মোটরদা

অলংকরণ: সাঈফ মাহ্‌মুদ

চায়ের দোকানের সামনে প্রায় নিঃশব্দে এসে থামল তিনটা গাড়ি। দুটি পাজেরো, মাঝখানে ল্যান্ড ক্রুজার। পাজেরো থেকে যে নেমে এল, তার গায়ের স্যুট, চোখের সানগ্লাসও গাড়ির মতোই ঝা–চকচকে।

‘সামনে একটা গ্যারেজ আছে না?’ প্রশ্নটা শোনাল ধমকের মতো।

চায়ের দোকানে টিভি চলছে। ভেতরে লোকজন তেমন নেই। দোকানদার নির্বিকার ভঙ্গিতে কাপ ধুতে থাকলেন। যেন প্রশ্ন শুনতেই পাননি।

পাজেরোর আরোহী এ রকম আচরণে অভ্যস্ত নয়। স্যুটের বাঁ দিকটা আলতো করে পেছনে সরিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল সে। আসলে কোমরে গোঁজা রিভলবারটা দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। আবারও একই প্রশ্ন, ‘আছে? গ্যারেজ?’

আড়চোখে রিভলবার দেখেও দোকানদারের ভাবভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হলো না। তার এখানে বসে যারা চা খায়, তাদের অনেকের কোমরেই ওসব গোঁজা থাকে। তবে এবার তিনি উত্তর দিলেন, ‘সোজা চার কিলো গেলে দেখবেন বাঁয়ে একটা রাস্তা ঢুকছে। মোটরদার গ্যারেজ বললে দেখায় দিবে।’

‘কী দা?’

‘মোটরদা।’

‘দোকানের নাম কী?’

‘নাম নাই। মোটরদা বললে সবাই চিনে।’

পাজেরোর আরোহী গাড়ির দিকে ফিরে যাচ্ছিল। দোকানদারের কথা শুনে তাকে থমকে দাঁড়াতে হলো, ‘মোটরদা কিন্তু সব গাড়ি দেখে না।’

‘মানে?’

দোকানদার কিছু বলে না। হাসে।

দুবার ভ্রুম ভ্রুম শব্দ করে গাড়িটা স্টার্ট হলো ঠিকই, কিন্তু কাঁপতে থাকল থরথর করে। যেন এখনই বন্ধ হয়ে যাবে। মোটরদা তখন স্টিয়ারিং ধরে বসে আছেন। সামনের ডেকের কাছে কান পেতে তিনি বললেন, ‘ব্যথা কোথায় রে বাবা?’ অ্যাকসিলারেটরে আলতো চাপ দিতে দিতে মোটরদা গাড়ির একেক জায়গায় হাত রাখেন আর মৃদু গলায় কথা বলেন, ‘এদিকে ব্যথা করে?...এখানে?...হুম।’ যেন ডাক্তার রোগী দেখছেন।

অবাক হয়ে লোকটার কাণ্ডকীর্তি দেখছিল ফয়সাল। ‘এই দোকানে আসা ভুল হলো না তো? এসব বুজরুকি দেখিয়ে ব্যাটা নির্ঘাত বিরাট একটা বিল ধরিয়ে দেবে।’ মনে মনে ভাবে সে।

ঘুরে ঘুরে গাড়ির আরও কিছু জায়গায় হাত রাখলেন মোটরদা। গাড়ির সঙ্গে কথা বললেন নিচু গলায়, কান পেতে শুনলেন। সহকারী ইসমাইলের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কী যেন বলে ঢুকে গেলেন নিজের খুপরিতে।

‘রেডিয়েটরের ফ্যান খারাপ। সময় লাগবে। একটু বসেন।’ বলল ইসমাইল।

ফয়সাল সন্দিহান চোখে তাকায়। ‘কত টাকা লাগবে?’

‘টাকা লাগবে না।’

ফয়সাল এবার আরও ভয় পেয়ে যায়। বড় ধুরন্ধরের পাল্লায় পড়া গেল তো!

‘কেন!’

‘ওই বাবলু, ফ্যানটা খোল।’ বলতে বলতে ফয়সালকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে ইসমাইল, ‘এলাকায় প্রথম আসছেন?’

‘হ্যাঁ,’ বলেই ফয়সাল নিজেকে শুধরে নেয়, ‘ইয়ে মানে…আমি প্রথম আসছি। কিন্তু আমার এক বন্ধু থাকে কাছেই। এখানকার লোকাল। পলিটিকস করে। খুব পাওয়ারফুল।’ ফয়সালের কথা শুনে বোঝা যায়, মিথ্যা কথা সে খুব ভালো বলতে পারে না।

রেডিয়েটরের ফ্যান ততক্ষণে বাবলুর হাতে চলে এসেছে। ফিক করে হেসে সে বলে, ‘এই এলাকায় যত পাওয়ারফুল লোক আছে, সব মোটরদার…’ ফ্যানের দিকে ইঙ্গিত করে সে কথার বাকি অংশ বুঝিয়ে দেয়।

হেসে বাবলুর মাথায় চাটি মারে ইসমাইল, ‘দাদা সব গাড়িতে হাত দেয় না। যারা গাড়ির যত্ন করে, গাড়ির লগে যাগো পেয়ার–মহব্বত আছে, শুধু তাগো গাড়ি দেখে। আর কাউরে পছন্দ হইলে সার্ভিস ফ্রি।’

‘আমাকে পছন্দ করার কী হলো? আমার তো তার সাথে কথাই হয় নাই।’

‘কথা আপনি বলবেন ক্যান? কথা বলবে আপনার গাড়ি।’

ফয়সাল আরও বিভ্রান্ত হয়।

ইসমাইল তাকে আশ্বস্ত করে, ‘আর দশটা গ্যারেজের সার্ভিস আর আমাগো সার্ভিস এক না। নরসিংদী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম থেইকাও মাইনষে গাড়ি নিয়া মোটরদার কাছে আসে। আপনার গাড়ির আরও কিছু কাজ আছে। কইরা দিতেছি। বসেন। ঘাবড়াইয়েন না। টাকা লাগবে না।’

বাবলু একটা গাড়ির টায়ার এগিয়ে দেয়। টায়ারটা যে বসার জন্য দেওয়া হয়েছে, বুঝতে ফয়সালের একটু সময় লাগে।

বেচারা এমনিতেই থতমত খেয়ে আছে। তাকে আরও অবাক করে দিয়ে ঠিক তখনই গ্যারেজের সামনে এসে থামে পাজেরো আর ল্যান্ড ক্রুজারের ছোটখাটো বহর। প্রথমেই পাজেরো দুটি থেকে নেমে আসে ৮-১০ জন সশস্ত্র বডিগার্ড। আশপাশটা একনজর দেখে ল্যান্ড ক্রুজারের দরজা খুলে দেয় একজন। ভেতর থেকে ধীরেসুস্থে নেমে আসে শেখর রাজ। কুখ্যাত ভূমিদস্যু। হাতে চুরুট। সব কটি আঙুলে আংটি। গায়ে একটা হাওয়াই শার্ট।

লোকটাকে দেখেই চট করে দাঁড়িয়ে যায় ফয়সাল। মুখ হাঁ হয়ে যায় তার। কিছু একটা বলতে নিয়েও গিলে ফেলে।

হঠাৎ করেই পরিবেশটা কেমন গুমোট হয়ে গেছে।

মুখোমুখি রাখা হয়েছে দুটি চেয়ার। তুলনামূলক ভালো চেয়ারটায় বসেছে শেখর রাজ। মুখে একচিলতে হাসি নিয়ে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মোটরদার দিকে।

শেখরকে ঘিরে দাঁড়ানো বডিগার্ডরা প্রত্যেকেই সশস্ত্র, পেটানো শরীর। সে তুলনায় গ্যারেজের ছেলে–ছোকরারা সব হ্যাংলা–পাতলা। তবু রেঞ্চ, হাতুড়ি বা প্লায়ার্স হাতে যে যার জায়গায় শক্ত মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে ওরা। বোঝা যায়, মোটরদার গায়ে একটা আঁচড় পড়লে ওরাও ছেড়ে কথা বলবে না।

মোটরদার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়েছে ইসমাইল। হাত দুটি পেছনে। এক হাতে একটা বড় স্ক্রু ড্রাইভার শক্ত করে ধরা।

ফয়সাল ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, সে কি চলে যাবে, না বসে থাকবে। তার গাড়ির কলকবজা সব খোলা হয়ে গেছে। নইলে সে এখনই পালাত। অবশ্য কী হয়, সেটা দেখার লোভও সংবরণ করা যাচ্ছে না।

‘তাইলে আপনিই মোটরদা?’ শেখর রাজই প্রথমে মুখ খোলে। ইসমাইলের দিকে একনজর তাকিয়ে বলে, ‘আর এইটা কে? মোটরশুঁটি?’

বিশ্রীভাবে হাসে লোকটা।

‘শুনলাম, আপনি নাকি গাড়ির ডাক্তার? আপনারে নিয়া তো গল্পের অভাব নাই। আমার একটা ছোটখাটো গাড়ি, ডাক্তার সাব। সকাল থেইকা এসিটা ঠান্ডা হইতেছে না। মনে হয় বদহজম। গ্যাস্ট্রিক।’ বলেই আবার সেই বিশ্রী হাসি।

মোটরদা শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু ইসমাইল চুপ থাকতে পারে না, ‘আপনার না পোষাইলে অন্য গ্যারেজে যান।’

ভ্রুক্ষেপও করে না শেখর রাজ। ‘আপনি নাকি সব গাড়ি দেখেন না?’

উঠে দাঁড়ায় সে। একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে হেঁটে যায় ল্যান্ড ক্রুজারটার কাছে। বনেটের ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে বলে, ‘একটা কথা কনফার্ম করে বলতে পারি, ডাক্তার সাব। গাড়ি আমার মতো কেউ ভালোবাসে না। এই গাড়ি...আমি এখনো নিজের হাতে ধুই। প্রতিদিন। কত রকম ময়লা লাগে গাড়িতে। ধুলাবালি, কাদা...রক্ত!’

‘আপনারে বললাম না…’ ইসমাইল কথা শেষ করতে পারে না। রীতিমতো হুংকার দিয়ে ওঠে শেখর, ‘অ্যাই চোপ! একদম চোপ! আর একবার যদি মুখ খুলোছ…কোটর থেইকা মোটর বাইর কইরা ফালামু, শালা...’

বডিগার্ডদের হাতে পিস্তল উঠে আসে। গ্যারেজের ছেলেরাও ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল। হাত তুলে ওদের থামতে বলেন মোটরদা।

শেখর রাজ নিজেকে সামলে নেয়। হাসে।

‘বাকি কথা গাড়ির ভিতরে বইসা বলি, ডাক্তার সাব? আমার গাড়ির সিটগুলা ভালো। নরম, বিছানার মতো।’ ঠোঁটের কোনায় ফিচেল হাসি নিয়ে যোগ করে শেখর, ‘মজা করার সময় মাইয়াগুলা যে তা–ও কেন এত চিল্লায়, বুঝি না…’

ফয়সাল বুঝতে পারে, লোকটা সম্পর্কে যা যা শুনেছে, মিথ্যা না। পত্রিকায় পড়েছে, এই গাড়িই তার টর্চার চেম্বার। খুন, অপহরণ—সব হয় এর ভেতরে। দামি গাড়িটার দিকে তাকিয়েই ফয়সালের গায়ে কাঁটা দেয়।

গেটের সামনে লোক জড়ো হয়ে গেছে। এলাকার মানুষ, আশপাশের দোকানদার, শ্রমিক…মজা দেখতে এসেছে, তা নয়। তারা সবাই মোটরদার কাছে কোনো না কোনোভাবে ঋণী। ভক্তও বলা যায়। ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বলে, ‘মোটরদা, কোনো সমস্যা?’ বলতে বলতে শার্টের হাতা গোটায়। ‘গ্যাঞ্জাম’ করার জন্য প্রস্তুত।

মোটরদা মুচকি হাসেন। শেখর রাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলেন, ‘মানুষ আর গাড়ির মধ্যে মিল কই জানেন? দুইটারই সবচেয়ে জরুরি জিনিস হইল ব্রেক। খালি ছুটাইলে হবে না, ব্রেক করা জানতে হবে। সময়মতো ব্রেক ধরতে না পারলে...’

মোটরদা কথা শেষ করেন না। চোখের ইশারায় ইসমাইলকে যা বলার বলে দেন। দুজনের এই এক বিস্ময়কর কমিউনিকেশন সিস্টেম!

‘আজকে হবে না। গাড়ি রেখে যান, কালকে নিয়ে যাবেন,’ ইসমাইল বলে।

‘আরে গাড়ি তো দেখলই না…’ তর্ক করতে যাচ্ছিল শেখর রাজের ড্রাইভার।

শেখর তাকে থামিয়ে দেয়।

‘থাক, চাবি দিয়ে দে।’

চলে যাওয়ার আগে আরেকবার মোটরদার মুখোমুখি দাঁড়ায় শেখর।

‘আপনারে আমার পছন্দ হইছে, ডাক্তার সাব। গাড়ির রোগ ধরতে পারেন আর না পারেন, আপনি আমার রোগ ধরতে পারছেন। আমার ব্রেকে সমস্যা। ব্রেকিং ব্যাড!’

আবার সেই বিশ্রী হাসি।

‘দাদা, আপনি ঘুমান নাই!’

গভীর রাতে মোটরদাকে ল্যান্ড ক্রুজারটার পাশে দেখে খুব অবাক হয় ইসমাইল। রাত ১০টার পর তো লোকটা কখনো জেগে থাকে না।

মোটরদাকে দেখে মনে হয়, গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন। গাড়ির গায়ে হাত বুলিয়ে বলেন, ‘৩৮ বছর…গত ৩৮ বছরে এমন গাড়ি আমি পাই নাই।’

‘কী কয় গাড়ি?’

‘এইটাই তো ঝামেলা। বড় আজব ব্যাপার ইসমাইল। গাড়ির সব ঠিক আছে। চকচক করতেছে। কিন্তু গাড়ি কোনো কথা কয় না।’

‘কী কন!’

‘গাড়ির জান আছে কিন্তু কথা কয় না। এমন তো আমার সাথে কোনো দিন হয় নাই। আমি কি শেষ হয়া গেলাম…?’

‘ধুরো মোটরদা। আপনি কী আবোলতাবোল কন।’

‘আমার মনে হয় সময় শেষ হয়া আসতেছে রে…’

‘চুপ করেন তো। যান, আপনি যান। এই গাড়ি আপনার ধরা লাগব না। এইটা আমি দেখতেছি। ক্যান যে এইটা রাখতে গেলেন…’

‘আমি আর কয় দিন? সব তো তোরই দেখতে হবে।’

‘আহ বাদ দেন না। চলেন, ঘরে চলেন।’ বলতে গিয়ে ইসমাইলের চোখে কেন যেন পানি চলে আসে। মোটরদাকে নিয়ে লোকে নানা কথা বলে। কেউ বলে ডাক্তার, কেউ বলে জাদুকর। কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকে মোটরদার দিকে তাকালে একটা শব্দই ঘুরেফিরে এসেছে ইসমাইলের মাথায়।

‘বাবা!’

সে রাতে মোটরদার ঘুম হয় না। অনেক রাত পর্যন্ত তিনি শুনতে পান, গ্যারেজে খুটুর–খাটুর শব্দ হচ্ছে। ‘থাক, যা করার ইসমাইলই করুক,’ ভেবে ঘুমানোর চেষ্টা করেন তিনি।

অবিশ্বাস্য ব্যাপার! যে মোটরদা কোনো দিনই গ্যারেজের ছেলেপুলের সঙ্গে উঁচু গলায় কথাও বলেননি, তিনিই কিনা চড় মেরে বসলেন! তা-ও তার ডান হাত ইসমাইলের গালে!

ছেলেরা হতভম্ব হয়ে দেখে, রাগে থরথর করে কাঁপছেন লোকটা। ঘটনা কী হয়েছে, ওরা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

সকাল থেকেই মোটরদা কেমন অন্যমনস্ক ছিলেন। কাজে মন দিতে পারছিলেন না। দুপুরে শেখরের লোকজন এসে গাড়ি নিয়ে গেছে। মোটরদা তার কাচঘেরা ঘর থেকে বেরও হননি। সব ইসমাইলই সামলেছে।

বিকেলে হঠাৎ কী এমন হলো?

একটা ফোন এল মোটরদার কাছে। আর তারপরই এই ঘটনা।

মোটরদা গটগট করে হেঁটে তার পুরোনো ভক্সওয়াগনে গিয়ে বসলেন। চড় খেয়েও পেছন পেছন ছুটে গেল ইসমাইল। ‘দাদা, আমি আসব?’

‘না!’

শাঁই করে বেরিয়ে গেল ভক্সওয়াগনটা।

ইসমাইল কথা শুনল না। একটা মোটরসাইকেল নিয়ে সে-ও গেল মোটরদার পিছু পিছু।

থানার ওসি মোটরদার পরিচিত। পুলিশের গাড়িগুলোর টুকটাক সমস্যা হলে মোটরদার গ্যারেজেই পাঠানো হয়।

টেবিলে চা আর বিস্কুট দেওয়া হয়েছে। মোটরদা বসে আছেন ওসির সামনে। ইসমাইল পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নিচু করে আছে সে।

চায়ে চুমুক দিয়ে বলে ওসি, ‘কিছু মনে করবেন না, দাদা। এমনি...রুটিন ইনভেস্টিগেশন। আর ওপর মহলের কাছের লোক, বোঝেনই তো। অবস্থা ভালো না।’

‘বাঁচবে?’ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করেন মোটরদা।

‘মনে হয় না।’ ওসি দুই দিকে মাথা নাড়ে।

মোটরদা ঘুরে ইসমাইলের দিকে তাকান। সে বেচারা পারলে মাটির ভেতরে ঢুকে পড়ে।

‘গাড়িটা একবার দেখতে পারি?’ মোটরদা বলেন।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ। চলেন।’

চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই, সকালেও গাড়িটা ঝা–চকচকে ছিল। প্রায় পুরো গাড়িটাই ঝলসে গেছে। সামনের অংশটা দুমড়েমুচড়ে গেছে বাজেভাবে। দেখেই বোঝা যায়, গাড়ির আরোহীদের যে হাসপাতাল পর্যন্ত নেওয়া গেছে, এ-ই অনেক।

‘আশপাশের লোকজন বলল, হঠাৎ করে আগুন ধরে গেছিল। ড্রাইভার কন্ট্রোল করতে পারে নাই। সোজা একটা গাছের সাথে গিয়ে ধাক্কা লাগছে। ব্যস।’

ওসির কথা শুনে চট করে ইসমাইলের দিকে একবার তাকালেন মোটরদা। ইসমাইল মাথা নিচু করে ফেলে। ব্যাপারটা ওসির নজর এড়ায় না।

‘সকালে তো আপনার গ্যারেজ থেকেই বের হইছিল। কোনো সমস্যা দেখছিলেন নাকি?’

‘নাহ। ওই এসিতে একটু ঝামেলা ছিল...’ মোটরদার গলার স্বর অপরাধীর মতো শোনায়।

 ‘গাড়ির কাজ করছে কে?’

‘আমি।’ ঝটপট বলেন মোটরদা। ইসমাইল অবাক হয়ে তাকায়।

এবারও ব্যাপারটা খেয়াল করেন ওসি। ‘না মানে...অ্যাকসিডেন্ট হইতেই পারে। তবু একটা তদন্ত তো হবেই। বোঝেনই তো। আর শেখর রাজের বডিগার্ড, মানে অন্য গাড়িতে যারা ছিল...ওরা বলতেছিল আপনার সাথে নাকি গতকাল একটু ঝামেলা হইছে…’

‘ওটা তেমন কিছু না।’

এই সময় ওসির কাছে ফোন আসে। ‘জি স্যার, জি স্যার…’ বলতে বলতে একরকম তটস্থ হয়ে ফোন কানে নিয়ে একটু দূরে চলে যান তিনি।

মোটরদা ধীরপায়ে গাড়িটা এক চক্কর ঘুরে দেখেন। পেছন পেছন ইসমাইল। কেউ কাউকে কিছু বলছে না। কিন্তু মোটরদা জানেন, ইসমাইল কাজটা ইচ্ছা করেই করেছে।

ভাঙা, পোড়া দরজাটা খুলে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসেন মোটরদা। আলতো করে স্টিয়ারিংয়ে হাত বোলান। হঠাৎই তার ভ্রু কুঁচকে যায়। স্টিয়ারিংয়ের খুব কাছে গিয়ে কী যেন শোনার চেষ্টা করেন।

চোখভরা বিস্ময় আর মুখে আলতো হাসি নিয়ে মোটরদা বলেন, ‘কয়! কথা কয়!’

মুহূর্তে ইসমাইলের মুখ থেকে ভয়–ডর-দুঃখ সব উধাও হয়ে যায়। দাঁত বের করে হাসে সে।