যে গ্যাস মানুষকে হাসাতে পারে | নাইট্রাস অক্সাইড

লাফিং গ্যাসের কথা তোমরা সবাই কমবেশি শুনেছ। এই গ্যাসটি নিশ্বাসের সঙ্গে অল্প পরিমাণ গ্রহণ করলে আমাদের হাসির উদ্রেক হয়। আর এ জন্যই ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে এই গ্যাসটি অন্য সব গ্যাসের জনপ্রিয়তাকে হার মানিয়েছে। আর অনেকের পার্টি তো লাফিং গ্যাস ছাড়া জমেই না।

গ্যাসটির রাসায়নিক সংকেত N2O। অর্থাৎ এতে একটি অক্সিজেন ও দুটি নাইট্রোজেনের পরমাণু রয়েছে। তবে অনেকের নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে ঠিক কোন সময় থেকে এই গ্যাসের নাম লাফিং গ্যাস হলো! নাইট্রাস অক্সাইডের হাসি তৈরি করার বিষয়টি প্রথম কীভাবে আমরা জানলাম তার একটি মজার ইতিহাস আছে। অক্সিজেন গ্যাসের আবিষ্কারক জোসেফ প্রিস্টলি ১৭৭২ সালে সর্বপ্রথম এই গ্যাসটি আবিষ্কার করেন। কিন্তু গ্যাসটি নিয়ে প্রথম বিস্তারিত গবেষণা করেন হামফ্রে ডেভি নামের একজন বিজ্ঞানী। ১৭৯৮ সালের কথা। ডেভি তখন সবে ব্রিস্টলের, ‘নিউমেটিক ইনস্টিটিউশনে’ যোগদান করেছেন। সে সময় তিনি তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে অনেকগুলো নতুন গ্যাসের রোগ সারানোর ক্ষমতা আছে কি না পরীক্ষা করে দেখছিলেন। নাইট্রাস অক্সাইড নিয়ে পরীক্ষা করে তো বিজ্ঞানীরা অবাক! এই গ্যাস নিশ্বাসের সঙ্গে নিলে বেশ ফুরফুরে অনুভূতি তৈরি হয়, এমনকি হাসির সৃষ্টি করতে পারে। ডেভি ও তাঁর সহকর্মীরা এই গ্যাসের প্রেমে পড়ে যান। ডেভি ও বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী নিয়মিত এই গ্যাস নিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করতে থাকেন। যা একসময় আসক্তির পর্যায়ে চলে যায়। শুনলে অবাক হবে যে ডেভির সহকর্মীদের মধ্যে বিখ্যাত বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটও ছিলেন। N2O-এর এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য জানাজানি হলে এটি লাফিং গ্যাস নামে পরিচিত হতে থাকে।

লাফিং গ্যাস নিয়ে গবেষণা করেছিলেন হামফ্রে ডেভি

ইতিহাস তো জানা হলো, এবার জানা দরকার এই গ্যাস কেনই বা হাসির উদ্রেক করে! আমরা যখন নিশ্বাসের সঙ্গে নাইট্রাস অক্সাইড গ্রহণ করি, এটি তখন আমাদের ফুসফুস থেকে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় রক্তে প্রবেশ করে। আর প্রবেশ করার পর খুব দ্রুত মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। আমাদের মস্তিষ্কে অনেক ধরনের রিসেপ্টর আছে। এই রিসেপ্টরগুলো মূলত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গে বন্ধন সৃষ্টি করে। যেকোনো রাসায়নিক পদার্থ কিন্তু যেকোনো রিসেপ্টরের সঙ্গে বন্ধন সৃষ্টি করতে পারে না। নাইট্রাস অক্সাইড মস্তিষ্কে পৌঁছে ‘গ্লুটামেট’ ও ‘গাবা’ নামে দুটি রিসেপ্টরের সঙ্গে বন্ধন সৃষ্টি করে। কোনো রাসায়নিক পদার্থ যখন একটি রিসেপ্টরের সঙ্গে বন্ধন সৃষ্টি করে, তখন সেই রিসেপ্টরটি নির্দিষ্ট কোনো নিউরোট্রান্সমিটার ক্ষরণ করে অথবা সেই রিসেপ্টরের কার্যক্রমকে বন্ধ করে। তোমরা কি জানো সুখ, দুঃখ, হতাশা ইত্যাদি সকল প্রকার অনুভূতির জন্য, ‘নিউরোট্রান্সমিটার’ নামের এই বিশেষ রাসায়নিক বস্তুগুলোই দায়ী। নাইট্রাস অক্সাইড গ্লুটামেট রিসেপ্টরের সঙ্গে বন্ধন সৃষ্টি করে এর কার্যক্রম বন্ধ করে। ফলে কিছু খারাপ অনুভূতি থেকে আমাদের মস্তিষ্ক রেহাই পায়, আর আমাদের ভালো লাগতে শুরু করে। অপরদিকে গাবা রিসেপ্টরের সঙ্গে বন্ধন সৃষ্টি করার পর এটি এমন কয়েকটি নিউরোট্রান্সমিটার ক্ষরণ করে, যা আমাদের হাসির উদ্রেক করে, ফলে আমরা হেসে ফেলি।