বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

ব্যাপারটাকে পাগলামি লাগছে না? এভাবে জীবন বাজি রেখে একক নৈপুণ্যে পাহাড়ে ওঠার কথা শুনলে বেশির ভাগ মানুষই তাই বলবেন। বলার কারণটাও তো ফেলনা নয়! বেশির ভাগ মানুষই এই চেষ্টা করতে গিয়ে মারা গেছেন। সুদীর্ঘ সেই মৃত্যুতালিকার জন্য সমালোচকেরাও এটাকে বাজে আর বিপজ্জনক খেলা হিসেবে দেখেন। হাতে গোনা কয়েকজন কেবল এতে খেলার রোমাঞ্চকর অনুভূতি টের পান। তাঁদের মধ্যে বড় নাম অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহী পল প্রয়েস। যাঁকে ‘একক নৈপুণ্যে পাহাড়ে ওঠা’র জনক বলা যায়। তাঁর মতে, সত্যিকারের পর্বতারোহণ হচ্ছে কোনোরকম কৃত্রিম যন্ত্রপাতির সাহায্য না নিয়ে কেবল শারীরিক ও মানসিক দক্ষতা দিয়ে পাহাড় জয় করা। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই দড়ি ছাড়া একক নৈপুণ্যে প্রায় ১৫০ বার পর্বতারোহণ করে ইউরোপজুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন পল প্রয়েস। কিন্তু ১৯১৩ সালের ৩ অক্টোবর অস্ট্রিয়ান আল্পসের ম্যান্ডকোজেলের উত্তর ভাগের পাহাড় একক নৈপুণ্যে আরোহণ করার সময় পড়ে গিয়ে তাঁকেও মৃত্যুবরণ করতে হয়।

প্রয়েস মারা যান, কিন্তু বেঁচে থাকে তাঁর আইডিয়া। যেটা ষাট ও সত্তরের দশকের আরোহীদের নিজ নৈপুণ্যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই পাহাড়ে চড়তে উৎসাহী করে তোলে। তবে আবার সাড়া ওঠে ১৯৭৩ সালে, যখন হেনরি বারবার ইয়োসেমাইটের সেন্টিনেল রকের উত্তর ভাগের খাড়া ১ হাজার ৫০০ ফুট উঠে যান কোনো দড়ি ছাড়াই। কিন্তু ১৯৮৭ সালে কানাডিয়ান যুবক পিটার ক্রফট তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। এক দিনেই পরপর ইয়োসেমাইটের বহুল পরিচিত দুই পাহাড় অ্যাস্ট্রোম্যান ও রস্ট্রাম জয় করে ফেলেন।

default-image

ক্রফটের কীর্তির বহুদিন পর, ২০০৭ সালে ইয়োসেমাইটের উপত্যকায় আসেন ২২ বছর বয়সী লাজুক যুবক অ্যালেক্স হোনোল্ড। ক্রফটের কীর্তির পুনরাবৃত্তি মানে এক দিনেই আবারও অ্যাস্ট্রোম্যান আর রস্ট্রাম জয় করে শোরগোল ফেলে দেন হোনোল্ড। পরের দুই বছর আরও কয়েকটি পাহাড়ি পথ একক নৈপুণ্যে আরোহণ করে ফেলেন। কিন্তু তাতে মন ভরছিল না তাঁর। আরও বড় কোনো অর্জন চাই!

২০০৯ সালে প্রথমবার হোনোল্ড এল কাপিতানকে খালি হাতে জয় করার ইচ্ছা পোষণ করেন। আশপাশের সবাই পাগলাটে এক ইচ্ছাই ভেবেছিল এটাকে। কিন্তু তিনি বদ্ধপরিকর। আত্মবিশ্বাসও আকাশচুম্বী। সঙ্গে পাথুরে দেয়াল বেয়ে ভোজবাজির মতো তরতর করে উঠে যাওয়ার দক্ষতা তো ছিলই।

default-image

যে–ই ভাবা সেই কাজ! এল কাপিতান নিয়ে গবেষণায় নেমে পড়েন অ্যালেক্স। দিনের পর দিন পড়ে থাকেন এটা নিয়েই। কখনো দড়ি নিয়ে পুরোটা ওঠেন। কখনো–বা খালি হাতে কিছু অংশ। কখনো মধ্যদুপুরে, যখন রোদের তাপে পাথর আগুনের মতো হয়ে থাকে, তো কখনো শীতের ভোরে যখন আঙুল অসাড় হয়ে যেতে চায়। দড়ি নিয়ে ওঠার সময়ও চলতে থাকে পরীক্ষা। হাতের আঙুল, কাঁধ, পা, বাহু—শরীরের যত অংশের সাহায্যে বেয়ে ওঠা যায়, সবগুলোর সাহায্যেই উঠতে থাকেন। সঙ্গে দম, ফুসফুসের জোর, শারীরিক নিয়ন্ত্রণ, আচমকা ঘটা সমস্যার সমাধান আর মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করাটা তো ছিলই। কিন্তু প্রতিবারই মসৃণ কয়েক ফুট পার হওয়া ছিল ভয়ানক অংশের শুরু। কারণ ওপরের দিকটা আরও ভয়াবহ। চিমনির মতো ফাঁকা পাথুরে ভাঙা অংশ রয়েছে, যেটায় হাত-পা সর্বোচ্চ পরিমাণ প্রশস্ত করে দিয়ে কেবল হাত-পায়ের তালু ব্যবহার করে এক এক ইঞ্চি করে উঠতে হবে। তার ২ হাজার ৩০০ ফুট ওপরে রয়েছে আরও জটিলতর ব্যাপার, যেটাকে বলে বোল্ডারস প্রবলেম বা নুড়ি পাথরের সমস্যা। যেটা উঠতে সবচেয়ে বেশি কসরত করতে হয়।

বছরখানেক ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবেই অনুশীলন করে গেছেন হোনাল্ড। সুনিপুণ দক্ষতার সঙ্গে প্রতিবার উঠেছেন দুরূহ পাহাড় বেয়ে। তবে পিছলেও পড়েছেন মাঝেমধ্যেই! কিন্তু ব্যর্থতা সফলতার স্তম্ভ। আর হোনাল্ড তো আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোনো কিছুই আটকাতে পারেনি, তাঁর মনোবলে চির ধরাতে পারেনি। হাতের তালুর মতো চিনে নেওয়া পথটাকে খালি হাতে তো জয় করেছেনই, বরং প্রায় দশ-বারোবার উঠেছেনও কোনো রকম দুর্ঘটনা ছাড়া। পর্বতারোহণের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়েই থাকবে একক নৈপুণ্যে অ্যালেক্স হোনোল্ডের এল কাপিতান জয় করাটা।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন