রাতের খাওয়াদাওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল সবাই। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি খেয়াল নেই। হঠাৎ চোখ দুটো ফাঁক হয়ে গেল। গভীর অন্ধকার। কিছু একটা যেন বিরক্ত করছিল। হাতটা ভেজা ভেজা লাগছিল। কম্বলের তলা দিয়ে মোবাইলটা নিয়ে আলো জ্বালালাম।

‘হ্যাঁ’ আমার দম আটকে গেল। মোবাইলের হালকা আলোতে স্পষ্ট দেখা গেল। আমার দুই হাতে তাজা লাল রক্ত।

হাত দুটো কাঁপতে শুরু করল। মোবাইলের আলো নিচু করলাম। আমার সাদা পাঞ্জাবিটা রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে। কোনোমতে খাট থেকে পা দুটো মেঝেতে রাখলাম। খাট থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে ছিল মেঝেতে। আমি আস্তে করে ঘরের দরজাটা খুললাম। রক্তের ফোঁটা সিঁড়ি পর্যন্ত গেছে এবং সিঁড়ির প্রথম ধাপে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল নিখিল। নিখিল আমার ভালো বন্ধু। কিন্তু জোছনার আলো যে ধূসর রং ওকে দিয়েছে, তাকে দেখলে যে কেউ ভয় পাবে।

শুকনা গলায় ওকে ডাকার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মুখ দিয়ে স্বর বের হলো না। রাতে আর কী হয়েছিল মনে পড়ছিল না। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, সেটিও মনে নেই। ভোরের আলো ফুটতেই ঘুম ভেঙে গেল। বিছানায় চিত হয়ে উঠে বসলাম। গত রাতের সব ঘটনা মনে পড়ল। বিছানা থেকে নেমে দরজা খুললাম আমি। ডাইনিংয়ে গিয়ে দেখি আমার তিন বন্ধু হাসতে হাসতে নাশতা করছে।

নিখিলকে এত তাড়াতাড়ি উঠতে দেখে আমি অবাক হলাম। ওর ওপর নজর পড়তেই দেখি একটা মোটা কাপড় পায়ের পাতা থেকে হাঁটু পর্যন্ত মোড়ানো।

‘নিখিল কী ব্যাপার? আজকে এত সকাল সকাল?’ আমি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

‘আজকে চন্দ্রঘোনায় যাব না, তাই।’ নিখিল বলল।

‘তোর পায়ে কী হয়েছে?’ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলাম। ‘কোথাও ব্যথা পেয়েছিস?’

‘কালকে বাথরুমের কোণায় লেগে পা কেটে গেছে।’ নিখিল বলল।

‘খুব বাজেভাবে কেটেছে মনে হয়?’

‘এই আরকি।’ নিখিলের ভ্রু কুঁচকে যায়। ‘তোর পাঞ্জাবিতে তো দেখি রক্ত লেগেছে, কী যে করলাম...’

‘সমস্যা নেই। আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম। ‘এটা কিছুই না।’

অতিথিশালা থেকে চন্দ্রঘোনা পেপার মিল বেশি দূরে নয়। বিশাল বড় এই কারখানাটি কাপ্তাই লেকের ঠিক পাশে অবস্থিত। বড় বড় জাহাজে করে কাগজ তৈরি করার জন্য বাঁশ নিয়ে আসছিল। গাইড বললেন, এই পেপার মিল প্রায় ষাট বছরের পুরোনো। অনেকগুলো বড় মেশিন রাখা ছিল, যা দিয়ে কাগজ তৈরি করা হয়। তারপর গাইড আমাদের কাগজ তৈরির কক্ষে নিয়ে গেল। বড় বড় সেসব মেশিনে গোল মণ্ড ঢোকানো হচ্ছিল। তারপর মেশিনের উল্টো দিক দিয়ে সেগুলো সমান-পাতলা হয়ে বের হচ্ছিল। তারপর সেগুলো মাপমতো কাটা হচ্ছিল।

হঠাৎ রশিদ চিৎকার করে ওঠে। ‘এই দিকে আসো তোমরা, তাড়াতাড়ি।’

দৌড়ে দেয়ালে রাখা একটি ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়াল ওরা তিনজন।

‘এটা সাইফের ছবি না?’ আস্তে করে জিজ্ঞাসা করল রশিদ। ‘ও না বলল যে ও কখনো এখানে আসেনি। ‘নামটা পড়,’ বলল সালমান।

‘মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সাইফ-উর-রহমানের মৃত্যুতে চন্দ্রঘোনা পেপার মিলের সব কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারী গভীরভাবে শোকাহত।’ আস্তে আস্তে পড়ল রশিদ। ‘এইটার মানে কী?’ গাইডকে জিজ্ঞাসা করল সে।

উনি এখানে পেপার মিল দেখতে এসেছিলেন। গাইড বললেন। ‘ভুল করে একটা যন্ত্রে ওনার হাত ঢুকে যায়। এই যন্ত্র এতটা শক্তিশালী যে ওনাকে পুরোপুরি ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলে। যন্ত্রটির উল্টো দিক দিয়ে ওনার রক্তাক্ত মৃতদেহ বের হয়। আস্ত মানুষটি কাগজের মতো পাতলা হয়ে যান। ওনার সাদা পাঞ্জাবিটি রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছিল। এটা আরও দুই মাস আগের ঘটনা।’

‘মানে কী?’ রশিদ রেগে গিয়ে বলল, ‘সাইফ তো আমাদের সাথে।’ কিন্তু সে পেছনে ঘুরে তাকায় কিন্তু সাইফ ওরফে আমার সন্ধান পায়নি। ওদের বড় বড় চোখগুলো দেখে আমার হাসি পাচ্ছিল।

আমাকে ওরা আর কখনোই যে খুঁজে পাবে না। কারণ, আমি অশরীরী। আমাকে তো দেখা যায় না। হাহাহাহাহা...

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন