাগ তৈরি হয়। আমরা অনেকেই পেনসিলের ভেতরের কালো অংশকে সিসা বলি, যা আসলে ভুল। এটি মূলত গ্রাফাইট ও কাদার মিশ্রণ। এই গ্রাফাইটের কণাগুলো শুধু যে কাগজের ছোট ছোট আঁশের ভেতর আটকে থাকে, তা নয়; বরং এদের অণুগুলোর মধ্যকার একধরনের সূক্ষ্ম আকর্ষণ বলের কারণেও কাগজের ওপর শক্তভাবে লেগে থাকে।’
ঠিক এই জায়গাতেই ইরেজার এর কাজ দেখায়। কাগজের চেয়ে রাবারের সঙ্গে এই গ্রাফাইট কণাগুলোর আকর্ষণের ক্ষমতা অনেক বেশি। তাই যখন কাগজের ওপর ইরেজার দিয়ে ঘষা দেওয়া হয়, তখন কণাগুলো কাগজ ছেড়ে রাবারের গায়ে আটকে যায় এবং কাগজটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
মেসোআমেরিকার আদি বাসিন্দারা স্থানীয় রাবারগাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে জানত। তারা সেই প্রাকৃতিক ল্যাটেক্স প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও খেলার সামগ্রী তৈরি করত। বর্তমানে বিশ্বের অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক রাবারের চেয়ে পলিভিনাইল ক্লোরাইডের মতো উপাদান দিয়ে তৈরি কৃত্রিম বা প্লাস্টিকের ইরেজার বেশি জনপ্রিয়। তবে উপাদান যা–ই হোক না কেন, সব ইরেজারের কাজের মূল ভিত্তি একটাই। গ্রাফাইটের কণাগুলো কাগজের চেয়ে ইরেজারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়।
এর পেছনে ঘর্ষণ বলেরও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ঘষার ফলে গ্রাফাইটের কণাগুলো এদের জায়গা থেকে সহজে স্থানচ্যুত হয়। এই ঘর্ষণের কারণে কাগজের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়ে। আর এ কারণেই বাজারে নানা ধরনের ইরেজার পাওয়া যায়। নরম ইরেজারগুলো কাগজের কোনো ক্ষতি না করে খুব আলতোভাবে দাগ মুছে ফেলে। আর শক্ত ইরেজারগুলো একটু বেশি স্থায়ী হয় এবং নিখুঁতভাবে দাগ মুছতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয়, ‘ভ্যান ডার ওয়ালস বল’। বিষয়টি সহজ করে বললে, অণুগুলোর পরমাণুর চারপাশজুড়ে খুব হালকা বিদ্যুৎ বা চার্জ ছড়িয়ে থাকে। আমরা জানি, ধনাত্মক (+) চার্জ সব সময় ঋণাত্মক (–) চার্জকে আকর্ষণ করে। কাগজের অণুতে থাকা এমনই কিছু ঋণাত্মক চার্জ গ্রাফাইটের ধনাত্মক পৃষ্ঠকে নিজের দিকে টেনে নেয়। মূলত এই আকর্ষণ বলের কারণেই পেনসিল দিয়ে লেখার সময় গ্রাফাইট কাগজের ওপর সুন্দরভাবে লেগে থাকে।
তবে গ্রাফাইট ও কাগজের মধ্যকার এই আকর্ষণ বলটি বেশ দুর্বল প্রকৃতির হয়। আর এই দুর্বলতার সুযোগটিই নেয় ইরেজার। আমরা যখন কাগজের ওপর ইরেজার দিয়ে ঘষি, তখন ঘর্ষণ বলের কারণে গ্রাফাইট ও কাগজের মধ্যকার আকর্ষণটি ভেঙে যায়। ফলে যে গ্রাফাইট এতক্ষণ কাগজের গায়ে লেগে ছিল, তা সহজে কাগজ ছেড়ে ইরেজারের গায়ে আটকে যায়।
অণু–পরমাণুর স্তরে গিয়ে দেখলে দেখা যাবে, গ্রাফাইট মূলত কার্বনের অনেকগুলো দ্বিমাত্রিক স্তর দিয়ে তৈরি, যে স্তরগুলোকে বলা হয় গ্রাফিন। এই গ্রাফিনের স্তরগুলো একটির ওপর আরেকটি সাজানো থাকে। এরাও ভ্যান ডার ওয়ালস বলের মাধ্যমেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
গ্রাফিনের প্রতিটি স্তর কিন্তু এমনিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকে। অর্থাৎ এদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী ধনাত্মক বা ঋণাত্মক দিক থাকে না। শুধু ইলেকট্রনের এই এলোমেলো ওঠানামার কারণেই এরা সাময়িকভাবে একে অপরের সঙ্গে আকর্ষণ তৈরি করে। এটি মূলত এমন একটি বল, যা যেকোনো দুটি বস্তুর ইলেকট্রনের আদান–প্রদান ও চলাচলের মাধ্যমে তৈরি হয় এবং বস্তু দুটিকে কিছুটা দুর্বল হলেও একসঙ্গে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
হোয়াইটবোর্ড মার্কার ও ড্রাই ইরেজার বোর্ড ডাস্টার মূলত আমাদের চেনা পেনসিল ইরেজারের মতোই কাজ করে। তবে এর পেছনে বাড়তি কিছু কৌশল রয়েছে। হোয়াইটবোর্ডের পৃষ্ঠটি অত্যন্ত মসৃণ হওয়ায় তা মার্কারের কালি শুষে নেয় না। এ ছাড়া এই কালিতে একটি বিশেষ তৈলাক্ত উপাদান থাকে, যা কালিকে বোর্ডের ওপর ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে ড্রাই ইরেজার দিয়ে হালকা টান দিলেই বোর্ডের মসৃণ গা থেকে তৈলাক্ত কালিটি সহজে আলগা হয়ে মুছে যায়।
আমরা যখন এই কলমের পেছনে থাকা ইরেজারটি দিয়ে কাগজের ওপর ঘষা দিই, তখন ঘর্ষণের ফলে সেখানে তাপ তৈরি হয়। এই তাপমাত্রার পরিমাণ যখন ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে যায়, তখন কালির ভেতরের একটি বিশেষ রাসায়নিক উপাদান সক্রিয় হয়ে ওঠে। কলম প্রস্তুতকারক সংস্থা পাইলটের মতে, এই তাপ মূলত কালির রং তৈরি করার উপাদানগুলোর মধ্যকার বন্ধনটিকে সাময়িকভাবে ভেঙে দেয়। ফলে রংটি অদৃশ্য হয়ে যায় এবং আমাদের মনে হয় লেখাটি মুছে গেছে।
জাপানি স্টেশনারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টমবো ১৯১৩ সালে তাদের প্রথম পেনসিল বাজারে এনেছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এর ২৬ বছর পর তারা বাজারে তাদের প্রথম ইরেজার নিয়ে আসে, যার নাম ছিল আয়রন হেলমেট ইরেজার।