গল্প

বনগৌরী

বিজ্ঞাপন
default-image

আপনি ভূত বিশ্বাস করেন?
প্রশ্নটা শুনে কৌতূহলী হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম, প্রৌঢ় গড়নের, কিন্তু বেশ শক্তপোক্ত। মাথায় বেরেট্টা ধরনের একটা ক্যাপ, চোখে গোল চশমা। চোখ দুটো কিন্তু ঝকঝকে কিশোরসুলভ। এ রকম আচমকা অচেনা কাউকে প্রায় মধ্যরাতে বলা নেই, কওয়া নেই পুরোনো দুর্বল বাংলা ভূতের গল্পের শুরুর মতো প্রশ্ন করে বসা মানুষটা কেমন হবে, তা ভেবে বের করতে পারলাম না। সাধারণত এই ধরনের ভূতের গল্পের শেষে দেখা যায়, যে জিজ্ঞেস করেছে সে–ই শেষে ভূত বলে প্রমাণিত হয়। বাতাসে মিলিয়ে যায় বা হা হা হা হা ধরনের একটা ভৌতিক হাসি দিয়ে এগিয়ে আসে। কিন্তু এখানে এই আলোকিত যাত্রীবোঝাই লঞ্চে সেটা কীভাবে হবে বুঝতে পারছি না। যা–ই হোক, উটকো ঝামেলা এড়াতে ছোট করে জবাব দেব ভেবেও পরে আবার বললাম—
—নির্ভর করে আপনি ভূত বলতে কী বোঝেন, তার ওপর। শুনে মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক।
—ভেরি ক্লেভার আনসার।
আলোচনা আর এগোবে কি না, বুঝতে পারছি না। ভদ্রলোকের দিকে ভালো করে লক্ষ করলাম, তাঁর হাতে একটা বনেদি ঘরানার পুরোনো আমলের লাঠি। লাঠির মাথায় অদ্ভুত করে খোদাই করা একটা কালো চিতার মাথা। লোকটা সম্পর্কে আগ্রহ জন্মাল। এই মাঝরাতে, যেখানে আমাদের সুন্দরবনগামী পিকনিক লঞ্চটি একটা ডুবোচরে আটকা পড়ে আছে—সুন্দরবনের থেকে কিলোখানেক দূরে—সেখানে অচেনা একটা লোকের সঙ্গে আড্ডা দেওয়াই যায়। আলাপ টানার জন্য তাই বললাম—
আপনি?
কী?
ভূত বিশ্বাস করেন কি না?
করি। একটু থেমে আবার বললেন, আমি ভূত বলতে যা বুঝি আরকি, সেটা বিশ্বাস করি।
আপনি কী বিশ্বাস করেন?
সেটা বলছি, তার আগে একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন কি না, আজকে বাইরের আবহাওয়াটা একটু অদ্ভুত?
আমি বাইরে তাকালাম, আসলেই একটু কেমন যেন অদ্ভুত ধরনের আলো এই রাতের বেলা, চারদিক সুনসান, কালচে নীল ধরনের একটা আলোর মধ্যে দূরে হালকা এক পোঁচ বেশি গাঢ় আরেকটা রেখা দেখা যাচ্ছে—সুন্দরবনের তটরেখা, আমাদের বিরাট সাইজের লঞ্চটা যেখানে আটকা, সেটা একটা হঠাৎ জেগে ওঠা চর। জোয়ারের সময় সেটা যখন প্রায় জেগে উঠছিল, তখন আমাদের লঞ্চ সেটার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় আটকে গেছে। আমাদের লঞ্চটা মূলত বরিশালের দিকে যাতায়াত করে। খরচ কমাতে আমাদের পিকনিকের আয়োজকেরা সদরঘাট থেকে এটি চুক্তিতে নিয়ে এসেছে। সারেং আগে দাবি করেছিল, সে বাংলাদেশের সবই চেনে। এখন বোঝা যাচ্ছে, সুন্দরবনের খাল তস্য, খালে ভরা অদ্ভুত জটিল এই জায়গার কিছুই সে আসলে চেনে না। আর আমার ধারণা, চরটা কোনো ম্যাপেও নেই। সম্প্রতি পড়েছিলাম, বাংলাদেশের দক্ষিণে নাকি আরও পলি পড়ছে, জেগে উঠছে নতুন নতুন চর।
না তেমন অদ্ভুত লাগছে না, ভদ্রলোকের দিকে ঘুরে বললাম। খালি আলোটা একটু অন্য রকম।
এগজ্যাক্টলি—চাঁদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, আজকে ব্লু মুন।
চাঁদের দিকে তাকালাম। সেটা স্বাভাবিকের চাইতে একটু বড় মনে হলো। কিন্তু ব্লু নয়।
জানি কী ভাবছেন, না ব্লু মুন মানে চাঁদ নীল হয়ে যাবে তা না, ব্লু মুন—বাই দ্য ওয়ে আমি সাদী, সাদী হক।
ভদ্রলোক সম্ভবত ইউরোপ বা আমেরিকায় ছিলেন বেশ কিছুদিন—বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করে এভাবে পরিচয় আমরা দিই না, আমরা আগেই পরিচিত হয়ে নিই।
আমি জুবেরী, আব্দুল্লা জুবেরী। ‘সকালের কণ্ঠ’–এর ফিচার সম্পাদক। এই ইভেন্ট কাভার করতে এসেছি।
জানি। ছোট্ট করে জবাব দিলেন সাদী হক।
কীভাবে জানেন জিজ্ঞেস করার আগেই পেছন থেকে ডাক শোনা গেল—
আরে, জুবেরী ভাই আপনি এখানে? আমাদের মূল আয়োজক সব কাজের কাজি মুনির ভাই চলে এসেছেন। চলেন চলেন ছাদে চলেন, সবাই মিলে গান গাওয়ার একটা প্ল্যান হয়েছে, রাতটা কাটাতে হবে তো। সাদী ভাই আপনিও আসুন।
না আপনারা যান, তবে এই নিস্তব্ধ পরিবেশে জঙ্গলের কাছাকাছি গান না গাওয়াই ভালো। পশুপাখিদের আবাসে এসেছি, ওদের বিরক্ত না করি।
ঠিক ঠিক, ঠিক বলেছেন, আচ্ছা আমি ক্যানসেল করে দিচ্ছি, বলেই রওনা দিচ্ছিলেন মুনির ভাই, সাদী হক আবার থামালেন তাকে।
না ক্যানসেল করার দরকার নেই, এই এখানে ইঞ্জিনরুমের পাশে গান চলতে পারে, রক অ্যান্ড রোল না করে রবীন্দ্রসংগীত চলতে পারে।
জি জি ভালো বলেছেন, আমি আসছি।
মুনির ভাই চলে যেতেই সাদী হকের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম,
ইয়ে, আপনি কী করেন বললেন না তো?
আমি? শুনে ঘাবড়ে যাবেন না যেন। আমি ভূত ধরি।
এবার নিশ্চিত হলাম ব্যাটা রগড় করছেন আমাকে পেয়ে।
হা হা হা, না আসলে মজা করে বললাম। আমি প্রাণিবিদ্যায় পড়াশোনা করেছি। বাইরে একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়াতাম। এরপর ইচ্ছে হলো দুনিয়া ঘুরে দেখি। ভ্রমণ করতে করতে অকাল্টবিদ্যায় বেশ একটা আগ্রহ জন্মে গেল। অকাল্ট মানে হলো আধিভৌতিক সব জিনিসপত্র আরকি। আসলে আফ্রিকার কয়েকটা দেশে ঘুরে বেড়ানোর সময় এত দুর্দান্ত সব জিনিস দেখেছি, সেখান থেকেই আগ্রহ। মনে হলো, পৃথিবীর কত কিছুই আমরা মানুষেরা জানি না, কিন্তু মনে করে নিই আমরা সব জেনে বসে আছি। এই সব জানার ফাঁকে ফাঁকে এই ভৌতিক ধরনের কয়েকটা রহস্যের সমাধান করতেই—
এবার আমি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,
আচ্ছা, আপনি কি নিহিলিন ক্লাবের সেই সাদী হক!
হ্যাঁ, ওই আরকি।
ওহ্, সরি আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল।
না না, এটা তো শুনেই চিনে ফেলার মতো কিছু না। যা–ই হোক, তাহলে তো একটা ধারণা পেলেন আমি কী করি। তো আমরা আবার আগের প্রসঙ্গে ফেরত যাই।
এই সময় হঠাৎ পাশে গান শুরু হলো, সবাই মিলে কোরাসে, একদল ঘুরতে আসা বাচ্চাকাচ্চার সঙ্গে কয়েকজন বয়স্ক গোছের শখের ট্যুরিস্ট ধরনের ভদ্রমহিলা। সবাই একসঙ্গেই এই ট্যুরে রওনা দিয়ে এখানে আটকে আছি। বিপদে পড়লে মানুষ যেমন খুব দ্রুত কাছাকাছি চলে আসে, সে রকম এই লঞ্চের সবাই সবার সঙ্গে একটু আপন আপন হয়ে গেছি। মুনির ভাই গানের আড্ডার কোনা থেকে উত্তেজিতভাবে আমাদের দুজনকে হাতের ইশারায় ডাকতে লাগলেন, প্রথম গান শুরু হলো—‘আনন্দলোকে, মঙ্গলালোকে’।
সাদী হককে দেখলাম বিনীতভাবে ক্ষমাপ্রার্থনার মতো হাতজোড় করে সেটা কাটালেন আর আমাকে আস্তে করে বললেন—
চলুন আমরা ছাদে যাই।
এখন আর কোনোভাবেই তাঁকে হাতছাড়া করতে চাইছি না। নিহিলিন ক্লাবের সাদী হককে এতক্ষণ চিনিনি বলে লজ্জা লাগছে। বেশ কিছু ভৌতিক রহস্যের দুর্দান্ত সমাধান করে উনি মোটামুটি বিখ্যাত হয়ে গেছেন। এই তো কদিন আগে পুরান ঢাকায় বানরের মতো কিছু একটা সব বাচ্চাকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল, সেটার একটা সমাধান করায় বিভিন্ন জায়গায় এসেছে ওনার নাম। আমাদের পত্রিকাতেও অপু এর ওপরেই একটা রিপোর্ট ছাপিয়েছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, আমিও এ ধরনের এক্সক্লুসিভ কোনো গল্প আজ পেয়ে যেতে পারি। ছাদে উঠে বসে নিলাম ভালোমতো চাদরটাদর পেঁচিয়ে। নভেম্বরের শেষের দিকে ঢাকায় তেমন শীত না থাকলেও এটা সুন্দরবনের নদী, জেঁকে আসছে হিম।

যা বলছিলাম, আমি ভূত বিশ্বাস করি। শব্দার্থে বললে ভূত মানে যা আগে ছিল এখন নেই। মানে অন্য অর্থে, মারা গেছে এমন আত্মাকে যদি আবার দেখতে পাওয়া যায়, তবেই তাকে বলে ভূত। কিন্তু আমি ভূত বলতে বুঝি অভূতপূর্ব কিছু, মানে উল্টোটা। যা আগে ঘটেনি বা বলতে পারেন, মানুষের অভিজ্ঞতায় নেই। মনে করুন তো, চুম্বক–পাথর যখন আবিষ্কার হলো মানে, মানুষ যখন জানল এ রকম একটা পাথর আছে, যা লোহাকে আকর্ষণ করে, সেটা জানার আগে যদি আপনি, মানে ধরে নিন আপনি মেষ চরান, হাতে একটা লাঠির মাথায় লোহার আঁকশি, সেটা একটা পাথরের গায়ে রেখে দুপুরে মেষগুলো ছেড়ে দিয়ে ঘুম দিলেন। উঠে বসে দেখলেন, সেটা পাথরে লেগে আছে। ছোটাতে গিয়ে দেখলেন, আপনার গলার লোহার চেইনটাও সেই পাথরের দিকে চলে যাচ্ছে আপনাআপনি। আপনি ছুটে গ্রামে এসে বললেন, একটা ভূত এই কাজ করছে। কোনো অশুভ আত্মা। আপনার কথা কিন্তু একই সঙ্গে সত্যি, আবার সত্যি না।
বুঝতে পেরেছি।
মানে, আপনি যা ব্যাখ্যা করতে পারছেন না, সেটাই আপনার কাছে ম্যাজিক বা আরেকটু কম যুক্তিবাদী হলে বলবেন ভুতুড়ে।
রাইট।
আমার অভিজ্ঞতায় আমি এ রকমই বেশি পেয়েছি। যেমন, যে প্রসঙ্গে আজকে আপনাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি ভূত বিশ্বাস করেন কি না, সেটা আসলে একটা ঘটনা মনে পড়ায়—আপনি চাইলে আমি সেটা বলতে পারি।
অবশ্যই অবশ্যই। বলে অজান্তেই আমার হাত চলে যাচ্ছিল আমার ঝোলা ব্যাগে—আমার মোলস্কিনের যে খাতাটায় আমি নোটস নিই সব সময়—খেয়াল হলো সেটা নিচে রেখে এসেছি।
ঘটনাটা বেশ আগের এবং এই সুন্দরবনেরই। আমি তখন মোটামুটি তরুণই বলতে পারেন। সবে ইংল্যান্ড থেকে পড়াশোনা করে ফিরেছি, ডক্টরেট করতে আবার যাব। তখন আমার বাবার লেখা একটা শিকার কাহিনির পাণ্ডুলিপি নিয়ে এক প্রকাশকের কাছে যাই। আমার বাবা পুরান ঢাকার লোক, জমিদারদের মতো তাঁরও সেই আগের আমলের ঢাকার জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে শিকারের নেশা ছিল। টঙ্গীর জঙ্গলে তখনকার দিনে তিনি বাঘও মেরেছিলেন। যা–ই হোক। প্রকাশকের অফিসে তাঁর অপেক্ষায় বসে আছি বাংলাবাজারের একটা দোকানমতো জায়গায়। তখন হঠাৎ প্রকাশক এক ছোটখাটো লোক নিয়ে ঢুকলেন—খুবই সাদাসিধে, কিন্তু গড়নে কোথায় যেন একটা খুব অন্য রকমের ব্যাপার আছে। প্রকাশক পরিচয় করিয়ে দিলেন, উনি করিম গাজী।
বাঘশিকারি?
হ্যাঁ, কিংবদন্তিতুল্য বাঘশিকারি করিম গাজীর সঙ্গে বাংলাবাজারের একটা গলিতে দেখা হয়ে যাবে, এটা আমি ভাবিনি। জানেন নিশ্চয়, তিনি শুধু মানুষখেকো বাঘই মারতেন এবং বন বিভাগ থেকে তাঁকে অ্যাসাইন করা হতো এই কাজে। যা–ই হোক, লোকটা খুব কম কথা বলেন, কিন্তু সব কথারই যেন একাধিক মানে হয়। বাংলাবাজারে তিনি এসেছেন কারণ, একটা প্রকাশনী থেকে তাঁর ওপরে একটা বই বের করবে, সেই কাজে। বইয়ের কাজ প্রায় শেষ। এখানে এই প্রকাশক তাঁকে নিয়ে এসেছেন আরেকটা কাজে। চা খেতে খেতে কথায় কথায় ভদ্রলোক জানালেন, অচিরেই তাঁর সুন্দরবনে আরেকটা বড় অপারেশনে যাওয়ার কথা আছে। আমিও ছুটিতে আছি। জিজ্ঞেস করলাম, আমি প্রাণিবিদ্যায় পড়াশোনা করেছি, আমি কি ঘুরতে হলেও তাঁর সঙ্গে যেতে পারি কি না? রাজি হলেন না। বললেন, সেটা আমার নিজের মতো করে আমি যেতে পারি, কিন্তু কোনো অপারেশনে যাওয়া যাবে না। তখনই আবার আমার বাবার পাণ্ডুলিপি নিয়ে সেই প্রকাশকের সঙ্গে কথা উঠলে এবার তিনি একটু আগ্রহী হন আমার পূর্বপুরুষদের নিয়ে। কিন্তু পরেই যখন শুনলেন, আমি নিজে কঙ্গো ফরেস্টে একটা শিকারি টিমের সঙ্গে ছিলাম ও বেশ কিছু বাইসন ও চিতা শিকার করেছি, আর যখন শুনলেন আমার কয়েক পুরুষই শিকারি, তখন আবার একটু নরম হলেন। বললেন, একসঙ্গে যাওয়া যেতে পারে, তবে শিকারে হয়তো নেওয়া হবে না, আমি তাতেই রাজি। যেতে যেতে অন্তত তাঁর কিছু গল্প তো শোনা যাবে।
দাঁড়ান, আমি একটু চায়ের কথা বলি, আপনি মনে হচ্ছে একটু বোর হচ্ছেন।
আরে না না, কী যে বলেন। চা পরে খাব, আপনি বলুন।
তো আমার আগ্রহের কারণে আর আমার বাবার শিকারকাহিনির কিছু অংশ শুনে তিনি রাজি হলেন। আমার বাসাতেও নিয়ে গেলাম তাঁকে। সেখানে আমাদের ব্যক্তিগত একটা কালেকশন মিউজিয়াম আছে জানেন বোধ হয়? সেটা দেখে তিনি খুবই চমত্কৃত হলেন। আমার নিজের শিকারের ছবিও দেখালাম। দেখেটেখে বললেন, যেতে হলে পরদিনই আমাদের রওনা দিতে হবে এবং আমি যেন সঙ্গে করে শিকারে যা যা লাগে তার সবই নিই। তার মানে কি সুন্দরবনের তাঁর সঙ্গে শিকারে যাওয়া হবে? কী জানি!
সাদী হকের কথার এই পর্যায়ে হঠাৎ দূরে কিছু একটা ডেকে উঠল। অজান্তেই আমি কিছুটা শিউরে উঠেই আবার ধাতস্থ হলাম। লক্ষ করে সাদী হক বললেন, হা হা, ভয় লাগলে লজ্জা পাবেন না। করিম সাহেব বলতেন, জঙ্গলে এসে বাঘের সামনে পড়ে বা তার রাজ্যে এসে যে তাদের ভয় পায় না, তারা হয় মিথ্যাবাদী, নয় পাগল। আর আমরা তো এই মুহূর্তে বাঘের বাড়ির উঠোনে আটকা পড়ে আছি। যা–ই হোক, তো আমরা সেই শরণখোলার কানাইনগর বলে একটা জায়গার কাছে ‘দায়লা’ নামের গ্রামে চলে এলাম। প্রায় এক দিনের পথ পেরিয়ে দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যা হয় হয়, এমন সময় সেখানে পৌঁছালাম। গ্রাম বলতে নামেই গ্রাম, আসলে কয়েকটা বিচ্ছিন্ন কুঁড়ে, গোলপাতা দিয়ে ছাওয়া। এদের সাহস দেখে অবাক হয়ে গেলাম। পৃথিবীর অন্যতম ভয়ানক জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গলের আবাসের কাছে এরা এভাবে কয়েকটা গোলপাতার ছাউনি দিয়ে বাসা করে আছে শুধু মধু সংগ্রহ করবে বলে। বাঘ যে সবাইকে নিয়ে যায়নি, সেটাই আশ্চর্য। গ্রামের মুরুব্বি গোছের এক মৌয়াল—নাম ভুলে গেছি এখন—সে দেখাল যেই কুঁড়েটা থেকে বাঘ দুজনকে নিয়ে গেছে সেটা। করিম সাহেব তাঁর দক্ষ চোখে পাগমার্ক, মানে বাঘের পায়ের ছাপ—
জি, জানি আমি।
ও সরি, হ্যাঁ, পাগমার্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন। সমস্যা হচ্ছে, বাঘটা এসেছিল শুকনোর সময়, কিন্তু এরপর একবার বৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ভদ্রলোকের দক্ষতা দেখে অবাক হয়ে গেলাম। ঠিকই তিনি কিছু নমুনা বের করে ফেললেন। বললেন, একটাই বাঘ সম্ভবত আর সেটা আকারে অনেক বড়। ছাপ দেখে মনে হচ্ছে, মাদি আর লম্বার প্রায় ১২ ফুট! আমার মনে হলো এত বড় হবে না, বৃষ্টির পানিতে হয়তো মার্ক অমন হয়ে গেছে। কিন্তু করিম সাহেব একটা সূক্ষ্ম ছাপ দেখিয়ে বোঝালেন, অতটা গর্ত হতে হলে বাঘের ওজন কত হতে পারে আর সেটা হতে হলে তার দৈর্ঘ্য ও রকমই দাঁড়ায়। যদি সত্যি তা–ই হয়, তবে তো ভয়ানক ব্যাপার। সত্যি বলতে, আমি বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। আফ্রিকায় হাতির পিঠে বসে বা গাছের ওপরে মাচা করে বিট ফেলে স্নাইপার রাইফেলে প্রাণী শিকার এক জিনিস, কিন্তু এ তো ভয়ানক ব্যাপার। ওদিকে আগে অনেক কিছু বলে নিয়ে এখন করিম সাহেবের সামনে ভয় পাচ্ছি, সেটা দেখানো যাচ্ছে না। যা–ই হোক, কথা হলো পরদিন সকালে আমরা রোদে বের হব। কীভাবে যাওয়া হবে আর গ্রামের কয়জন সঙ্গে যাবে—এই আলোচনা যখন করা শুরু করলাম, ঠিক তখনই ঘটল একটা অদ্ভুত ঘটনা—বলে সাদী হক দম নিলেন। আমি এইবার নড়েচড়ে বসলাম। সাদী হক ফাইনালি ভূতের কথা শুরু করেছেন। গল্পটা বেশ জমে উঠেছে, নিচে চলছে রবীন্দ্রসংগীত, আকাশে নীল চাঁদ, ওদিকে সুন্দরবন। যাকে বলে মোক্ষম পরিবেশ।
হ্যাঁ, হঠাৎ একটা কুঁড়ের দাওয়া থেকে এক খোনা গলা বলে উঠল—আপনারা যাবেন না! ওকে বনবিবি নিয়ে গেছে।
আমরা তাকিয়ে দেখি, অন্ধকারে প্রায় দেখাই যায় না এমন একটা জায়গা থেকে কাঁথা-কম্বলের একটা স্তূপে কে কথা বলছে। সেই গ্রামপ্রধান লোকটা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন,
ও আমার মা, ওর কথা ধরবেন না।
এই দুর্গম স্থানে মাকেসহ এসেছে দেখে একটু অবাক হলাম, মৌয়ালরা সাধারণত এইসব গ্রাম বানায় অল্প কয়েক মাসের জন্য। সেখানে পরিবারের অন্য কারও থাকার কথা না। পরে অবশ্য কারণটা জেনেছিলাম যে এই মহিলা খুব ভালো কবিরাজ, মাঝেমধ্যেই মধু সংগ্রহের সময় মৌমাছির হুলে মৌয়ালরা কাবু হয়ে যায়, তখন জঙ্গলের লতাপাতা দিয়ে সেগুলো সারিয়ে তুলতে এই মহিলার জুড়ি নেই। প্রধান যা–ই বলুক না কেন, ততক্ষণে সেই খোনা গলার বৃদ্ধা বলা শুরু করেছেন যে এই দুজন নাকি বদ লোক ছিল, বনের অনিষ্ট থামাতে বনবিবি তাঁর বাঘ পাঠিয়ে এদের তুলে নিয়ে গেছেন। সে নাকি নিজের চোখে দেখেছে—নীল রঙের বিরাট এক বাঘ আর দূরে বনবিবির আলো। এর উত্তরে কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। দেখুন, শহরে বসে দিনের আলোয় নিজেদের অনেক যুক্তিবাদী মনে হয়, কিন্তু ও রকম একটা জায়গায়—
জি, আমি এখনই টের পাচ্ছি, বলতে হবে না। সাদী হককে থামিয়ে দিয়ে বললাম।
তো আমি আরও ঘাবড়ে গেলাম, কিন্তু বাইরে প্রকাশ করলাম না। করিম সাহেব কিন্তু নির্লিপ্ত। রাতে খাবার সময় তাঁকে এ কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, হ্যাঁ, এটাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমরা আবার ফিরে যাব। বুঝুন! আমি সবে ইংল্যান্ডের এডিনবার্গ ইউনিভার্সিটিতে আমার থিসিস পেপার জমা দিয়ে এসেছি ইভাল্যুশনের একটা ক্রিটিক করে আর এদিকে এই মৌয়ালদের গ্রামে এসে শুনতে হচ্ছে, এক বনদেবী নাকি তাঁর পোষা বাঘ দিয়ে দুজনকে তুলে নিয়ে গেছেন, কারণ তারা দুষ্ট প্রকৃতির। খুবই অস্বস্তির একটা রাত কাটল।

পরদিন সকাল থেকেই আকাশে ঘন কালো মেঘ, দুর্যোগের আশঙ্কায় বের হওয়া ঠিক হবে কি না, ভাবার আগেই করিম সাহেব তৈরি হওয়া শুরু করলেন। এরপরে আবার বৃষ্টি নামলে যা চিহ্ন আছে, তার কিছুই মিলবে না। আর দিনের আলো এখনো যতটুকু আছে, তা ব্যবহার করতে হবে। সব দ্বিধা ঝেড়ে আমার রাইফেলটা নিয়ে রওনা দিলাম। ওদিকে পেছন থেকে সেই বুড়ি আবার খোনা গলায় আমাদের মানা করতে লাগল। সেটা পাত্তা দিলে নিজেদের শিকারি হিসেবে সম্মান থাকে না। ভালো কথা, এর মধ্যে সেই দুজনকে নিয়ে করিম সাহেব একটু খোঁজখবর করেছিলেন। জানা গেল, এরা দুজন মামাতো-ফুপাতো ভাই। আগে মোংলা পোর্টে নাকি চোরাচালানের কাজকর্ম করত। মানে, অতীত খুব একটা সুবিধার না। পরে পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে সুন্দরবনের গভীরে এসে আত্মগোপন করে। এর মধ্যে নাকি একদল ডাকাতের সঙ্গেও জুটেছিল। আর এখন মধু সংগ্রহের ফাঁকে ফাঁকে মাঝেমধ্যেই উধাও হয়ে যেত জঙ্গলের মধ্যে। মানে, আগে থেকেই বেশ সন্দেহজনক চরিত্র। যা–ই হোক, তা ভেবে এখন আর কোনো লাভ নেই, তারা কেউই নেই, আমরা বরং তাদের মরদেহের কিছু অংশ উদ্ধার করতে পারলে কবর দিয়ে দেব। আমরা এবার শেলা নদীকে হাতের ডানে রেখে হাঁটতে লাগলাম, আমার হান্টার বুট ভেদ করে সুন্দরবনের বিখ্যাত শ্বাসমূল খোঁচা মারছে, এর মধ্যে করিম সাহেব দেখি খালি পায়ে হাঁটছেন! যা–ই হোক, নিস্তব্ধ জঙ্গলের মধ্যে মানুষখেকো বাঘের পেছনে ট্র্যাক করা গল্পে পড়ে যতটা রোমাঞ্চকর লাগে, বাস্তবে সে রকম না। চারদিক খুব স্বাভাবিক, পাখি ডাকছে, প্রজাপতি উড়ছে, নদীর তীরে মাঝেমধ্যেই দেখা যাচ্ছে কুমির হাঁ করে বসে আছে। করিম সাহেব কিন্তু এসব থেকেই কী যেন একটা বোঝার চেষ্টা করছেন, ধীরে ধীরে একটা ঘন গেওয়াগাছের ঘেরের কাছাকাছি এসে তিনি হঠাৎ হাত তুলে থামতে বললেন, সামনে কিছু একটা শব্দ হচ্ছে। ঘাড়ের রোম খাড়া হয়ে গেছে আমার, হাতে বাগিয়ে ধরেছি রাইফেলটা। খসখস একটা শব্দ হচ্ছে সামনের ঝোপে, বন্দুক বাগিয়ে যোগীর চোখে স্থির সামনে তাকিয়ে করিম সাহেব, আমিও চুপ।

default-image

টুপ করে এ সময়ে ঝোপ ছেড়ে সামনে এল একটা রোগা–পটকা বাঘের বাচ্চা, রয়েল বেঙ্গলের! দেখেই আদর করতে ইচ্ছে করে এমন, কিন্তু সেটা দেখেই আতঙ্কে যেন সিঁটিয়ে উঠলেন করিম সাহেব। প্রবলভাবে হাত নাড়তে নাড়তে আমাকে পেছাতে বললেন, যতটা সম্ভব পিছিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন—বাঘিনী, তা–ও আবার বাচ্চাসহ বাঘিনী—সব থেকে ভয়ানক। বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে ভাবলে যে কাউকেই নিমেষে শেষ করে দেবে সে। সুতরাং আপাতত কেটে পড়াই ভালো। আমিও রাজি, মনে মনে খুশিই। কিন্তু ফিরতি পথে রওনা দেওয়ার আগেই করিম সাহেব আবার ইশারা করে থামতে বললেন। কান পেতে কী একটা শুনে নদীর পাড়ের দিকে এগোলেন। উঁচু হয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করে আমাকে ডাকলেন। হ্যাঁ আমিও টের পেলাম, কাদের যেন কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছি এবং আমার ভুল না হলে একটা গলা আইরিশ ইংলিশ! অবাক হয়ে সামনে আরেকটু এগিয়ে দেখি, সামনের যে খালটা নদী থেকে এসে এই দিক পর্যন্ত ঢুকেছে, তার মাঝামাঝি একটা চিকন নৌকা বাঁধা। তার ওপরে বেশ কায়দা করে একটা ঘরমতো বাঁধা, তার সামনে একটা চেয়ারে করে এক ব্রিটিশ সাহেব। নৌকায় আরও দুজন আছে। তাদের গড়ন বেশ শক্তপোক্ত, তবে তারা স্থানীয়। সাহেব কিছু একটা বলে এদের রীতিমতো ধমকাচ্ছে। আমি আরেকটু ভালোমতো খেয়াল করে শুনলাম, ছাড়া ছাড়া কথায় যা বোঝা গেল তাতে একই সঙ্গে অবাক হলাম এবং বেশ রেগে গেলাম। সাহেব আসলে পোচার, মানে চোরা শিকারি। সুন্দরবনে এসেছে রয়েল বেঙ্গল বাঘের চামড়া সংগ্রহ করতে! এবং সামনেই একটা বাঘ মরে পড়ে আছে, সেটার চামড়া ছাড়াতে ওই দুজনকে আদেশ দিচ্ছে, কিন্তু তারা তা মানছে না। কারণ, আগের দুজন নাকি মারা গেছে এভাবেই, বিদ্যুৎগতিতে মাথায় খেলে গেল দুজন? সেই মৌয়াল দুজন না তো? করিম সাহেবকে সে কথা বলতেই ভয়ানক রেগে গেলেন। মানুষখেকো বাঘের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে তিনি বাঘ মারেন বটে, কিন্তু অপ্রয়োজনে বা চামড়া বিক্রির জন্য প্রাণী হত্যা তাঁর কাছে ভয়ানক অপরাধ। বললেন, বন বিভাগের পক্ষ থেকে তিনি এখনই এই সাহেবকে গ্রেপ্তার করতে চান। আমি থামালাম। প্রমাণ ছাড়া ধরতে গেলে উল্টো বিপদে পড়তে হবে। তার চেয়ে দেখা যাক আদৌ যা ভেবেছি, তা-ই কি না। ওদিকে সাহেব ধীরে ধীরে আরও উত্তেজিত হয়ে রীতিমতো মারতে তেড়ে যাচ্ছে অন্য দুজনকে। তারা এবার তাকে কিছু একটা বলল। সাহেব একটু থেমে নৌকার ওপরের ঘরটায় গিয়ে ঢুকল। মিনিট পাঁচেক পরে আবার শিকারের সাজে বের হয়ে এল। বুঝলাম, নৌকার দুজন নিশ্চয় শর্ত দিয়েছে সাহেবকেও যেতে হবে সঙ্গে। করিম সাহেবকে ইশারা করলাম এদের অনুসরণ করতে। হাতেনাতে বাঘের চামড়া ছাড়ানোর চেষ্টা করার সময় এদের ধরতে হবে। উনিও রাজি। এদিকে আকাশ কালো করে সন্ধ্যার অন্ধকার নামছে জঙ্গলে। সে এক গা ছমছমে অনুভূতি। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, ওই যে বাচ্চাটা দেখলাম, তার মাকেই এদের লোকেরা হত্যা করেছে। ভেবে ভয়ানক মেজাজ খারাপ লাগল। যা–ই হোক, গাছের ফাঁকে ফাঁকে সাহেব আর তার দুই সহকারীকে দেখলাম, সাহেবও মনে হলো ভয় পাচ্ছে। আর আমরা দুজন রাগের কারণে ভয়টা টের পাচ্ছি না। খালি সুযোগ খুঁজছি কখন তাদের ধরব। হঠাৎ তারা চোখে সামনে থেকে হারিয়ে গেল। গতি বাড়িয়ে সামনে এগোতেই আমরা আবার সেই আগের জায়গায়, মানে যেখানে বাঘের ছানাটা দেখেছিলাম সেখানে পৌঁছে গেলাম। আরেকটু এগোতেই সাহেবের গলার আওয়াজ পেলাম,

গট ইট, ইউ..., নাউ পিইল ইট, হারি!
যা ভেবেছিলাম, সে এক করুণ দৃশ্য, একটা রয়েল বেঙ্গল বাঘ মরে পড়ে আছে, ভালোই লম্বা বাঘটা, তার চারদিকে অসহায়ের মতো কুঁই কুঁই করছে দুটো রুগ্‌ণ বাচ্চা, মা কেন উঠছে না, তা বুঝছে না তারা। আর এর মধ্যে সেই সাহেবের নির্দেশে সঙ্গের দুজন ছুরি বের করে বাঘের দিকে এগিয়ে গেল। দেখে আর সহ্য হলো না, বন্দুক বাগিয়ে এগোতে লাগলাম। চিৎকার করে তাদের থামতে বলব ও সারেন্ডার করতে বলব, ঠিক এমন সময় ঘটল ঘটনাটা—আকাশ এমনিতেই বেশ কালো হয়ে ছিল, হুট করে যেন একেবারে সন্ধ্যার ঘন আঁধার নেমে এল এবার। আর বাঘটা যেখানে পড়ে ছিল তার পেছন দিকে যে একটা ঢিবি মতন জায়গা ছিল, সেটার পেছন থেকে একটা অদ্ভুত নীলচে আলো দেখা গেল। সেটা করিম সাহেবকে দেখাতে যাব, তার আগেই চারদিক কাঁপিয়ে একটা বাঘের গর্জন শোনা গেল।
সাদী হক একটু থামলেন।
জুবেরী সাহেব, করিম গাজীর সেই বইটা যদি জোগাড় করেন, তবে দেখবেন সেখানে বলা আছে, যত বড় বীরপুরুষই হও না কেন, সুন্দরবনের ভেতরে দাঁড়িয়ে বাঘের ডাক শুনে ভয় পাবে না, এমন মানুষের জন্ম হয়নি। সত্যি তা–ই, তবে আমার জীবনের শোনা কোনো গর্জনের সঙ্গে এর তুলনা হয় না। খুব যে জোরে তা-নয়, কিন্তু এমন গম্ভীর আর গাঢ় স্বরে সেটা হলো আর মনে হলো কোনো একটা উত্স থেকে না, গোটা জঙ্গলের থেকেই যেন ডাকটা এল। সাহেব ভয় পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে আর সঙ্গের দুজন মুহূর্তের মধ্যে কোথায় দৌড়ে পালাল। আমরা কী করব বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইলাম যেন সম্মোহিত হয়ে। সাহেবের পায়ের কাছে বাঘের বাচ্চা দুটো দাঁড়িয়ে, পাশে পড়ে আছে তাদের মায়ের মৃতদেহ আর ওদিকে ঢিবিটার পেছন থেকে নীলচে আলোটা আরও বেড়ে উঠল, সাহেব এবার আতঙ্কে সেদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া শুরু করল। করিম সাহেব আমার হাত চেপে ধরে বলল, সাবধান! এবং এরপরেই সেই আলো গায়ে মেখে লাফিয়ে খোলা জায়গাটায় বের হয়ে এল একটা বাঘ। লম্বায় ৩০ ফুটের কম হবে না! আর সারা গা থেকে নীল আভা বের হচ্ছে ফসফরাসের মতো, সাহেব আর গুলি করতে পারলেন না। করিম সাহেব হাঁটু গেড়ে বসে চোখ বুজে বিড়বিড় করে কী একটা বলতে লাগলেন, আমি স্থাণু হয়ে তাকিয়ে, সেই অপ্রাকৃত বাঘটা খুব ধীরে ধীরে সামনে এল, সাহেবকে একটু শুঁকল, সঙ্গে সঙ্গেই সাহেব সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গেল। বাঘটা আবার গর্জন করতেই এবার পেছন থেকে খুব হালকা একটা গানের মতো আওয়াজ শোনা গেল। রিনরিনে কণ্ঠে যেন এক কিশোরী গান গাইছে, অদ্ভুত ভাষায়। সেই ঢিবির পেছনে থেকে এবার বেরিয়ে এল এক কিশোরী। বয়স ১৫–১৬ হবে, পরনে পুরোনো আমলের মতো করে পরা শাড়ি। চোখ বন্ধ, আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম, মেয়েটা আসতেই বাঘটা ঘুরে, যেন তার পোষা একটা বিড়াল—এভাবে কাছে গিয়ে তার চারদিকে ঘুরতে লাগল, মেয়েটা তার গায়ে হাত বুলিয়ে পড়ে থাকা সাহেবটার দিকে এবার চোখ খুলে তাকাল, আবার মৃত বাঘটার দিকে তাকাল, মৃত বাঘটার শরীরে আলতো করে হাত বুলিয়ে বাচ্চা দুটোকে তুলে নিল হাতে, এরপর হেঁটে হেঁটে যেদিক থেকে এসেছিল, সেদিকে রওনা দিল। আরও কী হয় দেখতে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিলাম। সংবিৎ ফিরল করিম সাহেবের সজোরে হাতে টান খেয়ে। উনি চোখ বুজে বিড়বিড় করেই যাচ্ছেন আর আমাকে বসে পড়তে বলছেন। বসে পড়তেই হঠাৎ চারদিক আবার আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে এল, যেন ভোর হচ্ছে। আরেকটু আলো হতেই করিম সাহেব আমার হাত ধরে টানতে টানতে ফিরে চললেন যেদিক থেকে এসেছিলাম সেদিকে। গ্রামে ঢোকার আগে বললেন, যা ঘটেছে কাউকে না বলতে, বলতে যে মরদেহ দুটো আমরা পেয়েছিলাম, সেগুলো গোর দেওয়া হয়েছে। আমরা কী দেখলাম, সেটা নিয়ে উনি কথা বলতেই রাজি নন। বললেন, বিরাট দোয়া ছিল আমাদের ওপরে, যে এখনো বেঁচে আছি। পরে বললেন,
— ও-ই বনবিবি। সঙ্গে তাঁর পোষা বাঘ। সেই দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে চুক্তির পর থেকে সুন্দরবন এভাবেই পাহারা দিয়ে আসছেন। তাঁকে দেখার ভাগ্য কারও হয় না, হলেও সে বেঁচে ফেরে না। তাই কাউকে বললেও সে সেটা বিশ্বাস করবে না। আমি কী জবাব দেব জানি না, কারণ যা ঘটেছে আমি বরং তার চেয়েও বেশি দেখেছি, বিজ্ঞান দিয়ে এর ব্যাখ্যা কী দেব?
আর সেই সাহেব? জানতে চাইলাম।
হ্যাঁ পরদিন লোকজন নিয়ে আমরা আবার গিয়েছিলাম সেখানে, সাহেব নেই, শুধু সেই নৌকাটা পেলাম, তার ভেতর থেকে উদ্ধার হলো সাহেবের পাসপোর্ট, সে আইরিশ লোক। ইন্টারপোলে পরে খোঁজ নিয়েছিলাম। সে মূলত আন্তর্জাতিক পোচার দলের একজন সদস্য। অত বড় কেউ না, তবে তখন ভারত আর বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু পোচিংয়ের সমন্বয় করছিল সে। রয়েল বেঙ্গলের চামড়ার লোভে এবার নিজেই চলে এসেছিল। ওই মৌয়াল দুজনকে দিয়ে সে এসব কাজই করাত। ওই মা বাঘিনীকে মারতে গিয়েই সবার কাল হলো। যা–ই হোক, তাই বলছিলাম, আমি ভূত বিশ্বাস করি, কিন্তু আমার ভূত হলো অভূতপূর্ব কিছু। আমি জানি, এটা বিশ্বাস করার কিছু নেই, আমি নিজেও পরে অনেক ভেবেছি, কোনো ব্যাখ্যা পাইনি। কোনো আদিবাসী মেয়ে কি জঙ্গলের কোনো বাঘ পোষ মানিয়ে ওখানে থাকে? বাঘটা কি অ্যালবিনো? গায়ে ফসফরাস মেখে তাকে দিয়ে চোরা শিকারিদের মেয়েটা ভয় দেখায়? আবহাওয়ার কারণে সেদিনের লাইটিং কি অন্য রকম ছিল বলে অপটিক্যাল ইলিউশনে বাঘটাকে অন্য রকম লেগেছে? জানি না।

সাদী হকের কাহিনি শুনে কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। নিস্তব্ধতা ভাঙতে কিছু একটা বলার উপক্রম করতেই বিকট শব্দে আমাদের লঞ্চের সাইরেনটা বেজে উঠল। ছুটতে ছুটতে ছাদে চলে এলেন মুনীর ভাই—
আরে আপনারা এখানে, হা হা হা, আমি ভাবলাম বুঝি বাঘে এসে নিয়ে গেছে হা হা হা, চলুন আমাদের লঞ্চ ছুটে গেছে, জোয়ারের সময়। আর সকাল হয়ে যাচ্ছে প্রায়, আসুন আসুন।
দুজনেই উঠে দাঁড়ালাম, কোনো কথা না পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার এই গল্পটা, মানে ঘটনাটা আমি কি লিখতে পারি কোথাও?
অবশ্যই, কিন্তু গল্প হিসেবেই লিখবেন, করিম সাহেবকে কথা দিয়েছিলাম, এটা কাউকে বলা হবে না। আর কোথাও ছাপা হলে দয়া করে কপি পাঠিয়ে দেবেন এই ঠিকানায়, বলে তাঁর একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিলেন।
তথাস্তু বলে সুন্দরবনের তটরেখার দিকে তাকিয়ে রইলাম, ভূত যদি এমনভাবে আসে, তবে বোধ হয় বিশ্বাস না করে আর উপায় নেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন