জোয়েল স্টেইনকে যে কারণে হাসপাতালে যেতে হলো
আমার বস জোয়েল স্টেইনকে আমি ঘৃণা করি। অনেক অনেক ঘৃণা। একটা মানুষ কীভাবে এত নীচ আর কুটিল হতে পারে? তবে আজ সকাল পর্যন্ত তাকে আমি বেশ পছন্দই করতাম। অসাধারণ মেধাবী একজন প্রোগ্রামার, দারুণ কর্মঠ আর হাসিখুশি মানুষ জোয়েল। তাকে পছন্দ না করার কোনো কারণ নেই, থাকতে পারে না। অফিসের সবাই তাকে পছন্দ করে। সত্যি কথা বলতে কী, তার মতো একজন বস পাওয়া ভাগ্যেরই ব্যাপার। প্রোগ্রামিংয়ের মতো গেমিংয়ের বাজারটাও অসম্ভব ভালো বোঝে জোয়েল। বলা যায়, একক প্রচেষ্টায় সে আমাদের এই গেমিং প্রতিষ্ঠান রোভিও এন্টারটেইনমেন্টকে ব্রাজিলে তো বটেই, পৃথিবীরই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন অফিস ফিনল্যান্ডে হলেও মূল কাজকর্ম সব হয় এই রিওতে। এখানে বসেই আমরা বানিয়েছি আমাদের ব্লক বাস্টার গেম ‘অ্যাংরি বার্ডস’। এটি এখনো বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় একটি গেম। আর এর ‘রিও সংস্করণ’-এর মূল প্রোগ্রামার হিসেবে আমার একটা গোপন গর্বও আছে।
তবে জোয়েলের সঙ্গে আমার অনেক অমিল থাকলেও মিল আছে কয়েকটি জায়গায়। আমার মতো জোয়েলও গেম পছন্দ করে, গেম নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে আর ভালোবাসে ফুটবল। তবে কাজের চাপে ফুটবল নিয়ে তার সঙ্গে খুব একটা আলাপ করা হয়ে ওঠে না। লাঞ্চের সময় ক্যাফেটেরিয়ায় যখন তাকে অন্যদের সঙ্গে ফুটবল নিয়ে তুমুল তর্ক করতে দেখি তখন মাঝে মাঝে সেখানে যোগ দিই। লাঞ্চ শেষ হলেই আবার কাজে ফিরে আসি। কারণ, আমি ডেডলাইন মিস করতে চাই না। তার ওপর এবার নিজের দেশে বিশ্বকাপ শুরু হতে হচ্ছে। কাজেই কিছু কাজ ডেডলাইনের অনেক আগেই শেষ করে রাখতে চাই। তারপর আরাম করে খেলা দেখব। এ সুযোগ বারবার আসে নাকি জীবনে!
তবে কয়েক দিন আগের এক সকালে জোয়েল আমাকে তার রুমে ডেকে নিয়ে যে খবরটি দিল তাতে আমি প্রথমে খুশিতে লাফ দিয়ে উঠলেও একটু পরে হতাশায় মুষড়ে পড়লাম। গুগলের সঙ্গে রোভিওর ‘প্রোগ্রামার এক্সচেঞ্জ’ প্রোগ্রাম আছে একটা। প্রতি ছয় মাস অন্তর আমাদের একজন প্রোগ্রামার গুগলে যায় আর গুগল থেকে একজন এখানে আসে। এই প্রোগ্রামে যাওয়ার ইচ্ছা আমার দীর্ঘদিনের। আমি এখনো যথেষ্ট সিনিয়র না হওয়ায় সুযোগ পাচ্ছিলাম না। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কীভাবে পেলাম সেটা বুঝতে পারছিলাম না। জোয়েল আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলল, অভিনন্দন পাওলো। তোমার কাজের মান বিবেচনা করে এইচআর ডিপার্টমেন্ট সময়ের অনেক আগেই এ বছরের জুন-ডিসেম্বর টার্মে তোমাকে এই প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত করেছে।
একদিকে বিশ্বকাপ আরেক দিকে গুগল। কি করব আমি? হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছি জোয়েলের দিকে। আমার অবস্থাটা বুঝতে পেরেই যেন জোয়েল বলল, আবার কিন্তু কিন্তু কিসের? যাও যাও, অভিনন্দন। দেখো গুগলের অভিজ্ঞতা তোমার জীবনটাকেই পাল্টে দেবে। গুগলেই কিন্তু থেকে যেয়ো না আবার। বলে হাসল কিছুক্ষণ। আর হ্যাঁ, ভিসার কাগজপত্রের জন্য এইচআরে যোগাযোগ করো। সব বলা আছে।
পরের কয়েকটা দিন অনেক দৌড়াদৌড়িতে কাটল আমার। এইচআর আর এম্বাসি করে অনেক অভিজ্ঞতাও হলো। তবে চলমান প্রজেক্ট কাকে কীভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছি, এ বিষয়ে কথা বলার জন্য আজকে সকালে জোয়েলের রুমে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম আমি। জোয়েল কার সঙ্গে জানি হেড ফোনের বদলে স্পিকার দিয়েই স্কাইপে কথা বলছে। ভাবলাম একটু পরে ঢুকি। কিন্তু জোয়েলকে আমার নাম উচ্চারণ করতে শুনে আড়ি পাতার লোভ সামলাতে পারলাম না। তবে না শুনলেই সম্ভবত ভালো করতাম। তাহলে আর জোয়েলকে এত ঘৃণা করতাম না। জোয়েল তার প্রিয় বন্ধু রিকার্ডোর সঙ্গে কথা বলছে:
—হা হা হা। সেটাই তো বলছি রিকার্ডো, কেল্লা ফতে। টিকিট পেয়ে গেছি আমি সেমিফাইনালের।
—কিন্তু কীভাবে জোয়েল? এখন তো টিকিট সেল হচ্ছে না। কেউ পেলে সেও তো সেল করছে না।
—আরে বুদ্ধি থাকলে কী না হয়। সেল করবে না মানে, বাপ বাপ করে সেল করবে। বুদ্ধি বুঝেছ, বুদ্ধি!
—আরে এত ঢং না করে বল তো কীভাবে পেলি?
—অফিসেই পেলাম। হা হা হা হা।
—অফিসে? কে দিল তোকে?
—আরে এমনি এমনি কেউ দেয় নাকি? ঘিলু খাটাতে হয়েছে এ জন্য। ঘিলু বুঝেছ, ঘিলু।
—আরে বুঝলাম তো, ঘটনা কী সেটা বল?
—ধীরে রিকার্ডো ধীরে! তুই তো জানিস, নানানভাবে সবগুলো টিকিট ম্যানেজ করতে পারলেও সেমিফাইনালের টিকিট অনেক চেষ্টা করেও ম্যানেজ করতে পারিনি আমি। কিন্তু এটা কি হয়, আমার দেশে বিশ্বকাপের এত বড় আসর বসবে আর আমি সেমিফাইনাল দেখতে পারব না। এ হয় নাকি? শেষে একটা বুদ্ধি মাথায় এল। রোজালিনকে বললাম, এই অফিসে কার কাছে সেমিফাইনালের টিকিট আছে, খোঁজ লাগাও। শুধু টিকিটধারীর নামটা দাও আমাকে।
—রোজালিন মানে তোর সুন্দরী অ্যাসিস্ট্যান্ট রোজালিন?
—হ্যাঁ, রোজালিন। কাজের আছে মেয়েটা। দুই ঘণ্টার ভেতর সে খবর নিয়ে এল আমাদের পাগলা প্রোগ্রামার পাওলোর কাছে নাকি একটা টিকিট আছে। কনফার্ম। কিন্তু তার যা স্বভাব, গুলি করে ঘিলু উড়িয়ে দিলেও সে এই টিকিট কাউকে দেবে না।
—না দেওয়ারই কথা। আমি পাওলোকে চিনি। তোর মতোই বড় ফুটবল ফ্যান সে। অনেক কষ্ট করে টিকিট ম্যানেজ করেছে কি তোকে দেওয়ার জন্য নাকি? এই টিকিট কেউ কাউকে দেয়?
—কিন্তু আমার মতো বুদ্ধি তো আর রাখে না সে।
—কীভাবে বাগালি তার কাছ থেকে টিকিট?
—আমি তো জানি সে একা মানুষ, কোনো বন্ধুবান্ধবও নেই বেচারার। প্রোগ্রামিং আর ফুটবল ছাড়া কিছু বোঝে না। তবে আমি এটাও জানি, ফুটবল থেকেও তার বড় নেশা প্রোগ্রামিংয়ে। তাই তাকে সেভাবেই টোপ ফেললাম।
—কী টোপ?
—তাকে ছয় মাসের গুগল এক্সচেঞ্জে যাওয়ার অফার দিলাম। আমি জানি, পাওলো এই অফার ফিরিয়ে দিতে পারবে না। গুগল তার জন্য পৃথিবীর সবকিছু থেকে বড়।
—হা হা হা হা হা। তারপর?
—তারপর আর কী? সে কিছুক্ষণ ভেবে রাজি হলো। গুগলে যাচ্ছে সে এই দফাতেই। বললাম, আমার খারাপই লাগছে ফুটবলের এই ডামাডোলের মধ্যে তোমাকে যেতে হচ্ছে। কিন্তু কষ্ট পেয়ো না, গুগলে অনেক জায়ান্ট টিভি স্ক্রিন আছে। সেসবে বেশ মজা করেই খেলা দেখতে পারবে। মাঠের মতোই অনুভূতি পাবে।
—জোয়েল, তুই একটা আস্ত বদমাশ। সাড়ে হারামি।
—মাই ফ্রেন্ড রিকার্ডো, কিচ্ছু করার নেই। তুমি তো জানো প্রেম এবং ফুটবলে আমি কোনো নীতি মানি না।
—তাই বলে, পাওলোর মতো একটা ছেলেকে...
—আরে শোনো না তার পরের কাহিনি। পাওলো আমার রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই রোজালিনকে ডেকে বললাম, পুরো অফিসের নোটিশ বোর্ডে একটা নোটিশ টানাও। গায়ের দামে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের একটি টিকিট কিনতে চাই। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। নিচে আমার নাম লেখা। হা হা হা হা। সেদিনই আমার হাতে টিকিট চলে এল...
রিকার্ডো আর জোয়েলের এই কথোপকথন আমি আর নিতে পারছিলাম না। অবশ শরীরে কোনোরকমে পা টেনে টেনে নিজের ডেস্কে এসে ঝিম মেরে বসে আছি এখন।
আমি জোয়েলকে ঘৃণা করি। অনেক ঘৃণা করি। জোয়েলকে খুন করে ফেলব আমি। এত কষ্ট করে জোগাড় করা টিকিট এভাবে আমার কাছ থেকে হাতিয়ে নিল? আমি খুঁজেপেতে একটা ভারী কিবোর্ড হাতে নিয়ে জোয়েলের রুমের দিকে রওনা দিলাম।