‘এই বাবু, এই!’

বাচ্চাটা মনে হয় কথাটা শুনতেই পায়নি। আগের মতোই তাকিয়ে আছে। এবার বিরক্ত লাগল জিনানের। ‘কী অদ্ভুত!’ বিড়বিড় করে জানালা বন্ধ করতে হাত বাড়াল।

এমন সময় চঞ্চল হয়ে উঠল বাচ্চাটা। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল আর চিৎকার করে বলতে থাকল কিছু একটা। জিনান হতভম্ব হয়ে খেয়াল করল, কোনো কথাই সে শুনতে পাচ্ছে না। এমনকি কান্নার শব্দটুকুও নয়।

জিনান জোরে বলে উঠল, ‘কাঁদছ কেন? কী হয়েছে?’

এবার মনে হলো বাচ্চাটা শুনতে পেয়েছে জিনানের কথা। উত্তরে কাঁদতে কাঁদতেই কিছু একটা বলল সে, কিন্তু একটা শব্দও শোনা গেল না। কিছু বুঝতে না পেরে বাচ্চাটার কান্না দেখতে লাগল জিনান। অস্বাভাবিক এই বিষয়ের কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না।

এমন সময় বাচ্চাটা কান্না থামিয়ে দিল। মনে হলো, কিছু একটা শুনে বা দেখে ভয় পেয়েছে। বারবার পেছন ফিরে ঘরের দরজার দিকে তাকাতে লাগল।

ওর দেখাদেখি জিনানও জানালা দিয়ে তাকাল ওই ঘরের দরজায়। মনে হয় দরজার বাইরে আরেকটা ঘর আছে, কিন্তু সেদিকে আবছা অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবে বাচ্চাটাকে দেখে মনে হচ্ছে, কিছু একটা দেখে প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে ও। কারণটা বোঝা গেল না। মনে হয় খুব খারাপ কিছু একটা হচ্ছে। কিন্তু সেটা কী, তা–ও বোঝা যাচ্ছে না। এমন সময় জিনানদের বাসার কলবেল বাজল। মুনতাহাকে নিয়ে আম্মু চলে এসেছে। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা খুলল সে।

আম্মুকে দেখেই জিনান হড় হড় করে বলা শুরু করল, ‘আম্মু জানো, খালি বাসাটায় একটা বাবু! কান্না করে, আসো দেখো।’

জিনানের মা কিছুই বুঝতে পারলেন না, তবু জিনানের সাথে গেলেন। পেছনে পেছনে মুনতাহাও এল।

‘দেখো! এই বাসায়।’

কথা শুনে জানালার বাইরে উঁকি দিলেন জিনানের মা, তাকালেন বাসাটার দিকে। ফাঁকা বাসায় কিছুই তার চোখে পড়ল না। অবাক হয়ে বললেন, ‘কী দেখেছ তুমি, জিনান?’

এবার জিনানের অবাক হওয়ার পালা। আম্মু সরে দাঁড়ালে ও জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, কিন্তু বাচ্চাটার কোনো দেখা পেল না। কোনো কথা না বলে সরে এল জানালা থেকে। জিনান মায়ের দিকে তাকাল।

‘আমি সত্যিই একটা ছোট ছেলেকে দেখেছি, ও কান্না করছিল।’

জিনানের আম্মু কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন জিনানের চোখের দিকে, আরেকবার উঁকি দিলেন জানালায়। তারপর নরম গলায় তার ১২ বছর বয়সী ছেলেকে বললেন, ‘তুমি ভুল দেখেছ, বাবা! মাঝে মাঝে এমন হয়! চিন্তা কোরো না। আর আমি জানালা বন্ধ করে দিচ্ছি, খুলবে না।’

জিনান মাথা নাড়ল। কিন্তু সেদিন রাতে মাঝেমধ্যেই ঘটনাটা মাথায় এল। অনেকবার জানালা খুলে জিনান দেখে নিল বাসাটা, কিন্তু ছেলেটাকে খুঁজে পেল না।

পরদিন বিকেলে স্কুল থেকে বাসায় ফিরে জিনান আবারও বই নিয়ে বসে পড়ল জানালার পাশে। দু–একবার উঁকিও দিল জানালা দিয়ে, কিন্তু খালি বাসাটা আগের মতোই নিশ্চুপ, নীরব। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডুবে গেল বইয়ের পাতায়। একটু পরই আকাশ মেঘলা হয়ে এল। সঙ্গে শুরু হলো ঠান্ডা বাতাস, এসব দেখতে দেখতে বই হাতে নিয়েই জিনান ঘুমিয়ে পড়ল। বৃষ্টি নামতেই ঘুম থেকে জেগে উঠল সে। খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টি ভিজিয়ে দিয়েছে প্রায়। বই তো ভিজে একাকার। দ্রুত জানালা বন্ধ করতে উঠে দাঁড়াল। ঝোড়ো হাওয়া আর তুমুল বৃষ্টির মধ্যেও তার চোখ গেল বাসাটার দিকে।

এবার আরেকটা ছেলে, প্রায় তার বয়সী। বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে আছে ওর জানালার দিকে আর বিড়বিড় করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। ঝড়–বৃষ্টির সাথে অন্ধকার ঘরে একটা ছেলে তাকিয়ে আছে, পুরো বিষয়টা খুবই ভৌতিক। যেটা গ্রাস করল জিনানকে, প্রচণ্ড ভয়ে চিৎকার করে উঠল সে। পুরো শরীর অবশ হয়ে এল তার। জ্ঞান হারানোর আগে সে খেয়াল করল, গতকালের ছোট্ট ছেলেটার মতো কপালে কাটা দাগ এই ছেলেরও আছে।

জিনানের জ্ঞান ফিরল হাসপাতালে। পুরো ঘটনাটা জিনানের মুখ থেকে শুনলেন তিনজন মানুষ। জিনানের আম্মু–আব্বু আর একজন ডাক্তার। দ্রুত এক মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শও নেওয়া হলো, তিনি জিনানকে নানা কিছু বোঝালেও ওই দৃশ্য ভোলাতে পারলেন না। রাতে বাসায় ফিরে আসার পর আব্বু সবার আগে জানালাটা বন্ধ করে বললেন, ‘এখন থেকে এই জানালা আর কেউ খুলবে না।’ তারপর সবাই এমন স্বাভাবিক আচরণ করতে লাগল যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু জিনান কিছু ভুলল না। বারবার তাকাতে লাগল বন্ধ জানালার দিকে।

ঘটনাটা এখানেই শেষ হওয়া উচিত ছিল। কারণ, পৃথিবীতে বহু অদ্ভুত ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে, যেগুলোর ব্যাখ্যা কারও কাছে নেই। সেগুলো থেকে দূরে সরে থাকতে হয়, দূরে সরে থাকাটাই নিয়ম। কিন্তু জিনান দূরে সরে থাকতে পারল না। প্রতিদিন বিকেলে তাকিয়ে রইল জানালার বাইরে, সেই রহস্যময় বাসার দিকে। যেখানে পরপর দুই দিন আরও দুজনকে দেখা গেল। দুজনের কপালেই ছিল কাটা দাগ। তাদের একজন জিনানের চেয়ে কয়েক বছরের বড়, আরেকজন তরুণ। দুজনই অঝোরে কাঁদছিল আর তাকিয়ে ছিল তার দিকে। তবে একটা ব্যাপার লক্ষ করল জিনান। সেটা হলো দুজনের চেহারার অদ্ভুত মিল।

এই ঘটনা দেখে এবার আর সে আগের মতো ভয় পেল না। দৌড়ে গিয়ে আম্মু–আব্বুকেও বলল না, বরং সম্মোহিতের মতো অপেক্ষা করতে লাগল পরের দিনের জন্য। কারণ, ও একটা জিনিস মিলিয়ে নিতে চাচ্ছিল, যার জন্য পরেরজনকে দেখতে হবে।

পরদিন বিকেলে আরেকজনকে দেখে বিচিত্র একটা জিনিস বুঝতে পারল জিনান। একটা ভয়ানক সত্য! যা তার বয়সী বাচ্চার মাথায় ঢুকল না। জানালা দিয়ে আজ যাকে সে দেখেছে, সে তার বাবার বয়সী এক লোক…এবং যথারীতি লোকটার কপালে কাটা দাগ! যে ভয়াবহ সত্যটা সে টের পেয়েছে, সেটা হলো প্রথম দিন সে যে ছোট্ট ছেলেটাকে দেখেছে আর আজ যে লোকটাকে দেখছে, তারা একই মানুষ। মাঝে যাদের দেখেছে, তারাও একই মানুষ। শুধু প্রতি রাতে তাদের বয়স বেড়েছে।

দম বন্ধ হয়ে এল জিনানের! দ্রুত জানালা বন্ধ করে দিল সে। কিছু সময় চুপচাপ জানালার পাশে বসে থেকে সিদ্ধান্ত নিল, বাসাটায় যাবে সে। নিশ্চয়ই কেউ একজন বাসাটায় আছে, যার সাথে এসব হচ্ছে, তার সাথে কথা বলতে হবে। ঘড়ির দিকে তাকাল ও, আম্মু মুনতাহাকে নিয়ে বাসায় ফিরবে প্রায় ৩০ মিনিট পর। এর মাঝে বাসাটা ভালোমতোই দেখে আসা যাবে। কারণ, বিল্ডিংটা তাদের বাসার ঠিক সাথেই, আর বাসাটা যে তিনতলায়, সেটা জানে ও।

নিজেদের বাসার চাবি হাতে নিয়ে রাস্তায় নামল জিনান। ঢুকে পড়ল বিল্ডিংয়ের গেট দিয়ে। কেউ তাকে আটকাল না দেখে একটু অবাকই হলো। বিল্ডিংয়ে কোনো সাড়াশব্দ নেই। চারপাশ একবার দেখে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল তিনতলায়। কিন্তু ঝামেলা বাধল এই সময়। তিনতলায় বাসা আছে দুটো, কোনটায় ঢুকবে, এটা বোঝা যাচ্ছে না। কোনো বাসাতেই তালা নেই। তার মানে কোনো বাসা খালি নয়, কেউ না কেউ থাকেই এই দুই বাসায়। তাহলে সে কোন বাসায় যাবে? কী বলবে? যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে সে কেন এসেছে? এটা তো বলা যাবে না, ‘আপনাদের বাসায় একটা বাচ্চা ছেলে অনেক দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে।’

কী করবে, বুঝতে না পেরে কিছুক্ষণ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকল জিনান। এরপর হতাশ হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। এমন সময় একটা বাসার দরজা খুলে গেল। সিঁড়িতে থমকে দাঁড়াল জিনান। তাকিয়ে রইল দরজায়। কিন্তু কেউ বের হয়ে এল না। অধৈর্য হয়ে সে এগিয়ে গেল দরজার দিকে, গিয়ে দেখল সামনে কেউ দাঁড়িয়ে নেই।

জিনান ঠিক করল, একবার উঁকি দেবে বাসাটায়, তাহলেই বোঝা যাবে, এটা সেই বাসা কি না, যেটা ওর জানালা দিয়ে দেখা যায়। কিন্তু জিনান উঁকি দেওয়ার আগেই বাসাটা থেকে তার আম্মু উঁকি দিল, ‘বাবা, তুমি বাইরে কী করছ?’

জিনান কোনো জবাব দিতে পারল না, হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।

সে নিশ্চিত এটা তার মা। কিন্তু কিছু একটা মিলছে না।

‘ঘরে আসো, জিনান,’ বলতে বলতে জিনানের হাত ধরল তার মা।

এবারও জিনান কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইল। ভালোমতো দেখল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তার মাকে। বুঝতে পারল কী মিলছে না। সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে তার মায়ের মতো দেখতে, কিন্তু মোটেই তার মা নয়।

ভয় পেয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল জিনান। অসহায় হয়ে বলতে চাইল, ‘আম্মু, এটা কি তুমি?’

কিন্তু তার মুখ দিয়ে শুধু অস্ফুট একটা আওয়াজ বের হলো।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কোনো কিছু না বলে জিনানকে টেনে ঘরে ঢুকিয়ে ফেলল, বন্ধ করে দিল দরজা। তারপর হাসতে হাসতে বলল,

‘কোনো ভয় নেই, জিনান। এই তো আম্মু।’

সেই ভয়ংকর হাসি দেখে জিনান কোনো ভরসা পেল না। শুধু অপ্রকৃতিস্থের মতো বিড়বিড় করে বলল,

‘আমি আম্মুর কাছে যাব।’

ছোট্ট মুনতাহা তার ভাইয়ার রুমের জানালার পাশে বসে আছে। দুই দিন ধরে তার ভাই নিখোঁজ, আম্মু–আব্বু দুজনই ছুটে বেড়াচ্ছে রাস্তায় রাস্তায়। মুনতাহা ঘরে তার এক খালার সাথে থাকছে। এত বড় সমস্যাটা তাকে স্পর্শ করছে না। সে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। এমন সময় সে দেখতে পেল পাশের বিল্ডিংয়ের বাসাটায় একটা ছোট ছেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মুনতাহা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ডাক দিল,

‘এই বাবু, এই!’

কিন্তু ছেলেটা কোনো কথা বলল না। ছেলেটাকে ভালোমতো দেখল মুনতাহা, তার মনে হলো ছেলেটাকে সে কোথায় যেন দেখেছে। একটু চিন্তা করতেই সে বুঝতে পারল। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল,

‘আমাদের বাসায় তোমার ছবি আছে, দেখবে?’

বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে তাদের ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে একটা ছবি নিয়ে এল। আম্মু বলে এটা নাকি ফ্যামিলি ফটো। কিন্তু মুনতাহা এটার মানে বোঝে না। ছবিতে পাশের ওই বাসায় দেখা ছেলেকে কোলে নিয়ে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছে, আরেকটা ছোট্ট বাবুকে তাঁর মা কোলে জড়িয়ে রেখেছে।

জানালার কাছে ছবিটা নিয়ে গেল সে ছেলেটাকে দেখানোর জন্য। কিন্তু তাকিয়ে দেখল, ঘরে আর ছেলেটা নেই।

মুনতাহা ইতিউতি করে খুঁজল ছেলেটাকে, কিন্তু খালি ঘরটায় ছেলেটা নেই। মন খারাপ করে সে শুয়ে পড়ল জিনানের খাটে। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়েও গেল। ঘুমের মধ্যেও সে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখল ছবিটা, যে ছবিতে চার বছর বয়সী ছোট্ট জিনান তার সব কটা দাঁত বের করে হাসছে।