শঙ্কুর বিড়ালের রং কী

প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর পোষা বিড়াল নিউটনের গায়ের রং কী? সেদিন আমার মেয়ে হুট করে আমাকে এই প্রশ্ন করে বিপাকে ফেলে দিল। দেখি প্রশ্নটার চটজলদি জবাব দেওয়া যাচ্ছে না। শুধু তা-ই না, লক্ষ করলাম, ব্যাপারটার মধ্যে কিছু জটিলতাও আছে।

শঙ্কু তাঁর ডায়েরির কোথাও নিউটনের গায়ের রং সম্পর্কে কিছু লেখেননি। তবে সত্যজিৎ রায় বিভিন্ন গল্পের অলংকরণে এবং শঙ্কুর বইয়ের প্রচ্ছদে নিউটনের চেহারা এঁকেছেন। গল্পগুলোর অলংকরণ সাদাকালো। কিন্তু বইয়ের প্রচ্ছদ রঙিন। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই রঙিন প্রচ্ছদগুলোতে নিউটনের গায়ের রং ক্রমাগত বদলে গেছে। একেক প্রচ্ছদে নিউটনের গায়ের রং একেক রকম। গল্পের অলংকরণেও বিড়ালকে কখনো সাদা আবার কখনো কালো করে আঁকা হয়েছে।

কেন এই ব্যাপারটা ঘটল, অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে দেখি এর মধ্যে আরও কথা লুকিয়ে আছে। বিড়ালের গায়ের রং বদলকে অত সরলভাবে দেখার জো নেই। বলতে কি, দুনিয়ার কোনো বিড়ালকেই আসলে নিছক বিড়াল হিসেবে দেখতে নেই।

শঙ্কুকে নিয়ে লেখা প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রোফেসর শঙ্কু। সেটার প্রচ্ছদে শঙ্কুর কাঁধে বসে থাকা নিউটনের রং সাদা। বইটি বেরিয়েছিল ১৯৬৫ সালে। পাঁচ বছর পর ১৯৭০ সালে যখন দ্বিতীয় বই প্রোফেসর শঙ্কুর কাণ্ডকারখানা বের হয়, তার প্রচ্ছদে বিড়ালের রং লাল। পরের দুটি বই সাবাস প্রোফেসর শঙ্কু এবং মহাসংকটে শঙ্কুর প্রচ্ছদে নিউটনের গায়ের রং একবার কালো, একবার হলুদ। এরপর শঙ্কুকে নিয়ে আরও দুটি বই বেরোলেও কোনোটির প্রচ্ছদে বিড়ালের ছবি নেই।

শুধু যে নিউটনের গায়ের রং নিয়ে লেখকের দ্বিধা ছিল, তা-ই নয়। বিড়ালের জাতও দেখছি বদলে বদলে গেছে। নিউটন হুলো না মেনি বিড়াল কোথাও বলা হয়নি। প্রথম বইয়ে দেখা যাচ্ছে নিউটন একেবারে দেশি জাতের আটপৌরে বিড়াল। মিহি লোমের শুকনো শরীরের এ রকম দুধভাত বিড়াল গ্রামবাংলার বাড়িতে বাড়িতে দেখা যায়। কিন্তু মহাসংকটে শঙ্কু বইয়ের প্রচ্ছদে যে বিড়াল, তার গায়ে বড় বড় লোম।

প্রচ্ছদগুলো দেখতে দেখতে গুরুতর যে ব্যাপারটি আমার চোখে পড়ল, তা হলো নিউটনের সঙ্গে শঙ্কুর সম্পর্ক। প্রথম চারটি বইয়ের প্রচ্ছদ পাশাপাশি রাখলে ব্যাপারটা যে কারও চোখে না পড়েই যায় না। দেখা যাচ্ছে, সময় যতই গড়িয়েছে, প্রোফেসর শঙ্কুর সঙ্গে তাঁর বিড়ালের দূরত্ব তত বেড়েছে। একেবারে প্রথম বই প্রোফেসর শঙ্কুর প্রচ্ছদে দেখা যায়: খুব তন্ময়ভাবে নিজের ডায়েরি পড়ছেন খেয়ালি বিজ্ঞানী। তাঁর কাঁধের ওপর বসা নিউটন আদুরে ভঙ্গিতে গালে গাল ঘষছে। শঙ্কুর একটি হাত বিড়ালের কাঁধে। পড়তে পড়তে পোষা বিড়ালের গায়ে বিলি কেটে দিচ্ছেন তিনি। এই ছবি দেখলে আর আলাদা করে বলে দিতে হয় না, এ দুজন কতটা হরিহর আত্মা। কিন্তু পরের বই প্রোফেসর শঙ্কুর কাণ্ডকারখানার প্রচ্ছদে কী দেখা যাচ্ছে? শঙ্কু তাঁর গবেষণাগারে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠেস দিয়ে আছেন তাঁরই উদ্ভাবিত রোবট বিধুশেখরের গায়ে। আর নিউটন কোথায়? নিউটন একটু দূরে মেঝেতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। রোবটের প্রতি শঙ্কুর ঘনিষ্ঠতার কারণে একটু যেন অভিমানে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে বিড়াল।

পরের বই সাবাস প্রোফেসর শঙ্কুতে বিজ্ঞানী শঙ্কুর জায়গায় দেখা যাচ্ছে এক অভিযাত্রী শঙ্কুকে। হাতে বাইনোকুলার। পকেটে হাত ঢুকিয়ে যেভাবে দাঁড়িয়ে আছেন শঙ্কু, তাতে তাকে গিরিডির নিভৃত এক গবেষণাগারের খেয়ালি বিজ্ঞানীর চেয়ে বরং জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়ানো পর্যটক বলে মনে হবে। তার থেকে অনেক নিচে দাঁড়িয়ে নিউটন ঘাড় বাঁকিয়ে যেন বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে এই বদলে যাওয়া শঙ্কুর দিকে। পরের বই মহাসংকটে শঙ্কুতেও এই দূরত্ব আর ঘোচেনি।

লেখার ক্রম মেনে গল্পগুলো পড়লেও বোঝা যাবে, শুরুর দিকে তাঁর বিড়ালের প্রতি শঙ্কু যতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন, পরের দিকে ততটা থাকেননি। প্রথম দিককার ডায়েরিতে ঘন ঘন এসেছে নিউটনের প্রসঙ্গ। দুটি গল্পে তো নিউটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করেছে। বিপদ থেকে রক্ষা করেছে বিজ্ঞানীকে। কিন্তু যতই সময় গড়িয়েছে, ডায়েরির পাতায় নিউটনের প্রসঙ্গ কমে এসেছে। শঙ্কু ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দেশ-বিদেশে সেমিনার আর বিদেশি বন্ধুদের নিয়ে। শেষ দিকে নিউটনকে আর কোথায় খুঁজে পাওয়া যায় না—না গল্পে, না অলংকরণে।

কেন এই বদল? এর একটা সহজ ব্যাখ্যা হলো বিজ্ঞানী প্রোফেসর শঙ্কুর চরিত্রটিই আসলে বদলে গেছে। শুরুতে শঙ্কু ছিলেন হালকা চালের কমিক একটি চরিত্র। প্রথম দুটি বইয়ের প্রচ্ছদে সেটার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু শিগগিরই সিরিয়াস চরিত্রে রূপ নেন শঙ্কু। হাস্যরসে ভরা নির্ভার গল্পগুলো বদলে যেতে থাকে। ক্রমেই টিনটিনের প্রোফেসর ক্যালকুলাসের বদলে আর্থার কোনান ডয়েলের প্রোফেসর চ্যালেঞ্জারের মতো চরিত্র হয়ে ওঠেন শঙ্কু।

শঙ্কুর রসাত্মক গল্পগুলো ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে অ্যাডভেঞ্চার ও থ্রিলারধর্মী। এই নতুন শঙ্কু কখনো সাহারা মরুভূমিতে ছুটছেন, তো কখনো চলে যাচ্ছেন হিমালয়ের দুর্লঙ্ঘ্য পর্বতে হিমবাহের আড়ালে লুকানো পরিত্যক্ত মঠে। এসব অভিযানে তো আর সঙ্গে করে পোষা বিড়াল নিয়ে যাওয়া যায় না। তাই অনুমান করে নেওয়া যায়, গৃহকর্তার ঘন ঘন দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে গিরিডির বাড়িতে চাকর প্রহ্লাদ আর জবুথবু রোবট বিধুশেখরের সঙ্গে নিরানন্দ সময় কাটে নিউটনের। কালেভদ্রে যখন ফেরেন বিজ্ঞানী, অভিমানী নিউটন দূরে দূরে ঘুরে বেড়ায়। তখন গৃহকর্তার আওয়াজ পেয়ে গেট ঠেলে কৌতূহলে আর উঁকি দেন না প্রতিবেশী অবিনাশবাবু, বিজ্ঞানের বিষয়-আশয় নিয়ে যাঁর খুব বেশি জানাশোনা নেই, গিরিডির বাইরের জগৎটা যাঁর কাছে দূরের অচেনা গ্রহ। ঠাট্টার সুরে তিনি আর বলে ওঠেন না, ‘কী মশাই, আপনি তো চাঁদপুর না মঙ্গলপুর কোথায় চললেন। আমার টাকাটার কী হলো?’