প্যান্ডোরার বাক্স

প্যান্ডোরাকে জিউস একটি উপহার দিলেন। উপহারটা হলো একটা জার। সে উপহারটা পেয়ে খুব খুশি হলো। কারণ, সেটা তো আর সাধারণ কোনো জার ছিল না। ছিল দেবরাজ জিউসের দেওয়া উপহার। তাই ওই জারের আলাদা একটা গুরুত্ব ছিল প্যান্ডোরার কাছে। কিন্তু জিউস উপহারটা দেওয়ার সময় খুব করে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যাতে কিছুতেই এ জারের মুখ না খোলা হয়।

এবার মর্ত্যে এল প্যান্ডোরা। কী তার চেহারা! কী তার পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা। দেখতে যেমন, তেমনি গুণেও তুলনাহীনা। তাকে হারিয়ে দিতে পারে এমন সাধ্য কার? কিন্তু মনে তার প্রবল কৌতূহল, কী আছে ওই জারে? কতবার খুলতে ইচ্ছে করল, কিন্তু জিউসের বারণের কথা ভেবে খুলল না। অবশ্য একসময় তার মনে হলো, ওটা না হয় না-ই খুললাম কিন্তু খোলার ব্যবস্থাটা রাখা হয়েছে কেন? তার মানে ইচ্ছে করলেই ওটা খোলা যায়, অথচ খোলা নিষেধ। এই যে নিষেধ, এটা কেন? এসব ভাবনায় ব্যাকুল হলো প্যান্ডোরা। ওদিকে প্যান্ডোরার সঙ্গে এপিমেথিউসের বিয়ে দিয়ে ছিলেন জিউস। আর এই জারটা ছিল বিয়ের উপহার। আরও একটা ব্যাপার ছিল, তা হলো প্রমিথিউস জানতেন যে জিউস তাঁকে অপছন্দ করতেন। বিশেষ করে লুকিয়ে লুকিয়ে স্বর্গ থেকে আগুন নিয়ে এসে মানুষকে দেওয়ায় তো জিউস ক্ষিপ্তই হয়েছিলেন। প্রমিথিউসের মনে শঙ্কা ছিল জিউস বা আর কোনো দেবতা চালাকির আশ্রয় নিয়ে তাঁদের দুই ভাইকে বিপদে ফেলতে পারেন। তাই তিনি এপিমেথিউসকে সতর্ক করে ছিলেন, যাতে দেবতাদের দেওয়া কোনো উপহার নেওয়া না হয়।

কিন্তু উপহারটা দেওয়ার সময় এপিমেথিউসকে বলা হয়েছিল যে তাঁর ভাই প্রমিথিউসের কাজের জন্য জিউস আর কিছু মনে রাখেননি। সেসব ভুলে গিয়েই এই উপহার তিনি দিচ্ছেন। এ কথায় এপিমেথিউস বিশ্বাস করলেন এবং ভাইয়ের সতর্কবাণীর কথা ভুলে গিয়ে ওই উপহার নিতে কোনো অসম্মতি তিনি জানালেন না।

প্যান্ডোরার ভেতর যেসব গুণ ছিল, সেসব গুণের অনেকগুলোই অন্যান্য মানুষের মধ্যেও ছিল। কিন্তু তার মধ্যে গুণগুলো ছিল অন্য সব মানুষের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায়। যেমন সংগীতে পারদর্শী অনেকেই, কিন্তু প্যান্ডোরার মতো পারদর্শিতা আর কারোরই ছিল না। তেমনি কৌতূহল জিনিসটাও অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি ছিল তার। তাই এপিমেথিউসকে না জানিয়ে এবং নিষেধ উপেক্ষা করে শেষমেশ প্যান্ডোরা খুলেই ফেলল সেই জার। আর যাবে কোথায়! রোগ, দুঃখ, হিংসা, অসাধুতা—আরও রাজ্যের যত মন্দ জিনিস সব একে একে বেরিয়ে পড়ল ভেতর থেকে। দুনিয়া ভরে গেল অশান্তি, দুঃখ-কষ্ট, রোগ–যন্ত্রণায়। মানুষের শান্তি গেল চলে। এভাবেই জিউসের মানুষকে শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছে পূরণ হলো। ওদিকে প্যান্ডোরাও বুঝতে পারল যে মন্দ জিনিসগুলো সব বেরিয়ে যাচ্ছে। তখন সে তাড়াতাড়ি মুখটা বন্ধ করে দিল। অবশ্য ততক্ষণে রোগ-যন্ত্রণা আর অশান্তির উপাদানগুলো ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীময়। তবে সব মন্দ বেরিয়ে পড়লেও একটা জিনিস জারের মধ্যে তখনো থেকে গিয়েছিল। সেই জিনিসটা ছিল আশা। তার মানে খারাপ জিনিসগুলো বেরিয়ে পড়লেও শুধু আশাটাই রয়ে গিয়েছিল।

আমরা এতক্ষণ যে গল্পটা শুনলাম তা গ্রিক পুরাণের বিখ্যাত একটি কাহিনি। ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায় গল্পের বিবরণে কিছু পার্থক্য দেখা গেলেও জিউস যে প্যান্ডোরাকে বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন এবং কৌতূহলী প্যান্ডোরা একসময় জারের মুখ খুলে দেওয়ায় মন্দ জিনিসগুলো বেরিয়ে পড়েছিল, আর আশাটুকু থেকে গিয়েছিল—তাতে ভুল নেই। গ্রিক পুরাণে জারের কথা থাকলেও পরে জারের বদলে বাক্সের কথাটা প্রচলিত হয়ে গেছে। সেই থেকে প্যান্ডোরার বাক্স। আর সারা দুনিয়াতেই এখন ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ কথাটা প্রবাদবাক্যের মর্যাদা পেয়েছে। কেউ যদি বলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দেব, তাহলে বুঝতে হবে তার কাছে এমন কোনো বিপজ্জনক তথ্য আছে, যা বেরিয়ে পড়লে সমস্যা হবে। কাজেই ওই বাক্স না খোলাই নিরাপদ। এই কাহিনির ব্যাখ্যায় বলা হয় যে এখনো নিরীহ ও ভালো মানুষেরাও যে বিপদ ও কষ্টের মুখোমুখি হয় তার কারণ, তার পূর্বপুরুষেরা জিউসের অবাধ্য হয়েছিল, জিউসকে রাগিয়ে দিয়েছিল। জিউসের অভিশাপ তাই মানুষের পিছু ছাড়ে না।

প্যান্ডোরার কাহিনির শিক্ষা: এই কাহিনিতে খুব বড় একটা শিক্ষা আছে। সেটি হলো, মানুষের মধ্যে বহু মন্দ উপাদান ছড়িয়ে থাকলেও আশা জিনিসটাই বন্দী হয়ে আছে। কিন্তু আশার কারণেই মানুষ বেঁচে থাকতে চায়। ‘ধন্য আশাকুহকিনী’। তাই লোকে বলে, ‘যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ’। মন্দ জিনিসগুলোর যত ক্ষতি করার আশঙ্কাই থাক না কেন, আশাকে নিয়েই মানুষ বাঁচতে পারে। অসম্ভব কাজও করা যায় আশা দিয়ে। আশা আছে বলেই বেঁচে আছে মানুষ।