default-image

লেকচার টেবিলের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে টুশি। লিটু স্যারের দিকে চোখ তুলে তাকানোর ইচ্ছা আপাতত নেই তার। তাকালেই স্যারের পান খাওয়া লাল দাঁতগুলো দেখতে হবে। এর চেয়ে মেঝের মোজাইক অনেক বেশি দৃষ্টিনন্দন। তবে টুশি না তাকালে কী হবে, চশমার ফাঁক দিয়ে রাগী দৃষ্টিতে ঠিকই ওর দিকে তাকিয়ে আছেন লিটু স্যার। ফ্যাসফ্যাসে গলায় স্যার বললেন, ‘তুই সায়েন্স ফেয়ারে প্রজেক্ট জমা দিতে চাস?’ টুশি মাথা নাড়ল। সে আসলেই প্রজেক্ট জমা দিতে চায়। স্যার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আচ্ছা। টিফিনের সময় আমার সঙ্গে দেখা করিস।’

টুশি নিজের সিটে এসে বসল। স্যার এত সহজে রাজি হয়ে যাবেন, এটা সে কল্পনাও করেনি। সাধারণত স্যার, ‘আপনার সকালের ব্যাচে প্রাইভেট পড়তে চাই’ টাইপের প্রস্তাব ছাড়া আর কোনো প্রস্তাবে স্যারকে রাজি হতে দেখেনি টুশি। এরই মধ্যে লিটু স্যারের ঐতিহাসিক বিরক্তিকর ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। একটা অধ্যায় টানা রিডিং পড়েই স্যার হুংকার দিয়ে বলবেন, ‘পাঁচ মিনিটের মধ্যে এ অধ্যায়টা শিখে দিবি আমাকে। দাঁড়ি-কমাসহ মুখস্থ চাই।’ সবাই যখন মাথা দুলিয়ে দাঁড়ি-কমাসহ মুখস্থ করবে, তখন মানবকল্যাণে আইনস্টাইন, তথা বিজ্ঞানের যে কী বিশাল অবদান, তা-ই বর্ণনা করবেন স্যার। টুশিরও মানবকল্যাণে ভূমিকা রাখার খুব ইচ্ছা। মানুষের উপকারে আসে, এমন অনেক কিছুর ভাবনা তার মাথায় দিনরাত ঘুরপাক খায়। এ জন্যই সায়েন্স ফেয়ারে প্রজেক্ট জমা দিচ্ছে সে।

ক্লাস শেষে লিটু স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এল টুশি। নিজের রুমে ভুঁড়ির ওপর হাত রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন স্যার। টুশির ডাকে চমকে উঠলেন। ‘কী চাস তুই?’ মৃদু ধমক দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন স্যার। টুশি ভয়ে ভয়ে বলল, ‘সায়েন্স ফেয়ারের প্রজেক্ট স্যার...আপনি আসতে বলেছিলেন।’ স্যার সঙ্গে সঙ্গে পাশের আলমারিতে রাখা কী সব কাগজ ঘাঁটাঘাঁটি করলেন। তারপর একটা সাদা কাগজে বড় করে ‘২’ লিখে বললেন, ‘এটা কিসের নম্বর?’ কোনো কিছু চিন্তা না করেই যা মাথায় এল বলে ফেলল টুশি, ‘এটা...স্যার মাশরাফির জার্সি নম্বর।’ স্যার কড়া গলায় বললেন, ‘মশকরা করিস আমার সঙ্গে? এটা তোর ফিজিকস ক্লাস টেস্টের নম্বর। ২ পেয়েছিস। অনলি টু। টি ডব্লিউ ও। আর তুই সায়েন্স ফেয়ারে প্রজেক্ট দিতে চাস? পড়ালেখার খবর নেই, প্রজেক্ট বানাবে! যা ভাগ!’

‘স্যার...মানে...’ তাত্ক্ষণিকভাবে কথা খুঁজে পেল না টুশি। একটু সামলে নিয়ে আবার বলল, ‘স্যার...আমার প্রজেক্টটা...কী বলব...মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে স্যার। আপনি একবার যদি দেখেন...খুবই সাধারণ একটা আইডিয়া...’

‘তোর মতো সাধারণ মানের ছাত্রী তো সাধারণ আইডিয়াই ভাববে।’ স্যার পাত্তাই দিলেন না।

‘প্লিজ স্যার!’

‘বল দেখি কী আইডিয়া। শুনি।’

‘স্যার, স্কুলের আশপাশের গলিগুলোতে বেশ কিছু ম্যানহোল আছে। অধিকাংশ সময় এগুলোর ঢাকনা থাকে না। চুরি হয়ে যায় আরকি! বৃষ্টি হলে ম্যানহোল উপচে পানিটানি উঠে বাজে অবস্থা হয়। তা ছাড়া অসতর্ক হলে যে-কেউ ম্যানহোলে পড়ে যেতে পারে...’

‘তোর প্রজেক্টটা কী?’

‘স্যার, প্রজেক্টটা হলো একটা সিকিউরিটি অ্যালার্ম সিস্টেম। এমন একটা পদ্ধতি, ম্যানহোলের ঢাকনা খুলতে গেলেই নিকটস্থ দারোয়ানের ঘরে অ্যালার্ম বাজবে। এতে আর ঢাকনা চুরি হবে না। কেউ ম্যানহোলেও পড়বে না। বর্ষাকালে কোমলমতি শিশুরা নিরাপদে স্কুলে আসতে পারবে। সিম্পল! এখন স্যার, আপনি যদি একটু সাহায্য করেন...’

‘গেট আউট!’

‘জি স্যার?’

‘বেরিয়ে যা! মশকরা করিস আমার সঙ্গে? আমি কি তোর ফেসবুক ফ্রেন্ড? বেয়াদব মেয়ে! সায়েন্স ফেয়ার তোর মতো অমনযোগী ফাজিল মেয়েদের জন্য না। কত সিরিয়াস সমস্যা আছে, সেগুলো বাদ দিয়ে আলতু-ফালতু জিনিস নিয়ে ভাবা হচ্ছে? সবাই এখন ড্রোন নিয়ে ভাবছে, আর তুই ভাবছিস ড্রেন, ম্যানহোল—এই সব নিয়ে? সায়েন্স কি হেলাফেলার বিষয়? কত নামীদামি লোকজন আসবে ফেয়ারে। সেখানে ম্যানহোলের ঢাকনা বাঁচাও প্রজেক্ট! ছিঃ!...তোর গার্ডিয়ানের ফোন নাম্বার লিখে যা! বেয়াদবকে কীভাবে স্ট্রেট ফরোয়ার্ড করতে হয়, তা আমি জানি। ২০ বছরের ক্যারিয়ারে আমি শতাধিক বেয়াদবকে স্ট্রেট করেছি। যা, ক্লাসে গিয়ে বস।’

টুশির মনটাই খারাপ হয়ে গেল। অনেক আগে থেকেই তার ধারণা ছিল লেখাপড়া কোনো কাজে আসে না। আজ সে ধারণা আরও পাকাপোক্ত হলো। দিনের পর দিন ‘মানবকল্যাণে বিজ্ঞান’ রচনা পড়েছে সে। অথচ তার মানবকল্যাণী প্রজেক্টটাকে কেউ পাত্তাই দিল না। এ দেশে আলু, পটোল, বাঁধাকপির দাম থাকলেও প্রতিভার যে কোনো দাম নেই, এ ব্যাপারে আরও একবার নিশ্চিত হলো সে।

দুই দিনের ছুটিতে লিটু স্যারের হুমকির কথা ভুলেই গিয়েছিল টুশি। মা এসে যখন বলল, ‘টুশি, তোমাদের লিটু স্যার ফোন করেছিলেন।’ তখন বেশ ভয় পেয়ে গেল সে। নাশতা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বলেছেন স্যার?’ মা হাসিমুখে বলল, ‘তুমি নাকি কী এক সিরিয়াস প্রজেক্ট জমা দিচ্ছ সায়েন্স ফেয়ারে? ওটা নিয়েই কথা বললেন। তোমাকে কাজ শুরু করে দিতে বলেছেন। উনি কয়েক দিনের ছুটি নিয়েছেন। ছুটি শেষে তোমার প্রজেক্ট দেখে দেবেন।’

মায়ের কথা শুনে তাজ্জব হয়ে গেল টুশি। স্যার হঠাত্ কী মনে করে রাজি হলেন, তা ভেবেই পেল না সে। আবার ছুটিও নিলেন...আজব ব্যাপার তো! এষাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। মনে মনে ভাবল সে। এষা স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে, সে নিশ্চয়ই জানবে ব্যাপারটা।

এষাকে ফোন দিতেই সে টেপ রেকর্ডারের মতো একটানা কথা বলা শুরু করল। ‘জানিস, নতুন যে সিরিয়ালটা দেখছি, এত কিউট, এত কিউট, কী বলব...।’ তাকে থামিয়ে টুশি জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, লিটু স্যারের কী হয়েছে জানিস নাকি? ছুটি নিয়েছেন শুনলাম...’

‘ওমা তুই জানিস না? হায় হায়! সবাই তো জানে। তুই এত ঢিলা কেন রে? শোন, স্যার না স্কুলের সামনের ম্যানহোলে পড়ে পা মচকে ফেলেছেন। হি হি হি। কী যে অবস্থা। জনসমক্ষে হঠাত্ স্যার ব্ল্যাকহোলে চলে যাচ্ছেন—ভাবতেই হাসি পায়।’

এষার কথায় টুশির আর মনোযোগ নেই। তার সাধারণ প্রজেক্টটা হঠাত্ কী কারণে ‘সিরিয়াস’ প্রজেক্টে পরিণত হয়েছে, তা ও খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে।

অলংকরণ: জুনায়েদ

বিজ্ঞাপন
গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন