তিন দেশের তিন ব্যক্তি কথা বলছে। প্রথম ব্যক্তি গর্ব নিয়ে বলল, ‘বুঝলি, আমরাই প্রথম, যারা মহাকাশে গিয়েছি।’ তার কথা শুনে নাক সিটকে দ্বিতীয়জন বলল, ‘এ আর এমন কী? আমরা চাঁদে প্রথম পা রেখেছি।’ এবার তৃতীয় ব্যক্তির পালা। সে গলা উঁচু করে বলল, ‘আমরাই প্রথম, যারা সূর্যে যাচ্ছি।’ এবার প্রথম দুই ব্যক্তি আঁতকে উঠে বলল, ‘সেকি! কীভাবে?’ তৃতীয় ব্যক্তি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে উত্তর দিল, ‘রাতের বেলায় যাব।’ এই তিন ব্যক্তির জারি-জুরি বাদ দিয়ে চলো মহাকাশের প্রথম বিষয়গুলো জেনে নিই।
ভাগ্যবান প্রথম মানুষ
তাঁর নাম ইউরি গ্যাগারিন। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল প্রথম মহাকাশে পা দেওয়া মানুষ। সোভিয়েত নভোযান ভস্তকে চড়ে মহাকাশে যাওয়া এই মানুষটি জন্মেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। জার্মানির নাজি বাহিনী তাঁদের এলাকায় হামলা করেছিল। ভাগ্যক্রমে সে যাত্রায় বেঁচে যান তিনি। প্রথম মহাকাশে যাওয়ার পর একটা ছোট্ট দুর্ঘটনায়ও পড়েছিলেন। কিন্তু তখনো ভাগ্যের জোরে বেঁচে গিয়েছিলেন গ্যাগারিন।
গ্রহ নয়, উপগ্রহ
স্পুটনিক হলো মহাকাশে পাঠানো প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। মহাকাশ নিয়ে গবেষণার প্রথম কার্যকরী পদক্ষেপ ছিল এটি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর স্পুটনিককে মহাকাশে পাঠায়। স্পুটনিকের মানে হলো পৃথিবীর ভ্রমণকারী শিষ্য। এই কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে যায়। যাকে বলে স্পেস রেস।
লাইকা, দি স্পেসডগ
লাইকার নাম শুনেছ তো? মহাকাশের প্রথম প্রাণী। স্পুটনিক ২-তে করে তাকে পাঠানো হয় মহাকাশে। মহাকাশে মানুষের টিকে থাকা সম্ভব কি না, এটা দেখাই উদ্দেশ্য ছিল। তবে লাইকাকে মহাকাশে পাঠিয়ে বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে। দেশটির পশু অধিকার সংস্থা মামলা করে এই অভিযোগে যে লাইকার মৃত্যু হয়েছিল মহাকাশে পৌঁছানোর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে। স্পুটনিক ৫-এ এই ধারণা ভুল প্রমাণ করতে আরও কুকুর ও ইঁদুর পাঠানো হয়। ১৯৬১ সালে স্ট্রেলকা নামের একটি কুকুর মহাকাশে এক দিন কাটিয়ে জীবিত অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরে আসে। পরে স্ট্রেলকা ছয়টি কুকুরছানার জন্ম দেয়। তখন অবসান হয় লাইকা মামলার। ভালো কথা, স্ট্রেলকার জন্ম দেওয়া কুকুরছানার একটি উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির মেয়েকে।
মহাকাশে প্রথম নারী
সোভিয়েত ইউনিয়নের ভ্যালেনতিনা তেরেস্কোভা একা স্পুটনিক ৬-এ মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন ১৯৬৩ সালে। যাত্রাপথে একটা ত্রুটি ধরা পড়ে তাঁর নভোযানে। সমস্যাটি ঘাবড়ে দিলেও তার সমাধান করে ফেলেন তেরেস্কোভা। তারপর আনন্দে চেঁচিয়ে বলেন, ‘আকাশ, তোমার পরনের হ্যাটটি খোলো! আমি আসছি।’ মহাকাশে যাওয়ার জন্য কঠিন নিয়মকানুন মানতে হতো তাঁকে। খাবারদাবারের নির্দিষ্ট ডায়েট ছিল। মজার ব্যাপার হলো, তেরেস্কোভা লুকিয়ে তাঁর পছন্দের খাবার খেতেন। প্রথম নারী নভোচারী হিসেবে তাঁর তিন দিনের সফরটি বিশ্বের অন্যান্য সব নারীকে মহাকাশের ব্যাপারে অনেক উৎসাহিত করেছিল।
হাঁটি হাঁটি পা পা মহাকাশে ঘুরে বেড়া
হাঁটাহাঁটি করতে মানুষ যায় পার্কে। আর সোভিয়েত অ্যালেক্সেই লেনভ গিয়েছিলেন মহাকাশে! তিনিই সর্বপ্রথম মানুষ, যিনি মহাকাশে ১০ মিনিট হেঁটেছিলেন। সেটা ১৯৬৫ সালের ১৮ মার্চের কথা। পরবর্তী সময়ে প্রথম আমেরিকান হিসেবে মহাকাশে ২২ মিনিট হাঁটার সৌভাগ্য অর্জন করেন এডওয়ার্ড হোয়াইট। তাঁর স্পেসশিপের নাম ছিল জেমিনি ৪।
মহাকাশে প্রথম মৃত্যু
মহাকাশকে জানতে গিয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে অনেককে। তবে প্রথম ঘটনাটি ১৯৬৭ সালের ২৭ জানুয়ারির। এক ত্রুটির জন্য আগুন লেগে যায় অ্যাপোলো ১-এ। এ কারণে মারা যান তিন নভোচারী—ভার্জিল গুস, এড হোয়াইট ও রজার শ্যাফে।
চাঁদমামার বাড়িতে প্রথম ভ্রমণ
নিল আর্মস্ট্রং হলেন চাঁদে পা রাখা প্রথম মানুষ। অ্যাপোলো ১১-তে চড়ে চাঁদে যান ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাজ আলড্রিন। নিলের সেই বিখ্যাত কথাটি বলা দরকার, ‘চাঁদে মানুষের ছোট একটি পদক্ষেপ, মানবজাতির জন্য মস্তবড় এক ধাপ।’ ভালো কথা, তাঁরা কেউই চাঁদের বুড়িকে দেখেননি।
উদ্ধার অভিযান
চীনারা বিশ্বাস করে ১৩ সংখ্যাটি নাকি অশুভ। সেটি নিয়ে মাথা না ঘামালেও অ্যাপোলো ১৩-কে নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়েছিল। ১৯৭০ সালের ১৩ এপ্রিল অক্সিজেন ট্যাঙ্কের বিস্ফোরণ ঘটে এই স্পেসশিপে। পরবর্তী সময়ে মিশন কন্ট্রোলের সহযোগিতায় মহাকাশচারী তিন অভিযাত্রী—জিম লভেল, ফ্রেড হাইসে ও জন সুইগার্ট নিরাপদে পৃথিবীতে ফেরেন।
মহাকাশে তিন শ পঁয়ষট্টি দিন
১৯৮৮ সালের ২১ ডিসেম্বর রাশিয়ার মির নামক স্পেস স্টেশনে এক বছর থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন মুসা মানারোভ ও ভ্লাদিমির তিতোভ। তবে তাঁদের এই রেকর্ড ভাঙেন ভ্যালেরি পলিয়াকভ, ১৯৯৫ সালের ২২ মার্চ। তিনি ৪৩৭ দিন ১৮ ঘণ্টা কক্ষপথে পার করে পৃথিবীতে ফেরেন। ফেরার পর তাঁর নাকি উচ্চতা বেড়ে গিয়েছিল!
রবোটের মঙ্গল অভিযান
১৯৯৭ সালের ৬ জুলাই মঙ্গলে পাঠানো হয় সোর্জনার নামক একটি রোবটকে। মঙ্গলের পৃষ্ঠে ঘোরাঘুরি করে ছয় চাকা-বিশিষ্ট রিমোটচালিত এই রোবট গবেষণায় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। তিন মাসের অভিযানে অনেক ছবি পাঠিয়ে আর বৈজ্ঞানিক খুঁটিনাটি জানিয়ে এটি দিকনির্দেশকের ঠিকঠাক কাজটিই করেছিল।
বয়স যাকে থামাতে পারেনি
৭৭ বছর বয়সে মহাকাশে পা রাখেন জন গ্লেন। তিনিই প্রথম বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে মহাকাশে যান ১৯৯৮ সালের ২৯ অক্টোবর। বয়স কোনো ব্যাপার নয়, ইচ্ছাশক্তিই মূল বিষয়—এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন গ্লেন।
মহাকাশে তৈরি প্রথম চলচ্চিত্র
২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর অ্যাপোজি অব ফিয়ার নামের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেন রিচার্ড গ্যারিয়ট। আট মিনিটের এই চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লিখেছেন ট্রেসি হিকম্যান। চার নভোযাত্রীকে নিয়ে গড়ে উঠেছে এ ছবির গল্পটি।
মহাকাশ নিয়ে গবেষণা চলছেই। আর কিছু না কিছু নিত্যনতুন আবিষ্কার হচ্ছে। তোমার যদি মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ থাকে, তবে গবেষণা চালিয়ে যাও। বলা যায় না, প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ইতিহাসের খাতায় নাম উঠিয়ে ফেলতে পারো তুমিও!