ঠিকানা ২২১-বি বেকার স্ট্রিট!

আর কিচ্ছু বলতে হবে?

পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ঠিকানা দেখেই তোমাদের বুঝে ফেলার কথা, কার কথা বলছি। হ্যাঁ, আধুনিক গোয়েন্দা বিজ্ঞানেরই অন্যতম বিস্ময়, শতাধিক বছর ধরে পৃথিবীর সব গোয়েন্দা চরিত্রের অনুপ্রেরণা, সর্বকালের অন্যতম সেরা গোয়েন্দা চরিত্র উইলিয়াম শার্লক স্কট হোমস; আমাদের শার্লক হোমস!

শার্লক হোমসকে চেনো না, এমন লোক তোমাদের মধ্যে খঁুজে পাওয়া নিশ্চয়ই কঠিন হবে। আমি খুব ভালো করে জানি, ঠোঁটে পাইপ, হাতে ছড়ি, পরনে ওভারকোট, মাথায় কানটুপি পরা এই দীর্ঘদেহী-খাড়া নাকের মানুষটিকে তোমরা অনেকে আমার চেয়ে ভালো চেনো। তাই হোমসকে চেনানোর চেষ্টা খুব একটা করব না, কথা দিচ্ছি।

শার্লক হোমসের প্রসঙ্গ এলে দুটো ব্যাপার সবার আগে তোমাকে চমকে দেবে—প্রায় ১২৫ বছর ধরে এই কল্পিত চরিত্রের বিস্ময়কর জনপ্রিয়তা এবং বাস্তব জগতে শার্লক হোমসের বিস্ময়কর প্রভাব।

জনপ্রিয়তার কথাটা একবার ভাবো। শার্লক হোমসের শুরু হয়েছিল ১৮৮৭ সালে আর তাকে নিয়ে শেষ গল্পটি লেখা হয়েছে ১৯২৭ সালে। সে যুগে আজকের মতো ফেসবুক-টুইটার তো দূরে থাক, টেলিফোন-টেলিভিশনও তখন হাঁটি হাঁটি পা পা করছে। সেই সময় কেবল ছাপার অক্ষরের জোরে আর চিঠিপত্রের যোগাযোগে পৃথিবীজুড়ে তৈরি হয়ে গিয়েছিল শার্লক হোমসের ভক্তরাজ্য। আর সেই ভক্তদের একাত্মতা ও সমর্থনের জোর এতটাই ছিল যে, শার্লক হোমসকে একবার মরে গিয়ে এবং একবার অবসর নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল স্রেফ ভক্তদের দাবির মুখে!

আজকের দিনেও এমনটা কল্পনা করা কঠিন, তাই না?

এটা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না যে, সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র এই শার্লকের স্রষ্টা ছিলেন স্যার আর্থার কোনান ডয়েল। পেশায় চিকিৎসক এই ভদ্রলোক হোমসকে নিয়ে চারটি বড় আকারের উপন্যাস এবং ৫৬টি ছোটগল্প লিখে গেছেন। এর মধ্যে চারটি ছাড়া সব কটি কাহিনি আমরা জানতে পেরেছি প্রায় হোমসের মতোই বিখ্যাত তার বন্ধু ডক্টর জন এইচ ওয়াটসনের ‘মুখ’ থেকে। বাকি চারটি গল্পের দুটি হোমস নিজে বলেছেন এবং দুটি বলেছেন স্যার কোনান ডয়েলই।

স্যার কোনান ডয়েল যে ক্ষুরধার বুদ্ধির হোমস রচনাবলি রেখে গেছেন, সেখানে দেখতে পাবে ১৮৮১ সালের কোনো এক সময়ে লন্ডনের ২২১-বি বেকার স্ট্রিটে একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে শার্লকের রুমমেট হয়ে ওঠেন যুদ্ধফেরত চিকিৎসক—সৈনিক ডক্টর ওয়াটসন। আর এই সাক্ষাতের ভেতর দিয়েই শুরু হয় শার্লক হোমসের প্রথম অভিযান—আ স্ট্যাডি ইন স্কারলেট। এই গা শিউরানো উপন্যাস দিয়েই শুরু হয় হোমসের পথচলা।

এরপর কোনান ডয়েল লেখেন ‘দ্য সাইন অব ফোর’। শার্লকের অন্যতম সেরা এই দুটি কাহিনির কোনোটিই তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। সেই জনপ্রিয়তাটা শুরু হয়  দ্য স্ট্যান্ড  ম্যাগাজিনে  স্ক্যান্ডাল অব বোহেমিয়া  ছোটগল্প ছাপা হওয়ার ভেতর দিয়ে। এই একটি গল্পই সারা দুনিয়ার কিশোর পাঠক, বুড়ো পাঠক থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানকে পর্যন্ত হোমস-ভক্ত বানিয়ে ফেলে।

কতটা জনপ্রিয় ছিল হোমস?

একটা উদাহরণ দিই। একসময় স্যার কোনান ডয়েল হোমস লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। বোঝোই তো। প্রতিটা গল্প-উপন্যাসে এই ভয়ানক সব বুদ্ধির খেলা লিখে যাওয়াটা তো চাট্টিখানি কথা নয়। আর কোনান ডয়েল নিজে সায়েন্স ফিকশন আর ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে ব্যস্ত থাকতে চাইতেন। ফলে ‘ফাইনাল প্রবলেম’ নামে এক গল্পে তিনি মেরেই ফেললেন হোমসকে! হোমসের জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ প্রফেসর মরিয়ার্টির সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে করতে ‘রাইখেনবাক’ জলপ্রপাতের ওপর থেকে পড়ে মারা যায় হোমস; এই প্রফেসর মরিয়ার্টিকে নিয়ে আমরা আরেক দিন আলোচনা করব। কারও কারও মতে শার্লকের চেয়েও প্রতিভাধর তিনটি চরিত্র আছে শার্লক হোমস সিরিজে, তার একটি এই মরিয়ার্টি।

সে যাই হোক, হোমসের এই অপমৃত্যু মেনে নিতে পারল না ভক্তকুল। হাজারে হাজারে চিঠি আসতে থাকল। কিন্তু কোনান ডয়েল অনড়। শেষ পর্যন্ত বলা হয়, ব্রিটেনের রানির হস্তক্ষেপে কোনান ডয়েল বাধ্য হন ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব এম্পটি হাউস’ নামে বহুল আলোচিত গল্পে হোমসের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটাতে। এর পরও হোমস মৌমাছি পালনের জন্য যখন অবসরে চলে গিয়েছিলেন, অবসর ভেঙে একটি গল্পে ফেরত আসতে হয়েছিল তাকে তুমুল ভক্তদের চাপের মুখে।

কিন্তু কেন এই জনপ্রিয়তা? কী ছিল শার্লক হোমসের মধ্যে, যা তাকে পৃথিবীর তাবৎ গোয়েন্দাকে ‘গুরু’তে পরিণত করেছিল!

সায়েন্স অব ডিডাকশন।

হ্যাঁ, এই এক অপূর্ব বিদ্যা, যা শার্লক হোমসকে করে তুলেছিল তুলনারহিত। সামান্য একটি সূত্র, সামান্য একটি চিহ্ন দেখে সমুদ্রের মতো বিশাল অনুমান করতে পারার এই বিস্ময়কর ক্ষমতা এবং এই ক্ষমতার চটকদারি প্রদর্শনীই শার্লক হোমসকে একেবারে নায়কের নায়কে পরিণত করে ফেলেছিল।

২০০৯ ও ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া শার্লক হোমস মুভিতে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন রবার্ট ডাউনি জুনিয়র

ব্যাপারটা কী, তা বুঝিয়ে বলার চেয়ে উদাহরণ দিয়ে বলা ভালো। এই ধরো, তুমি হোমসের কাছে গেলে একটা কেস নিয়ে। হোমস তোমাকে দেখেই বলল, তুমি বাংলাদেশের ঢাকা শহর থেকে এসেছ; তোমার বাড়িতে ছোট্ট একটা কুকুর আছে, তোমরা তিন ভাইবোন, তুমি সবার ছোট, তোমার বাবা সিগারেট খেয়ে থাকেন, তার ব্র্যান্ড হলো এই, তোমাদের ইদানীং টাকার কোনো সমস্যা নেই এবং তুমি এখন এক বন্ধুর হারিয়ে যাওয়া নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছ!

হোমস এই সবই বলে ফেলবে তোমার জুতার নিচে লেগে থাকা মাটি, জামার কলার, কলমের মুখ, আঙুলের গড়ন দেখে। বিশ্বাস না হলে হোমসের যেকোনো একটা গল্প পড়ে দেখো। আর এই যে চমক ধরিয়ে দেওয়া কথাগুলো বলে ফেলতে পারার ক্ষমতা, এটাই হোমসকে করে তুলেছে এক ও অদ্বিতীয়; যদিও অ্যাডগার অ্যালান পোর তৈরি অগাস্টিন দুপিনের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলো তোমরা দেখতে পাবে। কিন্তু হোমসের মতো তীক্ষ্ণভাবে কোনোক্রমেই নয়।

শার্লক হোমসের জনপ্রিয়তা বলো বা তার সেরা হয়ে ওঠা বলো, আরেকটি কারণ, আসলে বড় কারণ হলো অপরাধ তদন্তে তার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ। সামান্য একটা পায়ের দাগ, সিগারেটের ছাই, রক্তের ফোঁটা, নখের আঁচড় থেকে গবেষণা করে হোমস দিব্যি পৌঁছে যেত অপরাধী পর্যন্ত। এই কাজে সে রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নিজের অভিজ্ঞতা ও মেধার ওপর ভরসা করত।

অভিজ্ঞতা আর মেধা তো তোমারও আছে। কিন্তু হোমস যেখানে পথপ্রদর্শক হয়ে গেল, সেটা হলো এসব রাসায়নিক পরীক্ষা ও উপকরণের ব্যবহার করায়। হাত-পায়ের ছাপ নিতে প্লাস্টার অব প্যারিসের ব্যবহার, জমাট রক্তের পরীক্ষা, টাইপরাইটিংয়ের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা, অপরাধী অনুসরণের কুকুর ব্যবহারের মতো যে ব্যাপারগুলো হোমস করেছে; তার সবই কালক্রমে বিভিন্ন দেশের পুলিশ বিভাগ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। আর এটাকেই আমরা বলছি, বাস্তব জীবনে হোমসের প্রভাব। 

হোমসের একটা অবদান তো চোখের সামনে তোমরা দেখতে পাও। এই যে কোথাও বোমা হামলা হলে বা খুন হলে আশপাশের এলাকাটা হলুদ একটা ‘ক্রাইম সিন’ লেখা টেপ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়, এটা হয়েছে হোমসের জন্য। হোমস প্রায়ই অভিযোগ করত, পুলিশের এ রকম ঘিরে ফেলার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাদেরই বুটের চাপে নষ্ট হয়ে যায় অমূল্য সব সূত্র। আর এই অভিযোগ আমলে নিয়েই লন্ডন পুলিশ চালু করে এই ক্রাইম সিন টেপ!

এভাবে হোমস কত কি সত্যিকারের গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দিয়েছে, তার তালিকা করতে বসলে এ সংখ্যা কিআতে আর অন্য লেখা ছাপা কঠিন হবে। শুধু একটা ব্যাপার বলে রাখি, অপরাধী শনাক্তকরণে হোমসের এই বিশাল অবদান মাথায় রেখে ২০০২ সালে লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি শুধু হোমসের ফরেনসিক বিদ্যার ওপর গবেষণা করে ফেলোশিপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বলাই বাহুল্য, পৃথিবীর প্রথম কল্পিত চরিত্রের ওপর এমন বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে এখানে।

বিবিসির 'শার্লক' টিভি সিরিজের আধুনিক শার্লক ও ওয়াটসন

এসবের বাইরে হোমসের সম্মাননা ও স্মরণ পৃথিবীজুড়ে কম নয়। আজ এই ২০১৩ সালে এসেও হোমস ঠিক সেই আঠারো শ সালের মতোই জনপ্রিয়। আজও ২২১-বি বেকার স্ট্রিটে (এই ঠিকানাটাই পরে হোমসের সম্মানে তৈরি হয়েছে, আগে ছিল না) আগের মতোই চিঠির স্তূপ জমে, আজও প্রতিদিন শত শত মানুষ এই ঠিকানায় হোমস জাদুঘর দেখতে আর শত শত মানুষ রাইখেনবাক জলপ্রপাত দেখতে ছোটে। আজও লন্ডন মেট্রোপলিটন রেলওয়ে হোমসকে সম্মান দেখাতে চালু করে তার নামাঙ্কিত ট্রেন, আজও লন্ডনে নতুন করে হোমস-ওয়াটসনের নামে তৈরি হয় সরণি।

শুধু কি সরণি, ট্রেন আর জাদুঘর? গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বলছে, শার্লক হোমস হচ্ছে পৃথিবীর চলচ্চিত্র ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার চিত্রায়িত চরিত্র! এ পর্যন্ত আনুমানিক দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে কমপক্ষে ৭০ জন অভিনেতা শার্লক হোমস চরিত্র অভিনয় করেছেন। স্যার কোনান ডয়েলের মৃত্যুর পর তার ছেলে থেকে শুরু করে ডজন ডজন লেখক হোমসকে নিয়ে লিখেছেন। এই সর্বশেষ গত বছর কয়েকই হোমসকে নিয়ে তৈরি হয়েছে গোটা কয়েক সাড়া জাগানো চলচ্চিত্র আর বিবিসির ‘শার্লক’ নামে কাঁপিয়ে দেওয়া এক টেলিভিশন সিরিজ; যেখানে বেনেডিক্ট কামবারব্যাচ হোমসের চরিত্রে অভিনয় করে মন কেড়ে নিয়েছেন লোকদের।

এভাবেই পদে পদে পৃথিবীজুড়ে ধরে রাখা হয় শার্লক হোমসকে। আর একদল লোক এই হোমসকে নিয়ে গবেষণা করেই জীবন কাটিয়ে দেন—হোমসিয়ান! হ্যাঁ, বিশ্বাস করো আর না-ই করো, এটি একদল বিশেষজ্ঞদের নাম। কী তাদের কাজ?

এখানেই একটা সত্যি বলে দেওয়া দরকার। ওপরে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, শার্লক হোমসের একটা পুরো নাম বলা হয়েছে— উইলিয়াম শার্লক স্কট হোমস। আসলে এই নাম তুমি পুরো রচনাবলি ঘেঁটেও পাবে না। এই নাম আবিষ্কার করেছেন ওই হোমসিয়ান বা হোমস গবেষকেরা। শুধু পুরো নাম নয়, হোমস রচনাসমগ্রে তার বাবা-মায়ের নাম, জন্মতারিখ, পরিবারের ঠিকুজি; কিছুই নেই। কিন্তু হোমসিয়ানরা কী করেছেন? কোনান ডয়েলের খসড়া লেখা, স্মৃতিচারণা, ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে আলাপ, অন্য লেখায় পাওয়া ইঙ্গিত ব্যবহার করে হোমসের এসব তথ্য বের করে ফেলেছেন এবং এখনো ফেলছেন।

তাঁরা এভাবেই বের করছেন প্রফেসর মরিয়ার্টি, আইরিট অ্যাডলার, মাইক্রফট হোমস, ইনসপেক্টর লেস্ট্রাড বা ডক্টর ওয়াটসনেরও খুঁটিনাটি।

এই দ্যাখো, হোমসকে নিয়ে এত কথা বললাম, কিন্তু তার প্রাণের বন্ধু, একমাত্র সহকারী ডক্টর ওয়াটসন সম্পর্কে তেমন কিছু বললামই না। আসলে বলব কী করে? পেছনে দাঁড়িয়ে কিআ সম্পাদক লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে বলে কটু কথা শোনাচ্ছেন। আচ্ছা, আমি তাহলে আর না-ই বলি।

কোনো সমস্যা নেই। আজই শার্লক হোমস পড়া শুরু করে দাও। ইংরেজিতে সমগ্রটা পাবে নিউমার্কেট, আজিজ সুপার মার্কেট বা অন্য কোনো জায়গার বইয়ের দোকানে। ইংরেজি পড়তে না চাইলে সমস্যা নেই। বাংলায় সুন্দর অনুবাদসমগ্র পাওয়া যায়। সেটা কিনে ফেলো। তারপর দেখবে, তুমি নিজেই একজন হোমসিয়ান হয়ে গেছ।

তখন না-হয় আমরা সময় করে একবার ২২১-বি বেকার স্ট্রিটে ঘুরে আসব!