default-image

সজল আর যা–ই হোক না কেন, আমার বন্ধু হতে পারে না।

সেদিনের কথাই ধরো। স্যারের হোমওয়ার্ক করতে ভুলে গিয়েছি। হোমওয়ার্ক তুলতে এল ক্লাস ক্যাপ্টেন পল্টু। দুটো শিঙাড়ার কথা দিয়ে কোনোমতে রাজি করালাম ওকে। তখনো জানতাম না, ওসব দেখে ফেলেছে সজল।

স্যার যখন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী রে পল্টু, সবাই দিয়েছে তো?’

পল্টু একবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জি, স্যার।’

তখনই পেছন থেকে সজল বলে উঠল, ‘স্যার, আমার মনে হয় মাথাগুলো গুনে দেখা উচিত! বলা তো যায় না...’

স্যার বললেন, ‘হ্যাঁ! ঠিক বলেছিস। গুনে দেখা দরকার। তোদের মতো মিচকে শয়তানের ওপর কোনো বিশ্বাস নেই। দে তো পল্টু খাতাগুলো।’

শুনে ঘেমে উঠল পল্টু। সঙ্গে আমিও। খাতা গোনা শেষে স্যার হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘পল্টু! ছাত্র ৪২ জন, খাতা ৪১টা কেন? তুই না বললি সবাই দিয়েছে?’

‘ইয়ে স্যার, না...মানে...’

পল্টুর মুখটা হঠাৎ ১০০ ওয়াট বাল্বের মতো জ্বলে উঠল। বলল, ‘স্যার, আমার মনে হয় নিজের খাতাটাই দিতে ভুলে গিয়েছি। নিয়ে আসব স্যার?’

‘না থাক এখন, পরে সব এক করে দিয়ে আসিস আমার টেবিলে। এখন বোর্ডটা মুছে ফেল।’

পল্টু হাসি হাসি মুখে বলল, ‘জি স্যার।’

তোমরাই বলো, সেদিন পল্টুর মাথা থেকে বুদ্ধিটা না বের হলে কী হতো?

টিফিন টাইমে মাঠে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খাচ্ছি, এমন সময় কোথা থেকে সজল এসে আমাকে দিল এক ধাক্কা। আমি না পড়লেও ঝালমুড়ি কিন্তু ঠিকই পড়ল।

রেগে গিয়ে বললাম, ‘এটা কী হলো?’

সে উল্টো তেলে–বেগুনে জ্বলে গিয়ে বলল, ‘মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খেলে যা হয়, তা–ই হলো।’

‘তাই বলে এভাবে ধাক্কা দিবি?’

‘ইচ্ছা করে তো দিইনি। তা ছাড়া তুই আমার কে রে, তোকে ধাক্কা দেওয়া যাবে না?’

‘আমি তোর কেউ না?’

প্রশ্ন করে বোকা হয়ে গেলাম। নিজেই তো স্বীকার করেছি সে আমার বন্ধু না।

টিফিনের পর থেকেই মেজাজটা খারাপ। মনে হচ্ছে সজলকে ধরে কাঁচা খেয়ে ফেলি।

বিজ্ঞাপন

কোনোমতে ক্লাস শেষ করে স্কুল থেকে বেরিয়ে আসি। সাধারণত স্কুল ছুটির পর একাই বাসায় যাই, আজও যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি, এক লোক আমাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, ‘আরে নাঈম না!’

ঠিক চিনতে পারলাম না লোকটাকে, কিন্তু এমনভাবে ডাকছে, ডাকে সাড়া না দিয়েও পারলাম না।

‘জি, বলুন।’

আমার ঘাড়ে হাত রেখে হাঁটতে হাঁটতে লোকটা বলল, ‘চিনতে পারলি না?’

‘না...ঠিক তা নয়।’

লোকটা বলল, ‘একটু দাঁড়া।’

একটা রুমাল বের করে নাক ঝাড়তে যাবে লোকটি, এমন সময় হঠাৎ সেটা চেপে ধরল আমার মুখের ওপর। বুঝতে দেরি হলো না, কী হচ্ছে। ছটফট করতে লাগলাম। আশপাশে মানুষের চলাফেরা কম কিন্তু ঘুরে দেখি, সজল দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে। আমার দিকে হাবার মতো তাকিয়ে আছে, অথচ কাউকে ডাকছে না বা চিত্কার করছে না। লোকটা আমাকে ধাক্কা দিয়ে পাশে রাখা সাদা গাড়িটায় তুলে দিল।

জ্ঞান ফিরল যখন, দেখলাম একটা মানুষরূপী হাতি দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। মাথায় টাক (চকচকে), দেখে মনে হয় নেতা গোছের কেউ।

চ্যালা গোছের একজন বলল, ‘বস, বিচ্ছুর জ্ঞান ফিরছে।’

‘তাইলে অর বাপ রে ফোন দে।’

যত দূর মনে হয়, আমার বাবার কাছেই ফোন দিল ওরা।

‘আসসালামুআলাইকুম সাব।’

(ওপাশ থেকে কিছু বলা হলো)

‘আরে এত চিক্কুর পাড়েন ক্যান? বলছে না সব ঠিক আছে?’

(...)

‘দাঁড়ান দিতাছি।’

আমার কানে ফোনটা রাখল লোকটা—

‘হ্যালো...বাবা....বাবা...’

সঙ্গে সঙ্গে টান দিয়ে সরিয়ে ফেলল ফোন। বাবার কান্নার আওয়াজ শুনলাম শুধু।

‘ঠিকঠাক ৫০ লাখ, বুঝছেন তো? আমার লোকটা রে কইয়েন ঠিকমতো গুইন্না নিতে।’

কথা শেষ করে আমার দিকে ঝুঁকে লোকটা বলল, ‘খুব বড়লোকের পোলা, তাই না?’

চুপ করে রইলাম। কথাটা সত্যি। আজ কেন জানি মনে হচ্ছে বড়লোক হওয়াটা অপরাধ।

কিছুক্ষণ পর বেশ কয়েকটা টাকাভর্তি সুটকেস নিয়ে এল একটা লোক।

‘কিরে গুইন্না আনছিস তো?’

‘গুনবার জানলে তো গুনমু...!’

সবাই হেসে উঠল। নেতা গোছের লোকটা বলল, ‘এক কাম কর, আরও ২ কোটি চাই। এক কতা কওনেই ৫০ লাখ দিল, একটু ভয় দেখাইলেই তো ২ কোটি টাকা দিবই, তাই না?’

‘হ বস, কিন্তু বিচ্ছুটাই তো ঝামেলা...যদি পরে বইলা দেয়...’

‘অরে নাহয় বস্তায় ভইরা পানিতে ফালায় দিমু।—কিরে মিলছে না?’

‘ঠাসা হইছে বস। তাইলে ফোন লাগাই?’

‘এহন না। বাইরে যামু। তোরাও চল। কাল্লু থাকুক এইহানে।’

একটা চামচা বলল, ‘নিশ্চিন্ত থাকেন বস। কোনো ঝামেলা হইব না, হইলে সোজা গুল্লি।’

বিজ্ঞাপন

আমি আর কাল্লু নামক মানুষটা অন্ধকার ঘরে বসে আছি। বসে বসে মশা মারছে সে। হাত বাঁধা থাকায় আমি তা–ও পারছি না। তবে বেশ আজগুবি জিনিস ভাবছি। ভাবছি, হয়তো বাংলা সিনেমার মতন কেউ একজন এখন গাড়ি নিয়ে গ্লাস ভেঙে ঢুকে আমাকে উদ্ধার করবে।

গাড়ি নিয়ে গ্লাস ভেঙে না ঢুকলেও দরজা ভেঙে ঢুকল একজন মুখোশধারী। দেখেই বুঝলাম, ঠিক আমার বড় ভাই। তার আবার বেজায় সাহস।

‘এই এরে ছেড়ে দে।’

কাল্লু বলল, ‘আর যদি না দেই?’

বড় ভাইয়া কোনো কথা না বলে আমার দড়ি কেটে দিল। উঠে দাঁড়ালাম।

কাল্লুটা চুপচাপ দেখল। মানে কী?

আমরা চলে যাচ্ছি, এমন সময় সে বলল, ‘এই যে সাহেবেরা, দাঁড়ান!’

পেছন ফিরে দেখি, হাতে বন্দুক নিয়ে দুই পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে কাল্লু।

বড় ভাইয়া একবার আমার দিকে, একবার কাল্লুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পালা!’

পেছন থেকে গুলি করল কাল্লু। লাগল ভাইয়ার বাঁ পায়ে।

ভাইয়া বলল, ‘তুই পালা, আমি আসছি।’

‘যা! যা! দেখ নাঈম চলে এসেছে!’

বাড়িতে ঢুকেই মাথা খারাপ অবস্থা। দেখি ভাইয়া দিব্যি ঠিক আছে। মা-বাবা নিচে নেমে এসে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে।

ভাইয়া যদি এখানে থাকে, তাহলে আমাকে কে বাঁচাল?

পরদিন স্কুলে গিয়ে শুনি কী একটা অসুখে যেন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সজল। স্কুলে আর আসবে না। উচিত শিক্ষা হয়েছে বদমাশটার!

*

‘নেক্সট!’

ফজলুল সাহেবের ডাকে ভেতরে ঢুকল পরেরজন। একটা ইন্টারভিউ নিচ্ছি। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঢুকল লোকটা। পায়ে কোনো সমস্যা মনে হয়।

‘আসসালামুআলাইকুম স্যার!’

‘জি, বসেন। পায়ে কোনো সমস্যা?’

লোকটা পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তেমন কিছু না স্যার, একটা গুলি লাগছিল আরকি।’

লোকটার কথা শুনে মেজাজ ঠিক রাখা গেল না। রেগে গিয়ে বললাম, ‘আপনি হয়তো জানেন না, কোনো অপরাধীকে আমরা চাকরি দিই না।’

‘না, স্যার ব্যাপারটা সে রকম কিছু নয়।’

‘তাহলে কী রকম?’

‘আসলে হইছে কী স্যার, ছোটবেলায় যখন স্কুল-কলেজে পড়ি, তখন এক বন্ধু কিডন্যাপ হইছিল। বুকে তখন টগবগে সাহস। আগ বাড়াইয়া বাঁচাতে গিয়ে খাইলাম গুলি—হা...হা...’

পাগল নাকি লোকটা? মনে মনে বললাম।

‘সরি! আপনি এখন যেতে...’

শেষ করলাম না কথাটা। আরে! লোকটাকে কোথাও দেখেছি বলে মনে হচ্ছে। দাড়ি-গোঁফ সরিয়ে তার মুখটা কল্পনা করার চেষ্টা করছি।

না! এ কীভাবে সম্ভব! সান্ত্বনা দিলাম মনকে।

‘ভাই, আপনার নামটা কী?’

‘সজল, সজল চৌধুরী।’

‘আর আমি নাঈম। তোর কেউ না।’

অতঃপর ২৩ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি তারা বুঝে উঠতে পারল। বিস্ময়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল ওরা কিছুক্ষণ!

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন