default-image

ক্লাসে ঢোকার পর জহির স্যারের ওপর চোখ পড়তেই মুখটা হাঁ হয়ে গেল। জহির স্যার স্কুল থেকে চলে গিয়েছিলেন এক বছর আগে, আজ আবার এখানে কী করছেন!

কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো ব্যাপারটা জানতে পারলাম। মাথায় বাজ পড়ল যেন। জহির স্যার আবার জয়েন করেছেন স্কুলে। শান্তিতে কাটানো একটা বছর এখন দূর অতীতের বলে মনে হলো। ওহ! এতক্ষণ তো জহির স্যারের পরিচয়ই দেওয়া হয়নি। স্কুলের সবচেয়ে বদমেজাজি আর রাগী স্যার তিনি। ক্লাস টেনের ভাইয়ারা পর্যন্ত তার নাম শুনলে ভয়ে কাঁপে। স্যার যখন রেগে যান, তখন হেডস্যারেরও মুখ শুকিয়ে যেতে দেখেছি। জহির স্যার অঙ্ক পড়ান, আর আমাদের মতো পেছনের বেঞ্চে বসা কয়েকজনের কাছে এই সাবজেক্টটা বরাবরই আতঙ্কের। কোনোমতে অর্ধেক অঙ্ক করে বাকিটুকু আর পারতাম না। ফল হিসেবে আমাদের পিঠে তার ‘বোমাবর্ষণ’ হতো। স্যার যখন স্কুল থেকে চলে গিয়েছিলেন, তখন আমরা কয়েকজন মিলে চাঁদা তুলে ফকির খাইয়েছিলাম। স্যারকে আবার ক্লাসে দেখে মনে হচ্ছে সেদিন কিপ্টেমি না করে আরও কয়েকজন ফকিরকে খাওয়ানো উচিত ছিল।

অনেক দিন পর ফেরত এসে স্যার আবার তার পুরোনো ফর্মে ফিরে গেলেন। লাস্ট বেঞ্চে বসা আমাদের কয়েকজনকে পেটালেন ইচ্ছামতো। আমাদের অপরাধটাও অবশ্য ফেলে দেওয়ার মতো নয়, সবাই মিলে সরলের মান বের করতে গিয়ে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেছি। প্রত্যেকেরই সব লাইন হুবহু এক। উত্তরও এক এবং উত্তরটা খুব বিদঘুটে। অনেক দিন স্যারের মার খেয়ে অভ্যাস নেই, তাই হয়তো খুব ব্যথা পেলাম। সারা ক্লাস পিঠ টনটন করতে থাকল।

স্যারের অত্যাচার চলতেই থাকল। স্যারের আবার বদলির কোনো সম্ভাবনা না দেখে আমরা যখন হাল ছেড়েই দিয়েছি, তখন এক চরম সত্য আবিষ্কৃত হলো। আবিষ্কারকের নাম অনীক, স্যারের সবচেয়ে প্রিয় শিকার। বেচারা শুধু ‘আমরা জানি’ আর ‘দেওয়া আছে’ পর্যন্তই লিখতে পারে, এর বেশি আর ওর অঙ্ক এগোয় না। সেদিন ক্লাসে এসেই তুমুল উত্তেজিত হয়ে বলা শুরু করল, ‘স্যারের মাথায় পরচুলা। স্যারের মাথার সব চুল পড়ে গেছে, তাই পরচুলা দিয়ে ঢেকে রাখে।’

অনীকের কথা বিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না, সে যা বলে তার উল্টোটা সাধারণত সত্য বলে আমরা ধরে নিই। কিন্তু কয়েক দিন পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলাম স্যার আসলেই পরচুলা পরেন। স্যার যখন মারার জন্য কাছে আসেন, তখন খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলে পার্থক্যটা বোঝা যায়। এমনকি জাবেদের খাতায় সেদিন আগামাথাহীন অঙ্কের পাশে জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন দেখে এমন মার মারলেন, আমিসহ আরও কয়েকজন স্পষ্ট তার পরচুলা নড়ে যেতে দেখলাম। সেদিন থেকে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গেলাম স্যারের মাথার চুল আসলেই পড়ে গেছে।

এবার আমরা ব্যাকবেঞ্চাররা প্রত্যেকেই একেকজন ‘অতৃপ্ত প্রেত’ হয়ে গেলাম। স্যারের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার বাসনায় নানা রকম প্ল্যান করা শুরু করলাম। সব প্ল্যানের মূল বিষয় স্যারের পরচুলা হুট করে গায়েব করে দেওয়া। সব রকম ‘হাই লেভেলের’ প্ল্যানের মধ্যে থেকে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত প্ল্যানটা বেছে নেওয়া হলো। আমাদের ক্লাসে চোর হিসেবে হোসেনের খুব ‘সুনাম’ আছে। চোখের পলকে ক্যালকুলেটর, টিফিন, খুচরা টাকা গায়েব করে দিতে পারে। এত নিপুণভাবে সে পরচুলাটা গায়েব করে দিল, আমরাও কিছু বুঝতে পারলাম না। স্যার রাব্বিকে মারছিল, আমরা প্রহর গুনছিলাম। হুট করে দেখি স্যারের পরচুলাটা যেন হাওয়ায় ভেসে মাটিতে পড়ে গেল। আগে জানা না থাকলে বুঝতেই পারতাম না কাজটা হোসেন করেছে।

ঘটনাটা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়ল। সামনের কয়েকজন চেপে চেপে হাসছিল, আমরা দাঁত বের করে হাসা শুরু করলাম। অনীক আর রাব্বি হো হো করে বিকট অট্টহাসি দিল। আর এই প্রথমবার স্যার মনে হয় বিব্রত হলেন, কিছু না বলে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আধা ঘণ্টা পর হেডস্যার এলেন। অনেকক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকার পর বললেন, ‘এই একটা বছর জহির স্যার কোথায় ছিলেন, কেউ জানো?’

কেউ এই প্রশ্নের উত্তর দিল না।

‘স্যারের ক্যানসার হয়েছিল। কেমোথেরাপি নিতে হয়েছিল। এ জন্য তাঁর মাথার এই অবস্থা। এক সপ্তাহ আগে যখন তিনি আবার স্কুলে আসেন, আমি চমকে গিয়ে বলেছিলাম, আপনি আবার ক্লাস নেবেন!’

হেডস্যার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, ‘জহির স্যার তখন আমাকে অনুরোধ করেছিলেন আমি যাতে তাঁকে আবার নিয়োগ দিই। বলেছিলেন জীবনে তো একটা কাজই করতে পারি—গাধা পিটিয়ে মানুষ করতে। গাধাগুলাকে মানুষ না করলে আমি শান্তি পাই না...।’ হেডস্যারের চোখ ছলছল করে উঠল। ‘আর এই মানুষটার সঙ্গে তোমরা...’

পেছনে বসে থাকা এই মানুষ না হওয়া গাধারা মাথা নিচু করে বসে থাকলাম।

লেখক : শিক্ষার্থী, গভ. ল্যাবরেটরি হাইস্কুল, ঢাকা

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0