default-image

বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের এক অপার বিস্ময়ের নাম সালমা খাতুন। জে কে স্কুলে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু করলেও তাঁর মন পড়াশোনায় তেমন ছিল না, ছিল ক্রিকেট খেলার মাঠে। প্রথম প্রথম পরিবারের সমর্থন না পেলেও নিজের চেষ্টায় আজ তিনি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দলের সফল অধিনায়ক। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্র্যাকটিসের ফাঁকে এই ক্রিকেটার মুখোমুখি হলেন কিআর সাক্ষাৎকার দলের। সেই দলে ছিল শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজের নওশীন ইবনাত, ধানমন্ডি গভ. বয়েজ হাই স্কুলের মাহমুদ সৌরভ, ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নিশাত আনজুম, হলিক্রম কলেজের সুমাইয়া সানজিদা ও বিএন কলেজের আবু সাঈদ নিশান।

আপনার শৈশব সম্পর্কে বলুন—

 সালমা খাতুন:  আমার ছোটবেলাটা তেমন বিশেষ ছিল না। তবে প্রচুর ক্রিকেট খেলতাম মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে। নারী ক্রিকেট দল সম্পর্কে তখনো জানা ছিল না। ১০-১২ বছর বয়সে এ সম্পর্কে জানতে পারি।

প্রতিবাদী কোন গল্প—যেখানে অন্যায়ের সামনে মাথা নিচু করেননি, প্রতিবাদ করেছেন শক্ত হাতে, যদি বলেন—

সালমা খাতুন:  প্রতিবাদী গল্প... আসলে বাসায় যখন ক্রিকেট খেলতাম, তখন আশপাশের মানুষ নানা রকম সমালোচনা করত। তখন সাধারণত মেয়েরা খেলত না, তাই ছেলেদের সঙ্গেই খেলতাম। এ জন্য তাদের সমালোচনার সুযোগ ছিল বেশি। কিন্তু আমি তা কখনোই প্রাধান্য দিইনি, এ জন্যই আমি আজ এ পর্যায়ে আসতে পেরেছি।

সব সময় যেটা চান ঘটুক কিন্তু ঘটে না এমন কিছু?

সালমা খাতুন:  সব সময় যা চাই তা যদি ঘটে তবে তো ভালোই হয়। আমার মনে হয় যেটা চাই তা ঘটে। অনেক কিছু না চাইতেও পেয়ে যাই। তবে মাঝেমধ্যে সব চাওয়া না ঘটলেও ক্ষতি নেই।

অনেকে বলেন, যাঁরা খেলাধুলায় আসেন, তাঁরা নাকি খুব চঞ্চল হয়ে থাকেন। কী মনে হয় আপনার? চঞ্চল ছিলেন খুব?

সালমা খাতুন:  না, আমি ছোটবেলায় চঞ্চল ছিলাম না। চুপচাপই থাকতাম। কিন্তু এখন খেলার কারণে একটু চঞ্চল তো হতেই হয়।

ধরুন আপনি দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি, আপনাকে তিনটি জিনিস পরিবর্তন করতে হবে। কী হতো সেগুলো?

সালমা খাতুন:  প্রথমত, আমি নিজ দেশের পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে চাই। দ্বিতীয়ত, দেশের জনগণের কাছে চাইব যাতে তারা সংঘাতমুক্ত ও সুন্দরভাবে জীবন যাপন করে। সর্বশেষে চাইব আমার দ্বারা দেশের উন্নতি হোক। আর তা যদি না হতো তবে ক্ষমতা ছেড়ে দিতাম।

প্রিয়

রং: সাদা

প্রিয় ক্রিকেটার: সাকিব, মুশফিকুর। নারী দলের প্রিয় ক্রিকেটার: সুকতারা, পান্না, পিংকি।

ব্যক্তিত্ব: ইমতিয়াজ হোসেন পিলু (কোচ)

খাবার: গরুর কলিজা

জায়গা: খুলনা (নিজের বাসায়)

শট: পুল

অবসর সময় গান শুনতে এবং বিশ্রাম করতে পছন্দ করেন।

অন্য দেশের প্রিয় ক্রিকেটার (পুরুষ): শচীন টেন্ডুলকার, গেইল, নারী: ঝুলন গোস্বামী (ভারত)।

পোশাক: থ্রি পিস

মাঠ: শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম, মিরপুর।

default-image

শৈশবের কোনো মজার স্মৃতি কি আমরা জানতে পারি?

সালমা খাতুন:  আসলে শৈশবে ও রকম কোনো মজার স্মৃতি আমার নেই। খেলার ভেতরে অনেক মজার স্মৃতি আছে। সত্যি কথা বলতে আমার শৈশবের মজার স্মৃতির কথা মনে নেই।

ক্রিকেটে প্রথম কার মাধ্যমে সালমা খাতুনের হাতেখড়ি হয়েছে? ক্রিকেটে এলেন কীভাবে? অনুপ্রেরণা কে?

সালমা খাতুন:  আমি ছোটবেলা থেকে নিজে নিজেই খেলা শিখেছি। যখন ছেলেরা ক্রিকেট খেলত তখন আমি দেখে দেখে খেলা শিখেছি। খুলনায় যখন ওমেন্স ক্রিকেট টিমে খেলা শিখতে যাই, তখন আমাকে শ্রদ্ধেয় সালাউদ্দিন স্যার, শংকর স্যার এবং পিলু স্যার ভালোভাবে ক্রিকেট খেলা শিখিয়েছেন।

ক্রিকেটে আসার পেছনে পরিবারে উৎসাহ কেমন ছিল?

সালমা খাতুন:  ছোটবেলায় যখন ক্রিকেট খেলতাম তখন উৎসাহটা একটু কম ছিল। কারণ তখন কেউই জানত না যে আমি বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট টিমের জন্য বাছাই হয়েছি। তখন পরিবার থেকে এমনকি আমার গ্রামের আশপাশের লোকেরা অনেক উৎসাহ দিয়েছিল। এখনো যখন আমি খুলনায় যাই, তখন গ্রামের সবাই উৎসাহিত হয়ে আমাকে দেখতে আসেন।

দেশের নারী ক্রিকেটের উন্নতির জন্য কোন জিনিসটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?

সালমা খাতুন:  আমাদের দেশে নারী ক্রিকেটারদের জন্য একটি আলাদা জায়গা, আালাদা একটি মাঠ দরকর।

১৩ বছরের একটা মেয়ে আপনাকে এসে বলল সে আপনার মতো ক্রিকেটার হতে চায়। তখন তাকে কী পরামর্শ দেবেন?

সালমা খাতুন:  আমি তাকে অবশ্যই বলব শুধু ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখলেই হবে না। নিজের সব মনমানসিকতা ক্রিকেটের মধ্যে দিতে হবে। যেমন আমরা যখন পড়াশোনা করি তখন শুধু আমরা পড়াশোনায় মন দিই। তেমনিই ক্রিকেটে মন দিতে হবে। যদি কোনো মেয়ে আমাকে এসে এই প্রশ্ন করে তখন আমি তাকে বলব যে সে যাই খেলুক না কেন তার কোচকে অনুসরণ করতে হবে। কোচের ইনস্ট্রাকশন পালন করতে হবে।

কী নিয়ে সব সময় ভয় কাজ করে?

সালমা খাতুন:  আসলে ক্রিকেট যখন খেলতাম, তখন বাবা-মা কখনো বকা দেননি। ভয় ছিল একটাই, আমি যে খেলাটা শিখছি কখনো কি সেটা কাউকে দেখাতে পারব কি না। পরে আমি এই ভয়টা অতিক্রম করে ফেলি।

মেয়ে হয়ে ক্রিকেটে আসতে কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন?

সালমা খাতুন:  আসলে আমাকে তেমন কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। শুধু মা মাঝেমধ্যে বকতেন। কারণ আমি বই-খাতার ব্যাগ ফেলে রেখে ক্রিকেট খেলতে চলে যেতাম।

default-image

এখনো বাংলাদেশে মেয়েদের খেলাধুলায় আসতে নানা ধরনের পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, এ ধরনের সমস্যা দূর করতে আপনার মতামত কী?

সালমা খাতুন:  এ সমস্যাগুলো দূর করতে হলে মেয়েটিকে মন থেকে শক্ত হতে হবে। নারী ক্রিকেটকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। আমি বরাবরই বলি, নারী ক্রিকেটের জন্য আলাদা জায়গা, মাঠ, প্র্যাকটিসের সুযোগ ইত্যাদি দরকার। এসব ব্যাপারে গুরুত্ব প্রয়োজন। কতৃ‌র্পক্ষ গুরুত্ব দিলে ধীরে ধীরে মানুষও গুরুত্ব দেবে। এভাবে সমাজ-পরিবার নারী ক্রিকেটকে গুরুত্বের চোখে দেখবে। তখন আর এসব সমস্যা হবে না।

বিশ্বকাপের ফাইনাল। প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া। ১ বলে ৬ রান বাকি। ঠিক তখন কী করবেন?

সালমা খাতুন:  (হাসি) কঠিন কাজ। কিন্তু আমি অবশ্যই চেষ্টা করব দলকে জেতানোর।

একজন সফল নারী ক্রিকেটার হতে হলে কী কী গুণ থাকতে হয়?

সালমা খাতুন:  সফল হতে গেলে অবশ্যই পরিশ্রমী ও শক্ত-সামর্থ্য হতে হবে। পড়াশোনাটাও ভালো জানা প্রয়োজন। আমি তেমন পড়াশোনা করিনি। ভাগ্যগুণে সেটা কাটিয়ে উঠেছি। তবে পড়াশোনা জানা জরুরি।

রান্না করতে পারেন?

সালমা খাতুন:  (হাসি) একটু একটু পারি। ভাত, ডিম ভাজি, ডাল এগুলো পারি।

ক্রিকেট খেলা ছাড়া কোন কাজ করতে ভালোবাসেন?

সালমা খাতুন:  ব্যাডমিন্টন খেলতে ভালোবাসি।

আপনার মতে বর্তমানে বাংলাদেশ নারী দলে সেরা খেলোয়াড় কে?

সালমা খাতুন:  অনেকেই আমার পছন্দের। সুকতারা, পান্না, জাহানারা, পিংকি। আমার নিজের খেলাও নিজের পছন্দ।

জাতীয় দলের হয়ে প্রথম ম্যাচ খেলার অনুভূতি কী?

সালমা খাতুন:  অনুভূতি ভালো। আমি চিন্তিত ছিলাম আমার ইনজুরি নিয়ে। ভেবেছিলাম ইনজুরির জন্য যদি প্রথম ম্যাচেই বাদ দেয় তাহলে কেমন দেখাবে। আমার কোচ আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন তখন।

প্রথম ক্রিকেট ব্যাট কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন?

সালমা খাতুন:  (চিন্তিত) মামার কাছ থেকে। না, না আমার কোচ ইমতিয়াজ হোসেন পিলুর কাছ থেকে।

আপনি যখন ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দেবেন তখন জীবনকে কীভাবে সাজাবেন?

সালমা খাতুন:  খুব সম্ভবত কোচ হব।

জাতীয় টিমের?

সালমা খাতুন:  সেটা জানি না। তবে যেকোনো টিমের।

আগামী টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল খুব সম্ভবত আপনার নেতৃত্বেই খেলবে। এতে আপনার অনুভূতি কী?

সালমা খাতুন:  খুব ভালো লাগছে। আমার মনে হয় নারী ক্রিকেট টিম এবার বিশ্বকাপে ভালো কিছু করবে।

জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে কতটুকু সফল মনে করেন?

সালমা খাতুন:  আমি মনে করি আমি সফল। কারণ এ সময়ে দল বেশ উন্নতি করেছে। আরও উন্নতি করতে হবে। এ ছাড়া সবাই বলে থাকেন আমি সফল।

বোলিং না ব্যাটিং—কোনটা বেশি উপভোগ করেন?

সালমা খাতুন:  ব্যাটিং।

default-image

এ পর্যন্ত নিজের কাছে সেরা অর্জন কোনটি?

সালমা খাতুন:  আমার কাছে আমাদের নারী ক্রিকেট টিমের ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়াটা সেরা অর্জন।

কখনো কি বল মেরে কারও জানালার কাচ ভেঙেছিলেন?

সালমা খাতুন:  না, কখনো কাচ ভাঙা হয়নি। তবে অনেকবার খেলতে গিয়ে বাসায় বল চলে যাওয়ায় বকা শুনতে হয়েছে।

ক্রিকেটার না হলে কী হতেন?

সালমা খাতুন:  (হাসি) ক্রিকেটার না হলে এত দিনে কারও না কারও বউ হতাম। (আবার হাসি)

মাঠের যে মুহূর্ত আজও ভোলেননি...

সালমা খাতুন:  যেদিন আমার ক্যাপ্টেনসিতে আমরা ওডিআই স্ট্যাটাস পাই, সেদিনের মুহূর্ত সবচেয়ে স্মরণীয়।

বাংলাদেশের পুরুষ ক্রিকেট দলের আগেই কি নারী ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ জয় করতে পারবে?

সালমা খাতুন:  আসলে এটা বলা মুশকিল! তবে আমরা আমাদের সেরাটা খেলব। পুরুষ ক্রিকেট দলের আগে না হলেও পরে জয় করতে চেষ্টা করব।

অভিষেক ওয়ানডেতে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত বোলিং। (১০-০-৩৪-৪)। এটিই আপনার ওডিআইতে বোলিং ফিগার। প্রথম ম্যাচেই এত দুর্দান্ত বোলিং ফিগারের রহস্য কী?

সালমা খাতুন:  আসলে রহস্য বলতে কিছু নেই। আমি শুধু আমার সেরাটা খেলার চেষ্টা করেছি। তাই হয়তো সফল হয়েছি।

প্রত্যেক অধিনায়কের নিজস্ব দর্শন থাকে। আপনার অধিনায়কত্ব দর্শন কী?

সালমা খাতুন:  আমার খেলাটাও খেলতে হবে। পাশাপাশি অন্যদেরও গাইড দিতে হবে। খেলার সময় এই পুরো বিষয়টিকে মাথায় রাখি।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনেকেই স্লেজিং করেন। আপনার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে মজার স্লেজিং কী ছিল? আর আপনি নিজে কখনো স্লেজ করেছেন বিপক্ষকে?

সালমা খাতুন:  আমরা স্লেজিং করি না। অন্য টিমরা করে। লতাকে একবার ক্যাচ মিস করার পর দর্শক গ্যালারি থেকে স্লেজিং করেছিল। তখন লতার মন খারাপ হয়। আমাকে বলে ওই জায়গা থেকে তাকে সরিয়ে অন্য জায়গায় দিতে। তখন আমি ওকে বলেছিলাম, দর্শকেরা নিচে নামায়। আবার তারাই ওপরে ওঠায়। তারা অনেক কথাই বলবে। তুমি তা কানে না নিয়ে নিজের সেরাটা খেল।

বাংলাদেশে মেয়েরা কোথায় কোথায় ক্রিকেটের প্রশিক্ষণ নিতে পারে?

সালমা খাতুন:  শিখতে হলে বেশি বেশি খেলা দেখতে হবে। দেখতে দেখতেই শিখবে। আর বিভাগীয় শহরসহ অনেক জেলাতেই ক্লাব আছে। শেখার জন্য কোনো কমতি নেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0