শহরের বেশ সম্ভ্রান্ত এলাকায় বসবাস করেন এক ধনী ব্যবসায়ী। সবাই খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখে তাকে। কারণ, তার আছে ব্যাংক–ভরা টাকা আর ফেসবুক–ভরা ফ্রেন্ড-ফলোয়ার। কিন্তু এত কিছু থাকলে কী হবে? শান্তি ছিল না ব্যবসায়ীর মনে। অনেক আগেই তার স্ত্রী মারা গেছেন। টাকা আর সম্মানের পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবনে কোনো স্বাদ-আহ্লাদই পূরণ করার সময় পাননি তিনি। এখন তার শরীর ভেঙে গেছে। বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। হঠাৎ খেয়াল করলেন, ফেসবুকে নারীরা নক করলেও রিপ্লাই দিতে আগ্রহ পান না তিনি। সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ী বুঝতে পারলেন, বেঁচে থেকে আর কোনো লাভ নেই। এসব কথা ভাবতে ভাবতে একসময় আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। ব্যবসায়ী নিশ্চিত হয়ে গেলেন, তার সময় শেষ। তিনি আর বাঁচবেন না। তাই তিনি ই-মেইল করলেন তার তিন ছেলেকে।
বাবার ই-মেইল পেয়েই ‘কী হয়েছে বাবা?’ বলতে বলতে আশপাশের ঘর থেকে ছুটে এল তিন ছেলে। ব্যবসায়ী তার ছেলেদের দিকে তাকালেন। বড় ছেলে তার পাশে বসে স্মার্টফোনে টাইপ করছে। মেজটারও একই অবস্থা। একমাত্র ব্যতিক্রম ছোট ছেলে। সে বাবার পাশে বসে উদাস হয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। ব্যবসায়ী তার বড় ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন,
‘কী করছ, বাবা?’
‘তোমার অসুস্থতার কথা জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছি ফেসবুকে। তবে শুধু অসুস্থতার কথা লিখলে আজকাল চলে না। তাই তোমাকে যে আমি কত ভালোবাসি, তা-ই লিখেছি। ৫ মিনিটের মধ্যে ৩০টা লাইক পড়ে গেছে।’
‘বাহ্! খুব ভালো।’
এবার ব্যবসায়ী তার মেজ ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কী করছ, বাবা?’
‘আমিও একটা স্ট্যাটাস লিখেছি। তোমার সঙ্গে আমার ছোটবেলার স্মৃতির কথা লিখে পাবলিককে ইমোশনাল করে দিয়েছি একেবারে। ভাইয়ার চেয়ে আমারটায় বেশি লাইক পড়েছে। শেয়ারও হয়েছে কয়েকটা।’
‘বাহ্! খুব ভালো।’
ব্যবসায়ী ভাবলেন, তার বড় দুই ছেলেই পর্যায়ক্রমে বেকুব ও স্বার্থপর। এবার তিনি ছোট ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কী করছ, বাবা?’
‘মনটা খারাপ। কিছু করতে ইচ্ছা করছে না।’
সঙ্গে সঙ্গে বড় ছেলে বলে উঠল, ‘ওর কথা ভাবা ছেড়ে দাও। ওকে দিয়ে কিছু হবে না। তুমি অসুস্থ হওয়ার পর থেকে একটা পোস্টও দেয়নি ফেসবুকে।’ মেজ ছেলে বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, পোস্ট দিবি না ভালো কথা। আমাদের পোস্টগুলো তো শেয়ার দিতে পারতি, নাকি? আরে, তোর বাবা অসুস্থ, বাঁচা-মরার নাই ঠিক, তুই এটা নিয়ে পোস্ট না দিলে কে দেবে? পাশের বাসার আঙ্কেল?’
ছোট ছেলে কিছু না বলে মাথা নিচু করে তাকিয়ে রইল। ব্যবসায়ী কিছু বলার জন্য প্রস্তুতি নিলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘শোনো বাবারা, সবাইকেই একদিন লগআউট করতে হয়। আমারও বয়স হয়েছে। বিভিন্নভাবে পাওয়া নোটিফিকেশনে আমি বুঝে গেছি যে আমার সময় শেষ। তোমরা নিশ্চয়ই জানো, সব সম্পত্তি আমি তোমাদের নামে ভাগ করে দিয়েছি। আমার মনে হয়, বাবার দায়িত্ব আমি পুরোপুরিভাবে পালন করতে পারিনি। তবে চেষ্টা করেছি। যাওয়ার আগে তোমাদের ছোট্ট উপহার দিয়ে যেতে চাই।’
এই বলে তিনি তিন ছেলের হাতে ধরিয়ে দিলেন তিনটি কাগজ। ছেলেরা দেখল, কাগজে গোটা গোটা হরফে লেখা কিছু সংখ্যা। তাদের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে ব্যবসায়ী আবার বললেন, ‘প্রতিটি কাগজে একটা করে কোড নম্বর লেখা আছে। আমি মারা যাওয়ার পর যখনই তোমাদের মনে হবে, সোজা বাড়ির গেটের সামনে চলে যাবে। তারপর “বাবার আদেশ” টাইপ করে পাঠিয়ে দেবে ৪২০৪২০ নম্বরে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই বুঝতে পারবে উপহারটা কী।’
বাবার কথা শেষ হতে না হতেই খুশিতে লাফিয়ে উঠল বড় আর মেজ ছেলে। বড় ছেলে বলল, ‘ইশ্, কখন যে উপহারটা পাব! আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না!’
‘আমিও।’ বলল মেজ ছেলে। শুধু ছোট ছেলে কিছু বলল না। বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
এক রাতে মারা গেলেন ব্যবসায়ী। তিন ছেলেই খুব কাঁদল বেশ কয়েক দিন। তারপর ধীরে ধীরে সামলে উঠল শোক। হঠাৎ বাবার শেষ উপহারের কথা মনে পড়ল তাদের। ছোট ছেলের এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই। তবু বড় দুই ভাই তাকে জোর করে ধরে নিয়ে গেল বাড়ির গেটের সামনে। টেস্ট ট্রায়াল হিসেবে তাকেই প্রথমে এসএমএস পাঠাতে বাধ্য করল তারা। ছোট ভাই এসএমএস করল। কিছুক্ষণ পর টুনটুন শব্দে বেল বাজিয়ে হাজির হলো দারুণ রংচঙে একটা রিকশা। শীর্ণ দেহের এক চালক চালিয়ে এনেছে রিকশাটাকে।
রিকশা দেখেই হেসে মাটিতে গড়াগড়ি খেল বড় দুই ভাই। তারা বলল, ‘দেখ, বাবা তোকে ভালোবাসত না। তাই এই রিকশা দিয়েছে তোকে। হে হে হে...খেত।’
ছোট ভাই তাদের আচরণে কষ্ট পেল খুব। কিন্তু কিছু বলল না। এবার এসএমএস করল মেজ ভাই। একটু পর বাড়ির সামনে এল একটা চকচকে গাড়ি। মেজ ভাই তো খুশিতে একেবারে আটখানা হয়ে গাড়িতে উঠেই সামনে এগোতে আদেশ দিল ড্রাইভারকে। ধোঁয়া উড়িয়ে চলে গেল গাড়ি।
বড় ভাইও পাঠাল এসএমএস। এবার হাজির হলো আরও সুন্দর একটা গাড়ি। যেমন রং, তেমনি সুন্দর দেখতে। সে-ও ড্রাইভারকে নিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে এগিয়ে গেল।
ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল ছোট ভাই। মনটা খারাপ। এমনিতেই বড় দুই ভাইয়ের অত্যাচারে বিপর্যস্ত সে। তাদের সব কাজ করা, গার্লফ্রেন্ডকে গিফট পাঠানো, তাদের অ্যাসাইনমেন্ট করে দেওয়াসহ সব কাজ ছোট ভাইকেই করতে হয়। এখন নিশ্চয়ই গাড়িও ধুতে হবে। মন খারাপ দেখে তার রিকশাচালক বলল, ‘স্যার, চলেন। নয়া রিকশায় একটা রাউন্ড দিয়া আসি। ভালো লাগবে।’
‘চলেন।’
রিকশাচালক ধীরেসুস্থে রিকশা টানতে লাগল। ছোট ভাই ফোন করল তার বান্ধবীকে। নতুন রিকশায় দুজন একসঙ্গে ঘুরবে—এটাই ইচ্ছা তার। কিন্তু উপহার হিসেবে রিকশা পেয়েছে শুনে বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিল তার বান্ধবী। এই রোদে বের হয়ে স্কিনের ক্ষতি করতে চায় না সে। হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ছোট ভাই। একে তো প্রচণ্ড গরম, তার ওপর মেইন রোডে আসতেই ভয়াবহ জ্যামের মুখে পড়ল ওরা। এগোনোর উপায় নেই। প্রচণ্ড রাগে রিকশার পা-দানিতে লাথি মারল ছোট ভাই। আর কী আশ্চর্য! সঙ্গে সঙ্গে ওপরে উঠতে শুরু করল রিকশা! দুই পাশ থেকে শপাশপ তাকে বেঁধে ফেলল সিটবেল্ট। ছোট ভাই অবাক হয়ে দেখল, রিকশার দুই পাশে দুটো ডানা। সব গাড়ি, বাস নিচে রেখে তীব্র গতিতে উড়ে যাচ্ছে তাদের রিকশা! নিচে দীর্ঘ জ্যামে বড় দুই ভাইয়ের গাড়ি দুটোকেও আটকে থাকতে দেখল ছোট ভাই।
সারা দিন ঢাকার ওপর দিয়ে উড়ে বেড়াল ছোট ভাই। খুব আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরে সে শুনল, দুই ভাইকেই পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। থানায় খোঁজ নিয়ে সে জানল, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে নিয়ে আসা গাড়িসহ দুই ভাইকে আটক করেছে শুল্ক বিভাগ। ছোট ভাইয়ের মনে হলো, তার ভাইদের কথা ভুল। বাবা আসলে তাকেই ভালোবাসত।