কথাটা আমিও বিশ্বাস করিনি।
আমাদের স্কুলে একটা ভূতের ছেলে পড়ে। আমাদেরই ক্লাসে। নাম তার টুনু। ফার্স্টবয় আরিফ আমাকে কথাটা বলেছে। টুনুও বলেছে। আমি বিশ্বাস করিনি। কেউ করেও না।
এখানে আমরা নতুন এসেছি। আমরা মানে মা-বাবা, আমি আর ছোট বোন। বাবার সরকারি চাকরি। কৃষি কর্মকর্তা। কয়েক বছর পরপর বদলি হন। আমরাও সঙ্গী হই তার। এ বয়সে অনেক জায়গা ঘোরা হয়ে গেছে আমার। বেশির ভাগই শহরতলি। এ জায়গাটাও সে রকমই। তবে গ্রাম গ্রাম ভাবটা বেশি। লোকজন বেশির ভাগই কৃষিকাজ করেন। ছোট-বড় গাছপালা আর ঝোপজঙ্গল আছে। আমবাগান আছে। তালগাছ আছে। বড় পুকুর আছে। ফসলের মাঠ আছে। আছে মেঠোপথ। আর কাছেই একটা হাট আছে। সেই হাটে বাবার অফিস। হাটের পাশে একটা স্কুল। সেই স্কুলে ভর্তি করা হলো আমাকে। ক্লাস এইটে। আর প্রথম দিনই শুনলাম সেই কথা। ভূত ছেলের পড়ার কথা। ক্লাসে শেষ বেঞ্চে তার পাশেই বসেছিলাম আমি। অল্পক্ষণে খাতিরও হয়ে গেল। তুই তোকারির খাতির। বয়সে একটু বড়ই মনে হলো ওকে। দেখতে ঢেঙামতো। তখনো জানতাম না সে আসলে একটা ভূত।
ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরছি। পথে ফার্স্টবয় আরিফ ধরল আমাকে। বলল, ‘শোনো ছেলে, তোমাকে একটা কথা বলে রাখি। নতুন এসেছ তাই বলছি।’
ভাবলাম ফার্স্টবয়দের একটু দেমাগ থাকে। তারা নানা ধরনের কথা বলে। নানা উপদেশ দেয়। আমি গম্ভীর মুখ করে বললাম, ‘বলো, কী বলবে।’
এদিক-ওদিক দেখে আরিফ বলল, শোনো, টুনু কিন্তু পাগলা কিসিমের। বলবে, ও ভূতের ছেলে। সবাইকে বলে।’
‘তাই নাকি!’
‘হ্যাঁ। আমরা কেউ বিশ্বাস করি না। তুমিও করবে না। ওর সঙ্গে বেশি মিশতে যেয়ো না। আমরা মিশি না।’
‘ও, এই কথা! আমি তো ভাবলাম হয়তো আমাকে শাসাতে এসেছ।’
‘শাসাতে আসব কেন?’
‘ক্লাসে যেন তোমার সঙ্গে পাল্লা না দিই।’ হেসে বললাম, ‘ভাই, আমি খুব ভালো ছাত্র নই। টেনেটুনে পাস করি। আমাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
আরিফও হাসল, ‘আমিও ভালো ছাত্র নই।’
‘তাহলে ফার্স্ট হও কী করে?’ আমি জানতে চাইলাম।
‘গ্রামের ছেলেরা কেউ ঠিকমতো লেখাপড়া করে না। আমি একটু-আধটু করি। নম্বর যে খুব ভালো পাই তা নয়। সব যোগ করে সবার চেয়ে সামান্য বেশি থাকে। কী আর করা! খাতায় তোলার সময় স্যাররা না পেরে নামটা এক নম্বরেই লিখে দেন। এবার বিজ্ঞানে ত্রিশ পেয়েছিলাম। তিন মার্ক যোগ করে পাস করানো হয়েছে।’
‘বলো কী!’ আমি অবাক হই।
‘হ্যাঁ। আমি আদার বনে শিয়াল রাজা আর কি!’
টুনু সম্পর্কে কৌতূহল হলো। ভাবলাম ওকে এ ব্যাপারে জিগ্যেস করব। তা আর করতে হয়নি। পরদিন টুনুই সব বলেছিল আমাকে।
‘কাল আরিফ তোকে যা বলেছে আমি শুনেছি। আমার সঙ্গে মিশতে মানা করেছে।’ গড়গড় করে সব কথা বলে গেল টুনু।
আমি খুব অবাক হলাম। ও তো আশপাশে ছিল না। শুনল কী করে! তবে কি কোনো গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল! কিংবা সে কি আসলেই ভূত?
আমাকে আরও অবাক করে টুনু বলল, ‘আমি আসলেই একটা ভূত। আমার এ কথা কেউ বিশ্বাস করে না। আরিফ তোকেও বিশ্বাস করতে মানা করেছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি একটা ভূত।’
‘ভূত হলে তুই এখানে কেন? মানে স্কুলে পড়িস কেন?’ আমি অবিশ্বাসের সুরে জানতে চাই।
‘স্কুলে পড়ি মানুষ হওয়ার জন্য। আমি ভূত থাকব না। আমি মানুষ হব। মানুষের মতো মানুষ।’
‘তুই তো মানুষই। খামোকা ভূতটুত বলছিস কেন?’
‘যা সত্যি তাই বলছি। তাহলে শোন।’ তারপর টুনু যা বলেছিল তা রীতিমতো একটা গল্পই।
ভূত হলেও ভূতের কাণ্ডকারখানা করতে তার কখনোই ভালো লাগে না। ভূতদের প্রধান কাজ মানুষকে ভয় দেখানো। সেটা সে কখনো করেনি। মা-বাবা অনেক চেষ্টা করেছে। কোনো লাভ হয়নি। ছেলের এককথা, ‘দাঁত-মুখ খিঁচে মানুষকে মিছেমিছি ভয় দেখানোর কী দরকার! আমি ওসব পারব না।’
মা বলেছে, ‘একি কথা! ভূত হয়েও মানুষকে ভয় দেখাবি না তা কি হয়?’
‘কেন হবে না? ভয় দেখানো ছাড়া কি ভূতেদের আর কোনো কাজ নেই! মানুষের উপকারও তো করা যায়।’
কথা শুনে বাবা গেল ভীষণ খেপে, ‘এ তো দেখছি ভূত নামের কলঙ্ক! ভয় দেখাবে না! মানুষের উপকার করবে! যা তাহলে মানুষের কাছেই যা।’
‘ঠিক আছে, তাই যাচ্ছি।’ রাগ হয়েছিল টুনুরও। ভূত নয়, মানুষ হয়ে দেখিয়ে দেবে মা-বাবাকে।
সেই যে বাড়ি থেকে চলে এসেছে আর ওমুখো হয়নি টুনু। বাড়ি থেকে তো চলে এল কিন্তু থাকবে কোথায়?
এখানে-ওখানে ঘুরে শেষে আশ্রয় মিলল এক বুড়ির কাছে। বুড়ি থাকে এ হাটেরই পাশের গ্রামে। শাকসবজি-লতাপাতা বিক্রি করে কোনোমতে দিন চলে তার। সেদিন সন্ধ্যায় হাট শেষে ফেরার পথে দেখল টুনুকে। রাস্তার ঢালে বসে হাপুস চোখে কাঁদছে। জিগ্যেস করলে কিছুই বলে না। চোখ মোছে আর কাঁদে। কাঁদে আর কাঁদে। বড় মায়া হলো বুড়ির। আহারে, কোন মায়ের পুত! না জানি পথ হারিয়ে এখানে এসে পড়েছে! আবার কোথায় চলে যাবে! তার চেয়ে থাকুক আমার কাছে। কেউ খোঁজ করলে তখন দেখা যাবে।
টুনুর হাত ধরে বুড়ি নিয়ে এল বাড়িতে। সেই থেকে বুড়ির বাড়িতে থাকে টুনু। বুড়ির ফাইফরমাশ খাটে। আর ভাবে বুড়ির দুঃখ দূর করতে হবে। এ জন্য তার লেখাপড়া করতে হবে। মানুষ হতে হবে। শুনে বুড়ির আরও মায়া লাগে। আহারে, কোন মায়ের পুত! বুক খালি করে চলে এসেছে!
টুনুর মাথায় হাত বুলিয়ে বুড়ি বলে, ‘ঠিক আছে ভাই, তাই হবে। আমার কষ্ট হলেও তোমাকে লেখাপড়া করাব।’
স্কুলে ভর্তি হয়ে গেল টুনু। এক ক্লাস, দুই ক্লাস করে এখন এইটে। সে যে ভূত এ কথা কেউ বিশ্বাস করে না। বুড়িও না। প্রথম দিকে বুড়ি জানার চেষ্টা করেছে টুনু কোথা থেকে এসেছে। কারা তার মা-বাবা। কোন গ্রামে বাড়ি। টুনু তার আসল পরিচয় দিয়েছে। বলেছে সে একটা ভূত। বাড়ি থেকে রাগ করে চলে এসেছে। বুড়ি তা বিশ্বাস করেনি। হেসে বলেছে, ‘বালাই ষাট! তুমি ভূত হতে যাবে কেন, ভাই! ওসব আকথা-কুকথা বলতে নেই।’
কেউ যখন বলে, ‘ও বুড়ি, তোমার নাতি এসব কী বলে! সে নাকি ভূতের ছেলে?’
বুড়ি হেসে বলে, ‘ছেলেটা একটু পাগলা কিসিমের। ওর সব কথা ধরো না তো।’
কেউ যদি বলে, ‘তোমার নাতির ভূত তাড়াও। আমি এক কবিরাজকে চিনি। মরিচ পোড়া আর ঝাড়ু তার হাতিয়ার। বাপ বাপ বলে ভূত পালাবে! বলো তো খবর দিই তাকে।’
‘না গো না। খবর দিতে হবে না। রাগ করে বাড়ি থেকে চলে এসেছে। ওর কি মাথার ঠিক আছে! কখন কী বলে তারও তো ঠিক নেই। বলছে বলুক। তোমরা বিশ্বাস কোরো না।’
টুনু যে নিজ থেকে এসব বলে তা-ও নয়। কেউ ডেকে জানতে চাইলে বলে। বিশ্বাস না করলেও বলে।
ওর কথা আমিও বিশ্বাস করিনি। বলেছিলাম, ‘তুই যদি ভূতই হোস তাহলে আমাকে কিছু সোনাদানা এনে দে দেখি।’
‘তা এনে দিতে পারি। কিন্তু আনব না।’
‘আনবি না কেন? পারবি না সেটা বল।’
‘অবশ্যই পারব। আনব না কারণ, চুরি করে আনতে হবে। কিংবা ভয় দেখিয়ে। সে তো ভূতেরই কাণ্ড হবে। আমি ভুতুড়ে কোনো কাজ করব না প্রতিজ্ঞা করেছি।’
‘ভয় দেখাবি কেন! আর কেনই বা চুরি করবি। শুনেছি ভূতদের অনেক সোনাদানা থাকে। টাকাপয়সা থাকে! সেখান থেকে আনবি।’
‘ধেৎ! ওসব বাজে কথা। সোনাদানা আর টাকাপয়সা দিয়ে ভূতেরা করবেটা কী! ওসব আমাদের থাকে না।’
আমার একটা গল্প মনে পড়ল। এক হোস্টেলে নাকি এক ভূত ছাত্র থাকত। সে বিছানায় শুয়ে থেকেই তার হাত লম্বা করে টেবিল থেকে গ্লাস নিয়ে পানি খেত। তারপর দূরের দেয়ালের সুইচ অফ করে লাইট নিভিয়ে ঘুমাত।
বললাম, ‘ঠিক আছে, সোনাদানা না আনবি তো আর একটা কাণ্ড করে দেখা।’
‘কী কাণ্ড?’
‘ওই যে বড় গাছটা দেখছিস! মগডাল থেকে কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে এনে দে, পারবি তো?’
‘তা পারব। কিন্তু করব না।’
‘কেন করবি না? তুই না ভূত! হাত লম্বা করতে পারিস না?’
‘পারি। কিন্তু করব না। বললামই তো, ভুতুড়ে কোনো কাণ্ড আমি করতে চাই না। তাহলে তো ভূতই থেকে গেলাম। মানুষের মতো হলাম কই!’
আমি হেসে বললাম, ‘টুনুরে, ওসব পাগলামি কথা বাদ দিয়ে লেখাপড়ায় মন দে। তাহলেই মানুষ হতে পারবি।’
এরপর থেকে টুনুর সঙ্গে ভূতটুত নিয়ে তেমন আর কথা হয়নি। ভেবেছি, ওর হয়তো নিজেকে ভূত ভাবতে ভালো লাগে। তাই ওসব বলে। আর এ কারণে ওর তেমন কোনো বন্ধু নেই। পাগলাটে এ ছেলেটাকে আমার ভালো লেগে যায়। আমার বন্ধু হয়ে যায় টুনু।
আমাদের বিজ্ঞান পড়ান আজমত আলী স্যার। খুব কড়া ধাতের মানুষ। হাতে জোড়া বেত নিয়ে ক্লাসে আসেন। পড়া না পারলে বেত চালান। তিনি টুনুর ওপর মহাখ্যাপা। পড়া তো ঠিকমতো পারেই না। তার ওপর আছে ভূতের গল্প। স্যারও ওসব বিশ্বাস করেন না। বলেন, ‘দুনিয়াতে ভূত বলে কিছু নেই। বিজ্ঞানের জোরে পৃথিবী কোথায় এগিয়ে গেছে। আর উনি আছেন ভূত নিয়ে! নিজেই নাকি ভূত! তোর ভূত একদিন ছুটিয়েই ছাড়ব, বলে রাখলাম।’
একদিন আজমত স্যার ক্লাসে আমাকে দাঁড় করালেন। রাগী চেহারা দেখে ভয় পেলাম। স্যার প্রায় তেড়েই এলেন। টুনুকে দেখিয়ে বললেন, ‘ওর সঙ্গে তোর এত কিসের খাতির! এত কী গুজগুজ করিস? তোর মাথাতেও ভূত ভর করেছে বুঝি? নাকি ওর মতো তুই নিজেও একটা ভূত?’
আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না। তার আগেই টুনু দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, ও ভূত হতে যাবে কেন? ভূত তো আমি। আপনি তো বিশ্বাসই করেন না।’
ওর কথায় কান না দিয়ে স্যার আমার কাছে জানতে চাইলেন, ‘ওর কথা তুই বিশ্বাস করিস?’
আমি বললাম, ‘না স্যার, বিশ্বাস করি না।’
আজমত স্যার এবার টুনুর দিকে ফিরলেন, ‘দেখলি তো, তোর কথা কেউ বিশ্বাস করে না। আসলে তুই একটা পাগল!’
‘আমাকে পাগল বলবেন না, স্যার। আমি আগেও বলেছি। এখনো বলছি, আমি একটা ভূতের ছেলে। মানুষ হব বলে বাড়ি থেকে চলে এসেছি।’
স্যার এবার ভীষণ রেগে গেলেন, ‘ভূতের ছেলে! মানুষ হবি! দাঁড়া, আজ তোকে মানুষ করেই ছাড়ছি। গাধা পিটিয়ে মানুষ করা যায়। আর ভূত পিটিয়ে মানুষ বানাতে পারব না!’
আজমত স্যার সপাং সপাং জোড়া বেত চালালেন টুনুর পিঠে। তারপর শরীরের এখানে-ওখানে। বাধা দেওয়ার কোনো চেষ্টাই করল না টুনু। দাঁড়িয়ে মার খেয়ে চলল। বেত দুটো প্রথমে থেঁতলে গেল। তারপর ভেঙে গেল টুকরো হয়ে। আমরা অবাক হলাম। এত মার কীভাবে সহ্য করছে টুনু! মুখে কোনো উহ্ আহ্ নেই। পানি নেই চোখে। বেত ভেঙে যাওয়ায় স্যার থামলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘যা, বেরিয়ে যা আমার ক্লাস থেকে!’
বইপত্র গুছিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল টুনু।
পরদিন আর স্কুলে এল না। বুড়ির বাড়িতেও নাকি ফিরে যায়নি। গ্রামের কোথাও আর দেখা গেল না টুনুকে। সবাই ভাবল আপদ গেছে। শুধু বুড়ি একাই ইনিয়ে-বিনিয়ে কেঁদে ফিরল এখানে-সেখানে।
সেদিন স্কুলে এলেন না আজমত স্যারও। টুনুকে কোথাও খুঁজে পাওয়া না গেলেও স্যারকে পাওয়া গেল মেঠোপথের ধারে এক শেওড়াগাছের ডালে। পেট লাগিয়ে উপুড় হয়ে ঝুলে আছেন। ধরাধরি করে নামিয়ে আনা হলো তাঁকে। চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতেই জ্ঞান ফিরে এল। চোখ মেলে ফ্যাসফেসে গলায় শুধু বললেন, ‘টুনু, ওই যে ভূতের ছেলেটা...’ তারপর আবার জ্ঞান হারালেন। অবস্থা বেগতিক দেখে উপজেলা হাসপাতালে নেওয়া হলো আজমত স্যারকে।
আমরা খবর পেয়ে দেখতে গেলাম। ততক্ষণে স্যারের জ্ঞান ফিরেছে পুরোপুরি। স্যার আমাদের ফ্যালফ্যালে চোখে দেখলেন কিছুক্ষণ। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, ‘ছেলেটাকে ওভাবে মেরে ঠিক করিনি...ঠিক করিনি।’
স্যারকে দেখে ফিরছিলাম আর ভাবছিলাম। অত উঁচু গাছের ডালে স্যার উঠলেন কীভাবে? উঠলেনই বা কেন? আর কেনইবা জ্ঞান হারালেন? তাহলে কি টুনুই এসব করেছে? সত্যি সে একটা ভূতের ছেলে? গেলইবা কোথায়?
ভাবনা শেষ না হতেই দেখি টুনু দাঁড়িয়ে আছে সামনে। মলিন হাসিমুখে জানতে চাইল, ‘স্যারকে দেখে এলি?’
‘হ্যাঁ। তুই তো যাসনি?’
‘কোন মুখে যাই বল! স্যারের এ অবস্থার জন্য তো আমিই দায়ী।’
‘কী করেছিস তুই?’
টুনু সব খুলে বলল আমাকে।
কাল হাট থেকে রাত করে বাড়ি ফিরছিলেন আজমত স্যার। টুনু তাঁর অপেক্ষা করছিল ওই শেওড়াগাছের ডালে বসে। স্যার ওখানে আসতেই নাকিসুরে ডাক দিয়েছিল। স্যার ধমকে উঠেছিলেন, ‘কে রে! গাছের ওপর কে?’
‘স্যার, আমি টুনু।’
‘এত রাতে গাছের ওপর কী? নেমে আয়।’
‘এটাই তো আমার উপযুক্ত জায়গা, স্যার। ক্লাস থেকে তাড়িয়ে দিলেন। আমি তো ভূতের ছেলে। শেওড়াগাছ ছাড়া আর যাব কোথায়? হি হি হি!’
‘এখনো তোর শিক্ষা হয়নি, না? নেমে আয়। নেমে আয় বলছি!’
লাফ দিয়ে স্যারের সামনে নামল টুনু। আবার লাফিয়ে চড়ে বসল শেওড়ার ডালে। তারপর বলল, ‘আসুন স্যার। আমার মতো এক লাফে ওপরে উঠে আসুন। দেখি বিজ্ঞানের জোর!’
‘এসব কী হচ্ছে, টুনু?’ স্যার বললেন কাঁপা গলায়।
‘স্যার কি ভয় পাচ্ছেন? আপনি তো ভূত বিশ্বাস করেন না। তাহলে ভয় কিসের?’ টুনু ডালে বসেই তার হাত লম্বা করে স্যারের চোখের সামনে নাচায়।
স্যার একটু সরে যান। টুনুর হাতও যায় সেদিকে।
‘ভালো হচ্ছে না, টুনু! তোর এসব বুজরুকি থামা। নেমে আয় বাবা গাছ থেকে।’
টুনু ততক্ষণে স্যারকে দুহাতে ধরে ফেলেছে। স্যার কিছু বুঝে ওঠার আগেই তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছে শেওড়াগাছের ডালে। স্যারের ভিরমি খাওয়ার দশা। টুনু আবার স্যারকে নামিয়ে দিল মাটিতে। আবার তুলল ডালে। এভাবে বার কয়েক করতেই স্যার কাতর গলায় বললেন, ‘ছেড়ে দে বাপ! মানছি তুই সত্যি একটা ভূত। মানে ভূতের ছেলে। এবার ছেড়ে দে বাবা, ছেড়ে দে।’
টুনু কি আর ছাড়ে! ওর খুব রাগ হয়। স্যারকে একবার এ ডালে বসায়। আরেকবার ও ডালে বসায়। একসময় দেখে, স্যার জ্ঞান হারিয়েছেন।
‘কী আর করি। মাটিতে ফেলে রাখলে সাপখোপের ভয়। তাই গাছের ডালেই অমন ঝুলিয়ে রাখতে হলো।’ শুকনো গলায় বলল টুনু।
‘অমন কাজ তুই করতে পারলি?’
‘এখন বুঝতে পারছি, কাজটা আমি ঠিক করিনি। স্যারকে বলিস, আমাকে যেন মাফ করে দেন। এবার চলি রে।’
‘চলি মানে! কোথায় যাবি তুই?’
‘প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, মানুষকে ভয় দেখাব না। মানুষের মতো হব। কিন্তু তা আর পারলাম কই? মা-বাবার কাছেই আবার ফিরে যাচ্ছি। এখন থেকে ভুতুড়ে কারবার করে বেড়াব। ভূতের যা কাজ।’
ওর হাত ধরলাম আমি, ‘এসব কী বলছিস তুই!’
‘তোকে আমার মনে থাকবে রে। খুব ভালো বন্ধু ছিলি তুই?’
‘এসব কথা বাদ দে। কোথাও যাবি না তুই। এখানেই থাকবি। ভূতটুত যা-ই হোস।’
‘তুই কি এখনো বিশ্বাস করিস না, আমি একটা ভূত?’
আমি কিছু বলার সুযোগ পেলাম না। দেখলাম, শেষ বিকেলের আলোয় টুনু ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হতে লাগল। অস্পষ্ট হতে হতে দূরে মিলিয়ে গেল একসময়।
মনটা হাহাকার করে উঠল টুনুর জন্য।
আমি এখন বিশ্বাস করি, টুনু সত্যি একটা ভূত। আমার এ ভূত বন্ধুটা মানুষের মতো হতে চেয়েছিল।