‘এইমাত্র মণিকার প্যান্টের পেছনের পকেটে একটা জিনিস দেখলাম। মনে হলো আমাদের পাসগুলোই,’ জারা বলল।

‘আমিও দেখেছি,’ লরা বলল।

‘গোলাপি আর কমলা রঙের,’ সারা যোগ করল।

‘তাতে কী?’ ভুরু নাচাল ক্যারি। ‘রং এক রকম হলেই যে তোমাদের পাস হবে, এমন কোনো কথা নেই—কমলা ললিপপও হতে পারে কিংবা গোলাপি সানগ্লাস।’

‘তুমি আসলে জোর করেই আমাকে র্যাম্বলিং রোজিতে চড়াতে চাও,’ ভুরু কুঁচকে বলল জারা।

‘কী যে বলে!’ গুঙিয়ে উঠল ক্যারি। ‘জোর করলাম কখন? আরে, আমাদের মধ্যে একটা বাজি হয়েছিল, ভুলে গেছ?’

মুখ বাঁকাল জারা। ‘ভুলি আর কী করে?’

‘দোষটা আসলে আমার,’ লরা বলল। ‘আমার এখন খুব খারাপ লাগছে, জারা। ওই রাইডে চড়ার বাজি ধরতে আমিই উসকানি দিয়েছি ক্যারিকে।’

‘ও ঠিক আছে,’ জারা বলল। ‘আমি যখন রাইডে চড়তে যাব, তোমার কাছে নোটবুকটা রেখে যাব।’

সারাও জারার পিঠ চাপড়ে সাহস দিল, ‘চিন্তার কিছু নেই, জারা। রাইডটা আসলে দারুণ!’

তা তো বলবেই, মনে মনে বলল জারা। তোমার আর কী? চড়ব তো আমি।

রোলার কোস্টারটার কাছে যাওয়ার পথে জারা দেখল, মাদাম কোরানজি তাঁর তাঁবুর বাইরে বসে আছেন। মেয়েদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন তিনি, হাত নাড়লেন।

‘জ্যোতিষী কী বলেছেন?’ বিড়বিড় করে যেন নিজেকে বোঝাল জারা। ‘বলেছেন, সবখানেই সূত্র থাকে। তবে সেটা দেখার চোখ তোমার থাকতে হবে।’

র্যাম্বলিং রোজির কাছে এসে নীল নোটবুকটা সারার হাতে রাখতে দিল জারা।

‘তোমার পকেটে আর কিছু আছে?’ সারা জিজ্ঞেস করল। ততক্ষণে রাইডে চড়ার লাইনের দিকে দৌড় দিয়েছে ক্যারি আর লরা।

‘দেখি, দাঁড়াও,’ বলে নিজের বাঁ পকেট ভালো করে খুঁজল জারা। ডান পকেটে হাত দিয়ে প্রথমে কিছু পেল না। হাতটা বের করে আনার সময় আঙুলে লাগল কী যেন। এমন একটা জায়গায় আটকে আছে, ভালো করে না খুঁজলে আঙুলে লাগে না।

জিনিসটা বের করে আনল সে। একটা চকচকে লাল জিনিস। আংটি। লেডিবাগ আংটি।

‘এটা তো আমার না,’ আংটিটা উঁচু করে তুলে ধরে বলল জারা। ‘কার জিনিস?’

সবখানেই সূত্র থাকে। তবে সেটা দেখার চোখ তোমার থাকতে হবে। কথাগুলো জারার মগজে ঘুরপাক খেতে থাকল।

‘মণিকা!’ হঠাৎ বলে উঠল জারা। ‘সে গুবরেপোকা ভালোবাসে!’ তারপর শূন্যে হাত নাচাতে নাচাতে বলল, ‘ক্যারি! লরা! দেখো কী পেয়েছি!’

তাড়াহুড়া করে এগিয়ে এল ক্যারি আর লরা। ক্যারি জিজ্ঞেস করল, ‘কী, পাস?’

‘না,’ মাথা নাড়ল জারা। আংটিটা দেখাল। ‘এটা পেয়েছি। গুবরেপোকা। লেডিবাগ আংটি।’

‘তোমার নিশ্চয়ই ধারণা জিনিসটা মণিকা জোয়ানের?’ উত্তেজিত কণ্ঠে সারা জিজ্ঞেস করল।

‘হ্যাঁ, তাই তো সন্দেহ করছি,’ জারা জবাব দিল। ‘পাসগুলো নেওয়ার সময় জিনিসটা তার আঙুল থেকে খুলে আমার পকেটের কোনায় আটকে গিয়েছিল। এমন জায়গায় যেখানে প্রথমবার আমি হাত ঢোকালে হাতে লাগেনি। এখনই আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই।’

‘ও তো অনেক আগেই চলে গেছে,’ লরা বলল। ‘এতক্ষণে হয়তো বাড়ি পৌঁছে গেছে।’

‘তাহলে কাল কথা বলব ওর সঙ্গে,’ জারা বলল।

‘কাল?’ ভুরু কোঁচকাল ক্যারি। ‘তাহলে তোমার র্যাম্বলিং রোজিতে চড়ার কী হবে?’

‘আর একটা দিন সময় চাই, ক্যারি,’ জারা বলল। ‘মাত্র একটা দিন।’ 

*

সেদিন রাতে বাবার সঙ্গে বসে খাবার খেল জারা।

‘তোমার কেসের খবর কী, আপেল বেবি?’ জিজ্ঞেস করলেন আজিজ সাহেব। মেয়েকে আদর করে ‘আপেল বেবি’ ডাকেন।

‘ভালো, বাবা,’ জারা জবাব দিল। গ্লাস তুলে এক চুমুক দুধ খেল। তারপর বাবাকে সব কথা খুলে বলল।

‘তবে আমি এখনো নিশ্চিত নই, লেডিবাগটা মণিকার কি না,’ জারা বলল। ‘যা-ই হোক, সূত্র হিসেবে এটা খুব মূল্যবান।’

‘যদি এটা তোমাকে রহস্য সমাধানে সাহায্য করে,’ আজিজ সাহেব বললেন, ‘তাহলে বলতেই হবে এটা একটা সৌভাগ্য বহনকারী গুবরেপোকা।’

জোরে নিশ্বাস ফেলল জারা। ‘আমার জন্য ভাগ্যবান, বাবা, মণিকার জন্য নয়।’

*

সোমবার দুপুরে মণিকাদের বাসায় তার সঙ্গে দেখা করতে চলল জারা। সঙ্গে লরা আর সারা।

‘ক্যারি এল না কেন?’ লরা জিজ্ঞেস করল।

‘ফোন করেছিলাম। কিন্তু আসতে চাইল না। এখনো মণিকার ওপর রেগে আছে ও,’ জারা জানাল।

‘ক্যারি প্রচণ্ড জেদি,’ সারা বলল।

মণিকাদের বাসায় প্রায় পৌঁছে গেছে মেয়েরা।

‘মনে রেখো,’ নিচু স্বরে বলল লরা, ‘মণিকা কিন্তু খুব ভালো অভিনেত্রী। নিরীহ ভালো মানুষটি সাজার ভান করতে পারে।’

দরজার ঘণ্টা বাজাল জারা।

মিনিটখানেক পর দরজা খুলল মণিকা। কানে দুটো লেডিবাগ দুল পরেছে। দ্বিধা করে বলল, ‘হা-হাই!’

ওদের দেখে অবাক হয়েছে মণিকা, অস্বস্তিও বোধ করছে, বুঝতে পারল জারা।

‘হাই, মণিকা,’ জারা বলল। ‘তোমার কানের দুল দুটো খুব সুন্দর। তোমার আর কী কী লেডিবাগ জিনিস আছে?’

গর্বের হাসি হাসল মণিকা। ‘একটা লেডিবাগ ছাতা, একটা লেডিবাগের ছবি ছাপা নাইটশার্ট, একটা লেডিবাগ আংটি...’ হঠাৎ থেমে গেল সে।

‘দাঁড়াও দাঁড়াও,’ পকেট থেকে আংটিটা বের করে মণিকার চোখের সামনে তুলে ধরল, ‘এটার মতো আংটি, তাই না?’

আট.

‘আরে, আমার লেডিবাগ রিং!’ চমকে গিয়ে বলল মণিকা। পর মুহূর্তেই সামলে নিল। ‘ইয়ে...মানে...আমি বলতে চাইছি, এ রকম একটা আংটি আমারও আছে!’

‘এখন আর নেই,’ জারা বলল। ‘খুঁজলে পাবে না। এই আংটিটাই তোমার, আমার পকেটের ভেতর দিকে আটকে ছিল।’

হেসে মাথা নাড়ল মণিকা। ‘আমার আংটি না এটা। আমারটা অন্য রকম। নীল রঙের।’

‘নীল লেডিবাগ রিং আবার হয় নাকি?’ লরা বলল। ‘জীবনেও তো শুনিনি।’

‘তা ছাড়া,’ লরার কথা যেন কানেই যায়নি মণিকার, ‘এ বছর লেডিবাগ ভীষণ জনপ্রিয়। অনেক মেয়েই কিনছে।’

‘মণিকা,’ জারা বলল, ‘তুমি যখন আমাকে নাগরদোলার ঘোড়ায় ঠেলে তুলে দিচ্ছিলে, তোমার দুই হাত আমার কোমরে ছিল। মনে পড়ে?’

‘ঘর পরিষ্কার করতে হবে আমার। ও, তোমার পাসগুলো পেয়েছ?’ দরজাটা বন্ধ করে দিতে চাইল মণিকা।

‘এক মিনিট!’ ঘরের ভেতরে একটা পা ঢুকিয়ে দিল জারা, যাতে মণিকা পাল্লাটা লাগাতে না পারে। ‘মণিকা, আমি তোমাকে একবারও বলিনি, আমার পাস খোয়া গেছে। তুমি জানলে কী করে?’

হাঁ করে জারার দিকে তাকিয়ে রইল মণিকা। এক সেকেন্ড পর বলল, ‘গত রাতে ক্যারি বলেছে আমাকে।’

‘এক সপ্তাহ ধরে ক্যারি তোমার সঙ্গে কথা বলে না,’ জারা বলল।

মাথা নিচু করল মণিকা। মনে মনে বোধ হয় জবাব খুঁজছে।

‘আমাদের ফ্রি পাসগুলো তুমিই নিয়েছ, তাই না মণিকা?’ মোলায়েম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল জারা।

ভারি দম নিল মণিকা। তারপর মাথা ঝাঁকাল। ‘আমাকে না দিয়ে ক্যারি তোমাদের ফ্রি পাস দিয়েছে দেখে আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম।’

‘কিন্তু তার মানে এই নয় যে পাসগুলো তোমার চুরি করতে হবে,’ আবার বলল জারা।

‘উচিত হয়নি, নেওয়ার পরপরই বুঝতে পেরেছি। সত্যিই খুব খারাপ লেগেছে আমার,’ মণিকা বলল। ‘শনিবার রাতেই তোমাদের পাসগুলো ফেরত দিতে চেয়েছিলাম।’

‘দাওনি কেন?’ জারা জিজ্ঞেস করল।

‘কারণ, পলি আর কণাকে কথা দিয়ে ফেলেছিলাম, ফ্রি পাস দিয়ে রোববারে ওদের মেলায় নিয়ে যাব,’ মণিকা বলল। ‘ওরা জানত না পাসগুলো...’ থেমে গেল সে।

‘তুমি চুরি করেছ,’ মুখ বাঁকাল লরা।

‘আজই তোমাকে দিয়ে দিতাম,’ জারাকে বলল মণিকা। ‘সত্যিই দিতাম! বিশ্বাস করো!’

‘আজ তো আমি এলাম,’ হাত বাড়াল জারা। ‘দাও। এখন দিয়ে দাও!’

‘দিচ্ছি,’ মণিকা বলল। ‘ওপরতলায় রেখে এসেছি। আমার জিনসের পকেটে...’ বলতে বলতে অস্ফুট শব্দ করে উঠল মণিকা। মুখে হাত চাপা দিল।

‘কী হলো, মণিকা?’ জারা জিজ্ঞেস করল।

‘আমার জিনসের প্যান্ট তো ধুতে দিয়েছি!’ কঁকিয়ে উঠল মণিকা।

‘ধুতে!’ জারাও চেঁচিয়ে উঠল।

ঘুরে দৌড় দিল মণিকা। পেছন পেছন তিন কন্যাও ছুটল মণিকাদের কাপড় ধোয়ার ঘরে।

ওদের দেখে কাপড় ধুতে ধুতে থেমে গেলেন মণিকার মা। মণিকাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হলো? পকেটে কিছু রয়ে গেছে? সব সময় বলি, কাপড় ধুতে দেওয়ার আগে পকেটগুলো সব ভালো করে দেখে নিয়ো।’ মণিকার হাতে জিনসের প্যান্টটা দিলেন তিনি।

জারা দেখল, প্যান্টটা ভিজিয়ে ফেলা হয়েছে।

তাড়াতাড়ি পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল মণিকা।

‘ইশ্!’ চেঁচিয়ে উঠল সে।

‘কী?’ জারা জানতে চাইল।

গোলাপি আর কমলা রঙের তিনটে কাগজের পিণ্ড পকেট থেকে বের করল মণিকা।

হাতের তালুতে নিয়ে কাগজের টুকরোগুলো যতটা সম্ভব সমান করল।

‘কালি তো একেবারে লেপ্টে গেছে,’ জারা বলল। ‘কিছুই বোঝা যায় না।’

‘আমি...আমি...দুঃখিত...’ কেঁদে ফেলার অবস্থা হলো মণিকার।

‘দুঃখিত হয়ে আর লাভ কী?’ লরা বলল। ‘পাসগুলো শেষ! এগুলো দিয়ে আর কোনো কাজ হবে না।’

‘হয়তো এখনো আশা আছে,’ জারা বলল। ‘মিসেস অ্যানসনকে দেখালে বোঝা যাবে।’

চোখ উল্টে দিল মণিকা। ‘হায়রে, কী সর্বনাশ করলাম! ক্যারি আর কোনো দিনই আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে না।’

কয়েক ব্লক দূরে ক্যারিদের বাড়িতে এল মেয়েরা। মণিকাও এল সঙ্গে।

বেল বাজাল জারা। খুলে দিলেন মিসেস অ্যানসন।

‘আরে, তোমরা!’ মিসেস অ্যানসন বললেন। ‘ক্যারির সঙ্গে দেখা করতে এলে?’ ওপর দিকে তাকিয়ে জোরে চিৎকার করে ডাকলেন, ‘ক্যারি, এই ক্যারি। জারারা তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।’

‘আসলে আমরা আপনার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছি,’ জারা জবাব দিল। ভেজা পাসগুলো দেখাল। ‘দেখুন, ছোট্ট একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে।’

‘ও, তাই,’ মিসেস অ্যানসন বললেন। ‘এসো, ভেতরে এসে বোসো। তারপর খুলে বলো কী হয়েছে।’

লিভিং রুমে মেয়েদের নিয়ে এলেন মিসেস অ্যানসন। ওপরতলা থেকে নেমে এল ক্যারি। তিন কন্যার সঙ্গে মণিকাকে দেখে অবাক হলো।

সবাই বসলে কী হয়েছে সব জানাল মণিকা।

মণিকার কাঁধে হাত রাখলেন মিসেস অ্যানসন। ‘সাহস করে সত্যি কথাটা যে বলেছ, এতে আমি খুশি হলাম, মণিকা।’

‘এ ছাড়া আর কি-ইবা করার ছিল আমার!’ কেঁদে ফেলবে যেন মণিকা।

‘পাসগুলো কি আর কাজে লাগানো যাবে, আন্টি?’ জারা জিজ্ঞেস করল।

কাগজের টুকরোগুলো মেলে ধরে ভালোমতো দেখলেন মিসেস অ্যানসন। ‘দাঁড়াও, একটা ফোন করি, তাহলেই জানতে পারব।’

মিসেস অ্যানসন চলে গেলে প্রচণ্ড হতাশায় সোফার হেলানে এলিয়ে পড়ল মণিকা। ‘উনি পুলিশকে ফোন করতে গেলেন! আমি জানি! পুলিশ আমাকে জেলে ভরবে! উফ্, এর রচয়ে মরে যাওয়া ভালো!’

জারা বলল, ‘আমার ধারণা, আন্টি তাঁর অফিসে ফোন করতে গেছেন।’

রাগত দৃষ্টিতে মণিকার দিকে তাকাল ক্যারি। ‘এমন একটা কাজ কী করে করতে পারলে তুমি?’

মণিকা জবাব দিল, ‘তোমার ওপর রেগে আগুন হয়ে গিয়েছিলাম।’

‘আমিও তোমার ওপর প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলাম,’ ক্যারি বলল। ‘কারণ, গত সপ্তাহে আমার বদলে তুমি পলি ওয়েবারকে তোমাদের পারিবারিক পিকনিকে নিয়ে গিয়েছিলে।’

‘পলির বাবা-মা ওকে নিতে অনুরোধ করেছিল, কী করব?’ মণিকা জবাব দিল। ‘ওরাও ঠেকে গিয়েছিল। কারণ, বড়দের একটা পার্টিতে যেতে হয়েছিল ওদের।’

ভুরু কুঁচকে মণিকার দিকে তাকাল ক্যারি। ‘সত্যি?’

মাথা ঝাঁকাল মণিকা। ‘আমি পলিকে পছন্দ করি, তবে তোমার চেয়ে বেশি না। আমি আসলে তোমাকেই নিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু গাড়িতে আর জায়গা ছিল না।’

‘আমাকে বললেই পারতে,’ নরম হলো ক্যারি।

‘কী করে বলব?’ চেঁচিয়ে উঠল মণিকা। ‘তুমি তো পুরো এক সপ্তাহ ধরে আমার সঙ্গে কথাই বলো না!’

‘তা...ঠিক,’ ধীরে ধীরে বলল ক্যারি।

লিভিং রুমে ফিরে এলেন মিসেস অ্যানসন।

হঠাৎ করেই হট্টগোল থামিয়ে দিল মেয়েরা।

ঘরে পিনপতন নীরবতা।

কয়েক জোড়া চোখ উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে মিসেস অ্যানসনের দিকে।

কী খবর নিয়ে এসেছেন তিনি?

নতুন পাস কি দেবে?

নাকি দেবে না?

জানার জন্য অস্থির ।

অবশেষে মিসেস অ্যানসন জানালেন, ‘শোনো মেয়েরা, পাসগুলো বদলে দিতে পারবে না অফিস, নিয়ম নেই।’

দপ করে হাসি নিভে গেল মেয়েদের।

‘তবে অন্য একটা সুখবরও আছে,’ মিসেস অ্যানসন বললেন। ‘তোমাদের ক্লাসকে ২৫টা ফ্রি টিকিট দিয়েছে কোম্পানি। তোমাদের ফ্রি পাসগুলোর কথা বলেছিলাম, তখনই খবরটা জানাল। স্টার কুয়েস্ট-২ ছবির প্রিভিউ দেখার জন্য এই টিকিট। ফ্যান্টমল্যান্ড কোম্পানিই সিনেমা হলটার মালিক।’

আবার হাসি ফুটল মেয়েদের মুখে।

‘ইয়াহু!’ শূন্যে হাত ছুড়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠল জারা।

‘আরেকটা সুখবর,’ হাসিমুখে বললেন মিসেস অ্যানসন। ‘ফ্রি পাস পাওনি। তবে আমি তোমাদের আমার পয়সায় ফ্যান্টমল্যান্ডে নিয়ে যাব। মনিকাও আমাদের সঙ্গে যাবে।’

‘ডাবল ইয়াহু!’ আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল জারা।

মণিকার দিকে ফিরে হাসল ক্যারি। ‘কী মনিকা, খুশি?’

উজ্জ্বল হলো মনিকার মুখ। ‘উড়তে ইচ্ছে করছে আমার!’

জারার দিকে তাকাল লরা। ‘ফ্যান্টমল্যান্ডে গেলেও আর তোমাকে র্যাম্বলিং রোজিতে চড়তে হবে না।’

সারা বলল, ‘হ্যাঁ, বাজি তো জিতেই গেছে।’

মুখ টিপে রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসল জারা। কিছু বলল না।

সারা বুঝল, টিকিট-রহস্যের মীমাংসা হলেও জারা-রহস্য এখনো শেষ হয়নি।

সেদিন বিকেলে পাঁচ মেয়েকে নিয়ে মেলায় এলেন মিসেস অ্যানসন।

‘প্রথমে কোন রাইডটাতে চড়ব আমরা?’ ঢুকেই প্রশ্ন করল মনিকা।

‘র্যাম্বলিং রোজি!’ সবাইকে চমকে দিয়ে জারা বলল।

‘কী বলছ তুমি, জারা?’ লরা জিজ্ঞেস করল।

‘মনিকার মতো আমারও আজ খুশিতে উড়তে ইচ্ছে করছে,’ হেসে বলল জারা। ‘আর র্যাম্বলিং রোজিতে চড়াটা ওড়ার চেয়ে কম কিছু নয়।’

কয়েক মিনিট পর ফ্যান্টমল্যান্ডের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গতিশীল রাইডে চড়ল জারা। তার সঙ্গে সারা, ক্যারি আর মনিকা। তাদের সঙ্গে আনা জিনিসপত্র পাহারা দেওয়ার জন্য নিচে রয়ে গেল সারা।

পাহাড়শ্রেণির মতো উঁচু-নিচু হয়ে এগিয়ে গেছে রাইডটা।

‘এই যে আসছে সবচেয়ে ভয়াবহ অংশটা!’ চেঁচিয়ে উঠল ক্যারি। রাইডটা তখন সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠছে।

সেখানে উঠে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল চেয়ারগুলো। তারপর হঠা্ত মেঘের মতো গর্জন করে তীব্র গতিতে নামতে শুরু করল।

‘ইয়া-হুওওওওও!’ ইঞ্জিন আর বাতাসের শব্দ ছাপিয়ে শোনা গেল জারার চিৎকার। দুই হাত ওপর দিকে ছুড়ছে। দেখে মনে হলো যেন সত্যিই ওড়ার মজা পাচ্ছে সে।

রাইডটা যখন থামল, দৌড়ে এল সারা। ‘জারা, কেমন লাগল?’

‘আহ্, দারুণ, দারুণ! সত্যিই দারুণ!’ জারা জবাব দিল। ‘না চড়লে মিস করতাম!’

সন্ধ্যায়, ডিনারের আগে, লিভিং রুমের চেয়ারে বসল জারা। নীল নোটবুকটা খুলে কোলের কাছে ধরল। একটা খোলা পাতা বের করে লিখতে শুরু করল: র্যাম্বলিং রোজিতে চড়েছি আজ ভয় কাটানোর জন্য। গোয়েন্দাগিরি করব আর একটা সাধারণ রাইডে চড়তে ভয় পাব, তা তো হয় না। মাদাম কোরানজি ঠিকই বলেছেন: সবখানেই সূত্র থাকে। তবে সেটা দেখার চোখ থাকতে হবে। যাই হোক, নীল নোটবুকের অনেক পাতাই এখনো খালি। সেগুলো তো ভরতে হবে। ভাবছি, পরের কেসটা কী হবে? শিগগির ক্লাসে আমাদেরকে সিনেমা দেখার টিকিট বিতরণ করা হবে। আবার টিকিট! কী জানি, এগুলোও আবার চুরি হয়ে যায় নাকি? গেলে আমি খুশিই হব। আরেকটা কেস পেয়ে যাব সমাধান করার জন্য। একই সঙ্গে আমার নোটবুকের আরও কয়েকটা পাতা ভরবে।

ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল জারা।

(শেষ)