বিজ্ঞাপন
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষণা কিন্তু এটাও বলেছিল যে যারা দিনে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমায়, তারা আট ঘণ্টা ঘুমানো কিশোর-কিশোরীদের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ হয়, আর অবসাদগ্রস্ত হয় ৭১ শতাংশের বেশি।

‘তুমি কি নৈশপ্রহরী নাকি যে তোমাকে রাত জেগে বসে থাকতে হবে?’ এটা শুনে আমার ভাগনে মেহেদী বলতেই পারে, ‘ভুল বললে মামা, আমাদের নাইট গার্ড মোটেও রাত জাগতে পারে না। বাড়ির সবার আগে সে-ই ঘুমায়।’

তবু আমি আমার ভাগনেকে সুযোগ পেলেই শুনিয়ে দিতে চাই, আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ, মেকস এ মেন হেলদি, ওয়েলদি অ্যান্ড ওয়াইজ। কিন্তু আমি তাকে বলি না স্বনামধন্য রাতজাগা প্যাঁচা থমাস এডিসন, উইন্সটন চার্চিল, জোসেফ স্তালিন, এলভিস প্রিসলি কিংবা এ আর রহমানের রাতজাগার কথা। কারণ, আমি চাই না আমার ভাগনেটা রাত জাগুক। ওর সকালে স্কুল আছে, পড়া আছে। রাত জেগে ফেসবুকিং কিংবা গেমস খেলার চেয়ে ওটা ওর জন্য বেশি জরুরি। রাতে কম ঘুমিয়ে সকালে উঠুক, সেটাও আমি চাইতে পারি না। কারণ, কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষণা কিন্তু এটাও বলেছিল যে যারা দিনে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমায়, তারা আট ঘণ্টা ঘুমানো কিশোর-কিশোরীদের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ হয়, আর অবসাদগ্রস্ত হয় ৭১ শতাংশের বেশি। তা ছাড়া যারা অতিরিক্ত রাত জাগে, তাদের শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমার আশঙ্কা বেড়ে যায়, রাত জগলে রক্তের চিনি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হয়, যার জন্য টাইপ টু ডায়াবেটিস হতে পারে। এ ছাড়া দেহে স্ট্রেস হরমোনের পরিমাণ বাড়তে পারে, এমনকি বেড়ে যেতে পারে উচ্চ রক্তচাপের আশঙ্কাও। সম্প্রতি জার্মানদের এক গবেষণায় দেখা যায়, রাত জাগতে জাগতে একসময় ইনসমনিয়া হয়ে যেতে পারে। তখন কিন্তু তুমি চাইলেও ঘুমাতে পারবে না। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করা অসুখী ব্যক্তিদের তালিকায় তোমার নামটাও এন্ট্রি করতে হবে। তাঁরা আরও বলেছেন, যারা বেশি বেশি রাত জাগে, তাদের খারাপ নেশা করার প্রবণতাও বেড়ে যায়। কী ভয়ংকর কথা! অথচ তুমি কিনা পরীক্ষায় সামান্য দুটো নম্বর বেশি পাওয়ার আশায়ও মাঝেমধ্যে রাত জাগছ। কিন্তু তুমি কি জানো, মস্তিষ্কের সবচেয়ে ভালো বিকাশ কিন্তু ঘটে রাতে, ঘুমের মধ্যে। রাত জেগে তুমি একে যেমন বিশ্রাম নেওয়া থেকে বিরত রেখে তাকে চাপে ফেলছ, সেই সঙ্গে তাকে আবার বিকশিত হতেও বাধা দিচ্ছ। জীবনের পরীক্ষায় নম্বর কিন্তু উল্টো কমেও যেতে পারে।

default-image

আমি তাই তাকে ও তোমাকে শুনাতে চাই আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথাটি। তিনি বলতেন, ‘আমি ঘুমাতে খুবই ভালোবাসি, আর যতক্ষণ আমি জেগে থাকি, ততক্ষণ আমার জীবনের একটা লক্ষ্যই থাকে, তা হলো আবার কখন ঘুমাব!’ আইরিশরা বলে, ‘চিকিত্সকদের বইয়ে লেখা সবচেয়ে ভালো চিকিত্সা হলো, সুন্দর হাসি আর দীর্ঘ ঘুম।’ তাই বলে সারাক্ষণ তো আর ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যাবে না, তাই না? বিখ্যাত চিত্রশিল্পী লেওনার্দো দা ভিঞ্চি বলেছিলেন, ‘একটা সুন্দরভাবে কাটানো দিনই পারে ভালো একটা ঘুম উপহার দিতে।’ রাতে ভালো একটা ঘুমের আগে তাই দিনটাকেও সুন্দরভাবে কাটানোর চেষ্টা করতে হবে। মানে, ভালোভাবে জেগে থাকতে হবে। মনে রেখো, তুমি ঘুমাচ্ছ না মানেই কিন্তু জেগে আছো, এমনটি নয়। অনেক মানুষই স্লিপ এপ্নিয়া নামের একধরনের রোগে ভোগে, যারা ঘুমের মধ্যে কথা বলে কিংবা হাঁটে। সুতরাং, হাঁটা-চলা, কথা বলাই জেগে থাকার একমাত্র প্রমাণ নয়, সত্যিকারের জেগে থাকা হলো মানুষের মতো বেঁচে থাকা, মানুষের জন্য বেঁচে থাকা। সুন্দরভাবে জেগে থাকা যেমন জরুরি, তেমনি সুন্দরভাবে ঘুমানোও সমান জরুরি।

‘আমাদের অফিসের মিটিংগুলো বেশ সফলভাবেই সম্পন্ন হয়।’ আমার এই কথা শুনে পাভেল বলল, ‘এর জন্য আপনি কী করেন?’

আমি বললাম, ‘তেমন কিছু না। মিটিংয়ের সময় ঘুমাই।’

আমার প্যাঁচাল পাড়া শেষ; এখন বলটা তোমার কোর্টে ছুড়ে দিলাম। তুমিই সিদ্ধান্ত নাও, তুমি কি রাতজাগা প্যাঁচা হবে, নাকি শুভ্র সকালের কোকিল হবে।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন