গণিত ও বিজ্ঞানে আমরা হরহামেশাই কিছু শব্দের মুখোমুখি হই। তার মধ্যে কিছু শব্দ বেশিমাত্রায় প্রচলিত হলেও পাঠ্যবইয়ের লেখকেরা সেগুলোর অর্থ নিয়ে খুব বেশি কথা খরচ করার প্রয়োজন মনে করেন না। ভাবখানা এমন, এ তো সবাই জানে; এগুলোর অর্থ আবার সবিস্তারে বলার কী আছে! শিক্ষকেরাও আর সেসব নিয়ে ক্লাসে আলোচনা করে ‘সময় নষ্ট’ করার প্রয়োজন বোধ করেন না। ছাত্ররাও ভাবে, ‘এটার মানে জিজ্ঞেস করব; পাছে সবাই আমায় বোকা ভাবে!’ তা ছাড়া ওগুলোর অর্থ তো আর পরীক্ষায় আসে না। জানলেই কী আর না জানলেই বা কী! অগত্যা কাজ চালানোর জন্য হলেও সেই শব্দগুলোর একটা কিছু অর্থ আমরা মনে মনে দাঁড় করিয়ে ফেলি। তাই শেষমেশ দেখা যায়, শব্দগুলো ব্যবহারে আমরা ‘পারদর্শী’ হয়ে গেলেও তার অর্থগুলো নিয়ে আমাদের মনে একরকম গোঁজামিল ঢুকে যায়। তা ছাড়া, অন্যের সঙ্গে নিজের ধারণা শেয়ার না করার ফলে একেক জন একই শব্দের একেক মানে করে বসে থাকে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পরিভাষার উদ্দেশ্য ঠিক তার উল্টো। সবাই যাতে একই শব্দের অভিন্ন অর্থ ব্যবহার করে, সে উদ্দেশ্যেই পরিভাষার জন্ম। ফলে পারিভাষিক শব্দগুলোর অর্থ ঠিকঠাক না জানার কারণে অনেক সময় আমরা বিজ্ঞান, অবিজ্ঞান আর অপবিজ্ঞানের পার্থক্য করতে পারি না। বিজ্ঞানশিক্ষার মূল উদ্দেশ্যটাই এভাবে ব্যর্থ হয়। আজ এ রকম কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দের অর্থ আমরা শিখব।
আরোহ (Induction)
অনেকগুলো বিশেষ ঘটনা একই রকম ফল দিলে আমরা মনে করতে পারি যে ও রকম যত ঘটনা ঘটবে, তার সবই অনুরূপ ফল দেবে। এটাই আরোহ। যেমন: অনেকগুলো সমকোণী ত্রিভুজ এঁকে সেগুলোকে মেপে দেখা গেল প্রতি ক্ষেত্রেই অতিভুজের বর্গ অপর দুই বাহুর বর্গের সমষ্টির সমান। এখান থেকে আমরা আরোহ পদ্ধতিতে সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে যতগুলো সমকোণী ত্রিভুজ আঁকা হোক না কেন, সব ক্ষেত্রেই অতিভুজের বর্গ অপর দুই বাহুর বর্গের সমষ্টির সমান হবে। তবে আরোহ অনেক সময় ভুল ফল দিতে পারে। যেমন: ধরা যাক, এক ব্যক্তি জীবনে যতবার বাসে উঠেছেন, কোনোবারই দুর্ঘটনার শিকার হননি। এ থেকে তিনি আরোহ পদ্ধতিতে ভাবলেন তিনি জীবনে যতবারই বাসে উঠবেন না কেন, কোনোবারই দুর্ঘটনায় পড়বেন না। এমনটা ভাবা আসলে ঠিক নয়, বোঝাই যাচ্ছে। একইভাবে কোনো ব্যক্তি অনেকগুলো ত্রিভুজ আঁকলেন। কাকতালীয়ভাবে তাঁর আঁকা সবগুলো ত্রিভুজই স্থূলকোণী হলো। এখান থেকে তিনি আরোহ পদ্ধতিতে মনে করলেন, যতগুলো ত্রিভুজই আঁকানো যাক না কেন, সবই স্থূলকোণী হবে। স্থূলকোণী ত্রিভুজ ছাড়া অন্য কোনো প্রকার ত্রিভুজ আঁকানো সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত। গণিত তথা জ্যামিতিতে আরোহ পদ্ধতির ব্যবহার খুবই সীমিত, তবে জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় এর প্রচুর ব্যবহার আছে। উল্লেখ্য, আরোহ পদ্ধতিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে কখনো কখনো ‘সাধারণীকরণ’ (Generalization) বলা হয়।
অবরোহ (Deduction)
কোনো সাধারণ ঘটনা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে ব্যবহার করে কোনো বিশেষ ঘটনা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়াকে বলে অবরোহ। যেমন: আমরা জানি, সমতলে ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি ১৮০০। এটি একটি সাধারণ ঘটনা। একটি বিশেষ ক্ষেত্র কল্পনা করা যাক, যেখানে কোনো ত্রিভুজের দুটি কোণ ৫০০ ও ৬০০, তৃতীয় কোণটি নির্ণয় করতে হবে। উপরোক্ত সাধারণ ঘটনার জ্ঞান ব্যবহার করে আমরা বলতে পারি, তৃতীয় কোণ = ১৮০০—(৫০০ + ৬০০) = ৭০০। সাধারণ ঘটনার জ্ঞান যদি সঠিক হয়, তবে অবরোহ পদ্ধতিতে বিশেষ ঘটনা সম্পর্কে গৃহীত সিদ্ধান্ত সঠিক হতে বাধ্য। আরোহের মতো এতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া গণিতের সব প্রমাণ অবরোহ পদ্ধতিতে করা হয়। শুধু প্রমাণ নয়, প্রায় সব গাণিতিক প্রক্রিয়াই অবরোহ। গাণিতিক আরোহ, নামে আরোহ হলেও আসলে একধরনের অবরোহ। আর নামে গাণিতিক হলেও গণিতে আরোহ মানেই সব সময় গাণিতিক আরোহ নয়, তবে বাইরে থেকে দেখতে আরোহের মতো লাগে বলে এমন নামকরণ।
স্বতঃসিদ্ধ (Common notion)
স্বতঃসিদ্ধ আর স্বীকার্য বেশ কাছাকাছি, তবে এরা সমার্থক নয়। স্বতঃসিদ্ধের বিশেষত্ব হলো, এগুলো শুধু বিশেষ ধরনের জ্যামিতি বা বিজ্ঞানের বিশেষ কোনো শাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আমাদের কমন সেন্স থেকে এগুলোর যথার্থতা আমরা অনুধাবন করতে পারি। যেমন: ইউক্লিডীয় জ্যামিতির প্রথম স্বতঃসিদ্ধ হলো, যেসব বস্তু আলাদাভাবে কোনো একটি বস্তুর সমান সেগুলো পরস্পর সমান। এটা যে শুধু ইউক্লিডীয় জ্যামিতির জন্য সত্য তা-ই নয়, বরং জ্ঞানের বেশির ভাগ শাখাতেই সত্য। একই সঙ্গে স্বতঃসিদ্ধগুলো দুই বা ততোধিক বস্তুর মধ্যে এমন সম্পর্ক নির্দেশ করে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরিবর্তনীয়। যেমন: ইউক্লিডীয় জ্যামিতির প্রথম স্বতঃসিদ্ধ বিভিন্ন বস্তু কখন সমান হবে তা বর্ণনা করছে। স্বতঃসিদ্ধগুলো যদিও কমন সেন্স থেকে বোঝা যায়, তবু এগুলোর প্রমাণ থাকা চাই। তাই স্বীকার্যের মতো এগুলোরও আরোহী প্রমাণ রয়েছে।
স্বীকার্য (Postulate বা Axiom)
এর অর্থ অনেকে মনে করে এমন, যা কিছু প্রমাণ ছাড়া ধরে নেওয়া হয়। কথাটা শুধু ভুলই নয়, গুরুতর বিপজ্জনক ভুল। প্রমাণ ছাড়া কথা বললে সেটা আর বিজ্ঞান থাকে না। আসলে, স্বীকার্য হলো এক সেট ধারণা, যেখান থেকে যুক্তির ধাপ শুরু হয়। এই প্রাথমিক ধারণাগুলো কিন্তু আকাশ থেকে আসে না। এগুলোরও প্রমাণ আছে। তবে তা আরোহ পদ্ধতিতে পাওয়া। তার পর থেকে বাকি ধাপগুলো অবরোহ। জ্ঞানের কোনো শাখাতেই তার নিজস্ব স্বতঃসিদ্ধ বা স্বীকার্যের বাইরের কোনো বিষয় ব্যবহার করা হয় না কারণ, তা নিয়মবিরুদ্ধ। এটি করলে জ্ঞানের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়। তবু কোনো কারণে বাইরের কোনো স্বীকার্য বা স্বতঃসিদ্ধকে গ্রহণ করতে হলে স্বীকার্য অথবা নিজস্ব কোনো স্বীকার্য-স্বতঃসিদ্ধ বর্জন করতে হলে জ্ঞানের সেই শাখাটিকে গোড়া থেকে পরিবর্তন করতে হয়। পদার্থবিজ্ঞানের নিউটনীয় ধারণা থেকে আইনস্টাইনীয় বা আপেক্ষিক ধারণায় উত্তরণ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একইভাবে কোনো জ্যামিতিক সিদ্ধান্ত প্রমাণে এমন কোনো স্বীকার্য বা স্বতঃসিদ্ধ ব্যবহার করা ঠিক নয়, যা ওই জ্যামিতির অন্তর্ভুক্ত নয় কিংবা তার নিজস্ব স্বীকার্য বা স্বতঃসিদ্ধ হতে উদ্ভূত নয়। তাই ইউক্লিডীয় জ্যামিতিতে সব সময় এর পাঁচটি স্বীকার্য এবং পাঁচটি স্বতঃসিদ্ধ অথবা এ হতে প্রমাণ করা যায় এমন সিদ্ধান্ত ব্যবহার করা হয়। ইউক্লিডীয় জ্যামিতির পঞ্চম স্বীকার্য বাতিল করে নতুন জ্যামিতি বানানো হয়েছে, যার নাম অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি। লক্ষ করো, একটা স্বীকার্য বাদ দেওয়ার জন্য পুরো জ্যামিতিটাই পাল্টে গেল! সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে এই নতুন জ্যামিতির গুরুত্ব অনেক।
প্রতিজ্ঞা (Proposition), উপপাদ্য (Theorem) এবং সম্পাদ্য (Problem)
স্বীকার্য এবং স্বতঃসিদ্ধ হতে শুরু করে অবরোহ পদ্ধতিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছালে তাকে বলে প্রতিজ্ঞা। জ্যামিতিতে আমরা দুই ধরনের প্রতিজ্ঞার সঙ্গে পরিচিত—উপপাদ্য ও সম্পাদ্য। সাধারণভাবে উপপাদ্য বলতে আমরা কোনো কিছু প্রমাণ করাকে বুঝি আর সম্পাদ্য বলতে বুঝি জ্যামিতিক অঙ্কন। কিন্তু ব্যাপারটি আসলে তা নয়। দুটোই হলো প্রমাণ করার ব্যাপার। ‘দুটি ত্রিভুজের দুটি অনুরূপ বাহু এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত কোণ সমান হলে তারা সর্বসম হয়’—এটা একটা উপপাদ্য এ জন্য যে, এখানে দুটি ত্রিভুজের কিছু শর্ত দেওয়া আছে এবং ওই শর্ত ঠিক থাকলে তাদের মধ্যে আরও কিছু শর্ত (সর্বসম হওয়া) অবশ্যই মিলে যাবে। আবার ধরো, ‘দুটি বাহু এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত কোণ দেওয়া আছে; ত্রিভুজটি আঁক’—এটা একটা সম্পাদ্য এ জন্য যে, প্রদত্ত শর্তসাপেক্ষে একটি নির্দিষ্ট ত্রিভুজ আঁকা সম্ভব, সেটা প্রমাণ করা যায়। দুটি বাহু এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত কোণ ভিন্ন অন্য কোণ দেওয়া থাকলে কোনো নির্দিষ্ট ত্রিভুজ আঁকা যেত না, কারণ এটা প্রমাণ করা যায় যে ও রকম অসংখ্য ত্রিভুজ হতে পারে, যারা কেউ কারও সর্বসম হবে না।