default-image

অপি করিম। মঞ্চ কিংবা টেলিভিশন—প্রাণবন্ত অভিনয় দিয়ে দুই জায়গাতেই তিনি জয় করেছেন অসংখ্য মানুষের হূদয়। একটিমাত্র চলচ্চিত্রে অভিনয় করেই জিতেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। নিজেকে ‘অলরাউন্ডার’ মানতে নারাজ হলেও অলরাউন্ডারের মতোই সফল হয়েছেন লেখাপড়া, নাচ, অভিনয় আর উপস্থাপনাতেও। গান আর আবৃত্তিও রপ্ত করেছেন অভিনয়ের সুবাদে। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি শেষ করে স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। জার্মানি থেকে নিয়েছেন উচ্চতর ডিগ্রি। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল অপির। বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় নিজ বাসায় তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন কিশোর আলোর সাক্ষাত্কার দলের। সেই দলে ছিল লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মনন মাহমুদ, কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সাবা সিদ্দিকা, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের সুবেহ তারেক, ঢাকা সিটি কলেজের মোহাইমিনুল আল মাহীন এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের সামিয়া শারমিন। ছবি তুলেছেন খালেদ সরকার

আপনি যে পড়াশোনায় ভালো ছিলেন, সেটা আমরা জানি। কিন্তু  আপনি কি দুষ্টু ছিলেন?

আসলে ‘ভালো’ কাকে বলে? যদি সবকিছু সামলে পড়াশোনা করাটা ভালো হয়, তাহলে আমি অবশ্যই অন্য সবার চেয়ে ভালো ছিলাম। দুষ্টু ছিলাম না। তবে  কখনো পরীক্ষায় প্রথমও হইনি। বাবা-মাও কখনো প্রথম হওয়ার জন্য আমাকে চাপাচাপি করতেন না।

স্কুলের কোনো মজার স্মৃতি...

আমার অনেকগুলো স্কুল ছিল। উদয়ন স্কুলে পড়েছি। এরপর অনেকগুলো স্কুল বদলে সপ্তম শ্রেণিতে উঠে ভর্তি হলাম বিএএফ শাহীন স্কুলে। আমাদের ক্লাসে একটা ছেলে খালি বোর্ডে আমার নাম লিখে রাখত। মানে একটু নড়াচড়া করলেই বোর্ডে নাম লিখে ফেলত। কেন লিখে রাখত জানি না। জেলাস কিংবা পছন্দ করত কি না তাও বলতে পারি না। তারপর স্যার আসার আগেই সেটা মুছে ফেলত। একবার স্যার আসার আগে ও আর লেখাটা মুছতে পারেনি। সেদিন স্যার আমাকে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে কান ধরিয়ে রাখলেন। পরদিনও একই কাজ করল ছেলেটা। স্যার এসে হাতে মারলেন আমাকে। এটা আমি মজার অভিজ্ঞতা বলব কি না জানি না। তবে স্কুলজীবনে প্রথম ও শেষ মার খাওয়া, যেখানে আমার আসলে কোনো দোষ ছিল না।

আপনি বড় হয়েছেন পুরান ঢাকায়। ইতিহাস ঐতিহ্যে ভরা পুরান ঢাকার দিনগুলো কেমন ছিল?

পুরান ঢাকার যে একটা আলাদা ঐতিহ্যের ব্যাপার আছে, সেটা আসলে অনেক বড় হওয়ার পর বুঝেছি। বিশেষ করে স্থাপত্য,  রাস্তার আর্টিকুলেশন এসব। রাস্তাও কিন্তু কথা বলে। মোহাম্মদপুরের রাস্তার একরকম কথা, গুলশানের রাস্তার একরকম কথা। আবার পুরান ঢাকার রাস্তার কথা আরেক রকম। যখন ছোট ছিলাম, পুরান ঢাকা থেকে মোহাম্মদপুর চলে এসেছি, তখন মনে হতো, পুরান ঢাকার রাস্তাগুলো অনেক সরু। কিন্তু যখন আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি, তখন মনে হতো যে, এসব নির্জন রাস্তার চেয়ে ওই রাস্তাগুলো অনেক আপন। সবার সঙ্গে দেখা হয়, হাই হ্যালো হয়, মোড়ের দোকানে গিয়ে সবাই বসে, মুরব্বিরা এলে জায়গাটা ছেড়ে দেয়—সালাম, আদবকায়দা—ওই মানবিক বিষয়গুলো পুরান ঢাকায় অনেক বেশি আছে বলে মনে হয়। ওখানে সবাই একসঙ্গে থাকে, সবার মধ্যে একধরনের বন্ধন কাজ করে। ওইটা আমি মিস করি। আমি যখন বুয়েটে থিসিস করি তখন শাঁখারীবাজারের একটা বাড়ি ভেঙে পড়েছিল। প্রথম আলো সে সময় অনেক তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছিল। তখন আমাকে শিক্ষকেরা জিজ্ঞাসা করেছেন ‘তুমি এটা কেন করবে?’ আমি বলেছি আমি আসলে পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠা একটা মেয়ে—পুরান ঢাকায় এসে রাস্তা ধরে বিল্ডিং ফেলে দেওয়া হচ্ছে, এতে তো ঐতিহ্যটা থাকবে না। এটা নিয়ে আমি কাজ করতে চাই। পুরান ঢাকায় হয়তো হাঁটার জায়গা নেই, কিন্তু ছাদের মধ্যে সবাই একসঙ্গে কথা বলে। এখন হয়তো ততটা নেই এসব। আমাদের বাড়িতে মাঝখানে একটা কোর্ট ইয়ার্ড ছিল, ওখানে ছিল একটা চাপকল। এক বাসার দরজা দিয়ে আরেক বাসার কোর্ট ইয়ার্ডে যাওয়া যেত। ওই যে একটা মেলবন্ধন—এখন এই বাসায় আমাদের আশপাশে যে ফ্ল্যাটগুলো আছে, আমি কিন্তু জানি না সেখানে কে থাকে। পুরান ঢাকার মানুষের আত্মা যে খুব বড় হয়, এগুলোর কারণেই। তুমি শেয়ার করছ আমার সঙ্গে, আমি শেয়ার করছি ওর সঙ্গে। অনেক আত্মা মিলে তো বড় আত্মা হবেই।

ছোটবেলার কোন জিনিসটি খুব মিস করেন?

আমরা খালাতো, মামাতো ভাইবোনেরা সবাই একসঙ্গেই বেড়ে উঠেছি। খালা, নানু, মামা সবাই মিলে একটা বাসায় থাকতাম। তখন ছাদের ওপর ফুটবল খেলা বা রোজার সময় একটা টেবিল ভরে ইফতার সাজানো এসব মিস করি। আবার যদি ছোট হয়ে যেতে পারতাম!

আপনি অভিনেত্রী, মডেল, স্থপতি, শিক্ষক, নৃত্যশিল্পী, উপস্থাপক। আপনি আসলে কী হতে চেয়েছিলেন?

নাচ আমি অসম্ভব পছন্দ করি। নৃত্যশিল্পী হতে চেয়েছি কি না জানি না, তবে কখনো অভিনয়শিল্পী হতে চাইনি। ছোটবেলায় তো আসলে স্থাপত্য বুঝতাম না। তখন বলতাম, বাড়ি বানাব। সেভাবে বলতে গেলে, ছোটবেলায় হয়তো নির্মাণ করতে চেয়েছি। সে ক্ষেত্রে স্থাপত্যকেই ধরতে হয়। তবে আমি শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম সব সময়। কারণ, আমার আম্মা শিক্ষক ছিলেন। অনেকটা স্বপ্ন ছিল, আম্মার মতো শিক্ষক হব। আম্মাকে সবাই খুব পছন্দ করত। কারণ, আম্মা একদমই বকা দিতেন না। আমি আবার ঠিক উল্টো হয়ে গেছি। অসম্ভব বকাঝকা করি।

ছোটবেলায় এক কোচিংয়ে নাকি তারানা হালিমকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন। তিনি তখন অভিনেত্রীও ছিলেন। শিক্ষক বা অভিনয়শিল্পী হওয়ার পথে তাঁর কি কোনো প্রভাব আছে?

তারানা হালিমকে যখন পেয়েছি, তখন আমি বৃত্তি পরীক্ষা দেব। তখন আমার মাথায় ছিল আমাকে বৃত্তি পেতে হবে। বৃত্তি পেলে আমাকে আম্মা শিবলী মহম্মদের কাছে নাচ শেখাবে। অভিনয় আমাকে কখনো ও রকম টানেনি আরকি! কেউ যদি আমাকে বলে অভিনয় বা নাচ যেকোনো একটাই করতে পারবে—তখন আমি অবশ্যই নাচটা বেছে নেব। তারানা হালিম তাই অভিনয়শিল্পীর চেয়ে আমার  শিক্ষক—ওনার কাছ থেকে শিখেটিখে বৃত্তি পাব, বৃত্তি পেয়ে আমি নাচতে পারব—এটাই ছিল মনে (হাসি)।

অভিনয়জগতে কীভাবে এলেন?

আমি প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়াই আড়াই বছর বয়সে। সকাল সন্ধ্যা নাটকের অভিনয়ে। আমি খুব পকপক করে কথা বলতাম বলে আমাকে দেওয়া হয় পারুলির চরিত্র। সেই স্মৃতি আমার মনে নেই। ওটা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত করেছিলাম। এখন অনেকে দেখা হলে বলে ‘তুমি পারুলি না? তুমি মোড়লের মেয়ে না?’

অভিনয় জিনিসটা ছোটবেলায় করা সহজ ছিল; নাকি বড় হয়েই বেশি সহজ মনে হয়?

পর্দার অভিনয় বরাবরই কঠিন। ছোটবেলায় তো মনে নেই কী করতাম! বড়বেলায় কঠিন লাগে। তবে আমার এখন মনে হয় বাস্তবেও মাঝেমধ্যে অভিনয় করা উচিত্, যেটা আমি একদম পারি না। যখন আমার রাগ হয় তখন আমি কোনোভাবে আমার রাগের অনুভূতিটা লুকাতে পারি না। আবার কেউ একটা কথা বলল, শুনে আমার মনে হলো, ‘হাহ,্ কী বলে!’ কিন্তু এটা যে আসলে হজম করে ফেলা উচিত অভিনয়ের মাধ্যমে, এটা আমি চাইলেও পারি না।

নিজের অভিনীত কোনো একটি চরিত্র হয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে বললে আপনি কোন চরিত্রটি বেছে নেবেন?

রক্তকরবীর নন্দিনীকে বেছে নেব। কারণ, নন্দিনী অনেকটা আমার মতো। নন্দিনী অভিমান করে, ভালোবাসে, রাজাকে উচিত কথাটাও বলে, আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা অন্যায় যে ঠিক না তাও প্রকাশ করে। তাই আমার মনে হয় আমি নন্দিনী হলে এখন যেমন আছি, তেমন হয়েই কাটিয়ে দিতে পারি।

default-image

একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, তাতেই পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পরে আর চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি কেন?

যখন কোনো একটি জিনিস অর্জন করা হয়, তখন তা অর্জন করার চেয়ে ধরে রাখা অনেক বেশি কষ্টকর। একটা সময় মনে হয়েছে যে এমন চলচ্চিত্র করা উচিত, পরবর্তীকালে যেটা আমাকে আবার উদ্বুদ্ধ করবে। সে ক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় কাজ করত। প্রথমত, সে সময়ে যে চিত্রনাট্য পেতাম আমি, তার সঙ্গে আমার বুয়েটের ক্লাস ক্ল্যাশ করত। বুয়েট চলাকালীন কখনোই এমন হয়নি যে আমি ক্লাস মিস করে শুটিং করেছি। পড়াশোনাকে গুরুত্ব না দিয়ে অন্য কিছু কখনোই আমার কাছে প্রাধান্য পায় না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে গল্প বা চিত্রনাট্য আমার তেমন পছন্দও হতো না।

বেশ কয়েকবার পেয়েছেন মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার। পুরস্কার পেতে কেমন লাগে?

আমাকে কেউ যদি বলে ‘বাহ্, ভালো হচ্ছে তো, হয়ে যাবে’, তবে আসলেই হয়ে যাবে। মানে আমি অ্যাপ্রিসিয়েশন খুব পছন্দ করি। আমাকে বকা দিয়ে কেউ কোনো দিন কাজ করাতে পারে না। মা যদি বকে বলত, ‘তুমি পড়তে বসো না কেন?’ আমি বই নিয়ে বসে থাকতাম। কিন্তু দশ পৃষ্ঠা পড়লেও বলতে পারব না কী পড়েছি। কিন্তু আম্মা যদি বলে, ‘তোমার গতবারের রেজাল্টটা ভালো ছিল। এবার তো নাচের ক্লাসট্লাস আছে, এবারের রেজাল্টটা ভালো হলে সবাই কিন্তু খুশি হবে।’ আর কিছু বলা লাগত না আমি বসে পড়তাম পড়তে। তো পুরস্কার বা যা-ই হোক তা আসলে একধরনের অ্যাপ্রিসিয়েশন। এটুকুতেই আমি খুশি হই। পুরস্কারগুলো যখন পাই, তখন আমি খুশিতে ভাসতে থাকি। খুব খুশি লাগে।

আমরা আজ আপনার সাক্ষাত্কার নিচ্ছি। আপনি উপস্থাপক হিসেবে অনেকের সাক্ষাত্কার নিয়েছেন। সাক্ষাত্কার দিতে নাকি নিতে, কোনটা বেশি ভয় লাগে?

দিতে ভয় লাগে। নিতে তার চেয়েও ভয় লাগে। দিতে ভয় লাগে  কখন কোন প্রশ্ন আসবে, কীভাবে উত্তর দেব, সেটা কীভাবে উপস্থাপন করা হবে এসব ভেবে। আর হয় কী,  মাঝেমধ্যে কয়েকটা অনুষ্ঠানে সবাইকে একটু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি আমি। যখন মনে হয়, এই প্রশ্ন যদি কেউ আমাকে করে আমি সেটা কীভাবে নিতাম। একজন সিনিয়রকে একটা প্রশ্ন করতে চাচ্ছি, তিনি রাগ করবেন কি না ভাবতে হয়। তাকে তো অবশ্যই সম্মান দিতে হবে। কারণ, উনি আমার অতিথি। সম্মানটুকু দেওয়ার পর কতটুকু বললে উনি মাইন্ড করবেন না, ওই সমীকরণটি মেলাতে হয়। তো এটাতে আসলে শুধু ভয় না, অঙ্ক, অনুষ্ঠানের মানটা কেমন হবে, দর্শকের জনপ্রিয়তা—সবকিছু চিন্তা করতে হয়।

আপনি যদি অপি করিমকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেতেন তাহলে কী প্রশ্ন করতেন?

(অবাক হয়ে) তাই তো! খুব খুব ভালো প্রশ্ন! এটা আমার জীবনে শোনা সবচেয়ে ভালো প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটি। এবং খুব কঠিন প্রশ্ন! কী প্রশ্ন করতাম? (একটু ভেবে) আচ্ছা। জিজ্ঞেস করতাম, ‘অপি, তুমি এত বোকা কেন?’

আর এর উত্তরে কী বলবেন?

আমি পজিটিভ মানুষ। পজিটিভ কিছু শুনলে আমি খুব অনুপ্রাণিত হই। অভিনয়ের চরিত্রগুলোকে বিশ্বাস করে ফেলি। এই বিশ্বাসটা পেশা, ব্যক্তিগত কিংবা বন্ধু জগত্ সব জায়গায়। কিন্তু কষ্টটা তখন হয় যখন আমি বুঝতে পারি, ‘এটা একটা খেলা ছাড়া কিছু নয়,’ আমাকে ঠকানো হয়েছে বা আমার মাধ্যমে অন্যকে ঠকানো হয়েছে। আমি ওই জিনিসগুলো ধরতে পারি না। আমার কাছে সব মানুষকেই  অসম্ভব মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন  বলে মনে হয়। কখনোই মনে হয় না কোনো মানুষ মিথ্যা বলে। কারণ, আমি মিথ্যা বলতে পারি না। কখনো যে চেষ্টা করিনি, এমন না। অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা কথাটাকেই একটু সুন্দরমতো ঘুরিয়ে বললেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু মনে হয় ওটা একটা সাময়িক সমাধান। আমি সেটা সত্য দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করি। সত্য কথা অনেকের কাছে অপ্রিয় ঠেকে। তাই সবার অপ্রিয়র তালিকায় সব সময় পড়ে যাই। এখন জীবনযাপন যে রকম হয়ে গেছে, সব জায়গায় ঠাসঠাস কথা, নীতির কথা বলাটা যে উচিত নয়, তা নয়। তবে এখন যা অনুভব করি সেটা হলো টাইমিং খুব প্রয়োজন। মুশফিকের মতো, টেন্ডুলকারের মতো, সাকিব আল হাসানের মতো। সব বল খেললে তো আর হবে না। এটা আমি এই বয়সে এসে বুঝতে পেরেছি।

নাটক বা চলচ্চিত্রে অভিনয় আর বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেলিং—দুটোর পার্থক্য কেমন?

বিজ্ঞাপন একটু কঠিন কারণ এতে সময় খুব কম। এত কম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এক্সপ্রেশন দিতে হয়। টেলিভিশনের নাটকও কঠিন। কঠিন বলতে সবকিছুতে একটু মনোযোগ দিতে হয়। তবে ওখানে সুবিধা হলো, ভুল হলে আবার করা যায়। কান্না না পেলে বলি, ‘একটু গ্লিসারিন দিয়ে যাও তো’। তবে আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন লাগে মঞ্চনাটক। কারণ এখানে কোনো রিটেক নেই। এ কারণে ভয়ও লাগে। কারণ, পুরো নাটকটি ভালোভাবে রপ্ত করতে হয়। নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করতে হয়। এমনকি একেক দিন একেক রকম হয় বলে অনেক ইন্টারেস্টিংও হয়। তাই এটাকে সবচেয়ে ভালোও লাগে। কারণ, নাটক শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানা যায়।

এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, জাদুর চেরাগ পেলে দৈত্যকে এমন ব্যবস্থা করে দিতে বলবেন, যেন অনেক অনেক মিষ্টি, আইসক্রিম খাবেন, কিন্তু মোটা হবেন না। আইসক্রিম কি আপনার অনেক প্রিয়?

আমার যেকোনো ধরনের মিষ্টি জাতীয় জিনিস খুব পছন্দ। আমার ধারণা ছিল, মিষ্টি খেলে ব্রেন ভালো হয়। ব্রেন ভালো হলে অঙ্ক ভালো পারা যায় এবং অঙ্ক ভালো হলে, আমি ১০০-তে ১০০ পাব! আমি জীবনে কোনো দিন অঙ্কে ১০০-তে ১০০ পাইনি। ৯৯, ৯৮ পেয়েছি। সেই থেকেই মিষ্টি খাওয়াটা একরকম অভ্যাস হয়ে গেছে। এখনো আমাকে রাতে-দিনে যখনই কিছু খেতে দেওয়া হোক না কেন, পরে একটা মিষ্টি খেতে হয়। যদি কিছুই না পাই, শুধু চিনি খাই।

নিজে যদি অন্যের ইচ্ছা পূরণ করার ক্ষমতা পেতেন, তাহলে কী করতেন?

আমি এ রকম ক্ষমতা নিতামই না। খুব সহজে কিছু পাওয়াকে আমার কাছে পাওয়া মনে হয় না। আমি একটা জিনিস অর্জন করে যদি বুক ফুলিয়ে বলতে না পারি এটা আমার অর্জন, তবে তার মূল্য নেই।

জার্মানির পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে নাটকে অভিনয় করেছেন খুব বেছে বেছে। নাটকের চরিত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোকে অধিক গুরুত্ব দেন?

এটা জার্মানিতে যাওয়ার আগে না শুধু। আমি যদি ১৯৯৮ থেকে আমার ক্যারিয়ার ধরি, মানে ১৯ বছরে আমার নাটকের সংখ্যা অন্যদের সমান নয়। আমি সব সময় বেছে বেছে কাজ করেছি।  বুয়েট চলাকালীন আমি কখনো শুটিং করিনি। বুয়েট মাঝেমধ্যেই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকত। তো ওই অনির্দিষ্ট সময়গুলোতে আমি নির্দিষ্ট কিছু নাটক করতাম। আর দ্বিতীয়ত, পাস করার পর যখন আমি শিক্ষকতায় ঢুকে গেলাম তখন পুরো বিষয়টাকে মনে হলো যে আমি আসলে কিছু জানি না, কিছু পারি না। আমি যে একটা স্টুডেন্টকে কিছু বলব, আমাকে তো আরও জানতে হবে। তো আমার পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। ওইখানে সময় পেতাম কম। আর প্রথম থেকে সপ্তাহে পাঁচ দিনই চাকরি। এটাও একটা কারণ। যতটুকু কাজ করি খুব অল্প সময়ের জন্য করি তো, সেটা যেন আমাকেও আনন্দ দেয়।

আপনি তো স্থপতি। ঢাকা শহরের বর্তমান বেহাল অবস্থার জন্য কাকে দায়ী করবেন?

প্রথমে দায়ী করব একজন স্থপতিকে। কারণ, তাঁকে সত্ হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্লায়েন্টকে। তারা না বুঝেই বিদেশি জিনিসপত্র লাগাতে চায়। যা কি না অনেক সমস্যার সৃষ্টি করে। তৃতীয়ত, যেটকু অংশ ছাড়তে হয় ক্লায়েন্ট সেটুকু অংশ না ছেড়ে বাড়ি বানাতে বলেন। আসলে এগুলো হলো ছোট ছোট ভুল। প্রত্যেকে যদি প্রত্যেকের জায়গায় ঠিক কাজ করে, তাহলে এই ভুলগুলো হয় না। তখন প্রশ্নও আসে না। তখন কোনো কিছুই বেহাল থাকে না, সবই হালে হাল! আর সবাই যখন কোনো কাজ করবে তার প্রভাব ভালো হলে খুব ভালো, খারাপ হলে খারাপ। তাই আমি সবাইকে দোষ দিতে চাই।

১০ বছর পর ঢাকাকে কোথায় দেখতে চান?

আমি ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার থেকে পড়ে এসেছি। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমি ঢাকায় অনেক সবুজ দেখতে চাই। আমাদের যেসব ছোট ছোট সমস্যা আছে, যার বেশির ভাগই আমাদের নিজেদের তৈরি, সেসব থেকে যেন আমরা বের হতে পারি।

আমি আসলে ঢাকাকে কেন, সারা বাংলাদেশেই অনেক গাছ দেখতে চাই। গাছ না থাকার কারণে মাটি থেকে যে গরমটা ওঠে, তার জন্য আরবান হিট আইল্যান্ড তৈরি হয়। সেটা থাকবে না এবং আমাদের এই জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকবে না। আর চাই ফ্রেন্ডলি পার্ক। যে পার্কগুলোতে বাচ্চারা গিয়ে খেলতে পারবে। পার্কগুলোতে বাস-ট্রাক পার্ক করে রাখবে না। পার্ক পার্কই, পার্কিং না।

আর নিজেকে?

আমার কাছে মনে হয় একটা বয়স পর্যন্ত তুমি শুধু শেখো, আরেকটা বয়সে তুমি বোধ হয় ওটাকে লালন করো। আরেকটা বয়সে শেখাও। আমার কাছে এখনো মনে হয় যে দেওয়ার মতো ও রকম জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা আমার তৈরি হয়নি। দশ বছর পর আশা করি ও রকম একটা জায়গার কাছাকাছি পৌঁছাব, যেখানে হয়তো কিছু দিতে পারব। সেটা মানবিক, শিক্ষা কিংবা চলচ্চিত্র বা যেকোনো জায়গা থেকেই হোক। আর আমার খুব ইচ্ছা আমি একটা হলেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করব। তা যদি দশ বছরের মাথায় হয়, দশ বছর পর নিজেকে একজন নির্মাতা হিসেবে দেখতে চাই।

যেসব সমালোচনা গঠনমূলক না, শুধু আপনাকে আহত করার জন্য, সেগুলোকে কীভাবে সামাল দেন?

সামাল দিতে হয়। কারণ, জীবন আসলে একটাই। যদি এখন এসব ব্যাপার নিয়ে মন খারাপ করে সময় নষ্ট করি, তাহলে অনেক আনন্দের সময় অপচয় হয় জীবন থেকে। এসব কথা শুনে বা জেনে আমার লাভটা কী? এমন না যে এসব কথা শুনে আমি নিজেকে সংশোধন করতে পারছি। আমি কি তাদের বোঝাতে পারব যে, ‘যাহা আপনারা বলিতেছেন তাহা ঠিক নহে’? যেটা আমি করতে পারছি না, সেটা নিয়ে চিন্তা করার কী দরকার? জীবনে ভুল তো মানুষ করেই, কেউ পারফেক্ট না। কিন্তু ওই ভুলটা বুঝতে পারলে আর কিছু চিন্তা না করে সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত। আর সত্ থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ পর্যন্ত বেঁচে আছি, ততক্ষণ জীবনটাকে কোনো না কোনোভাবে সার্থক করা উচিত। সার্থকতা মানেই যে জীবনে অনেক বড় কিছু করতে হবে এমন না। পরীক্ষায় ভালো ফল করা সার্থকতা হতে পারে। বা কোনো কাজ করলে এতে পাশের বাড়ির দাদুটার উপকার হলো অথবা বাবা একটু হাসল, মা হাসল অথবা রাস্তার একটা কুকুরকে তুমি গলায় একটা বেল্ট পরিয়ে দিলে, সেটাও তো আসলে ভালো কিছুই করা হলো।

default-image

মন খারাপ হলে কী করেন?

ছোটবেলায় কী করতাম মনে নেই। আর একটু বড় হলে এসব গায়ে লাগাতাম না। আরও একটু যখন বড় হলাম, তখন কফিশপে গিয়ে কফি খেতাম। এখন বড় হচ্ছি আর মনে হচ্ছে আরও আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছি। এখন আমি কান্না ধরে রাখতে পারি না। নিজের রুমে গিয়ে কাঁদি। তখন মনটা আরও বেশি খারাপ হয়। কিন্তু এটা করা উচিত না। কারণ, ওই সময়টা নষ্ট হয়। কান্না কখনো কিছুর সমাধান হতে পারে না। এখন মনে হয়, ওই সময়টাতে না কেঁদে যদি ছবি আঁকতাম বা একটা বই পড়তাম,  একটা সিনেমা দেখতাম কিংবা পরিবারের সঙ্গে বিশেষ করে আম্মুর সঙ্গে সময় কাটাতাম, তাহলে সেটা আমার ভালো লাগত।

আপনার প্রিয় অভিনয়শিল্পী কে?

অনেক। যাদের কাজের মধ্যে আমি একধরনের সততা দেখি, মানে সে যখন চরিত্রটা করছে, তাকে যখন আমি ওই চরিত্রের বাইরে চিন্তা করতে পারি না, তখন তাকে আমার ভালো অভিনেতা মনে হয়। সেটা তুমি হুমায়ুন ফরিদী, আলী যাকের বা খালেদ খান বলো, আবার টম হ্যাংকস বা আমির খানই বলো।

প্রিয় গায়ক-গায়িকা?

আমার গান শোনার রেঞ্জ অনেক। সকালে যেমন কিশোরী আমানকার শুনি, আবার মেজাজ খারাপ হয়ে গলে আমি গানস অ্যান্ড রোজেসও শুনি। আর এখন যেহেতু আমাকে একটু পড়তে হয়, একটু মনোযোগ দরকার হয়। তাই ইন্সট্রুমেন্টাল শুনি বেশি। তবে গানের মধ্যে অবশ্যই রবীন্দ্রসংগীত বেশি প্রিয়। রবীন্দ্রসংগীতে একটা বিষয় আছে যে তুমি ভালো মুড, খারাপ মুড, কেউ ব্যথা দিয়েছে মুড—যে মুডেই থাকো না কেন, একটা না একটা কিছু তাতে পাবেই।

প্রিয় লেখক?

খুব কঠিন বলা। রবীন্দ্রনাথ ভালো লাগে, জীবননানন্দ ভালো লাগে। তারাশঙ্কর, শরদিন্দু ভালো লাগে। আমি এখন কই যাই বলো? জয় গোস্বামী খুব ভালো লাগে, হেলাল হাফিজও ভালো লাগে। আমার পড়তে ভালো লাগে, সেটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা। ছোটবেলায় বাদামের ঠোঙাও পড়তাম।

প্রিয় খেলোয়াড়?

মুশফিকুর রহিমের খেলা ভীষণ পছন্দ করি।

প্রিয় ব্যক্তিত্ব?

আমার কাছে অনেক মানুষের ব্যক্তিত্ব আকর্ষণীয়। ছোটবেলায় শুধু মনে হতো মাদার তেরেসা হব। একেকটা সময় একেকটা মানুষ কাজ করে। তবে আমার কেন জানি মনে হয়, কোনোভাবে একটুখানি হলেও যদি আমি আমার মায়ের ব্যক্তিত্বটা পেতাম! যদি সেরা ব্যক্তিত্বের কথা বলি—আমার মা।

প্রিয় বই?

আমার অনেক আছে, অনেক অনেক বই আমার। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল পছন্দ। এখন অরুন্ধতী রায়ের দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস পড়ছি। এটা ভালো লাগছে। সামনে আর্কিটেকচারের প্রতিযোগিতা আছে জেলখানাকে কীভাবে ব্যবহার করা যায় বিষয়ে। এজন্য আমি ঢাকার স্মৃতি বিস্মৃতি—মুনতাসীর মামুন পড়া শুরু করেছি। এক বসায় বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচা শেষ করেছি। এখন ওনার অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ছি।

default-image

যে কিশোরেরা আপনার মতো অলরাউন্ডার হতে চায়, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

অলরাউন্ডার হওয়ার দরকার নেই। এখন হয়তো বলবে যে নিজে এত কিছু করেন, তো কেন এটা বলছেন। সত্যি কথা বলতে কিছু হওয়ার জন্য এত সব করিনি। এগুলো ইচ্ছা আর আগ্রহের ওপর নির্ভর করে। নাচের প্রতি একধরনের ভালোবাসা ছিল। আবার পড়াশোনা ঠিকঠাক না করলে নাচ করতে দেবে না। সব মিলিয়ে যখন নাচটা করতে গেলাম তখন অভিনয়ও চলে আসছে, নাচও চলে আসছে। অভিনয়টা করতে একটু গলা সাধতে হয়। ফলে আবৃত্তি করতে হলো। এগুলো চলে আসে। কিন্তু কোনোটাই অলরাউন্ডার হওয়ার জন্য করিনি। এখন তুমি যদি আমাকে বলো আমার মেইন ফোকাস কী ছিল, আমি বলব নাচ। আমি শুধু পড়ালেখা আর নাচ করেছি। মাঝখানে কোথা দিয়ে যেন অভিনয় ঢুকে গেছে। এই তো। যেটা আমার রাস্তা সেটাতে আমি যেতে চাই। ওই রাস্তা দিয়ে আমাকে হাঁটতে হবে। রাস্তাটা যদি নির্দিষ্ট থাকে, আর সেখানে হাঁটার জন্য আমাকে যদি অন্য কিছু শিখতে হয়, ওটা শিখব।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0