ত্রয়ীর দেনা

অলংকরণ: রাকিব

ত্রয়ীদের স্কুলে খেলার একটা বড় মাঠ আছে। কিন্তু স্কুলে খোলা মাঠ থাকার বিশেষ কোনো সুবিধা কখনো অনুভব করেনি সে। গাছপালা ছাড়া মাঠে সারা বছর এমন চামড়া পুড়িয়ে দেওয়ার মতো রোদ থাকে যে বারান্দার বাইরে বের হওয়াই হয় না। তবে মাঠের এক কোণে একটামাত্র কৃষ্ণচূড়াগাছ।

স্কুলের এই একটা জায়গাই সবচেয়ে প্রিয় ত্রয়ীর। কেবল তার একার কাছেই নয়, জরিপ করলে দেখা যাবে, সব মেয়ে এ জায়গাটাই তাদের সবচেয়ে প্রিয় বলে ভোট দেবে। পুরো মাঠের এই একটা কোণে একটু ছায়া আছে বলেই যে জায়গাটা সবার এত প্রিয়, তা কিন্তু নয়। রিফাত মামাও একটা কারণ। স্কুল ক্যানটিনে সেই আদিকাল থেকে একই খাবার—ডিম চপ, নুডলস আর চিপসের প্যাকেট। এসব ছাড়িয়ে কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচে রিফাত মামার ঝালমুড়ির দোকান। বেশি মরিচ দিয়ে বানানো ঝালমুড়ি পুরো স্কুলের মেয়েদের কাছে এতই জনপ্রিয় যে টিফিনের সময় রিফাত মামার ঝালমুড়ি পাওয়ার জন্য মেয়েদের লাইন দেখলে বাইরে থেকে যে কেউ ভেবে নিতে পারে, এমন ভরদুপুরে মাঠে পিটি হচ্ছে নাকি!

ঝালমুড়ি বিক্রি করেই কূল পাচ্ছিলেন না রিফাত মামা; এর ভেতর গত বছরের শুরু থেকে যোগ হয়েছে নতুন এক রেসিপি। কাঁচা কলার সঙ্গে ধনেপাতা, কাঁচা মরিচ, বরই, তেঁতুল আর হালকা একটু চিনি—সব একসঙ্গে দিয়ে তারপর লোহার এক বাটিতে রেখে ঠুকঠুক করে কাঁচা কলার ভর্তা বানান রিফাত মামা। বইমেলার সময় টিএসসিতে এই পাঁচমিশালি অমৃত ভর্তা খেয়েছে ত্রয়ী। তারপর স্কুলে নিজের চোখের সামনে যখন বানানো শুরু হলো, তখন রিফাত মামা স্কুলে রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গেছেন। ধরে ধরে একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করছে, ‘খেয়েছ রিফাত মামার নতুন কলাভর্তা? লোহার মোটা দণ্ড দিয়ে যখন কাঁচা কলার ওপর আঘাত দেওয়ার ঠুকঠুক শব্দ শোনা যায়, তখনই জল এসে যায় ত্রয়ীদের মুখে।

রিফাত মামাও ব্যবসা ভালোই বোঝেন। ঝালমুড়ির মতো এই কাঁচা কলার ভর্তা সঙ্গে বানিয়ে দিতে হয় না। ভর্তা বানিয়ে ছোট ছোট প্লাস্টিক প্যাকেটে ভরে জমাতে থাকেন। ২০ টাকা দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট প্লাস্টিকের চামচ নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মুখে এই অমৃত চালান করে দিয়ে দিতে পারে সবাই। যে রিফাত মামা ঝালমুড়ির জন্য বিখ্যাত ছিলেন, কাঁচা কলার এক জাদুতে সেই ঝালমুড়ি প্রায় বিলুপ্তির পথে।

রিফাত মামার বয়স ঠিক অনুমান করা যায় না। ত্রিশ-চল্লিশের ঘরে হবে। বাড়ি পটুয়াখালী। ঝালমুড়ির শাসনামলে মাঝেমধ্যেই ত্রয়ীর বন্ধুরা মিলে খেতে খেতে এই সব গল্প জমিয়ে দিত রিফাত মামার সঙ্গে। ছোট্ট এক টুকরা কাঠের ওপর নিখুঁতভাবে পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ কাটতে কাটতে জবাব দিতেন রিফাত মামা। গল্প বেশি লম্বা হতো না। এত কথা বলার সময় আছে নাকি রিফাত মামার! দুই বছরের বেশি সময় ধরে এই ঝালমুড়ির থাল নিয়ে স্কুলের ভেতর বসেন তিনি। স্কুলের ভেতরে বসার জন্য কম কষ্ট করতে হয়নি তাঁকে। নানাজনের কাছে গিয়ে গিয়ে স্কুল কমিটিকে রাজি করিয়ে হেডস্যারের অনুমতি নিয়ে তবে সুযোগ পেয়েছেন ভেতরে বসার।

ত্রয়ী একদিন ঝালমুড়ি খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল, প্রতিদিন কত টাকা বিক্রি হয় মামা? সে টাকার ভেতর লাভই–বা কত হয়! একগাল হেসে দ্রুত হাতে খটাখট শব্দে পেঁয়াজ কাটতে কাটতে রিফাত মামা জবাব দিয়েছিলেন, ‘প্রতিদিন সাত শ-আট শ টাকা লাভ থাকে। নিজের থাকাখাওয়ার পর বাকি টাকা পটুয়াখালীর গ্রামে থাকা পরিবারের বাকিদের জন্য মোবাইল ব্যাংকে পাঠিয়ে দিই।’ কাটাকুটি, মুড়ি মাখানো, কাগজের ঠোঙা প্যাঁচানো—এসব কাজ তিনি এমন দক্ষতা আর তৃপ্তির সঙ্গে করেন, মাঝেমধ্যে মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে ঝালমুড়ি আর কলাভর্তা বানানো শিখি।

রিফাত মামা বলেছিলেন, স্কুলের ভেতর বসতে পারায় তাঁর আয় এখন অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু রমজান মাস আর ডিসেম্বর মাসে স্কুল বন্ধ থাকায় কোনো আয়ই থাকে না। তখন গ্রামের বাড়ি গিয়ে বেকারই থাকতে হয় মামাকে। গল্পে গল্পে হাশিখুশি রিফাত মামার সঙ্গে বেশির ভাগ ছাত্রীর সম্পর্ক এমন হয়ে গেছে যে দল বেঁধে খেয়েদেয়ে ক্লাসে ফেরার সময় ‘মামা, আজ টাকা নেই। কাল এক সাথে দিয়ে দেব’ বলে চলে যায়। রিফাত মামা চোখ তুলে দেখেনও না কে বা কারা বলল কথাটা। মন দিয়ে কাজ করতে করতে নিচের দিকে তাকিয়েই ‘আচ্ছা আপা’ বলেন কেবল। ত্রয়ী আর তার বন্ধুরাই যে কেবল রিফাত মামার গল্প জানে, তা নয়; ঝালমুড়ি আর কলাভর্তা খেতে খেতে যে যা–ই জিজ্ঞেস করুক না কেন, রিফাত মামা সব মুখস্থ উত্তর দিয়ে যেতে থাকেন।

ঘূর্ণিঝড় সিডরে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল রিফাত মামার পুরো পরিবার। পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্যের ভেতর থেকে বের হওয়ার আকুল চেষ্টা। রিফাত মামা অল্প অল্প করে টাকা জমাচ্ছেন একটা ইটের ঘর করবেন বলে। বারবার যেন ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি সব বিলীন না হয়ে যায়।

অপ্রত্যাশিত এমন ছুটিতে সে কটা দিন কী ভালোই না লাগছিল ত্রয়ীর। সে ভাবতেই পারেনি, সেই দুই সপ্তাহ গড়িয়ে গড়িয়ে প্রায় বছর হয়ে যাবে। স্কুলে যাওয়া হয় না কত দিন!

উপকূলের ঘূর্ণিঝড়ের মতোই এবার আঘাত হেনেছে করোনা। ত্রয়ীদের স্কুল বন্ধ হয়ে গেল আচমকা, কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই। শুরুতে দুই সপ্তাহের ছুটি ছিল। অপ্রত্যাশিত এমন ছুটিতে সে কটা দিন কী ভালোই না লাগছিল ত্রয়ীর। সে ভাবতেই পারেনি, সেই দুই সপ্তাহ গড়িয়ে গড়িয়ে প্রায় বছর হয়ে যাবে। স্কুলে যাওয়া হয় না কত দিন! বন্ধুদের সঙ্গে কথা হয় নিয়মিত, সবাই মিলে ভিডিও কলে দেখা হচ্ছে, অনলাইনের ক্লাসে পরিচিত সব স্যার, ম্যাডামরাও এসে হাজির হচ্ছেন। শুধু দেখা হয় না স্কুলের বড় মাঠটা, মাঠের শেষ কোনায় একা দাঁড়িয়ে থাকা একচিলতে ছায়া দেওয়া কৃষ্ণচূড়াগাছটা, আর সে গাছের নিচে সব সময় দাঁড়িয়ে থাকা ত্রয়ীদের সেই রিফাত মামার।

ত্রয়ী ভাবে, স্কুল বন্ধ থাকায় উপার্জন হারানো রিফাত মামা এখন তাহলে এই এক বছর কীভাবে চলছেন! শেষ যেদিন স্কুল খোলা ছিল, সেদিন ত্রয়ীরা পাঁচ বন্ধু মিলে সেই কলাভর্তা খেয়ে টাকা পরে দেবে বলে সেই যে এল, সেই ১০০ টাকা কি ত্রয়ী শোধ দিতে পারবে আর! রিফাত মামা কি স্কুল আবার খোলার আশায় এখনো ঢাকায় আছেন? নাকি ফিরে গেছেন তাঁর নিজের গ্রামে! উনি কি অন্য কোনো উপার্জনের রাস্তা খুঁজে পেয়েছেন!

স্কুল আবার খুললে রিফাত মামা কি আবার ঝালমুড়ি বা কাঁচা কলা আর তেঁতুল নিয়ে বসবেন স্কুলের সেই কৃষ্ণচূড়াগাছটার নিচে? কত টাকা জমিয়েছিলেন রিফাত মামা! ইটের ঘর কি রিফাত মামা করতে পারবেন আর! এসব বিচ্ছিন্ন ভাবনা গ্রাস করে রাখে ত্রয়ীকে।

ত্রয়ী তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছে, স্কুল আবার খুললে যদি ঝালমুড়ির রিফাত মামা ফেরত না আসেন, তবে সে কীভাবে তার ১০০ টাকার দেনা শোধ করবে! ত্রয়ীর বাবা খুব একটা পাত্তা দিলেন না, সোফায় বসে টিভির দিকে তাকিয়ে থেকেই বললেন, ‘আসবে না কেন!’ বলেই আরও বেশি মনোযোগ দিয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে রইলেন। ১০০ টাকা বাবার কাছে কিছুই না। কিন্তু রিফাত মামার কাছে তো অনেক কিছু নিশ্চয়ই। বাবাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলল ত্রয়ী। কিন্তু তার বলতে খুব ইচ্ছে করছিল, রিফাত মামা ফিরে এলে সে সেই ১০০ টাকার বদলে ৫০০ টাকা দিয়ে দেবে ত্রয়ী। এত দিন স্কুল বন্ধ থাকায় লোকটা পুরো পরিবার নিয়ে কী কষ্ট করেই না বেঁচে আছেন। আসলেই বেঁচে আছেন তো!