রবিন

অলংকরণ: বিপ্লব চক্রবর্তী

ওর বাপ-মা কাউকেই দেখেননি করবেট। এক ঝাড়ুদার সর্দারের কাছ থেকে কেনার সময় শুনেছিলেন, জাতে ও স্প্যানিয়েল, নাম পিঞ্চা। ওর বাপ নাকি ছিল খুব ভালো শিকারি। ওকে পাওয়ার ইতিহাসটাও বিচিত্র। এক বান্ধবীর বাড়িতে অতিথি হয়ে আছেন করবেট। এই সময় একদিন এক ঝাড়ুদার সর্দারের ময়লার ঝুড়ি থেকে সাতটি কুকুরের বাচ্চা বেরোল। পিঞ্চাই ছিল এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আর দুর্বল। প্রাণপণে টিকে থাকার চেষ্টায় ওর তখন নিতান্তই কাহিল অবস্থা। ওর ভাইবোনদের অবস্থা অবশ্য অত খারাপ না। তাদের কাছ থেকে সরে এসে করবেটের পায়ের কাছে একবার ঘুরল পিঞ্চা, তারপর তাঁর পায়ের তলায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তখন প্রচণ্ড শীত। বাচ্চাটাকে তুলে কোটের ভেতর আশ্রয় দিলেন করবেট। তাঁর হাত চেটে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার চেষ্টা করল পিঞ্চা। করবেটও এমন ভাব দেখালেন যেন ওর গায়ের দুর্গন্ধ মোটেও টের পাচ্ছেন না।

তিন মাসের বাচ্চাটার অনেক বেশি দাম, অর্থাৎ ১৫ টাকা দিয়ে কিনে নিলেন করবেট। বাড়ি নিয়ে গিয়ে ওকে ভালো করে সাবান আর গরম পানি দিয়ে গোসল করালেন, খাওয়ালেন। পিঞ্চা নামটা বদলে নতুন নাম রাখলেন রবিন। শুকনো মাটিতে পানি পেলে যেমন সাড়া দেয় তৃষ্ণার্ত উদ্ভিদ, রবিনও তেমনি নিয়মিত খাবার পেয়ে দেখতে দেখতে বেড়ে উঠল।

কয়েক সপ্তাহ পর রবিনকে নিয়ে শিকার আর বন্দুকের আওয়াজের সঙ্গে পরিচয় করাতে বেরোলেন করবেট। তাঁদের বাড়ির নিচের দিকে কতগুলো ঘন কাঁটাঝোপ ছিল। সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। এমন সময় ঝোপ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এল একটা ময়ূর। বন্দুক তুলে গুলি করলেন ময়ূরটাকে। মারলেন না, কেবল আহত করলেন। পেছন পেছন আসছিল রবিন। ময়ূরটা গুলি খেয়ে কাঁটাঝোপে গিয়ে পড়তেই ওটার দিকে ছুটে গেল সে। ঝোপটা এত ঘন আর কাঁটায় ভরা যে তার ভেতর করবেটের পক্ষে ঢোকা অসম্ভব, কাজেই ঘুরে ফাঁকার দিকে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। ফাঁকা জমিটার পরেই বড় বড় গাছ আর ঘন ঘাসবন। আন্দাজ করলেন, ওদিকেই ছুটে যাবে পাখিটা।

ভোরের সোনালি আলোয় ভেসে যাচ্ছে খোলা জায়গাটুকু। সঙ্গে মুভি ক্যামেরা থাকলে আহত পাখিটার ছবি তোলার এক অপূর্ব সুযোগ ছিল। করবেটের অনুমান ঠিক। সেদিক দিয়েই বেরিয়ে এল ময়ূরী। ডানা ভেঙে গেছে, দাপাতে দাপাতে জঙ্গলে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করল। তার লেজ কামড়ে ধরে আছে রবিন, কিন্তু কী করে কাবু করতে হয় জানে না বলে আটকাতে পারছে না।

তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেলেন করবেট। ময়ূরীটার গলা চেপে ধরে তুলতে যাবেন, এই সময় আচমকা এক লাথি মেরে রবিনকে উল্টে ফেলে দিল সে। কিছুই মনে করল না যেন কুকুরের বাচ্চাটা, পড়েই এক গড়ান খেয়ে আবার উঠে দাঁড়াল। ঘাড় মটকে পাখিটাকে মেরে মাটিতে নামিয়ে রাখলেন করবেট। সেটার চারপাশে ঘুরে ঘুরে খুশিতে লাফাতে লাগল রবিন। সেদিনের মতো শিক্ষানবিশ শেষ হলো তার।

শিকারের মৌসুম শেষ হয়ে এসেছে। তাই পরের কটা দিন রোজই রবিনকে নিয়ে শিকারে বেরোলেন করবেট। মারলেন কোয়েল, ঘুঘু ও তিতির।

পাহাড়ি অঞ্চলে গ্রীষ্মকালটা কাটালেন করবেট। নভেম্বর মাস এল, শীতকালীন আবাসস্থল থেকে নামার সময় হয়েছে। এই সময় একদিন রবিনকে নিয়ে বেড়িয়ে ফিরছেন করবেট, হঠাৎ পাহাড়ের ধার থেকে একটা হনুমান লাফিয়ে পড়ে রবিনের নাকের কয়েক ইঞ্চি দূর দিয়ে রাস্তা পার হয়ে গেল। করবেটের নিষেধ উপেক্ষা করে খাদের ধার ধরে হনুমানটাকে তাড়া করে গেল রবিন। বেকায়দা দেখে চট করে একটা গাছে উঠে পড়ল হনুমানটা। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু গাছ ছাড়া সব জমিটাই এখানে ফাঁকা। প্রায় ৩০-৪০ গজ খাড়া নেমে গিয়ে কয়েক গজ সমতল জায়গার পর ঢালটা আবার খাড়া নেমে গেছে উপত্যকার দিকে। সমতলভূমির ডানে কতগুলো ঝোপ আছে, ওগুলোর মধ্য দিয়ে চলে গেছে একটা গভীর নালা। কী মনে করে একটা ঝোপে উঁকি দিয়েই চরকির মতো পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল রবিন, তারপর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসতে শুরু করল।

অবাক হলেন করবেট, অমন করে ছুটে পালিয়ে আসছে কেন? মুহূর্ত পরেই বোঝা গেল কারণটা, ঝোপ থেকে বেরিয়ে তীব্র গতিতে রবিনকে তাড়া করে এল একটা চিতা। সঙ্গে বন্দুক নেই। একমাত্র উপায় চিৎকার করে চিতাটাকে ভয় দেখানো ছাড়া আর করার কিছু নেই তাঁর।

গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করলেন করবেট। তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন চেঁচাতে লাগল শ খানেক হনুমান। কিন্তু থামল না চিতাটা। রবিনকে প্রায় ধরে ফেলেছে, এই সময় সাহস হারাল ওটা। মানুষের প্রতি স্বাভাবিক ভীতি তো আছেই, তার ওপর এমন বিকট কোলাহল ভড়কে দিল ওটাকে। কুকুরটাকে না ধরে হঠাৎ মোড় নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল নিচের পাহাড়তলিতে।

পাহাড়ের ওপর একবার পাক খেয়ে করবেটের কাছে নেমে এল রবিন। অল্পের জন্য প্রাণ বাঁচল তার। এ থেকে দুটো শিক্ষা পেল সে, যা জীবনে ভোলেনি। হনুমানদের তাড়া করা খুব বিপজ্জনক, আর কারণ ছাড়া কোনো হনুমান অকস্মাৎ ডেকে উঠলে সন্দেহ করতে হবে চিতাবাঘ আছে কাছাকাছি কোথাও।

বছর ঘুরে আবার শিকারের মৌসুম এল। গত বসন্তে রবিনের শিক্ষায় যে ছেদ পড়েছিল তা শুরু হলো আবার। শিগগিরই বোঝা গেল, করবেটের কাছে থেকে সেবাযত্নে শরীরটা বাড়লেও ছোটবেলার অনাহার আর অযত্নের ফলে অত্যন্ত দুর্বল রয়ে গেছে ওর হৃদপণ্ড। বেশি পরিশ্রম করলেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে ও।

পাখি শিকারের ট্রেনিং শেষ হলে বড় শিকারের শিক্ষা আরম্ভ হলো রবিনের। দ্রুত শিকারের কায়দাকানুন শিখে ফেলল সে। রাইফেল হাতে করবেটকে কোথাও বেরোতে দেখলে তাঁর সঙ্গ নেবেই রবিন। রোজ ভোরবেলা বেরিয়ে বাঘ বা চিতার পায়ের ছাপ ধরে এগোতে থাকেন করবেট। যতক্ষণ পায়ের ছাপ নজরে আসে ততক্ষণ আগে আগে থাকেন তিনি, তারপর নেতৃত্বের ভার পড়ে রবিনের ওপর। এভাবে কোনো একটা জানোয়ারকে খুঁজতে খুঁজতে মাইলের পর মাইল হেঁটে যান মনিব-ভৃত্য। বড় জানোয়ার শিকারেও রপ্ত হয়ে উঠল বুদ্ধিমান রবিন। এরপর থেকে বহু শিকারে করবেটের সঙ্গী হয়েছে সে।

একটা শিকারের কথা বলা যাক। রবিনকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি থেকে বহুদূরে চলে এসেছেন করবেট। হঠাৎ একটা ঘন ঝোপের আড়াল থেকে একটা চিতাকে বেরোতে দেখলেন। থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাঁদের দিকে তাকাল চিতাটা। বেশ বড় গোছের পুরুষ চিতা, চকচকে গাঢ় রঙের চামড়ায় গোল গোল দাগ দেখে মনে হয় দামি মখমলের ওপর নকশা এঁকে দিয়েছে কেউ। মাত্র ১৫ গজ দূর থেকে ধীরেসুস্থে ওটার ডান কাঁধে গুলি করলেন করবেট। শরীর এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে গিয়ে ৫০ গজ দূরে মাটিতে লেগে এক ঝলক ধুলা ওড়াল গুলিটা। লাফিয়ে উঠে ডিগবাজি খেয়ে যে ঝোপ থেকে একটু আগে বেরিয়ে এসেছিল, আবার সেই ঝোপেই গিয়ে ঢুকল চিতাটা। তারপর ছুটল সামনের দিকে। টের পাওয়া যাচ্ছে, ঝোপঝাড় ভাঙতে ভাঙতে ছুটে চলেছে সে। গজ পঞ্চাশেক যাওয়ার পর হঠাৎ থেমে গেল আওয়াজ। করবেট ভাবলেন, মারা গেছে চিতাটা।

পাহাড়ের ওপাশে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। বাড়ি প্রায় চার মাইল দূরে। জঙ্গলের এই অংশে লোকালয় কিংবা লোক চলাচল তেমন নেই। বেঁচে থাকলেও খেপে গিয়ে আক্রমণ করার মতো কাউকে এখন আর পাবে না চিতাটা, সুতরাং এই অবেলায় আহত চিতাকে অনুসরণ করার মতো মারাত্মক ঝুঁকি নিলেন না করবেট। পরদিন সকালে এসেও ওটাকে খুঁজে বের করা যাবে। তাই খানিকটা উত্তরে ঘুরে বাড়ির পথ ধরলেন।

জায়গাটা চিহ্নিত করে রাখার কোনো দরকার মনে করলেন না, কারণ গত ৫০ বছর এই এলাকায় দিন-রাত ঘুরছেন করবেট। এখানকার জঙ্গলের ধরতে গেলে প্রতিটি গাছপালা-ঝোপঝাড়ের সঙ্গে তিনি পরিচিত।

পরদিন সকালে অন্ধকার থাকতে থাকতেই রওনা দিলেন করবেট। চলে এলেন আগের দিন চিতাটাকে যেখানে গুলি করেছিলেন সেখানে। অবশ্যই সঙ্গে এনেছেন রবিনকে। যেখানে দাঁড়িয়ে গুলি খেয়েছে চিতাটা, সে জায়গাটা ভালোমতো শুঁকল রবিন, তারপর মাথা তুলে বাতাস শুঁকতে শুঁকতে এগোল ঝোপের ধারে। চিতার শরীরের রক্ত পড়ে জমাট বেঁধে থাকতে দেখা গেল এক জায়গায়। অন্ধকার কাটেনি তখনো। আরেকটু আলো ফুটলে অনুসরণ করা সহজ হবে ভেবে বসার জায়গা খুঁজলেন তিনি। একটা গাছের তলায় খানিকটা শুকনো জায়গা পাওয়া গেল, রাতের শিশিরে ভিজে যায়নি। ঘন পাতার জন্য শিশির পড়তে পারেনি এখানে।

করবেট গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসলে তাঁর পায়ের কাছে পা ছড়িয়ে শুলো রবিন। আহত চিতাটার দিক থেকে সাড়া পাওয়ার ক্ষীণ একটা আশা আছে তাঁর মনে, তারই অপেক্ষায় রইলেন তিনি। জানেন, আশপাশে জানোয়ারটা থেকে থাকলে অথবা চলতে শুরু করলে নিশ্চয় জানাবে জঙ্গলের প্রাণীরা।

প্রথম সিগারেটটা সবে শেষ করেছেন এমন সময় সামনে বাঁ দিকে একে একে ডাকতে শুরু করল তিনটি চিতল হরিণী। সঙ্গে সঙ্গে কান খাড়া করে উঠে বসল রবিন, আস্তে করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল করবেটের দিকে। তাঁর চোখে চোখ পড়তেই ঘাড় ফিরিয়ে আবার তাকাল যেদিক থেকে ডাকছে হরিণীগুলো সেদিকে। ডাক শুনেই বোঝা যাচ্ছে হিংস্র কোনো মাংসাশী জানোয়ার দেখেছে ওরা। আর সেই জানোয়ার চিতাটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরে চুপ করে বসে থাকলেই জানতে পারবেন করবেট, চিতাটা বেঁচে আছে না মরে গেছে।

মিনিট পাঁচেক একা একা ডাকার পর হঠাৎ একসঙ্গে ডেকে উঠল হরিণগুলো, তারপর আবার একলা ডাক। বোঝা গেল বেঁচেই আছে চিতাটা, নড়েও উঠেছে একবার, তারপর আবার চুপ করে গেছে। এখন জানা দরকার, ঠিক কোথায় আছে ওটা। সহজ উপায়, হরিণীগুলোর পিছু নেওয়া।

অলংকরণ: বিপ্লব চক্রবর্তী

উঠে পড়ে উজান বাতাসে ৫০ গজ হেঁটে ঘন ঝোপের মধ্যে ঢুকে হরিণের খোঁজ করতে লাগল করবেট আর রবিন। দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফলে জঙ্গলের ভেতর ছায়ার মতো নিঃশব্দে চলতে পারে রবিন, আর ঠিক কোথায় পা ফেলতে হবে জানা আছে করবেটেরও। খুব কাছে যাওয়ার পর চিতলগুলোর দেখা পেলেন তিনি। খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে উত্তর দিকে মুখ করে ডাকছে ওগুলো।

চিতাটা কোথায় আছে জানা হয়ে গেল তাঁর। এখন নিঃশব্দে হরিণীগুলোর অজান্তে তাঁদের সরে পড়তে হবে, না হলে এতক্ষণ ধরে চিতাটার খোঁজ দিয়ে যে উপকার করেছে ওরা, তাঁদের উপস্থিতি চিতাটাকে জানিয়ে দিয়ে আবার ততটুকু অপকারই করে বসবে। ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন করবেট ঠিক এই সময় কি জানি কেন পেছন ফিরে তাকাল একটা হরিণী এবং দেখে ফেলল তাঁকে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভাষায় ‘খবরদার, মানুষ!’ বলে চিত্কার করে উঠে ছুটে পালাল। লুকোছাপার আর কোনো অর্থ হয় না। ঘুরে আসতে গেলে সময় লাগবে, তাই চিতাটা কোনো ঝোপে লুকিয়ে পড়ার আগেই দৌড় দিলেন তিনি। ঢুকে গেলই চিতাটা, কিন্তু লেজটা চোখে পড়ে গেল তাঁর।

ফাঁকা জমিটায় খানিকক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। চিতাটাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখন রবিনের। গন্ধ শুঁকে ওটাকে বের করতে হলে বাতাসের সাহায্য লাগবে তাঁর। সুতরাং বাতাসের দিক নির্ণয় করে নিলেন করবেট। উত্তর দিক থেকে বাতাস বইছে। চিতাটার গন্ধ পেতে হলে পশ্চিমে যেতে হবে রবিনকে।

হাঁটতে শুরু করলেন করবেট। আগে আগে যাচ্ছে রবিন। ৬০-৭০ গজ যাওয়ার পরই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সে, মুখ তুলে গন্ধ শুঁকতে লাগল বাতাসে। লেজ নাড়তে শুরু করেছে ধীরে ধীরে।

আগের বছর সাংঘাতিক ঝড় হয়েছিল এ অঞ্চলে, অনেক গাছ শিকড়সুদ্ধ উপড়ে পড়েছিল। ৪০ গজ দূরের এমনি একটা উপড়ে পড়া গাছের দিকে তাকিয়ে আছে রবিন। এদিকে মুখ করে আছে গাছের ডালপালাগুলো, গুঁড়ির দুধারে পাতলা ঝোপ, আর এদিক-ওদিক কয়েক গুচ্ছ সবুজ ঘাস। সাধারণ কোনো শিকার হলে দেখামাত্র সোজা ছুটে যাওয়া যায়, কিন্তু এমন এক জানোয়ারের পিছু নিয়েছেন তিনি, যে জখম হলে আর কারও তোয়াক্কা করে না। ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তা ছাড়া গত ১৫ ঘণ্টার অসহ্য যন্ত্রণা নিশ্চয় আরও খেপিয়ে দিয়েছে চিতাটাকে।

করবেটের সঙ্গে .২৭৫ রাইফেল। গত সন্ধ্যায়ও এটা দিয়েই গুলি করেছিলেন। বয়ে নেওয়ার জন্য খুবই চমৎকার হালকা অস্ত্র এটা, নিশানাও খুব ভালো, কিন্তু খুব কাছে থেকে চিতা বা বাঘের মতো বড় জানোয়ারকে ঠেকানোর জন্য তেমন কাজের নয়। যাতে একেবারে মুখোমুখি হয়ে যেতে না হয় সে জন্য সোজা রাস্তায় না গিয়ে এমন একটা পথ ধরলেন তিনি, যাতে ওপড়ানো গাছটা থেকে গজ ১৫ দূরে থাকতেই দেখতে পান চিতাটাকে।

এক পা এক পা এগিয়ে চললেন করবেট। গাছটার ডালপালা পেরিয়ে উল্টো দিকে পৌঁছাতেই হঠাৎ থেমে গেল রবিন। বোঝা যাচ্ছে চিতাটাকে দেখতে পাচ্ছে সে। রবিনের দৃষ্টি অনুসরণ করে ভালো করে তাকাতেই লেজটা চোখে পড়ল করবেটের, খুব ধীরে ধীরে আন্দোলিত হচ্ছে। অর্থাৎ আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে চিতাটা।

গোড়ালিতে ভর করে পাঁই করে ডানে ঘুরে রাইফেল কাঁধে তুলে নিলেন তিনি। ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে এল চিতাটা। গুলি করলেন করবেট। চিতার পেটের তলা দিয়ে গিয়ে বাঁ ঊরুতে বিঁধল বুলেট। গুলির আঘাত আর রাইফেলের প্রচণ্ড আওয়াজে খানিকটা ভড়কে গেল জানোয়ারটা। ফলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো সে। অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন করবেট। তাঁর কাঁধের এক পাশ দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে গিয়ে ওপাশের একটা ঝোপে ঢুকে পড়ল চিতাটা।

করবেটের পায়ের কাছ থেকে একটুও নড়েনি রবিন। চিতাটা অদৃশ্য হয়ে যেতেই প্রভুর দিকে মুখ তুলে তাকাল একবার। নীরব অনুমতি পেয়ে নাক উঁচু করে চিতার গায়ের গন্ধ শুঁকতে শুরু করল বাতাসে। রক্তের দাগ অনুসরণ করে আবার শুরু হলো এগিয়ে চলা। খানিকটা ঘন ঝোপের আড়ালে আড়ালে হাঁটার পর আস্তে আস্তে পাতলা হয়ে এল ঝোপ। আরও কয়েক শ গজ চলার পর একটা ঝোপের সামনে চিতাটাকে দেখা গেল, কিন্তু সে কেবল মুহূর্তের জন্য। রাইফেল তুলে নিশানা করারও সময় পেলেন না করবেট, দ্রুত একটা ল্যান্টানা ঝোপে ঢুকে পড়ল চিতাটা। মাটিতে ডালপালা ছড়ানো এই ঝোপটা বড়সড় একটা তাঁবুর মতো। এখানে যে শুধু লুকিয়েই থাকতে পারবে চিতাটা তা-ই নয়, খুশিমতো আক্রমণের সুযোগও পাবে। আর এগোনো উচিত মনে করলেন না তিনি, তা ছাড়া সঙ্গের রাইফেলটার ওপরও এখন আর তেমন ভরসা করতে পারছেন না। পরদিন সকালের জন্য বাকি কাজটুকু ফেলে রেখে দ্বিতীয় দিনের মতো শিকারে ইস্তফা দিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন।

পরদিন ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন আবার। অনেকক্ষণ থেকেই রওনা হওয়ার জন্য ছটফট করছিল রবিন। ঘর থেকে বেরিয়ে প্রায় ছুটতে শুরু করল সে। তার সঙ্গে তাল রেখে চলতে হিমশিম খেয়ে গেলেন করবেট।

আজ একটা ভারি 400p450 রাইফেল নিয়েছেন সঙ্গে। কাজেই জোর আছে মনে। আগের দিন যেখান থেকে ফিরে গিয়েছিলেন তার একটু আগে থাকতেই ডেকে রবিনকে থামালেন তিনি। বাতাসের দিক নির্ণয় করে নিয়ে একটু ঘুরপথে ঝোপটার দিকে এগিয়ে চললেন। ঝোপটা থেকে প্রায় এক শ গজ দূরে থাকতে থমকে দাঁড়াল রবিন। করবেটের দিকে মুখ ফিরিয়ে ইঙ্গিতে জানিয়ে দিল চিতার গায়ের গন্ধ পাচ্ছে। আগের দিনের মতো এদিনও একটা ওপড়ানো গাছের দিকে মুখ করে আছে সে। ঘন ঝোপের সঙ্গে একই সমান্তরালে পড়ে আছে গাছটা। তার এপাশে ফাঁকা জমি, অন্য পাশে কোমরসমান উঁচু বাসোন্তা ঝোপ।

ইশারায় রবিনকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন করবেট। কিন্তু ল্যান্টানা ঝোপটার কাছাকাছি এসেও কোনো ভাবান্তর দেখতে পেলেন না কুকুরটার মধ্যে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটু দূরে পাথরে ভর্তি একটা শুকনো নালা চোখে পড়ল তাঁর। নালাটার কাছে এগিয়ে গিয়ে গা থেকে কোট খুলে ফেলে পাথরে বোঝাই করে নিলেন ওটা। ফিরে এলেন আগের জায়গায়।

ওপড়ানো গাছটার আশপাশের ঝোপ লক্ষ করে পাথর ছুড়তে শুরু করলেন করবেট। জীবিত থাকলে খোলা জমিটুকুতে বেরিয়ে তাড়া করে আসবেই চিতাটা। কিন্তু সব পাথর শেষ হয়ে গেলেও বেরোল না ওটা। কাশি দিলেন তিনি, হাততালি দিলেন, জোরে জোরে চেঁচালেন, তবুও কোনো সাড়াশব্দ নেই চিতাটার। বেঁচে আছে তো ওটা? মরে গেছে এ ব্যাপারে কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারছেন না। পাহাড়িদের একটা গেঁয়ো প্রবাদ মনে পড়ে গেল, চামড়া ছাড়ানোর আগে পর্যন্ত চিতাকে বিশ্বাস নেই।

নতুন ফন্দি করলেন করবেট। ওপড়ানো গাছটাকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে ক্রমেই বৃত্তের পরিধি ছোট করে আনতে লাগলেন। গাছের বেশ কিছুটা কাছে চলে আসতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল রবিন। রবিনের এই আচমকা পরিবর্তনের কারণ জানার জন্য তার দিকে ফিরে তাকালেন তিনি, ঠিক সেই মুহূর্তে আক্রমণ করল চিতাটা।

কোনো রকম জানান না দিয়ে নিঃশব্দে এসে যদি ঝাঁপিয়ে পড়ত, তাহলে গুলি করারও সুযোগ পেতেন না। কিন্তু প্রথমে চাপা গর্জন করে উঠল চিতাটা। এই গর্জনের ভয়ংকরত্বের সঙ্গে তুলনা করা চলে, পৃথিবীতে এমন আর কোনো শব্দ নেই। এমনকি সাংঘাতিক রেগে যাওয়া আহত বাঘের গর্জনও এতটা ভয়াবহ নয়। চিতাটা গর্জন করে উঠতেই চোখের পলকে ঘুরে গেলেন করবেট। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আর অভ্যাসের ফলে বিপদের সময় আপনাআপনি রাইফেলের ট্রিগারে চেপে বসল আঙুল। ভারী রাইফেলের গুলি খেয়ে শূন্যে থাকতেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো চিতাটা, পড়ল এসে তাঁর এক হাত দূরে। মাটিতে পড়ার আগেই মরে গেছে, তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরেকটা বুলেট ওটার গায়ে বিঁধিয়ে দিলেন তিনি।

সব উত্তেজনার অবসান হতে হাঁটু ভেঙে বসলেন তিনি। এতক্ষণে টের পেলেন, সারা শরীর কাঁপছে। শুধু উত্তেজনায় নয়, সাংঘাতিক ভয়ও পেয়েছেন। সেখানেই মাটির ওপর বসে একটু জিরিয়ে নিলেন। এতক্ষণে মনে পড়ল রবিনের কথা। কোথায় কুকুরটা? এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোথাও দেখতে পেলেন না। কোথায় গেল? ভয় পেয়ে কোনো ঝোপের আড়ালে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে? শঙ্কিত হলেন তিনি। নাম ধরে ডাকলেন।

একটা ঝোপের আড়াল থেকে ভয়ে ভয়ে উঁকি দিল রবিন। তাকে কাছে আসতে ডাকলেন করবেট। চোখ-কান নামিয়ে ভয়ে ভয়ে কাছে এসে দাঁড়াল সে। দারুণ ভয় পেয়েছে বেচারা। থরথর করে কাঁপছে পুরো শরীর।

এটাই ছিল রবিনের শেষ শিকার। এর মাত্র দিন কয়েক পরেই প্রিয় প্রভুকে ছেড়ে পরলোকের পথে পাড়ি জমাল সে। ডাক্তার বললেন, হার্টফেল করে মারা গেছে। চিতার হিংস্র গর্জনে এতটাই ভয় পেয়েছিল, সইতে পারেনি তার দুর্বল হার্ট।

(জিম করবেটের কাহিনি অবলম্বনে)