এরপর সলু রিমির খাতা নিয়ে কিছু ছবি তুলল। তারপর বেরিয়ে এল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কই যাচ্ছি?

‘অপহরণকারীদের ধরতে।’

‘মানে?’

‘রিমি পালায়নি। ওকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

‘কেমনে বুঝলি?’

‘প্রথমত কাগজের লেখাটা রিমির না। হাতের লেখা অন্য কারও। তারপর সে তার মায়ের কাছে চিঠিতে লিখেছে। কিন্তু ওর মা নেই। তার ওপর ও বরিশালের মেয়ে। কিন্তু চিঠিটা লেখা পুরান ঢাকাইয়া ভাষায়।’

আমি বেশ অবাক হলাম তার কথা শুনে। সে একটি রিচ ফুডের দোকান ঢুকল। সে তারপর এদিক তাকিয়ে কিছু খুঁজছিল। সে দেখল একটি লোক দেয়ালে লাগানো মেন্যু দেখছে। তারপর বেরিয়ে এসে বলল,

রিমির কিডন্যাপারকে ধরতে পেরেছি।

‘এত তাড়াতাড়ি?’

‘হ্যাঁ, ওই লোকটা যে মেন্যু দেখছে।’

‘কীভাবে বুঝলে?’

‘প্রথমত তার তর্জনী নেই এবং সেখানে ব্যান্ডেজ করা। অতএব আঙুলটা সদ্য কেটেছে। রিমির টেবিলের বাম দিক কলমটা ছিল। মানে যে লিখেছে, বাম হাতে লেগেছে। প্লাস জানালার সঙ্গে আমি একটা আঙুলও দেখতে পাই। যেহেতু রিমির জানালায় কোনো বেড়া নেই সে সহজেই রিমিকে নিতে পেরেছে এবং বাম হাত দিয়ে চিঠি লিখেছে কারণ ডান হাত কাটা পড়েছি আর শেষমেশ পগার পার।

কিন্তু এ লোকটা যদি না হয়?’

‘আমার মন বলছে এটাই সেই লোক।’

কিছুক্ষণ পর লোকটি বেরিয়ে এল, হাতে কয়েক প্যাকেট বিরিয়ানি। আমরা সাবধানতার সঙ্গে তার পেছন পেছন গেলাম। লোকটি ঢুকে পড়লে জঙ্গলে। তার পেছনে যেতে যেতে, হঠাৎ দেখি লোকটা মির্জার হানাবাড়িতে ঢুকছে। লোকে বলে এখানে নাকি মুণ্ডুহীন মানুষ দেখা যায়। অবশ্য মুণ্ডুহীন হলে সেটা যে মানুষ না, এটা বোঝাই যাচ্ছে। আমি সলুকে বললাম,

‘লোকটা কোথায় যাচ্ছে খেয়াল করেছিস?’

‘হ্যাঁ, এজন্যই শিয়োর হলাম।’

‘কী, শিওর হলি?’

এই হচ্ছে অপহরণকারী কারণ সন্ত্রাসীরা সাধারণত এ রকম জায়গাতেই থাকে।’

‘আমার কিন্তু ভয় করছে।’

‘তুই ফিরে যেতে পারবি?’

‘কেন?’

‘পুলিশ নিয়ে আসতে হবে পুলিশকে বলবি পুরো বাড়ি ঘেরাও করে নিতে। যাতে সবাই পালাতে না পারে।

আমি সঙ্গে সঙ্গে দৌড় দিয়ে পুলিশ আনতে গেলাম। কিন্তু পুলিশ রাজিই হলো না। শেষে বললাম, ‘সন্ত্রাসী না পেলে আমাকে মাসের জন্য জেলে ঢুকিয়ে দিয়েন।’ পুলিশের ঠোঁটে একটা হাসির রেখা দেখা দিল। মনে হলো, জন্মের পরই তার ইচ্ছা হয়েছিল একটা বাচ্চাকে জেলে ঢোকানোর আর আজ তা পূরণ হতে চলেছে।

আমার কথামতো তারা দুই প্লাটুন পুলিশ দিয়ে পুরো বাড়ি ঘেরাও করে দুটো গুলি করল। ভেতরে পুলিশদের সঙ্গে আমিও ঢুকি। ঢুকে দেখি অনেকগুলো বাচ্চা হাত পা বাঁধা অবস্থায় হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছে। তাদের মুখ বাঁধা, আরও ১৬-১৭ জন গুন্ডাও বসে রয়েছে। সবার মুখে আতঙ্কের ছাপ। মনে হলো তারা কিছু দেখেছে যা তাদের দেখা উচিত ছিল না। মানে ভয়ংকর কিছু। কিন্তু সলু একটা চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে রয়েছে এবং মুচকি মুচকি হাসছে। কোনো ভয়ানক জিনিস দেখে কেউ যদি হাসে তাহলে ঠিক এভাবে হাসবে। ঘরের কোণে থাকা একটি গর্ত দেখিয়ে বলল, সর্দার অব পাচারকারী এই সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়েছে। তার পায়ে আমি এয়ারগান দিয়ে গুলি করেছি। বেশি দূর যেতে পারবে না। পুলিশরা খুশি হলো কারণ এই ঘটনার পর তাদের প্রমোশন কেউ আটকাতে পারবে না। সলু ওখান থেকে বেরিয়ে গেল এবং আমিও পেছন পেছন গেলাম। গিয়ে বললাম, ‘যদি পালিয়ে যায়?’

‘পালাবে না। তার পা থেকে রক্ত পড়ছে।’

‘আর ওই বাচ্চাগুলোকে নিজেদের বাসায় কে পাঠাবে?’

‘পুলিশ! তা ছাড়া আবার কে? আর সব ব্যাপার বাচ্চাদের থাকতে হয় না।’

‘কিন্তু তুই ভেতরে কী করলি?’

‘আমি শুধু এয়ারগান দিয়ে জানালার বাইরে থেকে একজনকে গুলি করেছি আর ভাগ্য ভালো যে সেই ছিল সর্দার।

কিন্তু সবাই ও রকম ভয়ার্ত অবস্থায় কেন ছিল?’

‘ও কিছু না।’

‘আমি কি ভাবছি জানিস?’

‘কী?’

‘তোর অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে যাব।’

কথাটা বলার মাঝেই সে একটা পেয়ারাগাছে উঠে আমার মাথার ওপর একটা পেয়ারা ফেলল। আর বলল, নিউটনের মাথায় আপেল পড়ার কারণে সে মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কার করেছিল আর তোর মাথায় পেয়ারা পড়ার কারণে তুই গল্প লেখা শুরু করবি। বুঝলি?’ (ওই দিন কথাগুলোর মানে বুঝিনি, কিন্তু আজ গল্পটা লেখার সময় বুঝতে পারছি।) এই বলে সে সামনের মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখল এবং আবার সেই মুচকি হাসি দিল। আমি দুপুরে স্পষ্ট রোদের আলোতে দেখলাম কতগুলো মুণ্ডুহীন দেহ! তাদের মুণ্ডু দড়ি দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে, একটা কাঁচা জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলছে। সবাই কেন ভয় পেয়েছিল তা বুঝতে সময় লাগল না। কারণ আমার মুখটাও হানাবাড়ির ভেতরে খুঁজে পাওয়া বাচ্চাদের মতো আতঙ্কিত হয়ে গেল।

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন