স্ট্রাইকব্রেকার

অলংকরণ: সাইফ মাহ্‌মুদ

দুই হাতের তালু ঘষল এলভিস ব্লেই। আড়ষ্ট হেসে বলল, ‘স্বনির্ভরতাই আসল ব্যাপার।’

তার দেওয়া সিগারেটে টান দিল ল্যামোরাক। ‘সিগারেটটা এখানকার তৈরি?’

‘হ্যাঁ।’

‘এই ছোট্ট গ্রহাণুতে এসব বিলাসদ্রব্যও তৈরি হয়!’

(স্পেসশিপের ভিসিপ্লেটে প্রথমবার এলসভেয়ারের ছবি দেখার কথা মনে পড়ে গেল ল্যামোরাকের। এক শ মাইল ব্যাসের ছোট্ট ধূসর, পাথুরে, বাতাসহীন গ্রহাণু। নিজস্ব সূর্য থেকে দূরত্ব ২০০,০০০,০০০ মাইল। এই ক্ষুদ্র গ্রহাণুতে এসে বসতি গড়ে তুলেছে মানুষ। অদ্ভুত এই জগতের পরিবেশের সঙ্গে তারা কীভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে, তা পর্যবেক্ষণ করতেই আসা সমাজবিজ্ঞানী ল্যামোরাকের।)

মুচকি হাসল ব্লেই। ‘আমাদের জগৎটা ছোট নয়, ড. ল্যামোরাক। আপনি আমাদের দ্বিমাত্রিক মানদণ্ডে বিচার করছেন। এলসভেয়ারের স্থলভাগ আয়তনে নিউইয়র্কের তিন ভাগের এক ভাগের সমান। তবু আমাদের সমস্যা হয় না। কারণ আমরা ইচ্ছে করলেই এলসভেয়ারের ভেতরের পুরো জায়গা ব্যবহার করতে পারি। ৫০ মাইল ব্যাসার্ধের একটা গোলকের ঘনফল পাঁচ লাখ কিউবিক মাইলের চেয়েও বেশি। আমরা যদি ৫০ ফুট দূরত্বের স্তর পর্যন্ত জায়গা দখল করি, তাহলে এলসভেয়ারের ক্ষেত্রফল হবে ৫৬,০০০,০০০ বর্গমাইল। অর্থাৎ, পৃথিবীর স্থলভাগের সমান। এই ৫৬,০০০,০০০ বর্গমাইলের এক ইঞ্চি জায়গাও পতিত থাকবে না, ডক্টর।’

‘তা-ই নাকি!’ অবাক হয়ে গেল ল্যামোরাক। ‘ও হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আশ্চর্য, এভাবে তো কখনো ভাবিনি! অবশ্য গ্যালাক্সির গ্রহাণুগুলোর মধ্যে কেবল এলসভেয়ারেই প্রতি ইঞ্চি জায়গা বাসযোগ্য করে তোলা হয়েছে। আসলেই আমরা বাকিরা দ্বিমাত্রিক ক্ষেত্রের বাইরে ভাবতে পারিনি। যাকগে, আমার পর্যবেক্ষণে সাহায্য করার জন্য আপনাদের কাউন্সিলকে ধন্যবাদ।’

মাথা দোলাল ব্লেই।

ল্যামোরাক ভুরু কুঁচকে ভাবল: লোকটা অমন বিরস মুখে মাথা দোলাচ্ছে কেন? ও বোধ হয় আমার আগমনে খুশি হতে পারেনি। কোথাও একটা ঘাপলা আছে।

ব্লেই বলল, ‘নিশ্চয়ই। খেয়াল করলে দেখবেন: যতটা পারতাম, ততটা জায়গা এখনো কাজে লাগাইনি আমরা। এলসভেয়ারের খুব সামান্য অংশ খুঁড়ে বাসযোগ্য করা হয়েছে কেবল। আমরা আসলে বসতি স্থাপনের জন্য অত বেশি উৎসাহী নই, রয়েসয়ে এগোতে চাই। নকল অভিকর্ষ-ইঞ্জিন আর সৌরশক্তি উৎপাদকের ক্ষমতা এখনো সীমিত। তাই দ্রুত এগোতে পারছি না।’

‘বুঝেছি। আচ্ছা, কাউন্সিলর ব্লেই, আপনাদের কৃষি এবং পশুপালন স্তরগুলো দেখাতে পারবেন? এই গ্রহাণুর ভেতর গমখেত, গবাদিপশু কেমন দেখাবে, ভাবতেই রোমাঞ্চ হচ্ছে।’

‘আমাদের গরু-ছাগল আপনাদেরগুলোর চেয়ে ছোট, ডক্টর। গম তেমন একটা ফলাই না। ইস্ট ফলাই বেশি। তবে কিছু গম আপনাকে দেখানো যাবে। তুলো-তামাক, ফলের গাছও দেখতে পাবেন।’

‘দারুণ। স্বনির্ভরতা। আপনারা সবকিছুই নবায়ন করছেন।’

ল্যামোরাক খেয়াল করল শেষ কথাটায় অস্বস্তিতে পড়ে গেছে ব্লেই। চোখ কোঁচকাল সে। ‘হ্যাঁ, নবায়ন ছাড়া আমাদের গতি নেই। বাতাস, পানি, খাবার, ধাতু—যা কিছু ব্যবহার করা হচ্ছে, তার সবই আগেকার অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হয়। বর্জ্যপদার্থকে কাঁচামালে রূপান্তরিত করা হয়। আমাদের দরকার শুধু শক্তি। আর সেটা আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে আছে। শতকরা এক শ ভাগ অবশ্য পাওয়া যায় না, নষ্ট হয় খানিকটা। ফি বছর কিছু পানি আমদানি করি। চাহিদা বেড়ে গেলে কয়লা আর অক্সিজেনও আনাতে হয়।’

ল্যামোরাক জিজ্ঞেস করল, ‘আমরা ট্যুর কখন শুরু করব, কাউন্সিলর?’

ব্লেইয়ের মুখের হাসি খানিকটা আন্তরিকতা হারাল। ‘যত শিগগির সম্ভব, ডক্টর। আগে কিছু রুটিন কাজ সারতে হবে।’

রুটিন কাজ? আগে তো এ কথা বলা হয়নি!

ল্যামোরাক বলল, ‘আমার উপস্থিতি বোধ হয় আপনাদের সংঘবদ্ধ ছোট সমাজকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।’

‘হ্যাঁ,’ বলল ব্লেই। ‘গ্যালাক্সির অন্যান্য গ্রহের চেয়ে আমাদের রীতিনীতি একেবারেই আলাদা। আমাদের সমাজে প্রত্যেক এলসভেরিয়ানের জায়গা নির্দিষ্ট। জাত-গোত্রহীন কেউ এলে এখানকার মানুষ অস্বস্তিতে পড়ে যায়।’

‘বর্ণপ্রথা এখানে খুব কড়াভাবে মানা হয়, না?’

‘হ্যাঁ। তবে এই ব্যবস্থা আমাদের আত্মবিশ্বাসও জোগায়। বিয়ে এবং বংশানুক্রমিক পেশার ব্যাপারে কড়া নিয়ম আছে আমাদের। প্রত্যেক নারী, পুরুষ, শিশু নিজের অবস্থান জানে এবং প্রথা মেনে চলে।’

‘এই ব্যবস্থার সঙ্গে বেমানান, এমন কোনো মানুষ নেই?’ জানত চাইল ল্যামোরাক।

‘না’ বলতে গিয়েও থেমে গেল ব্লেই। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, ‘আপনার ট্যুরের ব্যবস্থা করছি, ডক্টর। ততক্ষণে আপনি একটু বিশ্রাম নিন।’

চলে গেল সে।

মনটা খচখচ করছে ল্যামোরাকের। কেবলই মনে হচ্ছে, কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে।

পত্রিকা পড়ার পর সন্দেহ আরও পাকাপোক্ত হলো। শুতে যাওয়ার আগে কৌতূহলের বশে পড়তে নিয়েছিল আট পাতার কৃত্রিম কাগজে ছাপা ট্যাবলয়েড পত্রিকাটা। এক-চতুর্থাংশ কলামই জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, বাসযোগ্য স্থানের প্রসারণ (ত্রিমাত্রিক)—এসব ‘ব্যক্তিগত’ খবরে ভর্তি। বাকি অংশে রয়েছে প্রবন্ধ আর গল্প-কবিতা-উপন্যাস।

কেবল ছোট্ট একটা খবর নজর কাড়ল ল্যামোরাকের। ছোট শিরোনাম দিয়ে লেখা:

দাবি অপরিবর্তিত: সে গতকালের সিদ্ধান্তে স্থির আছে। দ্বিতীয় সাক্ষাতের পর চিফ কাউন্সিলর ঘোষণা করেছেন, তার দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কোনোভাবেই দাবিগুলো পূরণ করা সম্ভব নয়।

তারপর বন্ধনীতে একটা মন্তব্য:

এই পত্রিকার সম্পাদকেরা একমত যে এলসভেয়ার কোনো অবস্থাতেই তার কথায় নাচবে না, নাচতে পারে না।

আরও তিনবার পড়ল ল্যামোরাক খবরটা। তার সিদ্ধান্ত। তার দাবি। তার কথা।

কার?

রাতে ল্যামোরাকের ভালো ঘুম হলো না।

পরদিন থেকে আর পত্রিকা পড়ার সময় পেল না ল্যামোরাক। তবু ব্যাপারটা তাকে খুঁচিয়ে চলেছে। ট্যুরের প্রায় পুরোটা সময় ওর সঙ্গে রইল ব্লেই। আগের চেয়ে চুপচাপ হয়ে গেছে সে।

তৃতীয় দিনে (এখানকার ঘড়ি কৃত্রিমভাবে পৃথিবীর চব্বিশ ঘণ্টার সঙ্গে মেলানো) এক জায়গায় থেমে ব্লেই বলল, ‘এখানে শুধু রাসায়নিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু নেই...’

ফেরার জন্য ঘুরে দাঁড়াল সে। কিন্তু হাত ধরে তাকে থামাল ল্যামোরাক। ‘এই সেকশনে কী তৈরি হয়?’

‘সার...জৈব পদার্থ,’ আড়ষ্ট গলায় জবাব দিল ব্লেই।

তার হাত ছাড়ল না ল্যামোরাক। সে কী লুকাতে চাইছে, জানতে হবে। দিগন্তরেখায় সারি সারি পাথর এবং বাড়ি দেখা যাচ্ছে—স্তরে স্তরে সাজানো।

‘বসতবাড়ি না ওটা?’

বাড়িটার দিকে তাকাল না ব্লেই।

‘এর আগে এত বড় বাড়ি দেখেছি বলে মনে পড়ছে না,’ বলল ল্যামোরাক। ‘ওটা কারখানার স্তরে কেন?’ এ কারণেই বাড়িটা চোখে লাগছে। সে দেখেছে, এলসভেয়ারে কৃষি, শিল্প এবং বাসস্থান আলাদা আলাদা স্তরে থাকে।

ল্যামোরাকের মনে পড়ল, পত্রিকার কোথাও র৵াগাসনিকের নাম লেখা হয়নি। এমনকি তার দাবিদাওয়া সম্পর্কেও বিশদ লেখেনি। সে বলল, ‘তাকে বোধ হয় পেশার কারণেই অচ্ছুত করা হয়েছে, না?’

পিছু ফিরে দেখল হনহন করে চলে যাচ্ছে ব্লেই। ছুটে গিয়ে তাকে ধরল সে। ‘কোনো সমস্যা, কাউন্সিলর ব্লেই?’

ব্লেই বিড়বিড়িয়ে বলল, ‘দুঃখিত, একটা ব্যাপারে খুব দুশ্চিন্তায় আছি...’

‘ওর দাবি নিয়ে?’

থমকে দাঁড়াল ব্লেই। ‘এ ব্যাপারে কী জানেন আপনি?’

‘যতটুকু বললাম, ততটুকুই। পত্রিকায় এইটুকুই লেখা ছিল।’

আপনমনে কিছু একটা বলল ব্লেই।

ল্যামোরাক জিজ্ঞেস করল, ‘র৵াগাসনিক? ওটা আবার কী?’

দীর্ঘশ্বাস ফেলল ব্লেই। ‘আপনাকে সব খুলে বলাই ভালো। ব্যাপারটা বড় লজ্জার। খুব বিব্রতকর। কাউন্সিল ভেবেছিল আপনি আসার আগেই ঝামেলাটা চুকে যাবে। তাই আপনার সফর স্থগিত করিনি আমরা। কিন্তু এক হপ্তা পরও কোনো সমাধান হয়নি। সামনে কী হবে জানি না। আপনার এখন চলে যাওয়াই উচিত। বাইরের জগতের একজনের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার মানে হয় না।’

অবিশ্বাসের হাসি হাসল পৃথিবীবাসী। ‘প্রাণের ঝুঁকি? এই ছোট্ট, শান্ত জগতে? বিশ্বাস হচ্ছে না।’

এলসভেরিয়ান কাউন্সিলর বলল, ‘আপনাকে খুলে বলাই ভালো। জানেনই তো, এলসভেয়ারে সবকিছু রিসাইকেল করা হয়। ...এই নবায়নের মধ্যে মানুষের বর্জ্যও পড়ে। এই বর্জ্য থেকে পাতন ও বিশোষণের মাধ্যমে বের করা হয় পানি। বাকি যা পড়ে থাকে, তা দিয়ে জৈবসার এবং রাসায়নিক উপজাত তৈরি হয়। সামনে যে কারখানাগুলো দেখছেন, ওখানে হয় এসব কাজ।’

‘তাই নাকি?’ এখানকার পানি পান করতে প্রথমে অস্বস্তি হচ্ছিল ল্যামোরাকের। কারণ, পানিটা কোত্থেকে পরিশোধিত হয়ে আসছে, তা সে অনুমান করতে পারছিল। তারপরও অস্বস্তিটা কাটিয়ে উঠতে সমস্যা হয়নি তার। পৃথিবীতেও নানান বর্জ্য পদার্থ থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে পানি পরিশুদ্ধ করা হয়।

অস্বস্তিভরা কণ্ঠে বলে চলল ব্লেই: ‘এসব বর্জ্য পরিশোধনের দায়িত্বে আছে ইগর র৵াগাসনিক। এলসভেয়ারে বসতি স্থাপনের শুরু থেকে এই কাজ করে আসছে ওর পরিবার। মিখাইল র৵াগাসনিক এখানকার প্রথম বাসিন্দাদের একজন, এবং সে...সে...’

‘বর্জ্য পরিশোধনের দায়িত্বে ছিল?’

‘হ্যাঁ। আপনি যে বাড়িটা দেখালেন, ওটা র৵াগাসনিকদের। এই গ্রহাণুর সেরা বাড়ি ওটা। র৵াগাসনিক অনেক সুযোগ-সুবিধা পায়, যা আমরা পাই না। তবে...আমরা কেউ ওর সঙ্গে কথা বলি না।’

‘কী!’

‘পূর্ণ সামাজিক অধিকার চায় সে। চায়, ওর ছেলেমেয়েরা আমাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশুক, আমরা ওর বাড়ি যাই...উহ!’ তীব্র ঘৃণায় কথা শেষ করতে পারল না সে।

ল্যামোরাকের মনে পড়ল, পত্রিকার কোথাও র৵াগাসনিকের নাম লেখা হয়নি। এমনকি তার দাবিদাওয়া সম্পর্কেও বিশদ লেখেনি। সে বলল, ‘তাকে বোধ হয় পেশার কারণেই অচ্ছুত করা হয়েছে, না?’

‘হ্যাঁ। মানুষের বর্জ্য...’ কথা আটকে গেল ব্লেইয়ের। খানিক পর সামলে নিয়ে বলল, ‘পৃথিবীবাসী হিসেবে, ব্যাপারটা আপনি বুঝবেন না।’

‘সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে বুঝতে পারছি।’ প্রাচীন ভারতের অস্পৃশ্যদের কথা মনে পড়ল ল্যামোরাকের। ‘এলসভেয়ার বোধ হয় ওর দাবি মানবে না।’

‘কক্ষনো না,’ দৃঢ়কণ্ঠে বলল ব্লেই।

‘তারপর?’

‘র৵াগাসনিক হুমকি দিয়েছে, কাজকর্ম বন্ধ করে দেবে। অর্থাৎ স্ট্রাইক করবে।’

‘সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কি খুব গুরুতর হয়ে যাবে?’

‘কিছুদিন চলার মতো খাবার আর পানি আমাদের আছে। তাই পরিশোধন এখন তেমন জরুরি নয়। তবে বর্জ্য জমতে থাকলে গোটা গ্রহাণু বিষাক্ত হয়ে পড়বে। বহু প্রজন্ম ধরে অসুখ-বিসুখ নিয়ন্ত্রণ করে রাখার ফলে আমাদের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। একবার রোগ মহামারি আকার ধারণ করলে শত শত লোক মারা পড়বে।’

‘র‌্যাগসনিক এসব জানে?’

‘হ্যাঁ।’

‘এরপরও হুমকি দিয়ে যাবে?’

‘ও একটা পাগল। ইতিমধ্যে কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়েছে। আপনি যেদিন এলেন, সেদিন থেকেই কোনো বর্জ্য পরিশোধিত হচ্ছে না।’ নাক কুঁচকে বাতাসে গন্ধ শুঁকল সে। ‘এখন বুঝতে পারছেন তো কেন আপনার এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত?’

ল্যামোরাক বলল, ‘এখনই যাচ্ছি না। পেশাগত দিক থেকে ব্যাপারটা আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং লাগছে। র৵াগাসনিকের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে পারবেন?’

‘প্রশ্নই ওঠে না,’ সাফ মানা করে দিল ব্লেই।

‘কিন্তু আমি পরিস্থিতিটা বুঝতে চাই। এখনকার সামাজিক পরিস্থিতি অনন্য। অন্য কোথাও এমনটা দেখা যায় না...’

‘কীভাবে কথা বলবেন? ইমেজ রিসেপশনের মাধ্যমে?’

‘হ্যাঁ।’

‘কাউন্সিলকে জিজ্ঞেস করব,’ বিড়বিড়িয়ে বলল ব্লেই।

ল্যামোরাককে ঘিরে বসে আছে সবাই—চেহারায় উদ্বেগের ছাপ।

সাদাচুলো চিফ কাউন্সিলর নিচু গলায় বললেন, ‘আপনি ওকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারলে তো খুব ভালো। তবে আপনার কথায় ও যেন কোনোভাবেই ধরে না নেয় যে আমরা ওর দাবিদাওয়া মেনে নিচ্ছি।’

খানিক বাদে একটা চেহারা ভেসে উঠল পর্দায়। শক্ত চোয়াল, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। লালচে ঠোঁটজোড়া পরস্পরের ওপর চেপে বসেছে।

লোকটা সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘আপনি কে?’

‘আমার নাম স্টিভেন ল্যামোরাক। পৃথিবী থেকে এসেছি।’

‘বাইরের জগতের মানুষ?’

‘হ্যাঁ। এলসভেয়ারে বেড়াতে এসেছি। আপনি নিশ্চয়ই র‌্যাগাসনিক?’

‘ইগর র‌্যাগাসনিক, আপনার সেবায় নিয়োজিত,’ বিদ্রূপের সুরে বলল লোকটা। ‘কিন্তু আমার এবং আমার পরিবারের সঙ্গে যতক্ষণ মানুষের মতো ব্যবহার করা না হয়, ততক্ষণ আর কোনো সেবা নয়।’

‘এলসভেয়ার যে মারাত্মক বিপদের মধ্যে আছে, বুঝতে পারছেন? মহামারি ছড়িয়ে পড়তে পারে এখানে।’

‘চব্বিশ ঘণ্টার ভেতর অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। যদি ওরা আমাকে মানুষের মর্যাদা দেয়।’

‘কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি শিক্ষিত মানুষ।’

‘তো?’

‘শুনেছি, আপনার আরাম-আয়েশের কোনো অভাব নেই। এলসভেয়ারের অন্য যে কারও তুলনায় ভালো বাড়ি, খাবার, কাপড়চোপড় পান আপনি। আপনার ছেলেমেয়েরা সেরা শিক্ষা পায়।’

‘তা ঠিক। কিন্তু সবই সার্ভো-মেকানিজমের মাধ্যমে। আমাদের সেবা করার জন্য পাঠানো হয় এতিম মেয়েদের। বড় হলে ওদের সঙ্গেই আমাদের ছেলেদের বিয়ে হয়। একাকিত্বের কারণে অল্প বয়সে মারা যায় ওরা। কেন?’ রাগে থমথম করছে লোকটার গলা। ‘কেন আমরা দানবের মতো সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকব? কেন মানুষের সংস্পর্শে আসার অযোগ্য হব? অন্যদের মতো আমরাও কি মানুষ নই? ওদের মতো সাধ-আহ্লাদ, আবেগ-অনুভূতি নেই আমাদের? আমরা যে কাজ করি, তা কি মর্যাদাপূর্ণ এবং দরকারি নয়?’

একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ হলো ল্যামোরাকের পেছনে। শুনতে পেয়ে গলা চড়াল র‌্যাগাসনিক। ‘আপনার পেছনে দেখছি কাউন্সিলের সদস্যরা আছে। আমার প্রশ্নের জবাব দিন। আমাদের কাজ কি দরকারি এবং মর্যাদাপূর্ণ নয়? আপনাদের বর্জ্য থেকে আপনাদের জন্যই খাদ্য তৈরি করি আমি। বর্জ্য যে তৈরি করে, তার চেয়েও কি বর্জ্য পরিশোধনকারী বেশি খারাপ লোক? শুনুন, আমি হার মানব না। আমার পরিবারসহ এলসভেয়ারের সবাই মহামারিতে মরে গেলেও না। এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মহামারিতে মরে যাওয়াও ভালো।’

‘আপনি তো জন্ম থেকে এই জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন, তাই না?’ বলে উঠল ল্যামোরাক।

‘মোটেই অভ্যস্ত হইনি। মেনে নিয়েছি হয়তো। আমার বাবা মেনে নিয়েছিলেন, আমিও মেনে দিয়েছিলাম কিছুদিন। কিন্তু আমার একমাত্র ছেলের কোনো খেলার সঙ্গী নেই। আমার সঙ্গে খেলার জন্য ভাই ছিল, কিন্তু আমার ছেলের কেউ নেই। না, এই জীবন আর মেনে নিচ্ছি না। অনেক কথা বলেছি, আর না।’ রিসিভার বন্ধ হয়ে গেল।

পাণ্ডুর হয়ে গেছে চিফ কাউন্সিলরের চেহারা। ‘লোকটা উন্মাদ হয়ে গেছে! বুঝতে পারছি না ওর ওপর কীভাবে জোর খাটাব।’

ল্যামোরাক জানতে চাইল, ‘তার দাবিগুলো কি এতই অযৌক্তিক? সমাজ ওকে মেনে নিচ্ছে না কেন?’

‘বর্জ্য ঘাঁটাঘাঁটি করে ও!’ ঝাঁজিয়ে উঠলেন বৃদ্ধ। ‘আপনি তো পৃথিবী থেকে এসেছেন। এসব বুঝবেন না।’

এদের মধ্যযুগীয় চিন্তাধারা দেখে অবাক হয়ে গেছে ল্যামোরাক। তবে মুখে বলল, ‘র৵াগাসনিক কি সত্যি সত্যি বর্জ্য ঘাঁটে? মানে, হাত দিয়ে ঘাঁটে? সব কাজ নিশ্চয়ই স্বয়ংক্রিয় মেশিনে হয়?’

‘হ্যাঁ,’ সায় দিলেন চিফ কাউন্সিলর।

‘তাহলে র৵াগাসনিকের কাজটা ঠিক কী?’

‘নিজের হাতে মেশিন চালায় সে। মেরামতির দরকার হলে তা করে। কাজের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনের হার ঠিক করে।’ তারপর দুঃখী গলায় যোগ করলেন, ‘জায়গা বেশি থাকলে মেশিনগুলো এর চেয়ে দশ গুণ জটিল করে বানাতে পারতাম। তখন সবকিছুই স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেত।’

‘কিন্তু র৵াগাসনিক তো বোতাম টিপে মেশিন চালু করা আর বন্ধ করার বেশি কিছু করে না,’ ল্যামোরাক বলল।

‘হ্যাঁ।’

‘তাহলে তো এলসভেয়ারের অন্যদের পেশার সঙ্গে ওর পেশার কোনো তফাত নেই।’

ব্লেই আড়ষ্ট গলায় বলল, ‘আপনি সেটা বুঝবেন না।’

‘এ কারণে নিজেদের ছেলেমেয়ের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন?’

‘আমাদের আর কোনো উপায় নেই,’ জবাব দিল ব্লেই। তার বিমর্ষ কণ্ঠ শুনে ল্যামোরাক বুঝল, আসলেই খুব যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতিতে আছে লোকগুলো।

বিরক্ত হয়ে কাঁধ ঝাঁকাল সে। ‘তাহলে ধর্মঘট ভাঙুন। জোর করে কাজে পাঠান ওকে।’

‘কীভাবে?’ জিজ্ঞেস করলেন চিফ কাউন্সিলর। ‘কে ওকে ছোঁবে বা কাছে ঘেঁষবে? আর ওকে যদি দূর থেকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মেরেও ফেলি, তাতেই–বা কী লাভ?’

‘আপনাদের কেউ ওর মেশিন চালাতে জানেন?’

তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন চিফ কাউন্সিল। ‘আমি ওর কাজ জানব?’

‘আপনার কথা বলিনি,’ কড়া গলায় বলল ল্যামোরাক। ‘জানতে চেয়েছি, আপনাদের ভেতর কেউ ওর মেশিনটা চালানো শিখে নিতে পারেন কি না।’

এবার শান্ত হলেন চিফ কাউন্সিলর। ‘হ্যান্ডবুকে সব নিয়মকানুন লেখা আছে। তবে আমি কোনো দিন এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি।’

‘তাহলে কেউ একজন কৌশলটা শিখে নিতে পারেন না? র৵াগাসনিক যত দিন রাজি না হয়, তত দিন কাজটা সে-ই চালিয়ে নেবে।’

‘কে রাজি হবে অমন নোংরা কাজ করতে? আমি অন্তত হব না,’ ঘৃণাভরে বলল ব্লেই।

ভাবতে লাগল ল্যামোরাক। পৃথিবীতেও এ ধরনের কুসংস্কার প্রচলিত আছে অনেক। খানিক বাদে মুখ খুলল সে। ‘র৵াগাসনিকের পদ শূন্য ঘোষণা করুন। ধরুন, সে মারা গেছে।’

‘ও মারা গেলে তো ওর ছেলে কিংবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় নেবে চাকরিটা।’

‘যদি ওর কোনো প্রাপ্তবয়স্ক আত্মীয় না থাকে? ওর পরিবারের সবাই মারা গেলে?’

‘তেমনটা কখনো হয়নি, হবেও না,’ জবাব দিলেন চিফ কাউন্সিলর। ‘তেমন সম্ভাবনা থাকলে ওখানে দু-একটা শিশু পাঠিয়ে কাজ শিখিয়ে নিতাম।’

‘আচ্ছা! তা সেই শিশু বাছাই করতেন কীভাবে?’

‘জন্মের সময় যাদের মা মারা যায়, তাদের মধ্য থেকে মেয়ে নির্বাচন করা হয় র৵াগাসনিকদের সঙ্গে বিয়ের জন্য।’

‘তাহলে এখন র৵াগাসনিকের বিকল্প বেছে নিন,’ বলল ল্যামোরাক।

‘অসম্ভব!’ সরোষে বললেন চিফ কাউন্সিলর। ‘এমন পরামর্শ কীভাবে দিলেন? যে শিশু নির্বাচিত হয়, তাকে বড়ই করা হয় ওই পরিবেশের উপযুক্ত করে। এখন দরকার প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে ওই কাজ করতে পাঠানো। না, ডক্টর, আমরা তো অমানুষ নই।’

লোকটার কথায় হতাশ হয়ে পড়ল ল্যামোরক। আরেকটা চিন্তা এল তার মাথায়। তবে তখনই কিছু বলল না।

সে রাতে ঘুম হলো না ল্যামোরাকের। মনুষ্যত্বের ন্যূনতম অধিকারটুকু চাইছে র৵াগাসনিক। কিন্তু সে দাবি মেনে নিতে মোটেও প্রস্তুত নয় এলসভেরিয়ানরা। ফলে ৩০ হাজার এলসভেরিয়ান আজ মৃত্যুর মুখোমুখি।

একদিকে ত্রিশ হাজার এলসভেরিয়ানের জীবন, অন্যদিকে একটি পরিবারের মৌলিক অধিকারের ন্যায্য দাবি। এমন অন্যায় যারা সমর্থন করে, সেই ৩০ হাজার মানুষের কি মৃত্যুই প্রাপ্য? আর অন্যায়টা কিসের মানদণ্ডে? পৃথিবীর? নাকি এলসভেয়ারের? ল্যামোরাকই–বা এর বিচার করার কে?

আর র৵াগাসনিক? ৩০ হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে প্রস্তুত সে। এদের মধ্যে সেসব মানুষও আছে, যাদের এই ব্যবস্থা মেনে নিতে শেখানো হয়েছে। ব্যবস্থাটা পরিবর্তনের ক্ষমতাও তাদের নেই। আর আছে শিশুরা। ওরা তো এসবের কিছুই বোঝে না।

একদিকে ৩০ হাজার, অন্যদিকে একটি পরিবার। নিরুপায় হয়ে মনস্থির করল ল্যামোরাক। সকালে চিফ কাউন্সিলরের কাছে গেল সে। ‘স্যার, আপনারা যদি একজন বিকল্প বাছতে পারেন, তাহলে র৵াগাসনিক দেখবে ওর দাবি আর মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তখন সে কাজে যোগ দেবে।’

‘বললামই তো, ওর কোনো বিকল্প নেই,’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কাউন্সিলর।

‘এলসভেরিয়ানদের মধ্যে নেই, বাইরে তো আছে। আমি এলসভেয়ারের বাসিন্দা নই। বিকল্প হতে আমার কোনো অসুবিধা নেই।’

সবাই খুব উত্তেজিত। বারবার জিজ্ঞেস করছে, প্রস্তাবটা ল্যামোরাক ভেবেচিন্তে দিয়েছে কি না।

‘অবশ্যই,’ জবাব দিল সে। ‘এরপর কখনো যদি র৵াগাসনিক এভাবে আপনাদের হুমকি দেয়, তাহলে বাইরে থেকে বিকল্প কাউকে আমদানি করতে পারবেন। অন্য কোথাও আপনাদের মতো কুসংস্কার নেই। টাকা দিলেই প্রচুর সাময়িক বিকল্প পেয়ে যাবেন।’

(সে জানে, একজন নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখা ছাড়া তো ওর ওপর আর কোনো নির্যাতন হচ্ছে না। খুব আরাম-আয়েশে আছে সে।)

ল্যামোরাককে একটা হ্যান্ডবুক দেওয়া হলো। ছয় ঘণ্টায় ওটা পড়ে শেষ করল সে। এলসভেরিয়ানদের কেউ জানেও না ওতে কী লেখা আছে।

‘লাঞ্জ-হাউলার লাল সংকেত দেওয়ার সময় এ-টু গ্যালভানোমিটারের রিডিং শূন্য রাখতে হবে। এটা আবার কী?’

‘শুনেছি, আপনার আরাম-আয়েশের কোনো অভাব নেই। এলসভেয়ারের অন্য যে কারও তুলনায় ভালো বাড়ি, খাবার, কাপড়চোপড় পান আপনি। আপনার ছেলেমেয়েরা সেরা শিক্ষা পায়

র৵াগাসনিক যে হেডকোয়ার্টারে কাজ করে, সেখানে ল্যামোরাককে রেখে চলে গেল সবাই। একের পর এক ঘর পেরিয়ে যাচ্ছে সে। সব যন্ত্রপাতির কন্ট্রোল বুঝে নিচ্ছে হ্যান্ডবুকের নির্দেশনা ও ডায়াগ্রাম দেখে।

একটা যন্ত্র দেখে মনে হলো ওটাই বোধ হয় লাঞ্জ–হাউলার। অর্ধচন্দ্রাকৃতি চাকতির মধ্যে অনেকগুলো গর্ত।

ওগুলোতে বোধ হয় বিভিন্ন রঙের আলো জ্বলে।

ইতিমধ্যে কোথাও বর্জ্যের রাশি পুঞ্জীভূত হয়ে উঠছে—ভাবল ল্যামোরাক। ঠেলা মারছে বেরোবার পথে, গিয়ারে, পাইপলাইনে।

হ্যান্ডবুকের নির্দেশনা পড়ে, কাঁপা হাতে সুইচটা টান দিল সে। মৃদু গুঞ্জনের আওয়াজ ভেসে এল মেঝে ও দেয়ালের ভেতর দিয়ে। একটা নব ঘোরাতেই আলো জ্বলে উঠল।

হ্যান্ডবুক পড়ে একের পর এক কাজ করে গেল ল্যাম্বকে। ক্রমে উজ্জ্বল আলোয় ভরে গেল ঘর। বাড়তে লাগল মেশিনের ঘর্ঘর আওয়াজ। ডায়াল-ইন্ডিকেটরগুলো ঘুরতে লাগল দ্রুতবেগে।

কারখানার মধ্যে কোথাও জমে থাকা বর্জ্যগুলো পাইপলাইনের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হতে শুরু করল। সহসা একটা তীক্ষ্ণ হুইসেলে মনোযোগ ভেঙে গেল ল্যামোরাকের। যোগাযোগের সংকেত। রিসিভারের সুইচ অন করল ল্যামোরাক।

র৵াগাসনিকের বিস্মিত চেহারা ভেসে উঠল ইমেজ রিসেপশনে। ধীরে ধীরে বিস্ময়ের ভাব কেটে গেল তার চোখ থেকে। ‘এই তাহলে ব্যাপার।’

‘আমি এলসভেরিয়ান নই, র৵াগাসনিক। তোমার কাজ করতে বাধা নেই আমার।’

‘কিন্তু এ ব্যাপারে তোমার এত মাথাব্যথা কেন? নাক গলাতেই–বা এসেছ কেন?’

‘আমি তোমার পক্ষে, র৵াগাসনিক, তবু কাজটা আমাকে করতেই হবে।’

‘আমার পক্ষে থাকলে, করতে হবে কেন? আমার সঙ্গে ওরা যেমন করছে, তোমাদের জগতেও কি মানুষের সঙ্গে এমন ব্যবহার করা হয়?’

‘না, এখন আর করে না। তবু, তোমার দাবি ন্যায্য হলেও, এলসভেয়ারের ৩০ হাজার মানুষের কথাও ভাবতে হবে।’

‘এত ভাবলে ওরা আমার দাবি মেনে নিত। আমার একমাত্র সুযোগটা তুমি নষ্ট করে দিলে।’

‘কিছুতেই তোমার দাবি মানত না ওরা। একদিক দিয়ে তুমি জিতেছ। ওরা জানল, তুমি ওদের ওপর নাখোশ। আজতক ওরা ভাবতেও পারেনি, র৵াগাসনিক অসন্তুষ্ট হতে পারে, বিদ্রোহ করতে পারে।’

‘তাতে লাভটা কী হলো? এখন থেকে ওরা বাইরের জগতের লোক ভাড়া করে নিয়ে আসবে।’

তুমুল বেগে মাথা নাড়ল ল্যামোরাক। গত কয়েক ঘণ্টায় এ নিয়ে অনেক ভেবেছে সে। ‘আসল ব্যাপার হলো, এলসভেরিয়ানরা এখন থেকে তোমাকে নিয়ে ভাববে। কেউ কেউ ভাববে একজন মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করা ঠিক কি না। ওরা যদি বাইরের জগৎ থেকে লোক ভাড়া করে আনে, তাহলে গ্যালাক্সিতে খবরটা ছড়িয়ে পড়বে। তার ফলে গোটা গ্যালাক্সির জনমত তোমার পক্ষে যাবে।’

‘তারপর?’

‘পরিস্থিতি বদলাবে। তোমার ছেলের আমলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’

‘আমার ছেলের আমলে,’ বিরস বদনে বলল র৵াগাসনিক। ‘এখনই হতে পারত। যাকগে, আমি হেরে গেলাম। এখনই কাজে ফিরে যাচ্ছি।’

স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল ল্যামোরাক। ‘ধন্যবাদ, স্যার। নিন, কাজ শুরু করুন। তার আগে আপনার সঙ্গে হাত মেলাতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করব।’

চমকে উঠল র৵াগাসনিক। ধীরে ধীরে বিষণ্ণ অহংকারের ছাপ পড়ল তার মুখে। ‘আমাকে আপনি “স্যার” বললেন! নিশ্চয়ই হাত মেলাব আপনার সঙ্গে।’

করমর্দন সেরে ফিরতি পথ ধরল ল্যামোরাক। সংকট কেটে যাওয়ায় হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে, মনটাও খারাপ হয়ে আছে।

খানিক দূর এগিয়েই থমকে দাঁড়াল সে। সামনের করিডরে বেড়া দেওয়া। রাস্তা বন্ধ। যাওয়ার পথ খুঁজছে এদিক-ওদিক তাকিয়ে, এমন সময় মাথার ওপর অদৃশ্য কণ্ঠের আওয়াজ শুনে চমকে উঠল। ‘ড. ল্যামোরাক, শুনতে পাচ্ছেন? আমি কাউন্সিলর ব্লেই।’

ওপরে তাকাল ল্যামোরাক। কোনো ধরনের পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম দিয়ে আসছে কণ্ঠস্বর। ‘শুনছি,’ পাল্টা চেঁচাল সে। ‘কোনো সমস্যা হয়েছে? এখানে রাস্তা বন্ধ। র৵াগাসনিক আবার গোলমাল পাকিয়েছে নাকি?’

‘না, সে কাজে যোগ দিয়েছে,’ ব্লেইয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। ‘এবার আপনি বিদায় নেওয়ার জন্য তৈরি হোন।’

‘বিদায়?’

‘হ্যাঁ। আপনার জন্য একটা স্পেশশিপ প্রস্তুত আছে।’

‘কিন্তু আমার ডেটা সংগ্রহের কাজ তো এখনো শেষ হয়নি।’ হতভম্ব হয়ে গেল ল্যামোরাক।

‘আমাদের কিছু করার নেই। আপনাকে সোজা শিপে নিয়ে যাওয়া হবে। আপনার জিনিসপত্রও পাঠিয়ে দেওয়া হবে সার্ভো-ম্যাকানিজমের মাধ্যমে। আমাদের বিশ্বাস...’

ধীরে ধীরে ব্যাপারটা বুঝতে পারছে ল্যামোরাক, ‘কী বিশ্বাস আপনাদের?’

‘আমাদের বিশ্বাস, কোনো এলসভেরিয়ানের সঙ্গে কথা বা দেখা করার চেষ্টা করবেন না আপনি। এবং ভবিষ্যতে এলসভেয়ারে আসার চেষ্টা করে আমাদের বিব্রত করবেন না। ডেটা সংগ্রহের দরকার হলে আপনার কোনো সহকর্মীকে পাঠিয়ে দেবেন। আমরা তাকে সব ধরনের সাহায্য করব।’

‘বুঝতে পেরেছি,’ অনুভূতিশূন্য কণ্ঠে বলল ল্যামোরাক।

তাহলে সে-ই এখন র৵াগাসনিকে পরিণত হয়েছে! বর্জ্য পরিশোধনের কন্ট্রোল নাড়াচাড়া করেছিল বলে সে-ও এখন অস্পৃশ্য, অচ্ছুত।

‘গুড বাই,’ বলল সে।

ব্লেইয়ের গলা ভেসে এল, ‘এলসভেয়ারের কাউন্সিলের পক্ষ থেকে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, ডক্টর। ধন্যবাদ এই সংকট থেকে আমাদের উদ্ধার করার জন্য।’

‘ধন্যবাদ,’ তিক্ত কণ্ঠে বলল ল্যামোরাক।

লেখক পরিচিতি: আইজ্যাক আসিমভ (১৯২০-১৯৯৬) বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির অন্যতম প্রভাবশালী লেখক। অসংখ্য বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লিখে গেছেন তিরি। তাঁর বিখ্যাত ‘ফাউন্ডেশন’ সিরিজ আজও পাঠকপ্রিয়।