যত্ন-আত্তি

দাঁতের যত্ন

বিজ্ঞাপন
default-image

জালাল স্যারকে ক্লাসের সবাই খুব ভয় পায়। স্যার ক্লাসে ঢুকলেই সব চুপ। একটা কথা শুনলেই হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন স্যার, ‘অ্যাই! কে কথা বলে? এক চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেব।’ স্যারের ট্রেডমার্ক ডায়লগ এটা। কিছু হলেই স্যার সবার দাঁত ফেলে দিতে চান। কে জানে, স্যারের হয়তো ডেন্টিস্ট হওয়ার শখ ছিল, হয়ে গেছেন গণিতের শিক্ষক। তবে স্যার আসলেই কখনো কোনো দাঁত ফেলেছেন কিনা সে বিষয়ে কারও তথ্য নেই। কিন্তু তাতে কী? হোমওয়ার্ক যেহেতু করিনি, চড় তো খেতেই হবে। আর সেই চড়ে  সত্যি সত্যি দাঁত পড়ে যায় তাহলে কী হবে? উত্তর দিলো ক্লাসের সবচেয়ে ভাবুক ছেলে সাদমান। এমন কোনো বিষয় নেই যেটা সে জানে না। গম্ভীর হয়ে সে বলল, শোন, যে কোনো দুর্ঘটনা কিংবা মারামারি বা স্যারের চড় খেয়ে  দাঁত পড়ে যেতেই পারে। তবে কিছু জিনিস জানা থাকলে এই দাঁতই রক্ষা করা সম্ভব। স্থায়ী দাঁত যদি পুরোপুরি বের হয়ে আসে, সে ক্ষেত্রে দাঁতটি পরিষ্কার ভেজা তুলা  কিংবা সাধারণ স্যালাইনের পানিতে ভিজিয়ে রেখে যত দ্রুত সম্ভব চিকিত্সকের কাছে ছুটে যেতে হবে। চিকিত্সক তখন দাঁতটি আগের জায়গায় পুনরায় স্থাপন করবেন। রোগীকে দ্রুত চিকিত্সকের কাছে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হলে বের হয়ে আসা দাঁতটি ঠান্ডা পানি দিয়ে ৩০ সেকেন্ড ধুয়ে নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই দাঁতের শিকড় স্পর্শ বা শিকড়ের কোনো আবরণ তুলে ফেলা যাবে না। সম্ভব হলে দাঁতটিকে মুখে পুনরায় স্থাপন করে আঙুল দিয়ে চেপে কিছুক্ষণ ধরে রেখে অথবা পাশের দাঁতের সঙ্গে সুতা দিয়ে বেঁধে যত তাড়াতাড়ি সম্ভবকোনো ডেন্টাল সার্জনের কাছে চলে যেতে হবে।’ উফ! সাদমান এত কথা বলতে পারে! আর কিছু কি বলা বাকি আছে? ‘ও, হ্যা। যত দ্রুত সময়ে তুমি চিকিত্সকের কাছে পৌঁছাতে পারবে, দাঁতটি রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা ততই বাড়তে থাকবে।’  

বাপরে! ওর সঙ্গে কথা বলে আমি একজন দন্ত গবেষক হয়ে গেছি। এখন আমিও জানি, দাঁত থাকতে দাঁতের যত্ন নিতে হয়।  ত্বক-চুলের যত্নে যতটা সময় দিতে হয়, দাঁতের বেলায় কিন্তু সেটা একদমই লাগে না। প্রথমেই ভালো দেখে একটা টুথব্রাশ বাছাই করতে হবে। বেশি শক্ত ব্রিসেলের টুথব্রাশ দাঁতের জন্য ক্ষতিকর। ব্রাশ নষ্ট হোক বা না হোক, তিন মাস অন্তর টুথব্রাশ পরিবর্তন করা উচিত। কারণ, পুরোনো আর দীর্ঘদিন ব্যবহূত ব্রাশে ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধে। প্রতিদিন সকালের খাবারের পরে ও রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দাঁত ব্রাশ করতে হয়। দাঁত ব্রাশটা ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্টে করাই ভালো। যেনতেনভাবে দুবেলা দাঁত ব্রাশ করলে কিন্তু হবে না। দাঁত ব্রাশেরও কিছু নিয়মকানুন আছে। এটা মানলে দাঁতের রোগ সহজেই এড়ানো যায়।    

default-image

ব্রাশের ব্রিসল দাঁতের সঙ্গে ৪৫ ডিগ্রি কোনাকুনিভাবে ধরে ওপরের পাটির দাঁত ওপর থেকে নিচে এবং নিচের পাটির দাঁত নিচ থেকে ওপরে ব্রাশ করতে হবে। আমরা সব সময় বাইরের অংশটুকুই সুন্দর করে ব্রাশ করি। দাঁতের ভেতরে ও বাইরের অংশে সমান সময় নিয়ে ব্রাশ করার অভ্যাস করতে হবে। তাড়াহুড়া করার কী দরকার, টেলিভিশন দেখে দেখেই না হয় মিনিট দুই ধরে দাঁত ব্রাশ করে ফেলো। দিনে দুবার ব্রাশ তো রইলই, চকলেট কিংবা মিষ্টিজাতীয় আঠালো খাবার খাওয়ার পরও সুযোগ থাকলে দাঁত ব্রাশ করো অথবা ভালো করে কুলিকুচি করে ফেলো। অনেকে খাবারের পরই দ্রুত দাঁত মেজে দায়িত্ব শেষ করে ফেলে। আসলে দাঁতটা মাজতে হবে খাবারের কমপক্ষে ২০ থেকে ৩০ মিনিট পরে। খাদ্যে থাকা বিভিন্ন ধরনের উপাদান মুখের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় আঘাত করে। মুখ ও দাঁতকে তার প্রাকৃতিক উপায়েই এই যুদ্ধটাকে সামলে নেওয়ার সুযোগ দিতে হয়।

default-image

অনেকের দাঁত রোগহীন কিন্তু দাগহীন নয়। দাঁতের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য অনেক বদভ্যাস কিন্তু ছাড়তে হবে। জেনেশুনে বিষ খাওয়ার মতো অনেকেই ধূমপান করে ফেলে। দাঁত দাগহীন করতে ছাড়তে হবে এগুলো। যারা অ্যালকোহল কিংবা সিগারেটে অভ্যস্ত, তাদের দাঁতে দ্রুত দাগ পড়ে যায়। কোমল পানীয়, কৃত্রিম ফলের রসও দাঁতে দাগ ফেলে দেয় কিংবা কালচে করে দিতে পারে। কোমল পানীয় কিংবা কৃত্রিম ফলের রস যদি খুব খেতে ইচ্ছে করে, খাওয়া শেষে ভালোভাবে মুখ ধুয়ে ফেলো। দাঁত সাদা রাখতে মাঝেমধ্যে খানিকটা লবণ দিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে পারো। পেস্ট দিয়ে যেমন করে দাঁত ব্রাশ করতে হয় ঠিক সেভাবে। লবণ ব্রাশে দাঁতের উজ্জ্বলতা খানিকটা বাড়বে, দাগও দূর হবে। তবে তোমার দাদা দাদী বা নানা নানিকে আবার এ কাজটা করতে উদ্বুদ্ধ করো না। কারণ যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, লবণ তাঁদের জন্য ক্ষতিকর। একটা মজার তথ্য জেনে রাখতে পারো, আপেলকে বলা হয় প্রাকৃতিক টুথব্রাশ! এটি খানিকটা দাঁত মাজার কাজও করে দেয়। তাই কিছু খাওয়ার পরে, একান্তই যদি দাঁত মাজার সুযোগ না থাকে, আপেল খেতে পারো। শরীরের খানিকটা ভিটামিনও গেল, সঙ্গে দাঁতও পরিষ্কার হলো!

লেখক: ওরাল ও ডেন্টাল সার্জন

মডেল : মুনিবা, আশু, ফয়সাল, অর্নিমা, সাফা ও সালমান

ছবি : সুমন ইউসুফ

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন