গাড়ি কীভাবে বাতাস দূষিত করে, সমাধান কী

গাড়ির কালো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে বাতাসছবি: জুয়েল শীল

ঢাকার আকাশটা মাঝে মাঝে ধোঁয়াটে বা ঝাপসা মনে হয়? যেন কুয়াশা, কিন্তু আসলে এর বড় একটা অংশই ধোঁয়া আর ধূলিকণা। মূলত বর্তমানে শহরে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের জন্য যেসব যানবাহন ব্যবহার করা হয় সেগুলো বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতিবার গাড়ি স্টার্ট দিলে ইঞ্জিন থেকে সরাসরি বাতাসে ক্ষতিকর উপাদান মিশে যায়। এটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুব ক্ষতিকর। বিশেষ করে যাঁরা ব্যস্ত রাস্তার আশপাশে থাকেন, তাঁদের জন্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

বায়ুদূষণ বলতে বোঝায় বাতাসে এমন কিছু ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি, যা সেখানে থাকার কথা ছিল না। অথবা এমন কিছু সাধারণ উপাদানের অনেক বেশি পরিমাণ, যা আমাদের ক্ষতি করতে পারে। গাড়ি যখন জ্বালানি হিসেবে গ্যাসোলিন বা পেট্রল পোড়ায়, তখন সেখান থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়। এমনকি যখন পাম্প থেকে গাড়ির ট্যাংকে জ্বালানি ভরা হয়, তখনো সেই জ্বালানির বাষ্প বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে দূষণ ঘটায়।

আরও পড়ুন
ফিটনেসবিহীন গাড়ি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় বিপাকে চলাচলকারীরা। কুড়িল বিশ্বরোড
ছবি: দীপু মালাকার

গাড়ি থেকে নির্গত তিনটি প্রধান ক্ষতিকর উপাদান

গাড়ির ইঞ্জিন থেকে মূলত তিন ধরনের ক্ষতিকর উপাদান বাতাসে মেশে।

১. অতিক্ষুদ্র কণা

এটি বাতাসে ভেসে থাকা খুব ছোট ছোট কঠিন কণা ও তরল ফোঁটার মিশ্রণ। এগুলো কুয়াশার মতো ধোঁয়াশা তৈরি করে। এই কণাগুলো নিশ্বাসের সঙ্গে আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে। এমনকি রক্তেও মিশে যেতে পারে।

২. কার্বন মনোক্সাইড

ইঞ্জিনে জ্বালানি পোড়ানোর সময় এই গ্যাসটি তৈরি হয়। বাতাসে এই গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করে। স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শহরের বাতাসে থাকা কার্বন মনোক্সাইডের প্রায় ৯৫ শতাংশই আসে যানবাহন থেকে।

৩. নাইট্রোজেন ডাই–অক্সাইড

ইঞ্জিনের ভেতরে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন মিলে এই গ্যাস তৈরি করে। বাস, ট্রাক বা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এই গ্যাসটি নির্গত হয়। এটি আমাদের শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি করে।

আরও পড়ুন
লাহোরে সম্প্রতি ধোঁয়াশা বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছায়
এএফপি ফাইল ছবি

ধোঁয়াশা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

যখন জ্বালানির হাইড্রোকার্বন ও নাইট্রোজেন অক্সাইড সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসে, তখন এরা ওজোন গ্যাস তৈরি করে। ওজোন স্তরের কাজ আমাদের সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা করা। কিন্তু এই ওজোন যখন পৃথিবীর কাছাকাছি চলে আসে, তখন তা ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে এবং আমাদের শ্বাসকষ্টের কারণ হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, গাড়ি থেকে বের হওয়া এসব দূষিত পদার্থ ক্যানসার, হাঁপানি ও হৃদ্‌রোগের মতো কঠিন অসুখ তৈরি করতে পারে। এমনকি এটি চোখ জ্বালাপোড়া ও শিশুদের জন্মগত ত্রুটির কারণ হিসেবেও কাজ করে।

গ্রিনহাউস গ্যাস ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন

গাড়ি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। স্বাভাবিকভাবে এই গ্যাসগুলো সূর্যের তাপ ধরে রেখে পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী উষ্ণ রাখে। কিন্তু পেট্রলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে এই গ্যাসের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গ্রিনহাউস গ্যাসের এই বাড়তি পরিমাণই পৃথিবীকে অতিরিক্ত উত্তপ্ত করে তুলছে।

বায়ুদূষণের অন্যান্য উৎস

বাতাসে ঠিক কত শতাংশ দূষণ শুধু গাড়ির কারণে হয়, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। কারণ, মানুষের আরও অনেক কাজ বাতাসকে দূষিত করে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অনেক গাড়ির চেয়েও বেশি দূষণ ঘটায়। যাঁরা নিজেরা গাড়ি চালান না, তাঁরাও পরোক্ষভাবে দূষণে ভূমিকা রাখেন। কারণ, যখন কোনো পণ্য কিনি, সেটি তৈরি করতে বা দোকানে পৌঁছে দিতে কোনো না কোনো জ্বালানি পোড়াতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সে দেশে নাইট্রোজেন অক্সাইড দূষণের অর্ধেকের বেশি আসে পরিবহন খাত থেকে। এ ছাড়া বড় ট্রাক, জাহাজ, ট্রেন এমনকি তুষার সরানোর যন্ত্রও বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। চীনের মতো বড় শিল্পপ্রধান দেশগুলো এখন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বিশ্বের শীর্ষে।

আরও পড়ুন
নতুন গবেষণা বলছে, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গতের জন্য দায়ী মাত্র ৯০টি কোম্পানি
ছবি: ফাইল

প্রযুক্তি ও আমাদের করণীয়

শহরাঞ্চল ও মহাসড়কের পাশের এলাকায় গাড়ির ধোঁয়ার কারণে দূষণ সবচেয়ে বেশি হয়। তবে আশার কথা হলো, উন্নত জ্বালানি ও নতুন প্রযুক্তির কারণে আগের চেয়ে দূষণ কমছে। ১৯৬০ সালের তুলনায় বর্তমানের গাড়িগুলো প্রায় ৯৯ শতাংশ বেশি পরিষ্কার বা কম দূষণকারী। এ ছাড়া হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি এই দূষণ আরও কমিয়ে আনছে।

তবে রাস্তার গাড়ির সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে যে প্রযুক্তির এই উন্নতিও অনেক সময় কাজে আসছে না। বায়ুদূষণ কমাতে আমরা ব্যক্তিগতভাবে কিছু ভূমিকা রাখতে পারি।

  • প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি বের না করা।

  • কাছাকাছি জায়গায় যাওয়ার জন্য হাঁটা বা সাইকেল ব্যবহার করা।

  • গণপরিবহন বা বাসে যাতায়াতের অভ্যাস করা।

  • একাধিক কাজ থাকলে সেগুলো একবারে সেরে নেওয়া, যেন বারবার গাড়ি ব্যবহার করতে না হয়।

সূত্র: গ্রিন ভেহিকল গাইড

আরও পড়ুন