অভিশপ্ত

বিজ্ঞাপন
default-image

গোলটেবিলের এক পাশে রাখা ট্যালো ক্যান্ডেলের মৃদু আলোয় খুব মনোযোগে বই পড়ছেন ভদ্রলোক। পুরোনো হিসাবের খাতার মতো দেখতে বইটার ছিঁড়ে গেছে অনেকখানি। লেখাও খুব স্পষ্ট নয়। ফলে মাঝেমধ্যেই ঠিকমতো পড়ার জন্য বইটাকে মোমের আরও কাছে নিয়ে যেতে হচ্ছে পাঠককে। তখন বইয়ের ছায়ায় ঘরের অর্ধেকের বেশি জায়গা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। আর সেই ছায়ায় ঢাকা পড়ছে বসে থাকা বেশ কয়েকটি মুখ।

বইটির পাঠক ছাড়া আরও আটজন লোক আছে ঘরে। সাতজনই ঘরের কাঠের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে চুপচাপ। নড়াচড়া করছে না কেউ। রুমটা খুব ছোট। টেবিলের কাছেই সবাই এমনভাবে বসে আছে যে হাত বাড়িয়ে চাইলে অষ্টম ব্যক্তিকে ছুঁতে পারবে তারা। টেবিলের ওপরেই শুয়ে আছে সে, চিত হয়ে, শরীরটা একটা চাদরে ঢাকা। হাত দুটো শরীরের দুপাশে রাখা। এই অষ্টম ব্যক্তি মৃত।

সশব্দে পড়ছেন না ভদ্রলোক। অন্যদের মুখেও কোনো কথা নেই। কিছু একটা ঘটার অপেক্ষায় যেন বসে আছে সবাই। একমাত্র নির্বিকার মৃত ব্যক্তিটি। জানালার ফাঁক গলে বাইরের বিচিত্র সব শব্দ চলে আসছে ঘরের ভেতর। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। রাতপাখিদের বিচিত্র ডাক, দিনের থেকে একেবারে আলাদা। গুবরেপোকাদের বিরক্তিরকর একঘেয়ে আওয়াজ। আরও অনেক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শব্দে বিচিত্র ঐকতান বেজে চলেছে। কিন্তু এসবের কিছুই সাড়া জাগাচ্ছে না ঘরের লোকগুলোর মধ্যে। জাগানোর কথাও নয়। আর এসব শব্দের মধ্যে এমন কী মধু আছে যে কান পেতে শুনতে হবে, এদের মর্মার্থ অনুধাবন করতে হবে! এরা খুব বাস্তববাদী, কবি-সাহিত্যিক নয়। এই এলাকারই লোকজন এরা—কৃষক বা কাঠুরে। এটা একটা পাহাড়ি এলাকা।

যিনি বই পড়ছেন তিনি অবশ্য এদের সবার থেকে আলাদা। তাঁর বেশভূষা থেকেই বোঝা যায় সেটা। লোকটার অবয়বেই কর্তৃত্বের ছাপ স্পষ্ট। তিনি একজন করোনার—শব পরীক্ষক, যাঁর কাজ কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্ত এবং এখন এখানে, একই সঙ্গে তার বিচার করা। দূরের শহর থেকে এসেছেন তিনি। অফিস প্রদত্ত ক্ষমতাবলেই যে বইটি তিনি পড়ছেন, সেটি এখন তাঁর দখলেই থাকবে। বইটি পাওয়া গেছে মৃত লোকটির ঘরে অন্যান্য জিনিসের মধ্যে। সেই ঘরেই এখন তদন্তের কাজ চলছে।

পড়া শেষ হলে বইটা ব্রেস্ট পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন করোনার। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে যে তরুণ ঢুকল ঘরে সে যে পাহাড়ি নয়, সেটা চেহারা দেখেই বোঝা যায়। চেহারায় শহুরে ছাপ স্পষ্ট। গায়ের পোশাক ধূলিধূসরিত, সম্ভবত দীর্ঘ ভ্রমণের জের। বোঝাই যাচ্ছে, এই তদন্তে হাজিরা দিতে একরকম ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসতে হয়েছে তাকে।

করোনার তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। ঘরের আর কেউ কিছু বলল না।

‘আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।’ বললেন করোনার। ‘আজ রাতেই কাজটা সেরে ফেলা দরকার।’

তরুণটি মৃদু হাসল। ‘আপনাদের বসিয়ে রাখার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। আপনার সমন এড়ানোর চেষ্টা করছিলাম, তা কিন্তু নয়। আসলে আমার পত্রিকার জন্য খবর পোস্ট করতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল।’

করোনার হাসলেন। ‘আপনি পত্রিকায় যে খবর পাঠিয়েছেন আর এখানে শপথ নিয়ে যা বলবেন, দুটো নিশ্চয়ই এক হবে না।’

কথাটা শুনে রেগে গেল তরুণটি। জবাবে রাগের ঝাঁজটাও টের পাওয়া গেল, ‘সেটা আপনি বুঝবেন। আপনি কীভাবে নেবেন। আমি যা পাঠিয়েছি তার একটা কপি আমার কাছে আছে। এটা ঠিক নিউজ আকারে নয়। একটু অন্য রকম করে লেখা। কারণ, ঘটনাটি অবিশ্বাস্য। শপথ নেওয়ার পর যে বক্তব্য রাখব তার অংশ হিসেবেও এটা গ্রহণ করতে পারেন।’

‘কিন্তু আপনি নিজেই তো বললেন এটা অবিশ্বাস্য। সুতরাং এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’

‘তাতেও কিছু যায়-আসে না। আমি যদি কসম কেটেও বলি তবু আপনার কাছে এটা কিছু মনে হবে না।’

default-image

তরুণের বিরক্তভাবটা বুঝলেন করোনার, তবে গায়ে মাখলেন না। কিছুক্ষণ মেঝের দিকে চুপ করে চেয়ে থাকলেন। ঘরের অন্যরা একটু ফিসফাস শুরু করেছে। তবে সবারই চোখ মৃতদেহের দিকে।

চোখ তুলে গম্ভীর কণ্ঠে এবার বললেন করোনার, ‘এখন আমরা তদন্তের কাজ শুরু করব।’

বসে থাকা সাতজনই তাদের মাথার হ্যাট খুলল। শপথ নিল প্রত্যক্ষদর্শী।

‘আপনার নাম?’ তরুণের উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন করোনার।

‘উইলিয়াম হারকার।’

‘বয়স?’

‘সাতাশ।’

‘প্রয়াত হিউ মরগানকে আপনি চিনতেন?’

‘জি।’

‘তিনি যখন মারা যান তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন?’

‘কাছাকাছি ছিলাম।’

‘কীভাবে ঘটল ঘটনাটা—মানে আপনার উপস্থিতিতে কীভাবে খুন হলেন তিনি?’

‘শিকার এবং মাছ ধরার জন্য আমি তাঁর সঙ্গে এখানে এসেছিলাম। আমার আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে পর্যবেক্ষণ করা। তাঁর এই বিচিত্র, একাকী জীবনযাপনের রহস্যটা বের করতে চাইছিলাম আমি। গল্পের জন্য চমত্কার একটা সাবজেক্ট তিনি। বাই দ্য ওয়ে, আমি মাঝে মাঝে গল্প লিখে থাকি।’

‘আমিও মাঝে মাঝে গল্প পড়ি।’

‘ধন্যবাদ।’

‘উঁহু আপনার গল্প নয়, সাধারণ গল্পের কথা বলছিলাম।’

জুরিদের কয়েকজন হেসে উঠলেন। মন খারাপ করলেন না বক্তা। এমন তো হয়ই। যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকেও তো মানুষ সহজভাবে হাসে, উত্তেজনা কিছুটা কমে আসে।

‘এই মানুষটার মৃত্যুর বর্ণনা দিন।’ বললেন করোনার। ‘চাইলে, যেকোনো নোট বা মেমোরান্ডা ব্যবহার করতে পারেন আপনি।’

প্রত্যক্ষদর্শী বুঝলেন। তাঁর ব্রেস্ট পকেট থেকে একটা পাণ্ডুলিপি বের করে মোমের কাছে এসে পাতা ওল্টাতে লাগলেন। তারপর নির্দিষ্ট একটা জায়গায় এসে পড়তে শুরু করলেন।

২.

‘... বাসা থেকে যখন বের হই সূর্য তখন উঠি উঠি করছে। কোয়েল পাখি খুঁজছিলাম আমরা। দুজনের হাতেই শটগান। কুকুর আছে সঙ্গে মাত্র একটা। মরগান একটা খাঁড়ির দিকে লক্ষ করে বলছিল ওখানেই ভালো শিকার মিলবে। ঝোপঝাড়ের মাঝে একটা ট্রেইল ধরে সেদিকে এগোচ্ছিলাম আমরা। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে সমতল জমি। বুনো যবে ছাওয়া। ঝাড় থেকে যখন বেরোচ্ছি তখন মরগান আমার থেকে কয়েক গজ সামনে ছিল। হঠাত্ আমাদের সামান্য ডান দিকে এবং কিছুটা সামনেও একটা শব্দ শুনলাম। মনে হলো কোনো বুনো জন্তু ঝোপঝাড় তোলপাড় করে ছুটে যাচ্ছে, যা দেখলাম তাতে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লাম।’

‘একটা হরিণ দেখলাম মনে হয়।’ বললাম। ‘ইশ্ যদি একটা রাইফেল সঙ্গে নিয়ে আসতাম।’

‘মরগান গভীর মনোযোগ দিয়ে ঝোপঝাড়ের আলোড়ন লক্ষ করছিল। কোনো কথা নেই তার মুখে। কিন্তু এরই মধ্যেই বন্দুকের দুটো ব্যারেলই তাক করে প্রস্তুত সে। এই সামান্য ব্যাপারে তাকে এতটা উত্তেজিত দেখে আমি একটু অবাকই হলাম। বিশেষ করে যেকোনো বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখার ব্যাপারে তার সুনামের কথা সবাই জানে। এমনকি ভয়াবহ বিপদের মুখেও তাকে নির্বিকার থাকতে দেখেছি।’

‘আরে ছোড়ো! কোয়েল মারার গুলি দিয়ে নিশ্চয়ই হরিণ শিকার করতে চাচ্ছো না তুমি?’ বললাম আমি।

কিন্তু এ কথাতেও কোনো সাড়া দিল না সে। তবে খুব ধীরে ধীরে মুখটা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। ভয়ে ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে চমকে উঠলাম আমি। তক্ষুনি বুঝে গেলাম, সিরিয়াস কিছু একটা হতে চলেছে। কোনো কারণ ছাড়াই আমার কেন যেন মনে হলো আমরা কোনো ভালুকের এলাকায় ঢুকে পড়েছি। আমার বন্দুকটা রেডি করতে করতে মরগানের দিকে এগিয়ে গেলাম আমি।’

‘ঝোপঝাড়ে তখন কোনো আলোড়ন নেই। শব্দ থেমে গেছে। কিন্তু ওই দিক থেকে তখনো চোখ সরায়নি মরগান। তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে।’

‘জিনিসটা কী? কোন ধরনের জানোয়ার এটা?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘এটা সেই অভিশপ্ত...।’ অনেক হাতড়েও কোনো শব্দ না পেয়ে ফের বলল, ‘সেই অভিশপ্তটা।’ কণ্ঠস্বর ফ্যাসফ্যাসে, অস্বাভাবিক। শরীরটা যে কাঁপছে সেটাও বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে।

‘আমি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু জবান থেমে গেল এক অব্যাখ্যাত দৃশ্য দেখে। দেখলাম আমাদের একটু সামনেই বুনো ঝোপঝাড় নড়াচড়া করছে। অথচ ওখানে কিছুই নেই। আমি ঠিক বর্ণনা করতে পারব না দৃশ্যটা। মনে হচ্ছিল একদলা বাতাস ওই ঝোপঝাড়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে গাছপালা। ওই জায়গাটুকু বাদে আশপাশে কোথাও বাতাসের নামগন্ধ নেই। ঝোপঝাড়কে মাটিতে শুইয়ে দিতে দিতে ধীরে ধীরে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে ওটা।

‘আমার জ্ঞানবুদ্ধির বাইরের এই দৃশ্য দেখে রীতিমতো বেকুব বনে গিয়েছিলাম আমি। ভয়ের বোধটা তখনো কাজ করেনি। আসলে আমার অবচেতন মন তখন একটা দৃশ্যের ব্যাখ্যা খুঁজছিল সম্ভবত। ঝোপঝাড়ের পেছনে যে উঁচু গাছের সারি, সেখানে তাকিয়ে এক পলকের জন্য আমার মনে হলো কয়েকটা গাছ দেখতে আশপাশের অন্য গাছগুলোর তুলনায় কেমন একটু ঝাপসা লাগছে, মনে হচ্ছে ওগুলো যেন যেখানে থাকার কথা তার চেয়ে একটু দূরে। এবং এই ঘটনাটা একটু পরপর জায়গা বদল করছে। চট করে বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ভালো করে তাকালে আরও স্পষ্ট হচ্ছে। চোখের সমস্যা কি না সেটা বার কয়েক নিজের চোখ কচলে আশপাশে আবার তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম। না, কিছু একটা ব্যাপার আছে। বাতাস মাঝে বেশি ঘন হয়ে গেলে এটা কী হতে পারে? কিন্তু এমনটা হওয়ার মতো কোনো কারণ ঘটেনি।

‘এবার আমার মেরুদণ্ড বেয়ে ভয়ের একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। অভাবনীয় কোনো দুর্যোগের আশঙ্কায় বুকটা দুরু দুরু করতে লাগল। আমার সঙ্গী কখন যে কাঁধে বন্দুক তুলে নিয়েছে টের পাইনি। হুঁশ হলো গুলির শব্দে। আন্দোলিত ঝোপঝাড় লক্ষ্য করেই গুলি চালিয়েছে সে। গুলির পরপরই বিপুল আর্তচিত্কারের শব্দ শুনতে পেলাম। কোনো বুনো জন্তুর আর্তনাদ। আর পরক্ষণেই মরগানের বন্দুকটা দেখলাম মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। লাফ দিয়ে মরগান ওই জায়গা থেকে সরে গেল। আর তারপরই আমি ছিটকে পড়লাম মাটিতে। কিছুই দেখিনি। কিন্তু স্পষ্ট টের পেলাম নরম, ভারী কোনো জিনিসের প্রবল ধাক্কায় আমি মাটিতে পড়েছি।

‘উঠে কোনোমতে বন্দুকটা হাতে তুলে নেওয়ার আগেই মরগানের আর্তচিত্কার শুনলাম। ওর চিত্কারের সঙ্গে মিশেছিল বুনো হিংস্র কোনো পশুর গলার আওয়াজ। শব্দটা অনেকটা শিকারি কুকুরের মতো। কী যে ভয় পেয়েছিলাম সেটা বলার মতো নয়। কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে মরগান যেদিকে গিয়েছিল সেদিকে ছুটলাম। আর তারপর যা দেখলাম...ওহ্ খোদা...এমন কিছু দেখাও আমার ভাগ্যে ছিল! গজ তিরিশেক দূরত্বে পড়ে আছে আমার বন্ধুটি। হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে উবু হয়ে। মাথাটা বেঁকে আছে ভয়ংকরভাবে, টুপি কোথায় উড়ে গেছে, মাথার লম্বা চুলগুলো এলোমেলো। তার সারা শরীর ভয়ংকরভাবে এপাশ-ওপাশ দুলছে। হঠাত্ ওর একটা হাত দেখলাম ওপরে উঠে আছে, যেন ওটাও ওর হাত নয়, অন্য হাতটাও অদৃশ্য। ওই অস্বাভাবিক দৃশ্যের কথা লিখতে গিয়ে এখন আমার মনে পড়ছে আমি মাঝে মাঝে কেবল তার শরীরের কিছু অংশ দেখেছি, অন্য অংশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে। এই দৃশ্যটাকে আর কীভাবে বর্ণনা করব আমি বুঝতে পারছি না। এরপর মরগানের শরীরটা একবার উল্টে গেল। তখন আবার পুরোপুরি দেখতে পেলাম তাকে।

‘এসব কিছুই ঘটে গেল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। এই সময়টুকুতে মরগানকে মনে হলো কোনো বিশালদেহী এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করছে সে। কিন্তু দৃশ্যপটে আমি তাকে ছাড়া আর কিছু বা কাউকে দেখতে পাইনি। তাকেও যে সব সময় পুরোপুরি দেখতে পেয়েছি তাও নয়, সে কথা তো বললামই। পুরো ঘটনাটার সময়জুড়েই ওর চিত্কার চলছিল। আর সেই চিত্কারও ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল এক তীব্র ক্রোধোন্মত্ত গর্জনে, যা এর আগে কোনো মানুষ বা পশুর কণ্ঠে আমি শুনিনি।

‘এক মুহূর্তের জন্য কী করব বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে রইলাম, তারপর, আমার বন্দুকটা মাটিতে ছুড়ে ফেলে বন্ধুর সাহায্যের জন্য এগিয়ে গেলাম। আমার মনে হালকা একটা সন্দেহ উঁকি দিয়েছিল, ওর ফিটের ব্যামো হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আমি পৌঁছার আগেই ওর শরীরটা মাটিতে স্থির হয়ে গেল। থেমে গেল সব চিত্কার-গর্জন এমনভাবে যেন এখানে কিছু হয়নি, কিছুই ঘটেনি। পরক্ষণেই দেখতে পেলাম সেই দৃশ্য। ঘন বাতাসের মতো রহস্যজনক কিছু একটা ঝোপঝাড় দুমড়ে-মুচড়ে চলে গেল জঙ্গলের দিকে। জঙ্গলের মধ্যে ওটা ঢুকে যাওয়ার পর চোখ ফেরানোর সুযোগ হলো আমার। তাকিয়ে দেখি বন্ধুর নিশ্চল দেহের দিকে। মারা গেছে সে।’

৩.

আসন ছেড়ে উঠলেন করোনার। দাঁড়ালেন মৃতদেহটার পাশে। চাদরটা সরিয়ে পুরো দেহটা উন্মুক্ত করে দিলেন। মোমের আলোয় মনে হলো পুরো দেহে হলুদ কাদার মতো রং লেগে আছে। বুকটা আর দুই পাশ দেখে মনে হলো তাকে মুগুরপেটা করা হয়েছে। ভয়াবহ সব ক্ষত পুরো শরীরে। কিছু কিছু জায়গায় চামড়া মনে হচ্ছে টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, ফালি ফালি করা হয়েছে শরীরের বেশ কিছু জায়গা।

টেবিলের এক প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালেন করোনার। মৃতদেহের চিবুকের নিচে প্যাঁচানো একটা রুমাল ছিল। সেটাকে খুলে নিলেন তিনি। গলাটা এবার মুক্ত হলো। জায়গাটা ভালো করে দেখার জন্য কয়েকজন জুরি সামনে এগিয়ে এল কৌতূহল মেটাতে। দ্রুতই মাথা ঘুরিয়ে বসে পড়ল তারা বিবমিষা চেপে রাখতে। হারকার এগিয়ে গিয়ে একটা জানালা খুলল। দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে অসুস্থ বোধ করছে সেও। রুমালটা টেবিলে ফেলে রুমের এক কোণে গেলেন করোনার। সেখানে স্তূপ করে রাখার অনেকগুলো কাপড় একটার পর একটা নেড়েচেড়ে দেখলেন। সবগুলোই ছেঁড়া, রক্তমাখা। জুরিরা আর কৌতূহল দেখাল না। তাদের আগ্রহ মিটে গেছে মনে হলো। সত্যি বলতে, এসব দেখার অভিজ্ঞতা তাদের আগেও হয়েছে, নতুন কিছু নয়। তাদের কাছে নতুন ঠেকছে কেবল হারকারের জবানবন্দি। অবিশ্বাস্য!

‘ভদ্র মহোদয়গণ,’ জুরিদের লক্ষ করে বললেন করোনার, ‘আমার মনে হয়, আমাদের হাতে আর কোনো এভিডেন্স নেই। আপনাদের কর্তব্য কী তা আগেই বলেছি। এখন আপনাদের যদি কিছু জিজ্ঞাস্য না থাকে তাহলে বাইরে গিয়ে পরামর্শ করে আপনাদের রায়টা আমাকে জানাতে পারেন।’

জুরি দলের প্রধান উঠে দাঁড়ালেন, ‘আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই মিস্টার করোনার। আমাদের প্রত্যক্ষদর্শী সর্বশেষ কোনো পাগলা গারদ থেকে পালিয়েছিলেন?’

জানালার দিকে ঘুরলেন করোনার, ‘মিস্টার হারকার। কোন অ্যাসাইলাম থেকে আপনি সর্বশেষ পলায়ন করেছেন?’

মুখের রংটা দ্রুত বদলে গেল হারকারের। জবাবে কিছু বললেন না। জুরিরাও আর উচ্চবাচ্য না করে উঠে একে একে সাতজনই ঘর ছেড়ে বাইরে গেলেন। হিম নীরবতা নেমে এল ঘরের ভেতরে।

‘আপনার অপমান করার পালা যদি শেষ হয়ে থাকে তো,’ বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন হারকার, ‘আমার মনে হয় আমি এবার যেতে পারি স্যার।’

‘অবশ্যই।’

মাথায় টুপিটা চাপিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার নবে হাত রেখে একটু থামলেন হারকার। পেশাগত একটা তাগিদ তাঁর ভেতরে আঁকুপাঁকু করছিল বেশ কিছুক্ষণ ধরেই। ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি করোনারের দিকে এবং বললেন, ‘আপনার কাছে যে বইটা আছে সেটা মরগানের ডায়েরি বলে আমার বিশ্বাস। বইটার ব্যাপারে আপনার বেশ আগ্রহ আছে বলে মনে হলো। আমি জবানবন্দি দেওয়ার সময়ও আপনি ওটা পড়ছিলেন। আমি কি ওটা দেখতে পারি? সাধারণ পাঠকেরা হয়তো...

‘না।’ করোনার স্রেফ উড়িয়ে দিলেন আবেদনটা। ‘এ মামলায় এটার কোনো ভূমিকা নেই।’ বলতে বলতেই তাঁর পকেটে চালান করে দিলেন ডায়েরিটা। ‘এখানে যা কিছু লেখা আছে সব লেখকের মৃত্যুর আগের লেখা।’

হারকার বেরিয়ে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জুরিরা ঢুকল ঘরে। টেবিলটার পাশে দাঁড়াল। এরই মধ্যে দেহটা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন করোনার। জুরিদের প্রধান বসল মোমবাতিটার কাছে। তার বুকপকেট থেকে একটা কাগজ বের করল এবং একটা পেনসিল। অনেক কষ্ট করে আঁকাবাঁকা অক্ষরে তাদের রায় লিখে সবাই নিচে দস্তখত করে দিল। রায়টা এ রকম:

আমরা, জুরিরা সম্মিলিতভাবে মনে করি, পাহাড়ি কোনো সিংহের হাতে প্রাণ গিয়েছে হিউ মরগানের।

৪.

প্রয়াত হিউ মরগানের ডায়েরিতে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য ছিল, যার বৈজ্ঞানিক মূল্য থাকতে পারে। কিন্তু তার মৃত্যুর তদন্তে বইটিকে এভিডেন্স হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। করোনার হয়তো ভেবেছিলেন, বইটা জুরিদের বিভ্রান্ত করবে। ডায়েরির প্রথম এন্ট্রির তারিখটা ঠিক বোঝা যায় না, কাগজের ওপরের অংশটা অনেকখানি ছেঁড়া। বাকি অংশে যা লেখা আছে তা এ রকম:

‘... অর্ধবৃত্তাকারে দৌড়াল, মাথাটাকে মাঝে রেখে পুরো শরীরটা নিয়ে, ঘেউ ঘেউ করল হিংস্রভাবে। শেষতক ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে খুব দ্রুতই হাওয়া হয়ে গেল। প্রথমটায় ভেবেছিলাম, ওটা পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু বাসায় ফেরার পর ওর আচরণে কোনো পরিবর্তন আর টের না পাওয়ায় মনে হলো শাস্তির ভয়েই ও রকমটা করেছিল।

‘কোনো কুকুর কি নাক দিয়ে দেখতে পারে? কোনো বিলীয়মান গন্ধ কি কিছু কিছু ঘ্রাণেন্দ্রিয়তে বস্তুর ইমেজ সম্পর্কেও একটা ছাপ তৈরি করে?

‘সেপ্টেম্বর ২

গত রাতে বাড়ির ছাদে বসে তারা দেখছিলাম। বাড়ির পূর্বদিকে খাঁড়ির ওপরে ঝলমল করছিল তারাগুলো। লক্ষ করলাম, কিছুক্ষণের জন্য বাঁ থেকে ডান দিকে ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল তারাগুলো। কিন্তু খুব অল্প সময়ের জন্য। একবারে একগুচ্ছ করে তারা এভাবে হারিয়ে যাচ্ছিল দৃষ্টির আড়ালে, আবার হাজির হচ্ছিল কিছুক্ষণ বাদে। মনে হচ্ছিল ওই তারাগুলো আর আমার মাঝখানে কেউ হেঁটে যাচ্ছে, ফলে ওগুলো আমার নজরের আড়ালে চলে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে আমার চোখের সামনে কাউকেই দেখতে পাইনি আমি। খুব অস্বস্তি লাগছিল। এ রকম কেন হবে...।’

এরপর কয়েক সপ্তাহের কোনো এন্ট্রি নেই ডায়েরিতে। তিনটে পৃষ্ঠা ছেঁড়া। তারপর আবার লেখা শুরু।

‘সেপ্টেম্বর ২৭।

আবার শুরু হয়েছে। ওটা যে আবার এসেছে তার বেশ কিছু লক্ষণ টের পাচ্ছি প্রতিদিনই। কাল সারা রাতই ছর্রা বন্দুক হাতে নিয়ে আড়াল থেকে অনুসরণ করেছি ওটাকে। সকালবেলা ঠিক আগের মতোই উঠানে পায়ের ছাপ দেখতে পেলাম। কসম খেয়ে হয়তো বলতে পারব না যে আমি একেবারে ঘুমাইনি, তবে ঘুমালেও খুব অল্প সময়ের জন্যই দুচোখের পাতা এক করেছি। খুবই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হচ্ছে। একেবারেই অসহ্য। যা দেখছি তা যদি সত্যি হয় তাহলে কিছুদিনের মধ্যেই আমি পাগল হয়ে যাব। আর এসব যদি আমার উর্বর মস্তিকের কল্পনা হয়, তাহলে বলতে হবে আমি অলরেডি পাগল হয়ে গেছি।

‘অক্টোবর ৩।

না, আমি যাব না এখান থেকে।...এটা নিশ্চয়ই আমাকে এখান থেকে খেদিয়ে দেবে না। না, এটা আমার বাড়ি, আমার জায়গা। আমি পালাব না কিছুতেই। ঈশ্বর কাপুরুষদের ঘৃণা করেন।...

‘অক্টোবর ৫।

সমস্যাটার একটা সুরাহা করতে পেরেছি। কাল রাতে সমাধানটা মাথায় এল। হঠাত্ করেই। অনেকটা দৈববাণীর মতো। কী সহজ, কী দারুণ সহজ সমাধান!

‘অনেক শব্দ আছে যেসব আমরা শুনতে পাই না। মানুষের কান এমনভাবেই তৈরি। খুব উঁচু বা খুব নিচু তরঙ্গের কোনো শব্দ আমাদের কানে ধরা দেয় না। আমি লক্ষ করেছি, এখানে কিছু গাছের একেবারে উঁচুতে একদল পাখি বাসা বেঁধে থাকে। তাদের কিচিরমিচিরে ভরপুর থাকে ভোর বা সন্ধ্যাবেলাটা। হঠাত্, এক মুহূর্তেই, ঠিক একই সঙ্গে ডানা ঝাপটে উড়ে চলে যায় দূরে। কীভাবে ঘটে এটা? ওরা তো একজন আরেকজনকে দেখতে পায় না। ওদের নেতাকেও যে সবাই দেখতে পায় তাও নয়। তাহলে? নিশ্চয়ই সতর্ক করার জন্য সিগন্যাল দেয় ওরা, যা আমি শুনতে পাই না।

‘সমুদ্রের নাবিকেরাও দেখে, অনেকগুলো তিমি মাছ, যারা পানির ওপরে খেলা করতে থাকে, বহু দূরে দূরে, মাইলের পর মাইল দূরে থাকা সত্ত্বেও হঠাত্ করেই কখনো কখনো সবগুলোই একসঙ্গে ডাইভ দিয়ে পানির গভীরে চলে যায়। প্রায় একই সঙ্গে। নিশ্চয়ই ওদের মধ্যেও কোনো সিগন্যাল বিনিময় হয়, শব্দতরঙ্গ আকারে, যা মুহূর্তে সবার কাছে চলে যায়, কিন্তু ওইসব শব্দ নাবিকের বা ডেকে থাকা তাঁদের সহযাত্রীদের শ্রুতির অগম্য।

‘শব্দের মতো রঙের ক্ষেত্রে একই কথা বলা যায়। সৌর বর্ণালির প্রতিটি প্রান্তের অ্যাকটিনিক রশ্মি বলে যেটাকে আমরা বুঝি, তার উপস্থিতি কেমিস্টরা চিহ্নিত করতে পারেন। ওগুলো বিভিন্ন বর্ণকে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরে যেগুলোকে আলাদাভাবে উপলব্ধি করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। মানুষের চোখ নিখুঁত কোনো যন্ত্র না, সে সবকিছু দেখতে পায় না। দৃৃশ্যমান জগতে যে রঙের স্কেল তার সামান্য কিছু অংশই আমাদের চোখে ধরা দেয়। অধিকাংশই অধরা।

‘না, আমি পাগল হয়ে যাইনি। আমি এটুকু বুঝেছি, এ জগতে এমন অনেক রংও আছে, যা আমরা দেখতে পাই না।’

‘ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করুন। ওই জঘন্য জিনিসটা এমনই এক রঙের, যা আমি দেখতে পাচ্ছি না!’

অলংকরণ : আসিফুর রহমান

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন