পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে ফুলুদের বাড়ি। দক্ষিণ ভিটার ঘরের ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে বেরোল একটা সাদা হুলো বিড়াল। এত মোটা, ফুলে গোল হয়ে গেছে। ফুলু বলল, ‘অকর্মার ধাড়ি। খালি খায় আর ঘুমায়। সামনে ইঁদুর এসে বসে থাকলেও মুখ তুলে তাকায় না। এখন মনে হয় পায়খানা করতে বেরিয়েছে আলসেটা। তা-ও ভালো, ঘরের মধ্যেই যে সেরে ফেলেনি।’

‘বেড়াটা ভাঙল কী করে?’

‘ও, তোকে তো বলা হয়নি? আমাদের সিন্দুকটা পুকুরে নেমে গেছে।’

‘বলিস কী?’

‘হ্যাঁ, দেওয়ালা হয়ে গেছে।’

ভুতুড়ে সিন্দুককে ‘দেওয়ালা’ বলে, আমি জানি। নানির কাছে গল্প শুনেছি, এসব দেওয়ালা সিন্দুক পানিতে নেমে ভীষণ অত্যাচার করে। ওগুলোর তখন লম্বা শিকল গজায়। মানুষ নামলেই তার পায়ে শিকল পেঁচিয়ে টেনে নেয় পানির তলায়। সেই মানুষ আর কোনো দিন ভাসে না।

পুকুরের পানির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, লাল লাল চোখ মেলে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে বিশাল এক কালো দানব। সুযোগ খুঁজছে কখন আমাদের টেনে নেবে। দৃশ্যটা কল্পনা করে শিউরে উঠলাম। নিজের অজান্তেই পা দুটো উঁচু করে ফেললাম।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘ফুলু, তোদের সিন্দুকটা পড়ল কীভাবে রে?’

‘ঘরের ভিটাটা পুকুরের দিকে ঢালু। সিন্দুকের ভেতর অতিরিক্ত জিনিস ভরায় অতিরিক্ত ভারী হয়ে গিয়েছিল। এক রাতে হুড়ম-ধাড়ুম শব্দে জেগে গেল আব্বা। দেখে সিন্দুকটা বেড়া ভেঙে পুকুরে গিয়ে পড়ছে। ওই দেখ, পাড়টা এখনো ভাঙা।’

আনমনে মাথা দোলালাম। পুকুরের দক্ষিণ পাড়টা অন্য তিন পাড়ের মতো ঢালু নয়। খাড়া। আমগাছের ছায়ায় অন্ধকার। দিনের বেলায়ও রোদ পড়ে না। পানির গভীরতাও ওখানে বেশি, তাই কালো দেখায়। দেখলেই গা ছমছম করে।

মোটা কাঠ দিয়ে তৈরি ভারী এই সিন্দুকগুলোকে ঠেলে নেওয়ার জন্য বড় বড় চাকা লাগানো হয়। চাকাওয়ালা সিন্দুক, ঢালু জায়গায় গড়িয়ে পড়তেই পারে। কিন্তু ভূতের আসর করেছিল, বিশ্বাস হলো না আমার। জিজ্ঞেস করলাম, ‘সিন্দুকটা তুললি কী করে?’

‘কে তুলতে যাবে!’ হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল যেন ফুলু। ‘কার এত বুকের পাটা, ভুতুড়ে সিন্দুক তুলতে পুকুরে নামে? বরং সবাই এসে আব্বাকে ধরল, পুকুরে নামা যাচ্ছে না, ওটাকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করো। আব্বা গুনিন ডেকে আনল। রাতের বেলা এল গুনিন। ওই সময় নাকি ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে ভূতগুলো। তাড়াতে সুবিধে হয়। হাতে হারিকেন নিয়ে মন্ত্র পড়তে পড়তে পুকুরের চারপাশে পাক দিতে লাগল সে। সাত পাক ঘুরে এসে সিন্দুকটা যেখান দিয়ে পড়েছে, সেখানে থেমে এক মুঠো মাটি তুলে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিয়ে সেই মাটি পুকুরে ফেলে দিল। তারপর যা কাণ্ড! পুকুরের উত্তর পাড়ে ঝোপঝাড়ের মধ্যে যেন ঝড় বইতে শুরু করল। মুচকি হেসে গুনিন বলল, ‘ওই যে, চলে যাচ্ছে শয়তানটা। খেতের ওপর দিয়ে এখন বিলে গিয়ে পড়বে।’

‘সিন্দুকটাকে যেতে দেখেছিস?’ জিজ্ঞেস করলাম।

মাথা নাড়ল ফুলু। ‘নাহ্! অন্ধকার রাত। পরদিন সকালে উত্তর পাড়ে গিয়ে দেখি ঝোপঝাড় তছনছ। মাটিতে দুটো দাগ। গুনিন বলল, সিন্দুকের চাকার দাগ। পেট পুরে পোলাও-মাংস খেয়ে, আব্বার কাছে থেকে সিন্দুক তাড়ানোর সম্মানী সোয়া পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিদেয় হলো গুনিন।’

ভাবতে লাগলাম, আসল ঘটনাটা কী? গুনিনের মন্ত্রে পানি থেকে সিন্দুক উঠে চলে গেছে, কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলাম না। মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকাচ্ছি বাঁশবাগানের মাথার দিকে। পরি দেখার আশায়। যদিও জানি, পরিটরি কিচ্ছু যাবে না। ওসব রূপকথার গল্প। তবে জ্যোৎস্না দেখাটা সত্যিই মজার।

ফিরে এল প্যাঁচাটা। ডালে বসে কি-র-র-র কি-র-র-র করে তীক্ষ ডাক ছাড়ল। ওপারের বাঁশবন থেকে সাড়া দিল তার সঙ্গী।

পুকুরে ঘাই মারল একটা বড় মাছ। চাঁদের আলোয় রুপালি আংটি সৃষ্টি করে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ঢেউ।

সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা রে ফুলু, এই পুকুরে নাকি মোহরের ঘড়া আছে?’

‘আছে তো,’ মহা উৎসাহে জানাল ফুলু। ‘পানিতে নেমে গোসল করার সময় আমার গায়ে ঘষাও লেগেছে দুবার।’

‘তোর কোনো ক্ষতি করল না?’

‘কেউ বিরক্ত না করলে মোহরের ঘড়া কারও কোনো ক্ষতি করে না। সিন্দুকের মতো পাজি নয়।’

‘ঘড়াটা এল কী করে এই পুকুরে?’ জানতে চাইলাম।

‘আমার দাদার আব্বা তখন বেঁচে ছিলেন। একদিন ধনরত্ন নিয়ে আকাশ দিয়ে পরির দল উড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা পরির হাত থেকে ঘড়াটা পুকুরে পড়ে যায়। তারপর থেকে ওটা এখানেই আছে।’

অনেক রাত। বকবক করতে করতে ফুলুও বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে গেছে। তাই চুপ হয়ে গেল।

ঘুম পাচ্ছে আমার। হাই তুলতে লাগলাম। চোখ মেলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে।

মাথার ওপর থেকে অনেকখানি সরে গেছে চাঁদ। পরির দেখা নেই এখনো। শুধু ছোট একটা নিশাচর পাখিকে একটু পরপরই উড়তে দেখা যাচ্ছে। পোকা ধরে খাচ্ছে।

সময় কাটছে। আরও ঢলে পড়েছে চাঁদ। ভোর হতে দেরি নেই। জঙ্গল থেকে শোনা গেল শিয়ালের আহাজারি: হুয়া-হুয়া-হুয়া! কা-হুয়া! কা-হুয়া! আমার মনে হলো, বিদেশি ভাষায় হাঁক ছাড়ছে শিয়ালগুলো।

সামান্য তন্দ্রামতো এসে গিয়েছিল, ফুলুর কনুইয়ের ধাক্কায় চমকে জেগে গেলাম। জড়ানো গলায় তুতলে উঠলাম, ‘প-প-প-প্পরি এসেছে?’

‘চুপ! আস্তে!’ ফিসফিস করে বলে ঘাটলার দিকে আঙুল তুলল ফুলু।

আমিও দেখলাম! ঘাটের সামান্য দূরে পানিতে নড়ছে চকচকে একটা গোল জিনিস। উল্টো করে ভাসিয়ে রাখা কলসির মতো। চাঁদের আলোয় রংটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে তামার কলসির মতো তামাটেই মনে হলো।

ফিসফিস করে ফুলু বলল, ‘কী বুঝলি?’

‘কাছিম।’

‘ধ্যাৎ দেখছিস না কত বড়? বুঝতে পারছিস না?’

‘বড় কাছিম।’

‘নাহ্, তোর সঙ্গে কথা বলাটাই একটা ইয়ে....আরে, দেখতে পাচ্ছিস না, ওটা ঘড়া! ঘড়া!’

‘উল্টো হয়ে আছে কেন?’

সবজান্তার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে ফুলু বলল, ‘তো কীভাবে ভাসবে? কলসি তো পানিতে উল্টো হয়েই ভাসে।’

তা ঠিক।

‘চুপ করে দেখতে থাক। এখন পাড়ে উঠে মোহরগুলো ঢেলে রেখে আধার করতে যাবে কলসিটা। ফিরে এসে আবার মোহর ভরে নিয়ে নেমে যাবে।’

‘আধার কী?’

‘আধার কী তা-ও জানিস না? খাবার। রাতের বেলা কলসির শিকার করে খাওয়াকে বলে আধার।’

‘কলসির খেতে হয় কেন, বল তো?’

‘কলসি খায় না, খায় তার ভেতরে থাকা দেওটা, যেটা পরির কলসি পাহারা দেয়।’ এ কান-ও কান ছড়িয়ে গেছে ফুলুর হাসি। ‘আজ কলসির আধার করা দেখব। কত দিন চেষ্টা করেছি, দেখতে পাইনি। তোর জন্যই আজ দেখতে পাব। তুই জ্যোৎস্না দেখার জন্য বসেছিস বলেই।’ আমার কাঁধে হাত রাখল সে।

মসৃণ গতিতে ভেসে আসছে ফুলুর ‘মোহরের ঘড়া’। ওটার চারপাশ ঘিরে খুব ছোট ছোট ঢেউ গোল রিংয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। দম বন্ধ করে তাকিয়ে আছি দুজনে। যেকোনো মুহূর্তে পাড়ে উঠে আসবে জিনিসটা।

‘বাবা গো! সাপ!’ বলে বিকট এক চিৎকার দিয়ে কাত হয়ে গেল ফুলু। তাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল দুটো শিকড়ের মাঝখানে ফোকরের মধ্যে। পুরো শরীরটা ভেতরে পড়ল না, মাঝপথে বেকায়দা ভঙ্গিতে আটকে গেল।

চিৎকার শুনে এমনভাবে চমকে উঠলাম, মনে হলো হার্টফেল করবে আমার।

‘কোথায় সাপ! কই? কোনখানে?’ টেনেহিঁচড়ে বের করলাম ফুলুকে।

ফুলুর পরনে হাফপ্যান্ট। ঊরু ডলছে আর গোঙাচ্ছে, ‘এই যে এখানে! কালসাপে কামড়েছে রে ভাই! আর আমি বাঁচব না!’ গোখরোকে ‘কালসাপ’ বলে ওই অঞ্চলের লোকে।

কিসে কামড়েছে সে-রহস্য ভেদ করতে সময় লাগল না। আমগাছে বিষ-পিঁপড়ের বাসা। প্রচণ্ড জ্বালা এগুলোর বিষে। ফুলুর চামড়া কামড়ে থাকা পিঁপড়েটাকে দুই আঙুলে টিপে মেরে, ফেলে দিলাম।

ফুলুর চিৎকার থামলে মনে পড়ল ভুতুড়ে কলসিটার কথা। কোথাও দেখা গেল না ওটাকে। আমাদের চেঁচামেচিতেই বোধ হয় এই এলাকায় ‘আধার করা’ নিরাপদ নয় ভেবে পালিয়েছে। পানিতে দেখা যাচ্ছে বড় বড় বুদবুদ। বুঝলাম, কাছিমের ভোগলা।

কামড় খাওয়া জায়গাটা ডলতে ডলতে হতাশ কণ্ঠে ফুলু বলল, ‘শয়তান পিঁপড়ের জন্য আজ ঘড়া দেখার এত বড় সুযোগটা হারালাম।’

ঘড়া রহস্য ভেদ হলো আমার কাছে। তবে সিন্দুকের খুঁতখুঁতানিটা রয়েই গেল।

তবে সেটারও সমাধান হলো পরের বছর। আবার বেড়াতে গেছি গ্রামের বাড়িতে। ফুলুদের বাড়িতে গিয়ে দেখি ওদের বড় ঘরে একটা কালো সিন্দুক। জিজ্ঞেস করলাম, ‘নতুন নাকি?’

‘আরে নাহ্, আগেরটাই,’ হাসিমুখে জানাল আমাকে ফুলু। ‘রং করা হয়েছে।’

‘আগেরটা না বিলে চলে গিয়েছিল?’ অবাক হয়ে বললাম।

‘না, সিন্দুকটা পুকুরেই ছিল, বেশি পানিতে থাকায় দেখা যায়নি। চৈত্র মাসে পুকুরের পানি শুকিয়ে কমে গেলে ওটার পিঠ ভেসে ওঠে। আব্বা তো সঙ্গে সঙ্গে দৌড় গুনিনের বাড়িতে। সব শুনে গুনিন বলল, সিন্দুকের ভেতরের শয়তান ভূতটাই আসলে পালিয়েছে, ভারী সিন্দুকটা নিয়ে যাওয়ার কষ্ট আর করেনি।

মনে মনে হাসলাম। সমস্ত ব্যাপারটাই গুনিনের ধোঁকাবাজি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এবার আর ওটার গায়ে হাত দিয়ে ভয় পায়নি লোকে?’

‘না,’ ফুলু বলল। ‘আবার এক মুঠো মাটিতে ফুঁ দিয়ে আব্বার হাতে দিয়ে গুনিন বলেছে, এটা প্রথমে সিন্দুকের ডালায় ছড়িয়ে দিবি। ভূতের আসর একদম চলে যাবে।’ গুনিনকে আরও সোয়া এক হাজার টাকা গুনে দিয়ে মন্ত্র পড়া মাটি নিয়ে খুশিমনে বাড়ি ফিরল আব্বা। দশ-বারোজন লোক মিলে মোটা কাছি (দড়ি) বেঁধে ওটাকে কাদা থেকে টেনে তুলল।’

মুচকি হেসে বললাম, ‘এত ভারী বলেই ভূতেও নিতে পারেনি এটাকে।’

আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ফুলু। বোঝার চেষ্টা করল টিটকারি দিচ্ছি কি না।

তবে আমি খুশি। সিন্দুকের রহস্যও ভেদ হয়েছে। উত্তর পাড়ের ঝোপঝাড় ভাঙার বিষয়টাও এখন আমার কাছে স্পষ্ট। ওখানে গুনিনের লোক লুকিয়ে ছিল। ওরাই দাপাদাপি করেছে, ঝোপঝাড় ভেঙেছে। লাঠি বা ডাল দিয়ে মাটিতে এমনভাবে দাগ দিয়েছে, মনে হয়েছে চাকার দাগ। রাতের অন্ধকারে এসব কারও চোখে পড়েনি। ভয়ে উত্তর পাড়ে গিয়ে তখন দেখার অবস্থাও ছিল না কারও। ঘটনাটা সেই চিরাচরিত ব্যাপার—মানুষের ভীতিকে কাজে লাগিয়ে গুনিনদের লোক ঠকানো।

(সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে)

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন