যদি বলি, ‘নেলসন ম্যান্ডেলার কথা বলব, শুনবে?’
তুমি অনায়াসে বলে দিতে পারো, ‘নতুন আর কী বলবেন? সারা বিশ্বই ম্যান্ডেলাকে চেনে। ২৭ বছরের জেলজীবন, মুক্তির পর দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়া, শান্তি ও আপসের মাধ্যমে বর্ণবাদ পেরিয়ে আসা—এসবই তো আমার জানা।’
আমি বলব, ‘ঠিক তা-ই। আসলে ম্যান্ডেলা বা মাদিবার ব্যাপারে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে মানুষটিকে অচেনা মনে হয়।’
তুমি এবার আমার চোখের ওপর রাখতে পারো তোমার সন্দেহের চোখ। বলতে পারো, ‘কী রকম?’

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলব, ‘জেলখানায় বসে মায়ের সঙ্গে শেষ দেখার কথাটা একবার ভাবো তো! ১৯৬২ সাল থেকেই তো বন্দিজীবন তাঁর। ১৯৬৮ সালে জেলজীবনের ছয় বছর চলছে। বৃদ্ধ মাকে নিয়ে বোন ম্যাবেল এলেন রোবেন আইল্যান্ডে। সঙ্গে এল ম্যান্ডেলার ছেলে ম্যাকগাথা আর মেয়ে ম্যাকি...’
তুমি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলতে পারো, ‘তাতে ম্যান্ডেলাকে অচেনা মনে হওয়ার কী আছে?’
আমি ব্যাখ্যা করব, ‘এ রকম শীর্ণকায়, ভাঙাচোরা কুঁজো মাকে দেখে কী কষ্টটাই না পেয়েছিলেন মাদিবা। বোনকে আড়ালে জানিয়েছিলেন সে কথা। এ সাক্ষাতের কয়েক সপ্তাহ পরই রোবেন আইল্যান্ডে এল একটি টেলিগ্রাম, মা আর নেই। শোকাতুর ছেলে অতীতে মাকে অবহেলা করায় অনুশোচনায় ভুগতে থাকেন। একমাত্র সন্তান হিসেবে মাকে মাটি দেওয়ার জন্য ট্রানস্কি যাওয়ার অনুমতি চান। জেল কতৃর্পক্ষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, স্ত্রীকে সুইজারল্যান্ডের যক্ষ্মা হাসপাতালে নেওয়ার জন্য জওহরলাল নেহেরুকে কারাগারের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার ম্যান্ডেলাকে মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে থাকতে দেয়নি...’

এবার হয়তো আমার দীর্ঘশ্বাসটি তোমার দিকে ধেয়ে যাবে। তুমি নিজেই হয়তো বলবে, ‘হ্যাঁ, এই কষ্ট সহ্য করা খুবই কঠিন।’
আমি তোমার কাছ থেকে কথা টেনে নিয়ে বলব, ‘কষ্টের কি এখানেই শেষ? এরপর তো ১৯৬৯ সাল। কয়েক মাসের ব্যবধানে ম্যান্ডেলা পেলেন আরেকটি টেলিগ্রাম...’ তোমার মুখে চিন্তার রেখা দেখতে দেখতে আমি বলে যেতে থাকব, ‘এবার টেলিগ্রাম থেকে তিনি জানলেন, কেপটাউনে বসবাস করা বড় ছেলে থেম্বি বা মাদিবা থেম্বিকিল সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। প্রচণ্ড আঘাতে ম্যান্ডেলা বিছানায় পড়ে যান। সেদিন খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায় তাঁর। সতীর্থ সিসুলু নীরবে পাশে ঝুঁকে পড়ে সহানুভূতি জানাতে থাকেন। একসময় আবার নিজের মধ্যে ফিরে আসেন মাদিবা।’
এবার নীরবতা ভাঙবে তুমি, বলবে, ‘হুম। ২৭ বছর জেলখানায় থাকা সহজ কথা নয়, তার ওপর জেলে কারারক্ষীদের অত্যাচার...’
আমি হেসে বলব, ‘ঠিক বলেছ। রোবেন আইল্যান্ডে বন্দীদের থাকতে হতো অমানবিক পরিবেশে। শাস্তির অংশ হিসেবে সকাল সাড়ে পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠতে হতো, ঘর পরিষ্কার করে একটিমাত্র লোহার বালতি নিয়ে ঠান্ডা জলে গোসল ও শেভ সারতে হতো। খোলা উঠোনে থাকত ড্রামভর্তি ভুট্টার পরিজ, যা ছিল খাওয়ার অযোগ্য। সঙ্গে থাকত গরম পানিতে মেশানো ভুট্টার চোলাই। শীতের দিনে দুপুর পর্যন্ত ঠান্ডা উঠোনে একনাগাড়ে হাঁটাহাঁটি করতে হতো, তারপর সারি করে বসে হাতুড়ি দিয়ে পাথর ভাঙতে হতো।’
তুমি একটু ভালো কিছু শোনার আসায় আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারো, ‘দুপুরে নিশ্চয়ই ভালো কিছু খেতে দিত?’
‘না। দুপুরের মেন্যু ভুট্টার শ্বাস সেদ্ধ। চারটা বাজার পর স্নানঘরে সমুদ্রের জলে আধঘণ্টা ভিজতে হতো। রাতে আবার ভুট্টা সেদ্ধ।’
তোমার নীরবতা আমাকে উসকে দেবে আবারও কিছু কথা বলতে, ‘লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় ১৯৬৫ সালের এপ্রিলে “দক্ষিণ আফ্রিকার আলকাতরেজ” নামে আধপৃষ্ঠার এক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। হাতুড়ি হাতে সারি বাঁধা কারাবন্দীদের ছবি ছাপা হয়েছিল সঙ্গে। অন্য একটি ছবিতে অর্ধেক পাজামা পরা জার্সি বুনতে থাকা ম্যান্ডেলার ছবি। নিজের খাকি অর্ধেক পাজামার দিকে আঙুল দেখিয়ে ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “আমাদের সম্মানহানি করার জন্য এটাও একটা নির্মমতার অংশ”।’

তুমি কিছু না বুঝে আমার দিকে তাকিয়ে আছো দেখে আমি বলব, ‘অর্ধেক খাকি পাজামা পরতে দেওয়া হতো বন্দীদের। ম্যান্ডেলা তার প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন পুরো পাজামা। পরে তাঁর দাবির কাছে নতি স্বীকার করেছিল কারা কতৃর্পক্ষ। আর শোনো। কারারক্ষীদের ব্যাপারে ম্যান্ডেলা ছিলেন খুবই স্নেহশীল। নিজের ব্যক্তিত্ব ও অমায়িক আচরণ দিয়ে শ্বেতাঙ্গ কারারক্ষীদের মন জিতে নিয়েছিলেন ম্যান্ডেলা। বর্ণবাদের সমর্থক এই কারারক্ষীদের কেউ কেউ কারাবন্দীদের কাছাকাছি হচ্ছিল। তারা পরস্পরের খাবার চেয়ে নিয়ে খেত। কালো মানুষদের সঙ্গে একই সুরে বাদ্যযন্ত্র বাজাত। এ সময় জেল কতৃর্পক্ষ ম্যান্ডেলার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করত। সংস্কৃতি ছাড়া মানুষ বিকশিত হতে পারে না। রোবেন আইল্যান্ডের বন্দীরা শেক্সপিয়ারের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেত। বিশেষ করে জুলিয়াস সিজার আর পঞ্চম হেনরি । সনি ভেঙ্কাটরাথনাম নামের এক কয়েদি ধর্মীয় বইয়ের পেছনে লুকিয়ে রাখতেন শেক্সপিয়ারের বই। সফোক্লিসের আন্তেগোনে ও ছিল পছন্দের বই। আন্তেগোনে র ক্রিয়ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ম্যান্ডেলা।’

ধৈর্য ও পরমতসহিষ্ণুতা শেখার পেছনে জেলখানার দাবা খেলার ভূমিকাও কম নয়। কিন্তু কেউই ম্যান্ডেলার সঙ্গে দাবা খেলতে চাইত না। কেন জানো? একটি খেলা অন্তত তিন দিন ধরে খেলতেন তিনি। এটি কিন্তু ম্যান্ডেলার প্রস্ত্ততির অংশ ছিল। ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘আমি ঘঁুটিগুলোর সম্ভাব্য প্রতিটি চাল অতি সাবধানে বিবেচনা করতাম। এটিই আমার খেলার ধরন, শুধু খেলার ক্ষেত্রেই নয়, রাজনীতির ক্ষেত্রেও আমার চিন্তাভাবনা একই ধরনের।’
আর তাই তো ২৭ বছর বন্দিজীবনের পর ১৯৯০ সালে বিজয়ীর বেশে জেল থেকে মুক্ত হলেন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা-কালো বৈষম্য দিলেন ঘুচিয়ে, হলেন দেশের প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৯ সালের ১৪ জুন ক্ষমতা ছেড়েছেন। কিন্তু ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ৯৫ বছর বয়সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন সারা বিশ্বের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। মৃত্যুর পরও সে রকমই আছেন তিনি। থাকবেনও।