রোজ রাত তিনটায় কারেন্ট যেত বাড়িটায়। তিনটা মানে, ঠিক তিনটা। এক মিনিট আগেও না, পরেও না। ভাদ্র মাসের গরমে রাত তিনটায় ফ্যান ছাড়া ঘুমানো একেবারেই অসম্ভব। একে তো ভ্যাপসা গরম, তার ওপর মশার যন্ত্রণা। ফলে কারেন্ট যাওয়ার একটু পরই জেগে উঠতাম ঘুম থেকে। দু-এক দিনের ভেতর এই ঘটনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় ঘুমানোর আগে হাতের কাছে হারিকেন রেখে যেতাম বিছানায়। তিনটা বাজলেই টুক করে হারিকেন হাতে উঠে পড়তাম ছাদে। আলো নিভিয়ে আশপাশে তাকাতাম, আকাশে চাঁদ উঠলেই রীতিমতো দিগন্ত পর্যন্ত নরম আলোয় ছেয়ে যেত। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতাম চারদিক। ভীষণ রহস্যময় মনে হতো জগৎটাকে।
সেদিন রাত তিনটায় কারেন্ট যেতেই উঠে বসে হারিকেন হাতড়াতে শুরু করলাম। ঘরজুড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই সঙ্গে অসহ্য গরম। দক্ষিণের জানালাটা কোনো কারণে বন্ধ। ওদিকে তাকালেই তাই দম বন্ধ হয়ে আসছে, একফোঁটা বাতাসও নেই। কোনোমতে হারিকেন খুঁজে পেলেও ম্যাচ আর খুঁজে পেলাম না। অন্ধকারে কিছুক্ষণ খুঁজেই অসহ্য হয়ে গেলাম। হারিকেন না জ্বালিয়েই রওনা দিলাম ছাদের দিকে। রীতিমতো হাতড়ে বের হলাম ঘর থেকে। প্রতিদিন রাতে ছাদে যেতে যেতে সিঁড়ির পথ আমার প্রায় মুখস্থ।
কোনো এক অদ্ভুত খেয়ালে দাদাজি জনশূন্য এই প্রান্তরে মস্ত বড় এক বাড়ি বানিয়ে ফেললেন। কয়েক বিঘা জমিজুড়ে জীবনের সব সঞ্চয়ের ফসল। কিন্তু বাড়ি বানানো শেষ হতেই নিয়ম করে দিলেন, তিনি মারা যাওয়ার আগপর্যন্ত পরিবারের কেউ এই বাড়ির আশপাশে পা দেবে না। সুতরাং বাড়িটাকে চোখের দেখাও দেখল না কেউ। আজ এই অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে টের পাচ্ছি, কতটা শৌখিন মানুষ ছিলেন দাদাজি। নিজের সব শখ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এই বাড়ির মধ্যে। বড্ড ভালোবাসতেন এখানকার সবকিছুকে, প্রতিটা ইটকেও যেন আদর করতেন সন্তানের মতো। তাই সপ্তাহে দু–একবার কিছু সময়ের জন্য একলা এসে ঘুরে বেড়াতেন এ জায়গায়। অন্য কাউকে ধারেও ঘেঁষতে দিতেন না। এখন অবশ্য দাদাজি নেই। আমি অবাধে চলাফেরা করি বাড়িজুড়ে।
হাঁচড়ে–পাঁচড়ে ছাদে পৌঁছাতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল! জ্যোৎস্নায় যেন ঝলসে গেছে সবকিছু। এমন জ্যোৎস্না এই বাড়িতে আগে কোনো দিন দেখিনি। মনে হচ্ছে নরম সাদা আলোতে ডুবে আছি। অপরূপ এই দৃশ্য দেখেই রাত কাটিয়ে দেওয়া যায়। ছাদের এক কোনায় পেতে রাখা মাদুরের দিকে চলে গেলাম। নিয়মিত আসি বলে মাদুর বিছিয়ে রাখি ছাদের কোণে। ওখানেই ঘুমিয়ে পড়ি মাঝেমধ্যে। মাদুরে শুয়ে চারপাশে চোখ দিয়ে গুনগুন করে গান গাইতে শুরু করলাম।
এমন সময় মনে হলো, ছাদের ঠিক অন্যদিকে কিছু একটা গুঙিয়ে উঠল। প্রথমে ভাবলাম, শিয়াল বা কুকুর। নির্জন জায়গা বলে শিয়ালের কোনো অভাব নেই। সারা রাত ধরে একটানা ডেকে চলে। কিন্তু একটু পরই বুঝতে পারলাম, জান্তব এই শব্দটা নিচে কোথাও হচ্ছে না, ছাদ থেকেই আসছে। এমন অবস্থায় অনেকেরই ভয় পাওয়ার কথা। কিন্তু আমি ভয় পেলাম না। ভয় পেলে দুই মাস ধরে এই বাড়িতে থাকতেও পারতাম না। কারণটা ভুতুড়ে কিছু নয়, শুধুই একটা বাজে স্মৃতি। প্রথম দিকে বাড়িটায় সপ্তাহে দু–একবার এলেও কিছুদিনের মধ্যে দাদাজি অন্য রকম আচরণ করতে থাকলেন। এই বাড়ি থেকে ফিরতে চাইতেন না, জোর করে নিয়ে যেতে হতো এখান থেকে। শেষ বয়সে তো একরকম পাগলই হয়ে গেলেন। নানা কথাবার্তা রটতে লাগল তাকে আর এই বাড়িকে ঘিরে। লোকজন এই এলাকার আশপাশেও আসতে চাইত না। একসময় বিষয়টা মেনেও নিয়েছিল সবাই। তবে একদিন হুট করে দাদাজি এই বাড়িতেই মারা গেলেন। বয়স হয়েছিল, শরীরের দিকে নজর দিতেন না। এমন কিছু হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবু এই মৃত্যু নিয়ে ঘরের কেউ কোনো কথা বলত না আমাদের ছোটদের সামনে। কোনো এক কারণে এড়িয়ে যেত। সেসব বিষয় পাত্তা না দিয়েই এই বাড়িতে থাকছি। দাদাজির কথা মাঝেমধ্যে মনে পড়ে, কিন্তু ভয় কখনো পাইনি।
তাই সপ্তাহে এক-দুবার কিছু সময়ের জন্য একলা এসে ঘুরে বেড়াতেন এ জায়গায়। অন্য কাউকে ধারেও ঘেঁষতে দিতেন না। এখন অবশ্য দাদাজি নেই। আমি অবাধে চলাফেরা করি বাড়িজুড়ে
মাদুর ছেড়ে উঠলাম। গোঙানিটা আরও বেড়েছে, মনে হচ্ছে ছটফট করছে কিছু। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। তবে একটু এগোনোর পরই শব্দটা থেমে গেল। তাই আর ঠাওর করতে পারলাম না কোন দিক থেকে শব্দ এসেছে। এদিক–ওদিক একটু হাঁটাহাঁটি করে মাদুরের কাছে চলে এলাম। বসে পড়তেই মনে হলো, কাঁধের ডান দিক থেকে কান বরাবর ঠান্ডা বাতাস চলে গেল। সেই বাতাসে একটা কটু গন্ধ। পাশ ফিরে তাকালাম। তেমন কিছুই চোখে পড়ল না। রাত বাড়ছে, চাঁদ চলে এসেছে মাথার ওপর। সেই সঙ্গে শিরশির করে ঠান্ডা বাতাস। ঘুমে চোখ লেগে এল, ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত অনূভুতি হলো। বোধ হয় আমার দিকে কেউ তাকিয়ে আছে। একেবারে স্পষ্ট টের পাচ্ছি আমি, অথচ দূরদূরান্তেও কেউ নেই। সেই তাকিয়ে থাকাটাও অনুভব করা যায়। মনে হচ্ছে কেউ কড়া নজর রাখছে আমার ওপর। প্রতিটা নড়াচড়া তার নজরে ধরা পড়ছে। আমি মাদুর থেকে উঠে দাঁড়ালাম। ঘুম উড়ে গেছে। তাকাতে লাগলাম আশপাশে। ঠিক তখনই বুঝতে পারলাম, কী তাকিয়ে আছে আমার দিকে। অশরীরী অস্তিত্বে আমার বিশ্বাস নেই। কিন্তু যে ভয় আমাকে আঁকড়ে ধরল, সেটার উৎস আমার জানা নেই। পুরো শরীর ভয়ে কুঁকড়ে গেল। দেহের প্রতিটা অংশ আমাকে যেন বলতে লাগল, পেছনে তাকিয়ো না। তবু ঘাড় ঘোরালাম। আমি জানি কী হবে, কিন্তু থামতে পারলাম না। হঠাৎ কোথা থেকে আসা মেঘ ঢেকে দিল পুরো চাঁদকে। নিকষ অন্ধকারেও দেখতে পেলাম, স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে এক জোড়া চোখ। শুধুই এক জোড়া চোখ।
...
‘চাচ্চু আর বোলো না, ভয় লাগে আমার।’
আরিয়ানের কথা শুনে এহসান সাহেব দুলে দুলে হাসলেন।
‘বোকা ছেলে, ভয়ের কী হলো? এটা তো শুধুই একটা গল্প।’
‘না, আমি ভয় পাই না। কিন্তু এই গল্প বলার দরকার নেই। আমার ভালো লাগে না।’
মুখ গোমড়া করে বলল আরিয়ান।
এবার এহসান সাহেব রীতিমতো অট্টহাসি দিয়ে উঠলেন।
আরিয়ান চেঁচাল, ‘এভাবে হাসবে না চাচ্চু। একদম না, আব্বু এলে আমি বলে দেব।’
‘আচ্ছা, যা যা, বলব না। কিন্তু তোর আব্বু–আম্মু আসবে কখন, কে জানে।’
চাচ্চুর প্রশ্নের জবাব দিল না আরিয়ান। আব্বু–আম্মু ওকে চাচ্চুর কাছে রেখে কোথায় যে কাজে গেল, এখনো ফেরার নাম নেই। ফেরার কথা রাত ১০টায়, কিন্তু এখন বাজে প্রায় ১২টা।
‘কী রে, কী ভাবিস? তোর আব্বু–আম্মু চলে আসবে, চিন্তা করিস না।’ আরিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন এহসান সাহেব। তার ভাইয়ের ছেলেটা বড় মায়াকাড়া চেহারা পেয়েছে। এত মিষ্টি করে হাসে, দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে।
চাচ্চুর কথা শুনে আরিয়ান খাট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
‘আসুক আব্বু–আম্মু, তুমি অন্য একটা ভূতের গল্প বলো।’
এহসান সাহেব বললেন, ‘সাহস আছে তোর? পরে তো পাবি ভয়।’
‘মোটেই না। কেন ভয় পাব? ভয়ের কী?’
আরিয়ানের কথা শুনে তার চাচ্চু বলে উঠলেন, ‘ওরে আমার সাহসী রে, এখনই কারেন্ট চলে গেলে তো লাফ দিয়ে আমার কোলে উঠবি।’
আরিয়ান হেসে বলল, ‘কে বলেছে? আমি কি ভয়…’
এমন সময় অন্ধকার নেমে এল রুমজুড়ে। লোডশেডিং। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরিয়ান চিৎকার করে খাটে উঠে গেল। সেই চিৎকার ছাপিয়ে এহসান সাহেব বললেন, ‘কী বীরপুরুষ? কী হলো এখন?’
আরিয়ান কোনো জবাব দিল না।
অন্ধকারের মধ্যেই খাট ছেড়ে উঠে জানালা খুলে দিলেন এহসান সাহেব। মুহূর্তে ঘর ছেয়ে গেল চাঁদের আলোয়।
‘দেখলি কী সুন্দর জ্যোৎস্না?’
এতক্ষণে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে আরিয়ান উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, সুন্দর। তবে আমি কিন্তু ভয় পাইনি। শুধু একটু চমকে গিয়েছিলাম।’
এহসান সাহেব জানালা থেকে চোখ সরিয়ে ঘরের দিকে তাকালেন। তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘ও কিছু না, তুই মোম নিয়ে আয়।’
এহসান সাহেব বললেন, ‘বেশ, তাহলে উঠে গিয়ে মাঝের ঘর থেকে মোমবাতি নিয়ে আয়।’
খাট থেকে অন্ধকার সেই ঘরে উঁকি দিল আরিয়ান। ঢোঁক গিলে বলল, ‘মোম কেন লাগবে? বেশ তো আলো।’
‘উঁহু, একটু পরই চাঁদ ঢেকে যাবে, আকাশে মেঘ করেছে।’ জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তর দিলেন এহসান সাহেব।
খাট ছেড়ে উঠল আরিয়ান। চোখ চলে গেল ঘরের কোণে। চাঁদের আলোয় একটু পরপরই কিছু একটা চিকচিক করছে ওই দিকে।
‘চাচ্চু, ওখানে কী ওটা?’
এহসান সাহেব জানালা থেকে চোখ সরিয়ে ঘরের দিকে তাকালেন। তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘ও কিছু না, তুই মোম নিয়ে আয়।’
আরিয়ান কোনোমতে হাঁটা দিল মাঝের ঘরের দিকে। ভয়ে রীতিমতো হাঁটু কাঁপছে তার।
ঘর ছেড়ে আরিয়ান যেতেই এহসান সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালায় তাকালেন। ধীরে ধীরে ঠান্ডা বাতাস আসছে। বড় একটা মেঘ ঢেকে দিচ্ছে চাঁদকে, বোঝা যাচ্ছে সময় হয়ে গেছে। নিজের পেছনে সেই অস্তিত্বকে অনুভব করলেন এহসান, যে অস্তিত্ব দুই বছর ধরে তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন—দাদাজি যার কাছে হার মেনে পৃথিবী ছেড়েছিলেন। তিনি জানেন, ঘাড় ঘোরালেই দেখতে পাবেন ঘন কালো এক জোড়া চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখের ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছে তার তৃষ্ণা, যা মেটাতে হবে তাকে। তাই এহসান সাহেব ঘাড় ঘোরালেন না। ক্লান্ত চোখে দেখতে লাগলেন তীক্ষ্ণ ধারের কারণে চাঁদের আলোয় চিকচিক করতে থাকা ছুরিটাকে। একটু পরই জানালা ছেড়ে সেদিকে এগোতে লাগলেন তিনি। বিড়বিড় করে বলতে থাকলেন, ‘এই ছোট্ট বাচ্চাটার কী দোষ? কী দোষ ওর?’
কোনো জবাব এল না আশপাশ থেকে, চাঁদের আলোর সঙ্গে শব্দও যেন হারিয়ে গেছে পৃথিবীতে।
‘চাচ্চু, অনেক অন্ধকার। ভয় পাচ্ছি, প্লিজ একটু আসো জলদি।’ এই অন্ধকারে নিজের একমাত্র আশ্রয় চাচ্চুকে মাঝের ঘর থেকে ডাক দিল আরিয়ান।
এহসান সাহেব সেই ডাক শুনে বিচলিত হলেন না, ছুরিটা হাতে তুলে নিতে নিতে জবাব দিলেন, ‘এই যে চাচ্চু, আসছি বাবা। কোনো ভয় নেই।’