বিমানবন্দরের এই পাঁচ ফাঁদ থেকে যেভাবে বাঁচবে
একটু ভাবো তো, তুমি বিমানবন্দরে ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছ, বসে বসে ফোনে স্ক্রল করছ। হঠাৎ খুব উদ্বিগ্ন চেহারার অপরিচিত একজন তোমার কাছে ছুটে এল। পকেটে বোর্ডিং পাস বা কিছু একটা খোঁজার ভান করে তাড়াহুড়া করে বলল, ‘ভাইয়া/আপু, আমার কফিটা এক সেকেন্ডের জন্য একটু ধরবেন?’
কী করবে তুমি?
ক. কফিটা হাতে নেবে। একটা কাপই তো, ধরলে কী আর হবে!
খ. ভদ্রভাবে না করে দেবে।
গ. কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে সেটা ছুঁতে পরিষ্কার মানা করবে।
তুমি যদি শেষ উত্তরটি বেছে না নাও, তবে তুমি হয়তো নিজের অজান্তেই মারাত্মক এক বিপদে পড়তে চলেছ! ওই সাদামাটা কফির কাপের ভেতর হয়তো লুকানো আছে মাদক, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই হয়তো গোয়েন্দা পুলিশের ডগ স্কোয়াড তোমার দিকেই এগিয়ে আসছে।
মানুষের দয়া আর সাহায্য করার মানসিকতাকে পুঁজি করে বিমানবন্দরে এমন অনেক ভয়ংকর ফাঁদ পাতা হয়। চলো জেনে নিই এমন পাঁচটি ফাঁদ সম্পর্কে এবং কীভাবে এগুলো থেকে নিজেকে বাঁচাবে।
ফাঁদ ১: ‘ব্লাইন্ড মিউল’ বা অচেনা বাহক
কেউ একজন এসে খুব সাধারণ একটা জিনিস—যেমন কফির কাপ, স্যুভেনির ব্যাগ বা জ্যাকেট তোমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে, একটু ধরো তো।
আসলে হয়তো ওই জিনিসের ভেতরে বা ব্যাগের ফলস-বটমে হয়তো মাদক লুকানো আছে। ততক্ষণে হয়তো ডগ স্কোয়াড নিয়ে পুলিশের টহল দল সেদিকেই আসছে। আর যে লোকটি তোমাকে জিনিসটা দিয়েছিল, সে চোখের পলকে ভিড়ের মধ্যে হাওয়া হয়ে যাবে! বিপদে পড়বে তুমি।
ফাঁদ ২: আঙুলের ছাপই প্রমাণ
তুমি হয়তো ভাবছ, ‘পুলিশ এলে বুঝিয়ে বলব যে এটা আমার না, আমি শুধু একজনের হয়ে ধরেছিলাম।’ কিন্তু বাস্তবে ঘটনাটি এত সহজ নয়। তোমার হাত ওই জিনিসে লাগার সঙ্গে সঙ্গেই তোমার আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট তোমার বিরুদ্ধে প্রধান প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বের নানা দেশে যেমন মালয়েশিয়া, ইউএই বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশের আইন খুবই কড়া। ‘আমি শুধু ধরেছিলাম’—এই কথার সেখানে কোনো আইনি ভিত্তি নেই। মাদকসংক্রান্ত এসব মামলায় শাস্তি শুরু হয় ২০ বছরের জেল থেকে, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে!
ফাঁদ ৩: মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে চুরি
এটায় হয়তো মাদক থাকে না, থাকে নিখুঁত চুরির ছক। কেউ একজন তোমার হাতে কিছু একটা ধরিয়ে দিল, আর তুমি সেটার দিকে তাকাতেই পেছন থেকে তার পার্টনার তোমার ব্যাগ ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলল।
তুমি মুখ তুলে তাকানোর আগেই তোমার পাসপোর্ট, টাকা আর কার্ড গায়েব! তোমার মনোযোগ একটা দিকে আটকে রেখেই ওরা তোমার সর্বস্ব লুটে নেয়।
ফাঁদ ৪: টার্গেট যখন ‘ভালো মানুষ’
প্রতারকরা কখনো তাড়াহুড়া করা, রাগী বা অন্যমনস্ক কাউকে টার্গেট করে না। তারা এমন কাউকে খোঁজে, যাকে দেখে শান্ত, দয়ালু আর রিল্যাক্সড মনে হয়।
কারণ, একজন ভালো মানুষের কাছে মুখের ওপর ‘না’ বলাটা অভদ্রতা মনে হয়। ওই যে তুমি এক সেকেন্ড ইতস্তত করলে বা একটু ভদ্রতা দেখাতে গেলে, ঠিক সেটাই ওদের দরকার। তোমার এই মানুষের প্রতি দরদ আর সামাজিক স্বভাবটাই ওদের প্রধান হাতিয়ার।
ফাঁদ ৫: সাজানো ইমার্জেন্সি বা ভুয়া বিপদ
বোর্ডিং গেটের কাছে হয়তো এক নারী অঝোরে কাঁদছেন—তিনি তাঁর ভারী ব্যাগটা তুলতে পারছেন না, এদিকে ফ্লাইট ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। অথবা একজন বয়স্ক মানুষের হুইলচেয়ার ভেঙে গেছে, একটা ছোট জিনিস ধরার জন্য তার খুব সাহায্য দরকার।
এগুলো পুরোটাই হয়তো তাদের সাঁজানো নাটক বা রিহার্সাল করা পারফরম্যান্স। এই ভুয়া বিপদগুলোকে এত নিখুঁতভাবে অভিনয় করা হয় যে তোমার কাছে একদম সত্যি মনে হবে এবং তুমি সাহায্য করতে এগিয়ে যাবে।
বাঁচার উপায় কী
মনে রাখবে, বিমানবন্দরে কেউ তোমার কাছে সাহায্য চাইলেই সে যে খুব বিপদে পড়েছে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। অচেনা মানুষ তোমার জন্য বিশাল ঝুঁকির কারণ হতে পারে। যদি কেউ তোমাকে কিছু ধরতে বলে, তবে এই নিয়মগুলো মেনে চলবে:
১. অচেনা কারও সঙ্গে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখ: অচেনা কেউ তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে শারীরিক দূরত্ব তৈরি করো।
২. হাত ওপরে ওঠাও: তোমাকে কিছু ধরতে অনুরোধ করলে দুই হাত ওপরে তুলে (সারেন্ডার করার মতো) বুঝিয়ে দাও যে তুমি জিনিসটা নিচ্ছ না। এতে অপরজন চাইলেও জোর করে তোমার হাতে কিছু ধরিয়ে দিতে পারবে না।
৩. সরাসরি ‘না’ বল: অচেনা কেউ তোমায় কোনো ব্যাগ/জ্যাকেট রাখতে দিতে চাইলে সরাসরি শক্ত গলায় বলো, ‘জিনিসটা মাটিতে রাখুন।’
এরপরও যদি তারা জোর করে, সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মীকে ডাকতে পার। এ ক্ষেত্রে তোমাকে কিছুটা অভদ্র মনে হলেও, হয়তো বড় কোন বিপদ থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে।